ভয়ে গা শিউরে উঠে

প্রমা ইসরাত:

বহুল আলোচিত মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ড নিয়ে ভাবতে গিয়ে ভাবনা নানান জায়গায় পাঁক খাচ্ছে। ঠিক কীভাবে কোথা থেকে ভাবনাগুলো গুছিয়ে নেবো সেটা বুঝতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বারবার মনে হচ্ছে, কাজ করার সুবাদে আমি বহুবার টেকনাফের সেই রোড দিয়ে যাতায়াত করেছি, যে রোডের বাতাসে মিশে আছে আরো কত অজানা মানুষের আহাজারি।

প্রথমেই শোক প্রকাশ করছি মেজর সিনহার মৃত্যুতে। মা নাসিমা আক্তার তাঁর সন্তানের এই হত্যাকাণ্ডটির বিচার পাবেন কিনা এই ব্যাপারে আমি উদ্বিগ্ন।
এই যে পুরো ঘটনাটি, সিনহা, সিফাত, শিপ্রা এবং তাদের ট্রাভেল ডকুমেন্টারি নির্মাণের স্বপ্ন, এইসবই একটা সুন্দর পরিণতি পেতে পারতো। সৃজনশীল কাজ, প্রতিভাশালী এবং কিছু স্বপ্নবাজ মানুষের কাজের মাধ্যমে হয়তো আমাদের দেশের সৌন্দর্য্য ফুটে উঠতো। কিন্তু তা হয়নি। পুরো ঘটনাটি দেখলে অনেকগুলো পয়েন্ট বেরিয়ে আসে। এবং খুব সঙ্গত কারণেই সেই পয়েন্টগুলোই আমার ভাবনার নানান জায়গায় পাঁক খায়।
প্রথমে ভাবনায় আসে আমাদের দেশে প্রচলিত দুটি সংস্কৃতির কথা। এক বিচারহীনতার সংস্কৃতি, এবং দুই ভয়ের সংস্কৃতি। এবং এই দুটি সংস্কৃতির প্রতিনিয়ত চর্চা, যা আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়, তার নাম মানবাধিকার।

প্রমা ইসরাত, লেখক ও আইনজীবী

মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বেশ কয়েকটি ইস্যু নিয়ে একই সাথে আলোচনা হচ্ছে। এবং সবচেয়ে আগুন গরম বিষয় হচ্ছে, শিপ্রা এবং তার চরিত্র। ঝুনঝুনি বাজিয়ে শিশুর দৃষ্টি ফেরানোর চেষ্টার মতোই অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে ঢেকে দিতে, সবচেয়ে কার্যকর যে ব্যাপারটি তা হচ্ছে, একটা নারী ঘটিত ব্যাপার টেনে আনা, এবং সেই নারীকে কেন্দ্র করে, তার চরিত্র বিশ্লেষণের দিকে মনযোগ সরিয়ে মূল বিষয়টিকে আড়াল করে রাখা।
ঘটনাটির দিকে তাকালে দেখি, যে অঞ্চলটিতে এটা ঘটেছে, অঞ্চলটার নাম টেকনাফ। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভাবে নানান অপরাধীদের অভয়ারণ্য। বর্ডার অঞ্চল হওয়ার জন্য, মাদক পাচার, চোরাচালান, মানবপাচার, নারী ও শিশু পাচার, এবং বর্তমানে রোহিঙ্গা ক্যাম্প হওয়ার কারণে, নানান সংকট এবং অপরাধে টইটম্বুর একটি এলাকা। এরকম একটি এলাকায় নাগরিকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই পুলিশ, প্রশাসন, তথা যৌথ বাহিনীর যথেষ্ট তৎপর থাকার কথা। ছদ্মবেশে, বা সাদা পোশাকে পুলিশের নানান কর্মকর্তাই দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

একটি ট্রাভেল ডকুমেন্টারি টিম, যে টিমে একজন নারীও আছে, এই করোনার সিজনে তারা ৩ জুলাই থেকে কক্সবাজার-টেকনাফ জোনে অবস্থান করছে, এবং এই বিষয়ে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন, কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা অবগত না, এই ব্যাপারটি খুবই আশ্চর্য লেগেছে। এবং সেইজন্যেই পুরো ঘটনাটি সঠিক তদন্তের দাবি রাখে।

মেজর সিনহা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তার হত্যাকাণ্ডটির তদন্ত চলছে। শিপ্রা এবং সিফাতের বিরুদ্ধে দুটি ভিন্ন থানায় মামলা দেয়া হয়েছে। যেখান থেকে তারা জামিনে ছাড়া পেয়েছেন। নূর বন্ড সই মানে মূচলেকা দিয়ে পুলিশের আটক থেকে ছাড়া পেয়েছে।
কিন্তু এদের মধ্যে শিপ্রার দিকে যদি তাকাই কয়েকটি ব্যপার দেখতে পাই, এক নারী হওয়ার জন্য শিপ্রার যেমন জামিন পেতে সুবিধা হয়েছে, তেমনি নারী হওয়ার জন্য, পুরো সোশ্যাল মিডিয়াতে তাকে স্লাট শেইমিং করা হচ্ছে। আইন এবং আদালতকে নারীবাদের আলোকে দেখতে গেলে দেখা যায়, আইন এবং আইনের কিছু চর্চাকে নারীবান্ধব মনে হয়, আদতে সেগুলো নারীবান্ধব হলেও তা মূলত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। তাই নারীর বিরুদ্ধে মামলা হলে শুধু মাত্র “নারী, সে অবলা অসহায়” তাই আদালত মাঝে মাঝে ব্যাপারটিকে শিথিল করে জামিন দেয়ার চিন্তা করে থাকেন।

