ভেতর বাড়ি

ফাহমিদা খানম:

বদলি হয়ে এই স্কুলে এসেছি কয়েকদিন আগেই, কিন্তু বাসা থেকে এতোদূর যে রীতিমতো হাঁপিয়েই উঠেছি, আপাতত বদলি সম্ভব না, অন্তত তিন মাস অপেক্ষা নাকি করতেই হবে।

“শায়লা আপা, আজ কি আপনি আমার ক্লাসটা নিতে পারবেন? বাসা থেকে মা ফোন করেছে –উনার শরীরটা ভালো না”
অবাক হলাম কারণ এখানে আসার পর থেকেই দেখছি এই ম্যাডাম সবাইকেই এড়িয়েই চলেন, আর পুরানো কাউকে না বলে আমাকেই অনুরোধ!

“জী পারবো, আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যেতে পারেন”
উনি যাবার পর বাকি সহকর্মীরা নিজ দায়িত্বে এসে উনার গুণপনা করে গেলেন –
“এই ম্যাডাম থেকে দূরেই থাইকেন, যে অহংকারী!”

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা আমি, আগে যেখানে ছিলাম সেখান থেকে বদলি হয়েছি — প্রতিদিন বাস, নৌকা, তারপর রিকশা ঠেলে এখানে আসতে প্রায় দুই ঘন্টাই লেগে যায় বলে চাকরি ছেড়ে দিতে সবাই বলে, কিন্তু আমি ঊধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমার সমস্যার কথা জানিয়েছি, উনারা তিন মাস অপেক্ষা করতে বলেছেন, আর চাকরিও ছাড়তে চাই না – নিজের টাকায় নিজের ইচ্ছেগুলো পুরণ করতে পারি বলে।

“আজকে বাচ্চাকে নিয়েই স্কুলে এলেন?”
“উপায় ছিলো না, আমার শাশুড়ির কাছে রেখে আসতাম – উনি বেশ অসুস্থ বলে ঢাকায় মেয়ের কাছে গেছেন, আর বাচ্চার বাবার চাকরি অন্য জেলায়, সপ্তাহে আসেন, তাই বাধ্য হয়েই নিয়ে এসেছি”
“আপনি ক্লাস করার সময় আমিই রাখবো বাবুকে”
শিপা ম্যাডামের কথায় মুগ্ধ হলাম, অথচ অন্যরা কতো কী বলে! পরদিন দেখি বাসা থেকে বাচ্চার জন্যে মোয়া আর পিঠা নিয়ে এসেছেন—
“এতো লাই দিয়েন না, পরে কিন্তু মাথায় চড়ে বসবে, আমার ছেলে ভীষণ দুষ্টু”
“খালার কাছেই তো আবদার করবে, তাই না?”

আমি অন্যদের সাথে কিছুতেই উনাকে মেলাতে পারতাম না, অবশ্য উনি খুবই গম্ভীর প্রকৃতির, কারও সাথে আড্ডা বা কথা বলতেও তেমন দেখি না –ক্লাসের অবসরে হাতে বই নিয়ে থাকেন, পাক্কা সাতদিন ছেলেকে নিতেই হয়েছে, আর আমি অনুভব করেছি আমার ছেলেও উনার অনেক ভক্ত হয়ে গেছে।
“আজ বাবুকে আনেননি?”
“নাহ ওর দাদী আর বাবা বাসায়ই আছে, এতো ঝামেলা করে চাকরি করতেও ইচ্ছা করে না”।
“উপায় থাকলে আমিও ছেড়েই দিতাম, আমি যে জলে–ডাঙ্গায় সব জায়গাতেই যুদ্ধ করি!”

আমি বুঝলাম গভীর কোনো কষ্ট থেকেই হয়তো কথাটা বলেছেন, কিন্তু নিজ থেকে কিছু না বললে জিজ্ঞেস করাটা অভদ্রতা হবে ভেবে চুপ করেই রইলাম।
ম্যাডাম দেখতে খুবই মিষ্টি – বয়স আমার থেকে কমই হবে, শুনেছি উনিও এখানে এসেছেন ছয় মাসের বেশি, পুরুষ সহকর্মিরা একটু নমনীয় হলেও অন্য নারী সহকর্মিরা তেমন সহ্য করতে পারেন না, আড়ালে দেমাগী, অহংকারী বলেন, কিন্তু বাচ্চা আনার পর আমার সাথে সম্পর্ক এখন অনেকটাই স্বাভাবিক।

“আপনার কি পরিচিতা কোনো নারী ডাক্তার আছেন? মায়ের শরীরটা একদম ভালো না, আর এখানে সরকারি হাসপাতালে নারী ডাক্তারও ছুটিতে আছেন”।

জেলা শহরে আমার পরিচিতা ডাক্তারের ঠিকানা দিলাম আর জানালাম, উনি ঢাকা থেকে সপ্তাহে দুদিনের জন্যে এখানে আসেন, আগেই সিরিয়াল কেটে রাখতে হয় – সেটার দায়িত্ব আমি নিজে থেকেই নিলাম।

“আপনার মা কেমন আছেন?”
“সত্যি বলতে ভালো নেই, ডাক্তার যেসব পরীক্ষা করতে দিয়েছেন, সেসবের জন্যে ঢাকা নিতে হবে, রিপোর্ট দেখে শিওর হতে চান ডাক্তার”।

