আমাদের মরচে ধরা একপেশে অভ্যস্ততা

ফারজানা নীলা:

আমরা অভ্যস্ততায় অভ্যস্ত। অভ্যস্ত বলে আমরা যা জনম জনম ধরে দেখে আসছি তাকেই স্বাভাবিক ভাবি। এর বাইরে কিছু দেখলে সেটা অস্বাভাবিক, ক্ষেত্র বিশেষে অগ্রহণযোগ্য। সেই ক্ষেত্র যদি হয় নারী, তবে অস্বাভাবিক হওয়ার আগে অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠে প্রথমেই।

আমরা জনম জন্ম ধরে দেখতে অভ্যস্ত যে নারী ঘরেই থাকে, ঘরের সকল কাজ করে, সবার সেবা করে। তাদের সাপ্তাহিক কোনও ছুটি নেই। তারা অসুস্থ, নতুন কেউ না আসা পর্যন্ত বা মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত এই রুটিনে আবদ্ধ থাকে। এর বিপরীত যদি দেখি কোন নারী বাইরের কাজ করছে, তাকেই বরং সবাই সেবাযত্ন করছে, ছুটির দিনে বা ইচ্ছে হলেই কোনও ভিন্ন আইটেম রান্না করছে, তাহলেই সেটা সংখ্যাগুরুদের চোখে খটকা দেয়। এই খটকা আক্রমণের দিকে যায় যদি দেখা যায় যে রান্না ঘরে থাকছে পুরুষ। সে যখন সবকিছুর তদারকির দায়িত্বে।

অথচ ঘরে নারী পুরুষ দুজনই থাকে। এই ঘরের সমস্ত দায়দায়িত্ব দুজনের সমান হওয়ার কথা। কেন শুধু এক পক্ষ উপার্জনের দায়টা কাঁধে নিবে আর অন্যপক্ষ উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসার তদারকির দায় নিবে।

ঘর ভাড়া, খাবার খরচ, চিকিৎসা খরচ, লেখাপড়া খরচ, মাসিক জমার খরচ এবং রান্না বান্নার কাজ, ঘর সামলানোর কাজ, আদর সেবার কাজ দুজন সমানভাবে ভাগ করবে। এক তরফা “আমি বাইরেটা সামলাবো, তুমি ভেতরটা সামলাবে” বলে “বিচার মানি তালগাছ আমার” হয়ে যায় প্রতিবার বা অসংখ্যবার বা অধিকাংশ বার।

এটা এক ধরনের চালাকি। নারী যদি স্বেচ্ছায় বা অযোগ্যতায় ঘরে থাকতে চায়, বাইরের কাজ তার জন্য যদি পাহাড়সম জটিল মনে হয়, তবে সেখানে আর তর্কের সন্দেহ থাকে না। কিন্তু যদি হয় এমন, নারীটিও সক্ষম বাইরের কাজ সামলাতে, কিন্তু “দুজনেই যদি বাইরে থাকি তবে সংসার দেখবে কে” রীতিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তবে সেটা “পুরুষের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া বুঝায়”। দুজনের সম্মতি বুঝায় না।

তা পুরুষদের বা সমাজের এই যুক্তিও মেনে নেওয়া যায়, “সংসার সামলাবে কে” এই যদি হয় মূল সমস্যা, তবে সেই সংসার সামলানোর দায়িত্ব মেয়েরাই কেন নেয় শুধু? কেন মেয়েরা বলে না বা বলতে জানে না যে, “বেশ, তবে তুমি সামলাও ঘর, আমি বাইরেটা দেখি”।

