নারীর প্রতি ঘৃণা যখন রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ডকে আড়াল করার কুটকৌশল

উইমেন চ্যাপ্টার:

পত্র-পত্রিকার মধ্যে দিয়ে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে আমরা এর মধ্যেই মেজর সিনহা হত্যার বিষয়ে জেনে গেছি। তারপরও ঘটনা বোঝার জন্য পিছনের ঘটনা প্রবাহ একটু টানতে হচ্ছে। গত ৩১শে জুলাই পুলিশের গুলিতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো: রাশেদ নিহত হয়। ঘটনাস্থল টেকনাফ থেকেই সিনহার দুইজন সহকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার দেখায় এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার আইনে মামলা দেয়। অন্যান্য বিচারবর্হিভূত হত্যার সাথে এই হত্যার দুটি মৌলিক র্পাথক্য আছে, এই প্রথম সেনাবাহিনীর সাথে সর্ম্পকিত কোন ব্যক্তিকে ক্রসফায়ারে হত্যা করা হলো। যে কারণে অন্যান্য ক্রসফায়ার যেমন পুলিশ বাহিনী খুব সহজেই উৎরে যেতে পেরেছে, এটি লুকিয়ে ফেলা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিষয় এই প্রথম পুলিশের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার চার্জশিট গঠন করা হয়েছে এবং চারজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।

ঘটনার যেসব ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট পত্রিকায় করা হয়েছে তা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে টেকনাফ থানার পুলিশ পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ডটি ঘটায়। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ দাসসহ অন্যান্যদের মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। এরকম পরিস্থিতে স্বাভাবিকভাবেই সামগ্রিক পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তির উপর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং নাগরিক সমাজ প্রশ্ন তুলতে থাকে। পুলিশ কর্তৃক ক্রসফায়ারে মৃত্যু আবারও আলোচনায় উঠে আসে। বিবিসি তাদের একটা রিপোর্টে পরিসংখ্যানটি শেয়ার করে।

এই রকম একটি পরিস্থিতে সিনহা হত্যার দুই সপ্তাহ পর সিনহার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথের একটি ইউটিউব ভিডিও প্রথমে ভাইরাল হয়। আশ্চর্যজনকভাবে এই ইউটিউব ভিডিওটি চ্যানেল ২৪ টেলিভিশন প্রচার করে। এই ভিডিওটি যেই দেখবে তার মনে হবে শিপ্রা অসম্ভব অসংবেদনশীল একজন মানুষ, তার বন্ধুর মৃত্যুর পরও সে আসলে কেমন করে পারছে তথ্য গোপন করতে, বিচার না চাইতে এবং সম্পূর্ণ মার্কেটিং ফোকাস একটি ভিডিও প্রচার করতে। এটি হলো প্রথম ধাপ।

দ্বিতীয় ধাপটি আসলে আতংকজনক। যেটির কারণেই মূলত এই লিখাটা লেখা। যেটি সরাসরি আমাদের দেশের নারী সমাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরুপ। ১৪ অগাস্ট থেকে শিপ্রার কিছু খুব ব্যক্তিগত ছবি ফেইসবুকে ভাইরাল হতে থাকে। যেই পোস্টগুলোর মূল বক্তব্য হচ্ছে যেহেতু শিপ্রার হাতে মদের বোতলসহ ছবি আছে, শিপ্রা সিগারেট খায় এবং হাফ প্যান্ট পরা ছবি আছে কাজেই খুবই সম্ভাবনা সে মাদক চোরচালানের সাথে যুক্ত থাকতেই পারে। সবচেয়ে আতংকজনক হলো এই আলোচনাটি তুলছে এবং প্রচার করছে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বশীল ব্যক্তি, আওয়ামী লীগের সরাসরি কর্মী দাবি করা আইডি থেকে। ঢাকা দক্ষিণের ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের এসপি মুহাম্মদ মিজানুর রহমান শেলী তার ফেইসবুক আইডি থেকে শিপ্রার খুব ব্যক্তিগত কিছু ছবি আপলোড করে লিখেছেন, “ফিডার হাতে শিপ্রা ও তার বন্ধু (যারা ভাবেন এরা ফিডার খায় আর পুলিশ মাদক মামলায় চালান দেয় …) আরো আছে … আসিতেছে ..” ।

এটি একটি সরাসরি হুমকিমূলক পোস্ট এবং নারীর প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানো পোস্ট। এই একই ভাষায় পোস্ট শয়ে শয়ে শেয়ার হয়েছে। যা কিনা আসলে অরগানাইজড প্রপাগান্ডার আওতায় পড়ে।
আমি আইনজীবী নই, কিন্তু আমার কমনসেন্সে আমি কতগুলো প্রশ্ন তুলতে চাই।

১. পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়ে উনি তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় এই ধরনের তথ্য শেয়ার করতে পারেন কিনা?
২. বিনা অনুমতিতে ব্যক্তিগত ছবি ভাইরাল করা বেআইনী কিনা?
৩. অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার আগেই উনি মাদক পাচারকারী হিসেবে পোট্রেট করার চেষ্টা করছেন, সেইটা বেআইনী কিনা?
যদি এই তিনটি প্রশ্নেই উনি আইন বহির্ভুত কাজ করে থাকেন, তাহলে এতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ কর্মকর্তা এই কাজটি করতে পারেন কিনা?

