সাকিবকন্যার ছবি ও একটি বিকারগস্ত জাতি

শাহরিয়া দিনা:

বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান তার বড় কন্যা আলাইনার একটি ছবি শেয়ার করেছেন ফেইসবুকে। ফুটফুটে পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়ে সূর্যমুখী ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। খুব সাধারণ একটা ছবি। মুহূর্তেই ভাইরাল হলো এর কমেন্ট সেকশনে আসা কমেন্টের কারণে। এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করলো এই দেশের অধিকাংশ মানুষ কতটা জঘন্য যৌন বিকারগস্ত এবং মানসিক বৈকাল্যের অধিকারী অসভ্য মানসিকতার অধিকারী।

লেবাসধারী ধার্মিক বয়স্ক থেকে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া কে নেই ‘পাটক্ষেত’ টাইপ মানসিকতার তালিকায়! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন একটা বিষয় ঢালাওভাবে একই ধরনের মন্তব্য আসে তখন সহজেই অনুমেয় মুষ্টিমেয় মানুষের চিন্তাভাবনা।

কন্যাশিশু মানেই নিরাপত্তাহীন। লোভী চোখ চারপাশে। যে বয়সে সে নিজের শরীর চেনে না, দুনিয়া জানে না, ভালোমন্দ বুঝে না, তখন থেকেই কিছু শকুনের চোখের লোলুপ দৃষ্টি তাড়া করে ফেরে তাকে। এই শকুনের জন্মও কোন নারীর গর্ভ থেকে, এরাও কখনও জন্ম দেয় কোন কন্যাশিশুকে। জন্ম দেবার ক্ষমতা তো ইতর প্রাণীরও থাকে। শুধুমাত্র পুরুষাঙ্গ থাকলেই কি পুরুষ বলা যায় তাকে?

আমার কাছে পুরুষ শব্দটার ব্যাপকতা বিশাল, অবয়বও ততোধিক সুন্দর। পুরুষ মানে নির্ভরতা আর নিশ্চয়তার প্রতীক। যার হৃদয়ের বিশালতা কোন নারীর হৃদয়ের আশ্রয় হবে, চিন্তার গভীরতা পরিবারের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে, শারীরিক শক্তি কন্যাশিশুকে রক্ষা করবে জগতের যাবতীয় কলুষতা থেকে। আর পৃথিবীর সব সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো দেখবে।

সন্তান কিংবা শিশু শব্দের কোন বিপরীত লিঙ্গ নেই বাংলা ব্যাকরণে। সন্তান আপন-পর বলে আলাদা করারও কিছু নেই। সব মানুষই তো প্রকৃতির সন্তান। আমাদের হৃদয় গেঁথে আছে পরস্পরে। তবে আমরা ভাগ হই ধর্মে, জাতিতে, বর্ণে। এরপর আপন, পরে। শিশুদের প্রতি যার মমত্ববোধ নেই সে মানুষ হবার অযোগ্য।

এদেশের মানুষ যে কতটা সেক্সুয়্যালি ফ্রাস্ট্রেটেড সেটা অনুমান করা যায় সেলিব্রিটিদের পাব্লিক কমেন্ট সেকশনে আর মেয়েদের ইনবক্সের আদার বক্সে। কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার এক মূর্খ এবং নগ্নরুপ। এরা নোংরামি ছড়িয়ে দেয় সবখানে। পাত্রের মধ্যে যা থাকে ঢাকনা খুললে তো সেটাই বের হয়। সুগন্ধি পাত্রের থেকে যেমন সুগন্ধি ছড়ায়, তেমনি ময়লার ভাগাড় থেকে দুর্গন্ধ। ফেইসবুক অর্থ মুখবই হলেও অন্তরের প্রতিচ্ছবি এখানে ফুটে ওঠে। লাইক, শেয়ার, কমেন্ট জানান দেয় ব্যক্তির পার্সোনালিটির একটা বড় অংশ।

আমাদের শিক্ষা সার্টিফিকেট সর্বস্ব। তাইতো যতোটা স্বাক্ষরতা হার বেড়েছে, উন্নত আলোকিত মানুষ ততটা বাড়েনি। মানুষ হবার প্রথম পাঠ আসে পরিবার থেকে। তারপর পারিপার্শ্বিকতা, পরিবেশ, বিদ্যালয়, ধর্মীয় শিক্ষা ইত্যাদির মাধ্যমে। জ্ঞান আরোহন কিংবা ভালো মানুষ হবার জন্য যদি তাগাদা না থাকে তাহলে নৈতিক অবস্থা কি হতে পারে তার চিত্রই দেখতে পাই চারপাশে।

নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা নেই, ভালো মানুষ হবার পাঠ নেই, সঠিক সেক্স এডুকেশন নেই, আছে হাতে সস্তা চায়না মোবাইল সেট, কমদামে ইন্টারনেট সুতরাং মুঠোভর্তি পর্নোগ্রাফি! বানরের হাতে ঝুনঝুনি কিংবা পাগলের হাতে রাইফেল থাকার মতো অবস্থা।

সাকিবকন্যার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা আমেরিকার মতো উন্নত দেশে। মেয়েটে বড় হয়ে নিজের পূর্ব-পুরুষের দেশটাকে যদি ছোটলোকের দেশ বলে, অবাক হবার তো কিছু নেই! যদিও তখনও একদল ঠিকই তার জন্মপরিচয় উদ্ধার করতে আদা-জল খেয়ে নেমে পড়বে। আর কে না জানে, যে নিজস্ব শক্ত পরিচয় দাঁড় করাতে পারে না, সে-ই অন্যের কুষ্টিনামা নিয়ে পড়ে থাকে।

শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.