এই কথা শোনা যায় নারীদের মুখে? কান পাতলেও মনে হয় হিসপিসও শোনা যাবে না।

বলে না কারণ মেয়েরা বলতে অভ্যস্ত না। তারা তাদের মা’দের, বোনেদের, ভাবিদের, বান্ধবীদের দেখে এসেছে এভাবেই সামলায়। এর বিপরীত ভাবতে গেলে তাদের মনে অনেক শঙ্কা দেখা দেয়। শঙ্কা দেখা দেওয়ার পরও যারা পুরোপুরি বিপরীত বলতে পারে না, কিন্তু দুজনই বাইরেটা সামলাবো রীতিতে চলে, তাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং উঠানামার মধ্য দিয়ে পারিবারিক সমস্যা চলতে থাকে এবং চলতে চলতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। হাতেগোনা পাওয়া যায় যাদের ভেতর আসলেই কে কোনটা সামলাবে এই প্রশ্ন কাজ না করে, বরং দুজনই দুইটাই সামলায়। তাদের দেখে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অভ্যস্ত হয়। এই অভ্যস্ততা দেখতে দেখতে তৈরি হয়।

তাই পরবর্তী প্রজম্ন যখন রঙ তুলি দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ছবি আঁকে, তখন শুধু “মা খুন্তি হাতে নিয়ে রান্নাঘরে রাঁধছে” আঁকে না। বরং আঁকে বাবা-মা একসাথে খুন্তি নিয়ে নাড়াচাড়া করছে বা বাবা মার দুজনরই অফিসিয়াল পোশাকে ল্যাপটপের সামনে বসার ছবি।

আমাদের সমস্যা আমরা একটা চিন্তায় নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলছি। বা করিয়েছে আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। সুগার কোট ব্যবহার করে সংসার সন্তানের মায়া দেখিয়ে “তুমি ঘর দেখো আমি তো আছি” টাইপ ন্যাকা কথা বলে মেয়েদের বাইরের জগতের সাথে লড়াই করা থামিয়ে দিতে চায়।

আমরা অভ্যস্ত এই দেখে এবং জেনে যে জগতের সকল খারাপ কাজ পুরুষরা করে। তারা খুন করে, চুরি করে, ডাকাতি করে, ধর্ষণ করে, ঘুষ খায় আর সিগারেট মদও খায়।

আর মেয়েদের কী করতে দেখে আমরা অভ্যস্ত? গতানুগতিন সংসারের কর্ম ছাড়াও মেয়েরা পান খায় তাও বুড়ি হলে, মেয়েরা কুটনামি করে, ননদ জা, প্রতিবেশীদের সাথে ঝগড়া করে। সিগারেট খোর স্বামীর এশট্রেটা পরিষ্কার করে রাখে। স্বামীর ঘুষের টাকা সাবধানে আলমারিতে তুলে রাখে। নতুন শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে সেই টাকার ব্যবহার হয়।

এর বিপরীত যদি হয়? মেয়ে সিগারেট, মদ খাচ্ছে, ছেলেদের মতো এদিক সেদিক যাচ্ছে ঘুরছে। এমনভাবে ছন্নছাড়া পড়ুন ‘ঘর ছাড়া’ জীবন যাপন করছে যেন সে মেয়ে না, ছেলে!

কী সাহস! ছেলেদের মতো জীবন যাপন করে! বেয়াদব মেয়ে!

অর্থাৎ মদ গাঁজা সিগারেট খাওয়া, এদিক সেদিক হইচই করে ঘুরে বেড়ানো ছেলেদের কাজ, বা ছেলেদের জীবন। যদিও আমরা জানি মদ গাঁজা সিগারেট খাওয়া সবার জন্যই খারাপ। কিন্তু সেটা ছেলেদের জন্য খারাপ শুধু খাতা কলমে। ছেলেদের জন্য যেগুলো খারাপ, সেগুলো মেয়েদের জন্য পাপ! নোংরা কদর্য পাপ! এই পাপের শাস্তি তাকে নষ্টা মেয়ে বলে ঘোষণা দেওয়া! তার চরিত্র নিয়ে কথা বলা। অথচ একই খারাপ কাজের জন্য ছেলেদের চরিত্র মূল্যায়ন হয় না, নষ্ট ভ্রষ্ট বলা হয় না।

