শিপ্রার ‘চরিত্র’ বা ‘জীবনাচরণ’ নয়, ফোকাসটা থাকুক অপরাধীর যথাযথ শাস্তির প্রতি

সালমা লুনা:

শিপ্রা দেবনাথ।
নামই যথেষ্ট। এখন আর কাউকে তার পরিচয় যদিও আলাদা করে দেবার কিছু নেই। তবু বলে রাখা ভালো কিছুটা।
শিপ্রা বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম এন্ড মিডিয়া বিভাগে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের খেয়াাল খুশিমতো ছবি পোস্ট দেয়। উচ্ছল, প্রাণবন্ত।
পড়ালেখার পাশাপাশি ডকুমেন্টারি বানায়। পড়ালেখার অংশ হিসেবেই এসব করতে হয় তাকে। এই কাজে সে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মো. রাশেদ খানের সাথে পরিচয়ের সুবাদে সে তার সাথেই কাজ করতে শুরু করে। তারই ভার্সিটির আরো দুই শিক্ষার্থী সিফাত ও তাহসিনও কাজ করে।
কাজের অংশ হিসেবেই তারা এক মাসের জন্য কক্সবাজার অবস্থানকালে গত ৩১ শে জুলাই রাতে মেজর সিনহা রাশেদ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। পুলিশ নিজের পিঠ বাঁচাতে শিপ্রা আর সিফাতকে গ্রেফতার করে মাদক আইনে। কারণ হিসেবে পুলিশ দেখিয়েছে তাদের ঘরে বিদেশি মদ, ইয়াবা ও গাঁজা পাওয়া গেছে।

অবশ্য ইয়াবা মেজরের গুলিবিদ্ধ লাশের পাশেও পাওয়া গেছে।
এই ঘটনার পানি গড়িয়ে অনেকদূর যায়।
শিপ্রা সিফাত জামিনও পেয়েছে পরে।
সিফাত পুরুষ, বেঁচে গেছে।
তাহসিন পুরুষ, বেঁচে গেছে।
সিনহা খুন হয়েও বেঁচে গেছে।
কিন্তু শিপ্রা নারী!
সে কীভাবে বাঁচতে পারে?
কেনই বা বাঁচবে?
বাঁচতে চাইলেই তাকে বাঁচতে দেয়া হবে কেন??

ফেসবুক জগতে মোক্তার ব্যারিস্টাররা আছেন! আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গোয়েন্দা। আছেন মোল্লা ব্রাহ্মণ, আর কূটনীতিবিদ। হাইল্লা জাইল্লা কামার কুমোর সবাই নেমে পড়েছেন সত্য সন্ধানে।

কোন নারী ঘটনার সঙ্গে জড়িত হলেই প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এর গোয়েন্দা বিভাগ খুঁজে বের তার আইডি। তারপর আইটি ইঞ্জিনিয়াররা চিপাচাপা থেকে কোন আমলে মদের বোতল জড়িয়ে ধরে ছবি দিয়েছিল, চায়ের স্টলে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিয়েছিল, প্রেমিক কিংবা প্রেমিকার গলা ধরে ঝুলে বসেছিল, খালি গায়ে ছবি দিয়েছিল, কোমর বুবস ক্লিভেজ দেখিয়েছিল, বন্ধুদের আড্ডায় তাস পিটিয়েছিল, কাকে ফান করে বলেছিল – তোরে খুন করবো এইসব মুহূর্মূহু বেরিয়ে আসতে থাকে।
তখন ডাক্তাররা পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেয়, এ তো আসলেই বেবুশ্যে।
সাথে সাথেই এ খুনী, এ অপরাধী – বলে হামলে পড়ে উকিল মোক্তাররা। তক্ষুনি পারলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয় দেয় অবস্থা।
প্রায় সাথে সাথেই মোল্লা ব্রাহ্মণ পাঞ্জাবি আর পৈতের খোট সামলাতে সামলাতে দৌড়ে এসে, ছিঃ ছিঃ ধর্মনাশ হলো – বলে থুতু ছিটায়।
বাকি হাইল্লা জাইল্লা কামার কুমোর তাঁতি এসে হাজির হয়, মাইয়া ও মাইয়া তুই অপরাধী রে গাইতে গাইতে।
এতো রোম্যান্টিক সবাই অবশ্য হয়ও না।
বেশিরভাগই মাইয়ার তিন প্রজন্মকে কবর থেকে উঠে বসিয়ে দেয়ার মতো গালি দেয়। পিতৃলোকে অবস্থিত পূর্বপুরুষগণের লজ্জায় মুখ দেখাবার উপায়টিও থাকে না।
আর যে আত্মীয়েরা বেঁচে থেকেন, তারা দুনিয়াতেই দোজখ আর নরক দর্শন করে নেন।

শিপ্রার বেলায়ও তাই হয়েছে অথবা হতে যাচ্ছে।
অবশ্য শিপ্রার বেলায় আরো একটি বিষয় স্বর্গের আলোকে উদ্ভাসিত হচ্ছে। সেটি হলো সে হিন্দু!
হিন্দু?
হ্যাঁ হিন্দু। দেবনাথ।
মেজর সিনহাকে গুলির আদেশ দিয়েছে যে প্রদীপ সেও হিন্দু। দাস।
অতি সাম্প্রদায়িক তো বটেই, অতি অসাম্প্রদায়িকও তাই বলাবলি করছে, এখানে একটি খেলা হচ্ছে।
ধর্ম ধর্ম খেলা।
একেবারে জমে গেছে।

