‘ভয়’ এর রাজ্যে ধর্ম ও নারীর মোক্ষম মিশ্রণ

মেঘকন্যা:

আজকে আমার মনটা অনেক খারাপ। একটা পরীক্ষায় ৪৫ এর নিচে পাবো, যা লিখেছি খাতায় তাতে বুঝে গেছি। ইচ্ছে করছে ঘণ্টায় একটা রিকশা নিয়ে হুড ফেলে দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে কয়েকটা সিগারেট টানি। এটার কোনটাই এই ঢাকা শহরে সম্ভব না দেখে আমি ভরা রোদে আট কিলো রাস্তা হেঁটে বাসায় যাওয়ার পথ ধরলাম।

কোনো দোকান থেকে নারী হয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কেনা একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। সিগারেট কেনার সাথে সাথে কোথায় বাসা, কী ফোন নাম্বার সব টার্গেট হয়ে যাবে। তাই নিজের এলাকা থেকে কখনও সিগারেট কিনি না।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে করতে আমিও সাকুরাতে বসি বন্ধুদের সাথে। হয়ে ওঠে না। আমার কখনও কোন আড্ডায় থাকা হয় না সন্ধ্যার পরে। অথচ সব আড্ডা আজিজের শুরুই হয় সন্ধ্যার পরে। সবাই যখন নতুন গল্প কবিতা উপন্যাস নিয়ে মাতোয়ারা হয়, আমি তখন গেটলক বাসের জন্য পিজির সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, নিজের লেখা ডাকে পত্রিকায় পাঠিয়ে সাহিত্য পাতার প্রধানের দয়ার দিকে চেয়ে থাকি। আমার কোন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠে না। কারণ ভালো মেয়েরা ভালো লিখলেও সন্ধ্যার পর কখনও বাইরে থাকে না।

আমার কখনো কোন বান্ধবীর বাসায় রাতে থাকা হয় না, বান্ধবীরাও আমার বাসায় থাকে না। ঢাবির হলে থাকলে কেমন সময় কাটে, জানা হয় না। প্রভাত ফেরী কেমন বুঝি না। আমাদের একসাথে তাস খেলা হয় না, ক্রিকেট নিয়ে কি, আবাহনী মোহামেডান নিয়ে তর্ক হয় না। কোনদিন পূর্ণিমায় বাসার ছাদেই কীভাবে দাঁড়িয়ে থাকা যায় সে জিনিসও বোঝা হয় না। ওড়না ছাড়া সমুদ্রে নামা যায় তাই জানা হয় না। কোনদিন কোন প্রয়োজনে টি-শার্ট বা শার্ট পরলেও আমরা তার উপর স্কার্ফ বা ওড়না ঝুলিয়ে দেই। নিজের দেহ নিয়ে, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সারাক্ষণ সংকুচিত থাকতে থাকতে, বাবা-ভাই-মা পাড়া-প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন সবার শাসনে থাকতে থাকতে, সবার সিদ্ধান্তে চলতে চলতে আমরা দ্বিধাগ্রস্ত এক পরগাছা হয়ে উঠি এবং মনে মনে ভাবি এ জীবনে তো মানুষই হয়ে উঠতে পারলাম না, তাহলে পরের জনমে সব পাবো।

আমাদের এহেনতরো লুকোচুরির শহরে একদিন আশ্চর্য এক ক্ষণ আসে, আমরা সাংস্কৃতিক মানসিক সব বিপ্লবের আশায় নেটে লিখতে লিখতে ব্লগাররাই যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে লাখো মানুষ জড়ো করে ফেলি শাহবাগে। আমাদের মনে পড়ে আমরা জাহানারা ইমামের উত্তরসুরি, আমাদের এক নারী হাজারও সহযোদ্ধার কণ্ঠের ধ্বনি তুলে দিতে থাকেন খালি গলায়, মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে স্লোগান নামক বিদ্রোহী কবিতার অক্ষরে। আমরা দুলে উঠি, গর্জে উঠি। নিজের জেন্ডার, ভালো নারী হয়ে উঠবার আপ্রাণ মিথ্যা চর্চাকে ছাপিয়ে আমরা সেদিন মানুষ হয়ে উঠবার এক নির্মল মৌতাত পেতে থাকি, আমাদের ভয় কেটে যেতে থাকে।

