দৃঢ় হোক প্রতিটি নারীর চলার পথ

এম শাহনাজ পারভীন চৌধুরী:

নারী জীবনের মুক্তি বলতে যদি কেউ মনে করে রান্নাঘর থেকে মুক্তি, তাহলে আমি বলবো এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। শুধু রান্না থেকে মুক্তি খুঁজে নিয়ে যদি জীবন শৃঙ্খলামুক্ত করা যেত, সেটা হয়তো এতোটা আলোচনার বিষয় হতো না।

যেই সংসার থেকে নারী মুক্তির অমোঘ বাণী প্রকাশিত হয়, সেই সংসারেই আরেক নারী তিলে তিলে শেষ হচ্ছে কিনা, তা কয়জন ঘুরে দেখে বা দেখার প্রয়োজন মনে করে তা আমার জানা নেই।তবে অনেক দেখেছি একি পরিবারের মেয়ের জন্য সবাই যেমন মুক্তির পতাকা আকাশে উড়াতে ভালোবাসে তেমনি কেন জানি পরিবারের বৌয়ের জন্য মুক্তির পতাকাটা নির্দিষ্ট সিন্দুকে তালাবদ্ধ করে রাখতেই বেশি ভালোবাসে। কেউ নিশ্চয়ই এই সত্যিটুকু অস্বীকার করবে না।

পরিচয়হীন জীবন নিয়ে কতদিন বাঁচা যায় প্রশ্ন করেও কি নারীকে পুরুষের পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়ার উস্কানি দেয়া হয় না? কেন আপনার নাম কি আপনার পরিচয় নয়? একটা মেয়ে কোনও পরিবারের বউ মানে তো এই নয় যে, তার সার্টিফিকেট তথা বাবার বাড়ির দেয়া শখের নাম এখন বিরক্তিকর।

মনে পড়ে আমারই এক বান্ধবী যখন তার সদ্যজন্ম নেওয়া সন্তানের রেজিস্ট্রি বুক এ۔۔ নিজের নাম লিখতে গেলো, তখন নাকি তার শাশুড়ি তার সম্পূর্ণ নাম লিখতে নিষেধ করেছে, যার প্রেক্ষিতে তার নাকি এতোদিনের চেনা নিজেকেও মনে হলো কোনও দেয়ালে আটকানো ক্যানভাস যেখানে যা মনে চায় তাই লিখে সম্পূর্ণ করে ছিঁড়ে ফেলা যায়। যেখানে একজন নারীর নাম লিখারই স্বাধীনতা নেই, সেখানে নারীমুক্তির আশা করা কতটা দুরূহ হবে, তাও আমার জানা নেই।

ছোটবেলায় ভাবতাম শিক্ষাই বুঝি নারীমুক্তির আসল উপায়। কিন্তু কালের বিবর্তনে বুঝতে পারলাম আমার এই ধারণাও ভুল। খবরের পাতা জুড়ে যখন লেখা থাকে কোনও শিক্ষিত মেয়ের লাঞ্ছনার কথা, তখন এর ভয়াবহ সমাধান খুঁজতেও মানুষ ভয় পায়।

তুমি যত শিক্ষিত হবে, যত তুমি তোমার আত্মপরিচয় বানিয়ে নিবে, সমাজের একস্তরের মানুষ বারে বারে তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিবে যে, ‘মেয়েমানুষ’ হয়ে এতো যশ নাম দিয়ে কী হবে, বিয়েশাদি করে সংসারী হও, সন্তান লালন-পালন করো, তা হলেই না সুন্দর। আর সাথে থাকবে কিছু সংসারী মেয়ের অসাধারণ উদাহরণ, আপনি নিজেকে যতই স্বাবলম্বী বানিয়ে ফেলুন না, তাতে কিছু যায় আসে না, কারণ শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে আপনার সমবয়সী পাশের বাড়ির বিবাহিত মেয়েটি, যে সমাজের চোখে স্বামীর সংসারে সন্তানসহ দিব্যি ভালো আছে। কতটা ভালো আছে তা ঐ মেয়েটির কাছে কেউ জানার প্রয়োজন মনে করে না। কারণ মেয়েরা তো বাঁচে অন্যের জন্য, তার নিজের কোনও মতামত কেন থাকবে, আর যদি থাকে তাহলে সে যেন নারীবাদী হয়ে গেলো।