জানা গেছে শিপ্রা সিগারেট খেতো। মদ খেতো। একলা তিন ব্যাটাছেলের সাথে কক্সবাজার গিয়েছিল। হাফপ্যান্ট পরতো। পেট দেখাতো। শিপ্রা সিনহাকে ‘আমার মানুষটা’ বলেছে। শিপ্রা সিনহাকে, এক মেজরকে তুমি করে বলেছে।

কিন্তু কেউ বলছে না শিপ্রা কারও টাকা মেরে খায়নি। শিপ্রা ব্যাংক ডাকাতি করেনি। শিপ্রা জমি জবরদখল করেনি। বলছে না সে মানুষকে ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়নি। গুম-খুন-অপহরণ করে টাকা আদায় করেনি। তাহলে তাকে নিয়ে আলোচনা কেন হচ্ছে?
কেউ বলছে না সে কাপড় খুলে উদোম হয়ে ঘুরলেই বা কার কী?
বলছে না আমরা শুধু সিনহা খুনের বিচার চাই।

যেসব উকিল মোক্তার ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার মোল্লা ব্রাহ্মণ গোয়েন্দা কামার কুমাররা এসব নিয়ে একটা কথাও বলেননা বলেননি বলবেনও না কোনদিন। তারাই একেকজন শিপ্রাকে দেখছেন মাইক্রোস্কোপের নিচে নিয়ে সে কতটা উলঙ্গ কতটা মদখোর কতটা ধোঁয়া উড়ায় আর কতটাই বা চরিত্রহীনা।

শিপ্রা মেজরকে ইজ্জত দেয়নি। তুমি করে বলেছে, সেটা মেজরের সাথে তার সম্পর্ক কেমন ছিল সেটার উপর নির্ভর করছে বললেই যে সে চরিত্রহীন হয়ে যায় না- কেউ বলছে না।
তার ফেসবুক ঘেঁটে মদের বোতল হাতে একটা ছবি পাওয়া গেলেই যে তার হোটেলের ঘরে মদের বোতল রেখে দিতে পারে পুলিশও, সেই চিরচেনা সত্যটা কেউ গ্রাহ্য করছে না।
এমনকি সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খানের মৃত্যুটাও আউট অব ফোকাস হয়ে যেতে চাইছে শিপ্রাকে নগ্ন করার আনন্দে।

অথচ সিনহা পুলিশের হাতে খুন হয়েছে। এবং এই হত্যাকাণ্ডের বিচারই এখন জরুরি। কারো মদ গাঞ্জা সিগারেট খাওয়া কিংবা হাফপ্যান্ট পরে দৌড়ানোর ছবি জরুরি না। বিচার এবং শুধু বিচার চাওয়াই জরুরি। সতর্ক থাকাও জরুরি যেন কোনভাবেই ফোকাস সরে না যায়।

হ্যাঁ বিচারও চাইতেই হয়। সতর্কও থাকতে হয় এদেশে। কারণ পুলিশ যেখানে অপরাধী, কান টানলে সেখানে অনেক মাথা চলে আসার সমূহ সম্ভাবনা। এবং এজন্যই এই খুন এবং খুন পূর্ববর্তী সকল অপরাধের বিচার চাওয়াই শুধু যৌক্তিক। আর কিছুই গুরুত্ব রাখে না।

শিপ্রার সমস্ত ডিভাইস কাদের কাছে? ইমেজ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় তাড়া করছে কাদের? শিপ্রার যে ছবিগুলো দুদিন ধরে ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলো ছড়ালো কে?

এসব প্রশ্নের উত্তর না চাইলে নাই।
এসব যেই যেই ছড়াক, যেই করুক আমি আপনি ঠিক থাকলেই তো হয়।
না, ঠিক থাকা যাচ্ছেই না, কারণ সমাজ ঠিক করার দায়িত্ব আজ ফেসবুকবাসীর হাতে এসে পড়েছে।
তাহলে ভয়ানক খুনি ওসি প্রদীপ কেন অন্ধকারে? প্রদীপের মতো পাপীর পাপের কাহিনী তো তেমন করে চোখে পড়ছে না। তাহলে নারী শরীর, নারী চরিত্র, এমন জঘন্য খুনী পুলিশদের চেয়েও বেশি ভয়ানক?

ওয়েলডান ফেসবুকবাসী।

নারী সিগারেট খেলে কিংবা হাফপ্যান্ট পরে ঘুরলেই সমাজ উচ্ছন্নে যায় না। সমাজ উচ্ছন্নে যায় অপরাধীকে বাঁচার রাস্তা তৈরি করে দিলে। সমাজ উচ্ছন্নে যায় পষ্ট অন্যায় দেখেও নানান তাইরে-নাইরে করে সেই অন্যায়কে পিঠ বাঁচানোর, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ করে দিলে।

আর হ্যাঁ, এভাবে অন্যের প্রাইভেসি লঙ্ঘনও একটি ঘোরতর অন্যায়, অপরাধ। অন্যের ছবি, ভিডিও তার অনুমতি ছাড়া ছড়ানোও অপরাধ। সবচেয়ে বড় কথা অন্যের ছবি নিয়ে তার চরিত্র কাটাছেঁড়া করাও অন্যায়, যা কোনমতেই আমার কিংবা আপনার সুরুচির পরিচয় দেয় না।

#JusticeForShipra

#JusticeForSinha

#JusticeForSifat

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.