ভয় না থাকলে মানুষের ভেতর বাধ্যতা আসে না, যে মানুষ প্রশ্ন করতে শেখে তার কাছে ধর্ম ও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব আলাদা আকারে দেখা দেয়। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় সেই মানুষ তখন নারীর অবনমিত মর্যাদা আবিষ্কার করে ফেলে। এমনতরো অবস্থায় নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর ভয়ে আবার ধর্মবাদীরা চাড়া দিয়ে ওঠে। দেশের সবচাইতে বড় প্রিন্ট মিডিয়া হাউজ প্রথম আলো স্লোগান নামক বিদ্রোহী কবিতার রচয়িতাকে পুরুষতন্ত্রের আতশ কাঁচের নিচে নিয়ে গিয়ে বলে সে নষ্টা, এজন্য তারা একুশে পদক জয়ী এক লেখককে দিয়ে গল্প লেখায়। ফরহাদ মাজহার ও মাহমুদুর রহমানরা নিয়ে আসে ধর্মের জড়িবুটি, বলে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবিতে যারা একসাথে, তারা সবাই ধর্মবিরোধী, নাস্তিক। এই নষ্ট দুই ব্যক্তি তাদের মিথ্যাচারের প্রপাগান্ডা এমন পর্যায়ে উঠায় মানুষ বিভ্রান্ত হতে বাধ্য হয়ে সরে যায় মূল ফোকাস থেকে, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জায়গায় মানুষ জুটে যায় আস্তিক-নাস্তিক, ভালো নারী-খারাপ নারী এর বাঘবন্দী খেলায়।

সেই খেলা এখন তুঙ্গে – তনু নামক তরুণী আর্মি এলাকায় তাদেরই কারও দ্বারা নিহত হলে আমরা শুনতে পাই সে থিয়েটার করতো ছেলেদের সাথে। যেহেতু তার চরিত্র সুবিধার না তাই তাকে মেরে ফেলা অনেকটাই ঠিক আছে। চট্টগ্রামে এক পুলিশের স্ত্রী মিতু খুন হলে আমরা শুনতে পাই সেই নারীর পুলিশের ইনফর্মারের সাথে প্রেম ছিলো। তাই তাকে মেরে ফেলা অনেকটাই যুক্তিসম্মত। ষোলজন ব্লগার ২০১৩ থেকে ২০১৬ এর মধ্যে খুন হলে আমরা জানতে পারি তারা যেহেতু ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন না, তাই তাদের মেরে ফেলা একদম ঠিক আছে।

যখন যে ব্যক্তি, রাষ্ট্রের চলমান এনার্কি ও ধর্ম নামক মিথকে চ্যালেঞ্জ করেছে তখনই আমরা সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে কারও মদ হাতে ছবি, কারও লেখা, কারও ব্রা’র স্ট্র‍্যাপ নিয়ে এসেছি। সাবরিনা ধরা পড়েছে জেকেজি গ্রুপের হয়ে ভুয়া করোনার রিপোর্ট দিয়ে। হাজার মানুষের প্রাণ নিয়ে এই এটেম্পট টু মার্ডার সদৃশ ফৌজদারী অপরাধ ফেলে আমরা তার ক্লিভেজ নিয়ে পড়েছি।

আওয়ামী দলের ম্যানিফেস্টো ছিল সরকার গঠন করলে তারা বিশেষায়িত বাহিনী অবলুপ্ত করবে। আমরা তাদের ল্যান্ডস্লাইড ভিক্টোরি এনে দিয়ে রিলাক্সড হয়েছিলাম। আমাদের সেই রিলাক্সেশনের কালে তারা ‘ভূমিধ্বস এনার্কি’ দেশে প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই এক থানার ওসি ২০০ ক্রসফায়ার করে ফেলে। তার অপরাধ ঢাকতে আমাদের পুলিশ ভাইয়ারা শিপ্রার হাফপ্যান্ট, ব্ল্যাক লেবেল ও সিগারেটের ভেতর ফোকাস করি। সেই ধর্ম, নারী এই দুই ধামা দিয়ে আমাদের সব অপরাধের দায়মুক্তি ঘটে যায়।

২০১৩ থেকে আজ পর্যন্ত একই ফর্মুলায় আমরা চলছি। যে তারুণ্য প্রশ্ন করতে জানে না, যে তারুণ্য বলে না কেন আমার দেশে প্রাইমারি স্কুলের সংখ্যা মসজিদের চাইতে কম, যে তারুণ্য বলে না নারী-পুরুষ সহযোদ্ধা -প্রতিদ্বন্দ্বী না, যে তরুণ তার সহযোদ্ধা নারীর নামে ধর্মের দোহাই দিয়ে প্রার্থনার আড়ালে বিষোদগারের প্রতিবাদ করে না, সেই তারুণ্যের ঘরে কোনদিন আলো আসবে না।

শিপ্রার হাফপ্যান্ট দিয়ে ওসি প্রদীপের অপরাধ ঢাকা যায় না। যে দেশের মানুষ হাফপ্যান্ট পরা সিগারেট খাওয়া বা মদ্যপানকে খুনের চাইতে বড় অপরাধ মনে করে সে দেশের মানুষের জন্য এমন সরকার বার বার দরকার।

#JusticeForShipra

#JusticeForSinha

#JusticeForSifat

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.