কেন? ওই অভ্যস্ততা।

মেয়েদের আমরা সতীসাধ্বী নরম সরম, আলুথালু অবুঝ নির্বোধ কম বুদ্ধি মানুষ ভাবতে অভ্যস্ত। তাদের দ্বারা পান খাওয়া হতে পারে, মদ সিগারেট স্বপ্নেও না। এগুলা খায় তারা যাদের অনেক জটিল কাজ করতে হয়, ভাবতে হয়, লড়াই করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয়।

মেয়েরা কি জটিল কিছু করে? তাহলে পুরুষদের মতো সিগারেট খাবে কেন? উদ্দাম আনন্দ হইচইয়ে ভরা জীবন শুধু ছেলেদের একচছত্র অধিকার। পাহাড় ডিঙোবে শুধু পুরুষ, নারী কেন? নারী কেন এই খোলামেলা জীবনের স্বাদ নেবে? স্বাদ নিতে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে যদি আর ঘরে ফেরানো না যায়? যদি আর তাকে দমিয়ে থামিয়ে রাখা না যায়? তবে কার উপর পুরুষ কর্তৃত্ব দেখাবে? কার উপর অত্যাচার করে নিজেদের পৌরুষত্ব দেখাবে?

ভয়টা কোনো পুরুষ স্বীকার করে না, কিন্তু এই ভয়ের চেয়ে সত্য তাদের জীবনে নেই। তারা মানুক বা না মানুক। কোনও পুরুষ আজ পর্যন্ত বললো না যে “সিগারেট খেও না মেয়ে, শরীরের ক্ষতি হয়”। উল্টো বলে “সিগারেট খায় সে মানে নষ্টা”।

শরীরের জন্য ক্ষতিকর এই তথ্য দিয়েই তো সিগারেট না খেতে উৎসাহী করা যায়। চরিত্র নিয়ে টান মারতে হয় কেন?

কারণ চরিত্র নারীর ভূষণ ভাবতে আমরা অভ্যস্ত। নারীদের পরম পবিত্র করে রাখতে আমরা অভ্যস্ত। নারীকে সৌন্দর্যের প্রতীক আর পুরুষকে বীরের প্রতীক ভাবতে অভ্যস্ত। সুন্দরের সাথে কোনও খারাপ কিছু যায় না এই ভাবনাতে অভ্যস্ত বলে খারাপ কিছুর সাথে মেয়েদের দেখলে পুরুষরা চরিত্র নিয়ে টান দেয় মেয়েদের পবিত্রতা সম্পর্কে মনে করিয়ে দিতে।

এই অভ্যস্ততা ভাঙার জন্য যখন গণহারে মেয়েদের সিগারেট খাওয়ার ছবি দেখা যায় ফেসবুকে তখন আবার বলি “খারাপ জিনিসের ছবি শুধু খারাপ জিনিসের প্রতি ঝোঁক বাড়ায়”

ওহে মূর্খ পুরুষগন, সিগারেট খাওয়াকে শারীরিক ক্ষতিকর বিষয় না বলে চরিত্রের দোষ বলতে তোমাদের বাধে না যখন, তখন গণহারে খারাপ জিনিস খাওয়ার ছবি দেখতে দেখতে তোমাদের অভ্যস্ততায় একটু পরিবর্তন আনো!

পরিবর্তন আনার জন্য আসলে বেশি কিছুর প্রয়োজন নেই। শুধু চিন্তায় একটু ভিন্নতা আনলেই, সোজাকে সোজা বলে, সাদাকে সাদা বলে ভাবতে শিখলেই অনেক জটিল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

আমরা ভাবতে শিখি যা খারাপ তা ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য খারাপ। যা অর্জনযোগ্য, তা যোগ্যতা অনুযায়ী সবাই অর্জন করবে। ঘরের কাজ, বাইরের কাজ, ছেলের কাজ, মেয়ের কাজ বলে আলাদা না করে কাজ মাত্রই নারী-পুরুষ সমানভাবে যোগ্যতা ক্ষমতা শ্রম দিয়ে সাধ্য অনুযায়ী করবে। এই সামান্য পরিবর্তন আনতে পারলে আমাদের অনেক পুরনো অভ্যস্ততা নতুন অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.