এই যে একজন নারীর বিরুদ্ধে এইভাবে সংগঠিত হয়ে প্রপাগান্ডা চালালেন, এইটাতো আসলে সংগঠিত ক্রাইম এর আওতায় পড়ে। একজন নারীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সাইবার ক্রাইম। এখন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে?

এবার আসি এই সংগঠিত প্রপাগান্ডাটি তারা কেন করলেন? এই যে শিপ্রাকে দুশ্চরিত্র দেখানোর চেষ্টা, সেটা কেন?

দেখেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হিসেবে আমাদের সমাজে প্রচণ্ডভাবে নারী বিদ্বেষ আছে। বিশেষ করে ফেইসবুকে ঢুকলেই আপনি দেখবেন জোয়ারের মতো এই নারী ঘৃণা এসে আপনাকে আঘাত করবে। একজন মেয়ের মদ খাওয়া, সিগারেট খাওয়া, হাফ প্যান্ট পরা এইগুলো আমাদের সমাজে খুন, ধর্ষণ, অর্থ পাচার, মাদক পাচার এর চেয়ে ঢের বেশি ঘৃণিত কাজ। একজন খুনিকে বা মাদক পাচারকারীকে যে প্রতিবন্ধকতা ফেইস করতে হয় না, একজন মেয়ে শুধুমাত্র হাফপ্যান্ট পরার কারণেই তাকে তার চেয়ে শতগুণ বেশি প্রতিবন্ধকতা ফেইস করতে হয়। এখন এইটা আমি আপনি জানি, এই রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনী এইটা জানে না ভাবছেন? তারা যেহেতু সামাজিক এই নারীর প্রতি ঘৃণার সাথে খুবই পরিচিত, তাই এইটাকেই এরা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলেন।

খেয়াল করেন প্রথমে শিপ্রার ভিডিও’র মাধ্যমে তার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হলো। তারপর মদ হাতে তার ছবি প্রচার করে সে যে কত খারাপ, চরিত্রহীন মেয়ে, সেইটা প্রমাণ করা হলো। এবং এই রকমের চরিত্রহীন মেয়ে তো ইয়াবা ব্যবসা করতেই পারে, এই মনস্তত্ব তৈরি করার চেষ্টা করলো এবং অনেকখানি সফলও হলো।

এখন আসি শিপ্রাকে চরিত্রহীন এবং ইয়াবা ব্যবসায়ী দেখানো জরুরি কেন? দুইটা কারণে। এক, সিনহার প্রতি যে পাবলিক সেন্টিমেন্ট তৈরি হয়েছে সেইটা নষ্ট করা। সিনহা হত্যার সাক্ষী হিসেবে শিপ্রার গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। আর আইনী দিক হচ্ছে টেকনাফ পুলিশ কিন্তু সিনহাকে হত্যা করার কারণ দেখিয়েছে সিনহা ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। শিপ্রা এবং সিফাতের বিরুদ্ধে মামলাও কিন্তু করেছে মাদক পাচার এর। এখন যদি যেকোনোভাবে প্রমাণ করা যায় যে এদের কোন একজন মাদক পাচারের সাথে যুক্ত ছিলো, তাহলেই কিন্তু বর্তমান আইনে সিনহার ক্রসফায়ার বৈধ হয়ে যায়।

এর আগে আমরা পুলিশ কাস্টডিতে ইয়াসমিন ধর্ষণ এবং হত্যা দেখেছি, তিন বছর এর শিশু তানিয়াকে ধর্ষণ করে হত্যা করতে দেখেছি। মেয়েরা আজ থেকে ২৫ বছর আগে আন্দোলন করে রাস্তায় নেমেছে। আর এখন দেখছি খোদ পুলিশ এর দ্বারাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার সামনে শিপ্রাকে হিউমিলেয়ট হতে, অপদস্থ হতে, সাইবার ক্রাইমের শিকার হতে।

প্রশ্ন করেন, কোনটি বড় অপরাধ, হত্যা না মদের বোতল নিয়ে ছবি তোলা?
খেয়াল করেন, আপনার খানকি, মাগি চরিত্রহীন গালির ফাঁক গলে কোন রাক্ষস তৈরি হয় কিনা!

#JusticeForShipra

#JusticeForSinha

#JusticeForSifat

লেখক: বিশিষ্ট চরিত্রহীন খানকি মাগী বেশ্যা

 

(ফিচারে ব্যবহৃত ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.