এদিকে নারী হওয়ার জন্য শিপ্রাকে অনবরত সোশ্যাল মিডিয়ায় করা হচ্ছে স্লাট শেইমিং। তার ব্যক্তিগত ছবি, যেখানে সে ধূমপান করছে, তার হাতে মদের বোতল আছে, এবং যেখানে কারো সাথে তার ব্যক্তিগত মূহুর্তের ছবি আছে, সেগুলো অবলীলায় শেয়ার করা হচ্ছে, এবং তার চরিত্র যে কত খারাপ সেটা উল্লেখ করা হচ্ছে। চরিত্র খারাপ সেটা তুলে ধরছে, তার সিগারেট -মদ খাওয়ার উপর এবং পুরুষদের সাথে তার মেলামেশার উপর ভিত্তি করে। মানে, যেহেতু সে নারী, তো মদ সিগারেট এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা করার জন্যে সে একজন “খারাপ চরিত্রের নারী”। আর যেহেতু সে খারাপ চরিত্রের নারী, এবং সে শুধু শিপ্রা না “শিপ্রা দেবনাথ”, তাই এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় দোষী শিপ্রা। এবং মেজর সিনহা কেন, এমন একটি খারাপ চরিত্রের নারীর দেখা পেলো, সেটাও অনেকের ভ্রুকুঞ্চিত প্রশ্ন।

শিপ্রার এই খারাপ চরিত্র এবং তার বিরুদ্ধে মাদক মামলা দায়ের করা যে যুক্তিযুক্ত সেটা প্রমাণ করার জন্য, সেইসব ছবি দিয়ে পোস্ট করেছে খোদ একজন পুলিশ কর্মকর্তা। এবং দেদারছে সেগুলো শেয়ার হচ্ছে, নিশ্চয়ই তাদের অনেকেই পুলিশ বাহিনীতেই কাজে আছেন। এখন এই যে সাইবার বুলিং বা স্লাট শেমিং, এটা আইন অনুযায়ী অপরাধ। কিন্তু ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮ এ অধিকসংখ্যক অপরাধী হলে করণীয় কী, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট করে কোনকিছুর উল্লেখ নেই। শুধু মানহানির প্রেক্ষাপটে ধারা-২৯ এ কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যাবে তা উল্লেখ আছে।

তিক্ত একটি কথা হচ্ছে, অধিক সংখ্যক অপরাধীকে শুধু আইন দিয়ে বাধিত করা যায় না। তাই যে সমাজ পুরুষতান্ত্রিক এবং নারীবিদ্বেষী, সেই সমাজেরই সাধারণ একজন নাগরিক যখন পুলিশ বাহনীতে কর্মরত থাকে, তখন ভয়ের সংস্কৃতি চলমান থাকে।
কারণ পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণেই, একজন কর্মকর্তার ভুল অনুমানের বলি হতে হয় নাগরিকদের।
আমাদের দেশে পুলিশকে ক্ষমতাশীল করে রাখে, এরকম কয়েকটি আইনের মধ্যে একটি হচ্ছে, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট ২০১৮, এবং আরেকটি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮।

ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট এর ৪২ এবং ৪৩ ধারা দুটি, এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৮ এর ধারা ২১, শুরুই হয়েছে এইভাবে,
-“যদি কোন পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে…”
অর্থাৎ, ব্যক্তিকে আটক, তল্লাশী, সন্দেহের কারণে তদন্তের স্বার্থে তার জিনিসপত্র তল্লাশি এবং জব্দ, এই জাতীয় সকল কিছু করা যাবে, একজন পুলিশ অফিসারের বিশ্বাস অনুযায়ী। ভয়ে গা শিউরে ওঠে, এই ভেবে যে, “পুলিশ অফিসারে’র” মননে মগজে যদি থাকে রক্ষণশীলতা, পুরুষতান্ত্রিকতা, মৌলবাদ, কট্টর পন্থা, নারী বিদ্বেষ তবে, একজন সাধারণ নাগরিক কি পরিমাণ লাঞ্ছিত ও নিপীড়িত হতে পারে!!

এই যে আমার ভয়ে গা শিউরে উঠলো, এই যে আমার ফিকশন কিংবা ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকার বন্ধুরা ভয়ে কুঁকড়ে গেলো এই ভেবে যে এমন পরিস্থিতিতে তারাও পড়তে পারে। এই যে ফিল্ম নিয়ে পড়তে চাওয়া, কাজ করতে চাওয়া মেয়েটি শিপ্রার মানসিক ট্রমাটাইজড হওয়া এবং বিপদে পড়া দেখে পিছিয়ে গেলো, এটা হলো দুটি কারণে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, এবং ভয়ের সংস্কৃতি। আর এই দুটো সংস্কৃতি যদি চলমান থাকে, তাহলে কিছুতেই আমাদের মানবাধিকার নিশ্চিত হবে না।
যে শক্তি মানুষকে তার মর্যাদা নিয়ে বাঁচার অধিকার কেড়ে নেয় সেই শক্তি অশুভ। আর অশুভ শক্তিকে কিছুতেই জিততে দেয়া যাবে না।

#JusticeForShipra
#JusticeForSinha
#JusticeForSifat

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.