মুক্তির পথেও যেন রয়েছে হাজারো বাধা। যেই হাতে খাতা-কলম তুলে দেন বাবা মা, আবার তারাই যেন সমাজের করাল গ্রাস থেকে মেয়েকে মুক্ত করতে খাতা-কলম কেড়ে নিয়ে সংসার বুঝিয়ে মুক্তি নিয়ে নেয়। বড়ই নিষ্ঠুর সেই দৃশ্য।

মনে পড়ে সেই বন্ধুটির নিষ্পাপ চেহারা যার খুব ইচ্ছে ছিল পড়ালেখাটা শেষ করার, কিন্তু তার বাবার অসুস্থতার জের ধরে অচিরেই সেই স্বপ্ন জলাঞ্জলি দিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হলো। হারিয়ে গেলো সেই বন্ধুটি স্বপ্নহীন হয়ে স্বপ্নময় কোনও সংসারের বেড়াজালে। তবে বেশ কয়েকবার ফিরে এসেছিলো আর ফিরে যাবে না মনে করে, কিন্তু সমাজ? হ্যাঁ, সমাজের চোখে ‘তালাকপ্রাপ্তা’ ‘একাকি’ ‘মেয়েমানুষ’ হয়ে থাকার থেকে অত্যাচারে জর্জরিত জীবনেই হয়তো সে ছায়া খুঁজে পেয়েছে, তাই তার জীবন ঐ নির্দিষ্ট গণ্ডিতেই বাঁধা পরে রইলো।

কেন একজন নারী তার পছন্দের জীবন বাছাই করে নিতে পারবেন না? সমাজের কাছে এই উত্তর চাইতে গেলেই নারীবাদী, খুব হাসি পায়-দুঃখের হাসি।সমাজকে বলতে ইচ্ছে করে হাজারও দুঃখিনী নারীর আত্মচিৎকার হয়ে- সমাজ তুমি মূর্খ, দিতে পারোনি মায়ের জাতির সম্মান। সমাজ তুমি সভ্যতার নগর হতে পারোনি। সমাজ তুমি ব্যর্থ।

সংসার হবে দুটি মানুষ দ্বারা সাজানো সুখের নীড়। যেখানে নারীপুরুষ দুইজনে মিলে শতভাগ সম্পূর্ণ করবে, সেখানে কে ঘর সামলাবে, আর কে বাইরে জব করবে, সেই প্রশ্নটা আমার কাছে নিতান্তই তুচ্ছ। আর যারা এইধরনের মনমানসিকতা থেকে এখনও বের হতে পারেনি, আমার কাছে তারা সেঁকেলে।সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সহযোগিতা থাকলেই আসলে সংসার জীবন সুন্দর হয়। মানুষকে মানুষ ভাবতে পারে যে, সেইতো প্রকৃত মানুষ।

পুরুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানে নারী মুক্তি নয়, নারীমুক্তি হলো নারীকেও তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দেয়ারই এক নাম। একজন পুরুষের জীবনে যেমন নারীর অবদান অস্বীকার করা যায় না, তেমনি যেন নারীর জীবনেও পুরুষের অবদান স্বীকৃত করতে কেউ পিছপা না হন, তারই নাম জীবন। একে অপরের এগিয়ে চলার সঙ্গী হওয়ার মধ্যেই সার্থকতা রয়েছে।

পুরুষের ছায়া হয়ে নারীর জীবন কাটবে, এইধরনের চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে যখন আমরা বুঝতে পারবো যে, নারীপুরুষ একে অপরের ছায়া, তখনই হয়তো সার্থক হবে মানব জন্ম। আর সবচেয়ে বড় সত্যি হলো- নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে মুক্তির আসল পথ, আর মনেপ্রাণে যেকোনও কিছু পাওয়ার আশা করে তা একদিন বাস্তব হয়ে আসবেই। দৃঢ় হোক প্রতিটি নারীর চলার পথ।

শেয়ার করুন:
  • 661
  •  
  •  
  •  
  •  
    661
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.