ছুটি নিয়ে উনি মাকে নিয়ে ঢাকায় গেলেন, ফেরার পর দেখি উনার চোখের নিচে এই কয়দিনেই কালি পড়েছে –
“মায়ের জরায়ু ক্যান্সার ধরা পড়েছে, আমি সত্যি জানি না আমি এখন কী করবো?”
হতভম্ব হয়ে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম –
“আপনি তাহলে স্কুলে এসেছেন কেনো?”
“ছুটির দরখাস্ত বাড়াতে আর কতদিন লাগে জানি না, সব গুছিয়ে যেতে হবে তো!”
“আর কেউ নেই? আপনি একা সামাল দিতে পারবেন?”
“আমার বড়ো বোনের বিয়ে হইছে চুনারুঘাট, এখনও যৌথ পরিবার ওদের, আর দুই ভাই মায়ের খোঁজ তেমন নেয় না”।
“আপনি সবাইকে জানান, একা কি সব সামলাতে পারবেন?”

সেদিন ইচ্ছে করেই উনার সাথে উনার মাকে দেখতে বাসায় গেলাম – দুই রুমের সে বাসায় মা আর বাচ্চাকে নিয়ে থাকেন, উনার মুখে কখনও স্বামীর কথা শুনিনি –
“আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি, অবশ্য এখানকার কেউই জানে না, জানলে হয়তো চাকরি করা সহজ হবে না, আগের দুই জায়গা থেকে বদলি হয়েছি আমি নিজেই ইচ্ছে করে”।

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে উনার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম – মনে হলো ভয়ংকর কোনো গল্প আছে ভিতরে, নারী জীবনের পথটা সবসময় সুগম হয় না – অনেক দেখেছি সংসারে।

“আমার স্বামীর সাথে বনিবনা হয়নি বলে আমি মাকে নিয়ে আলাদা থাকি”
“এ যুগে এসব কোনো ব্যাপার না – বনিবনা না হলে আলাদা হতেই পারে মানুষ”
“যখনই সবাই জানে স্বামী নেই, খুব সহমর্মিতা দেখাতে শুরু করে – প্রথমে বুঝতাম না, কিন্তু তারপরের রুপটা ভয়ংকর, নানান ছুতায় বাসায় আসা, বাবার বয়সী কলিগেরাও গায়ে পড়ে উপকার করতে আসে – একটা মেয়েমানুষ একা আছে দেখে সবাই তাকে খুব সস্তাদর ভাবে, আর আমার একটা ভয়ংকর অতীত আছে যার জন্যে আমি মুখোশ পরে থাকি – আড়ালে কে কী বলে আমি বুঝি, কিন্তু আমি কাউকেই বিশ্বাস, ভরসা করতে ভয় পাই”

স্তব্ধ হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে থাকলাম পরেরটুকু শোনার জন্যে —
“চাকরির সুবাদে ও অন্য জেলায় ছিলো –হোটেলে অন্য নারীর সাথে পুলিশের হাতেই ধরা পড়েছিল, সেসব পেপার আর নেটেও ভাইরাল হয়েছিল, সে বলে তাকে ইচ্ছে করেই নাকি ফাঁসানো হয়েছিল, কিন্তু আমি আর সে সংসার করিনি”।

পাথরস্তব্ধতা বুঝি একেই বলে!

“আচ্ছা, স্বামী দূরে থাকলে স্ত্রীরা কি নিজেকে সামলে চলে না, কতো পুরুষই প্রবাসী, তারা কি নিজেকে সামলে চলে না? শরীরের খিদে কি এতোই বড়ো? মন না জাগলে কি শরীর জাগে?”
“এই কথার উত্তর আসলে আমিও জানি না”।
“দুঃখ কি জানেন? আমার একটাই মেয়ে – বড়ো হবার পর ওকে বিয়ে দিতে গেলেও এসব কথা উঠবেই, সেই পুরানো ক্ষত! এক জীবনে আর দ্বিতীয় সংসার করতে ইচ্ছেও জাগে না, ভাইয়েরা মাকে দেখে না আমাকে দ্বিতীয় বিয়ে দিতে চেয়েছিল, আমি রাজি হইনি দেখে ওরাও খোঁজ রাখার দরকার মনে করে না, আমি দুই মা নিয়ে বেশ আছি, কিন্তু আমার অতীতের জন্যে আমি কোথাও ভালো থাকতে পারি না, এখানে আমার দোষ কোথায়?”

আমার সামনে কান্নারত নারীকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা নেই বলে আমি চুপ করেই থাকলাম – নিরবতা কতোটা ভয়ংকর আজকের মতো আগে কখনো টের পাইনি।
যে যুদ্ধ করে একমাত্র সেই জানে যুদ্ধের সত্যিকার চেহারাটা কেমন! বাইরে থেকে দেখে কতো সহজেই মানুষ বিচার করে ফেলি আমরা ভেতরবাড়ির খবর অজানাই থেকে যায়, জীবনের ধর্মই হলো কিছু কথা একান্তে বুকের ভিতরে লুকিয়ে রেখে সামনের দিকে আগাতে হয় – মুখ খোলাও যায় না কারণ আঘাতগুলো খুব কাছের মানুষেরাই দেয় কিনা!

শেয়ার করুন:
  • 81
  •  
  •  
  •  
  •  
    81
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.