বন্ধুত্বে ছেলেমেয়েতে ভেদাভেদ কেন?

কৌশিক এইচ হায়দার:

আমাদের সমাজে খুব প্রচলিত কথা একটা হলো- দুইটা ছেলেমেয়ে কখনও শুধু বন্ধু হয়ে থাকতে পারে না। তাদের মধ্যে রোমান্টিক সম্পর্ক থাকবেই। বিভিন্ন সিনেমা এবং সাহিত্যিকদের নানা উক্তির মাধ্যমে এ কথাগুলো সমাজে বার বার রিইনফোর্স করা হয়।

সমাজে প্রায় সবক্ষেত্রেই দেখা যায় ছাত্রাবস্থায় মানুষের প্রিয় বন্ধু হয় সমলিঙ্গের কেউ। অর্থাৎ ছেলের বেস্টফ্রেন্ড ছেলে, মেয়ের বেস্ট ফ্রেন্ড মেয়ে। এবং এসব বেস্ট ফ্রেন্ডের অধিকাংশই হয় সহপাঠী। এর অবশ্য একটা বড় কারণ মানুষ ছাত্রজীবনে সহপাঠীদের সাথে যতটা সময় কাটায়, যেসব কথা শেয়ার করে এবং এর ফলে যে ধরনের সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগ থাকে, আর কোনো ক্ষেত্রেই তা থাকে না।

আমাদের দেশের অর্ধেকেরও বেশি ছেলে ছেলেদের স্কুল কলেজে পড়ে এবং মেয়েরা মেয়েদের স্কুল কলেজে। তাই যেহেতু তারা স্কুল কলেজ জীবনে সহপাঠী হিসেবে বিপরীত লিঙ্গের কাউকে পায় না, তাই বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবেও বিপরীত লিঙ্গের কেউ হিসেবেও আসে না। আবার যদি ছেলেমেয়ে একত্রে পড়াও হয়, তবে দেখা যায় ছেলেমেয়েরা একে অপরের থেকে সবসময় একটা দূরত্ব বজায় থাকে। যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ দেখা যায় ক্লাসরুমে, যেখানে একপাশে ছেলেরা আরেক পাশে মেয়েরা বসে। এছাড়া ছেলেমেয়ে একত্রে কথা বললেই সহপাঠীদের মধ্যে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর শুরু হয়ে যে, অমুকবার তমুকের মাঝে নিশ্চয়ই কিছু আছে। তাছাড়া অনেকের পরিবার থেকেই বলা হয় যে ছেলেদের সাথে বা মেয়েদের সাথে মেশা যাবে না।

কৌশিক এইচ হায়দার

এর ফলে সমস্যাটা দেখা দেয় বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে। তখন ছেলেমেয়েরা একত্রে পড়াশোনা করে। কিন্তু একে অপরের সাথে কথা বলতে দ্বিধান্বিত থাকে, আর যারা আগে কখনো বিপরীত লিঙ্গের কারো সাথে মেশেনি তারা তো কথা বলতেই ভয় পায়। এবং ক্লাসরুমেও প্রথম বর্ষে দেখা যায় সেই স্কুল-কলেজের চিরায়ত বিভাজিত রূপ- ছেলেরা একপাশে, অন্যপাশে মেয়েরা। যদিও ধীরে শেষ বর্ষে এসে এই বিভাজনটা অনেক কমে যায়। তবুও ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে বিভাজনটা খুব বেশি কমেনা।

আবার অনেকে অনেক গালভরা কথা বলে, যেমন ছেলে বেস্টফ্রেন্ড বা মেয়ে বেস্টফ্রেন্ড। মানে একজন ছেলের একজন বেস্ট ফ্রেন্ড থাকবে। সে অবশ্যই ছেলে এবং কোনো মেয়ের সাথে ভালো বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকলে তাকে আলাদা করে বলা হয় মেয়ে বেস্ট ফ্রেন্ড। মেয়েদের ক্ষেত্রে ঠিক এর উল্টোটা ঘটে ।
আবার বর্তমান যুগে ‘জাস্টফ্রেন্ড’ নামে একটা ব্যাপারের জন্য ছেলেমেয়েদের নির্দোষ বন্ধুত্বের উপরেও কালিমা লেপন করা হয়। ফলে তারা ভয় পায় বিপরীত লিঙ্গের সাথে বন্ধুত্ব করতে।

এর ফলে বিপরীত লিঙ্গের মানুষের সাথে ভালো পরিচিতি গড়ে উঠে না, চিনতে পারে না ভালোভাবে। ফলে ছেলেমেয়ের একে অপরের সম্পর্কে ধারণা গড়ে ওঠে সমলিঙ্গের বন্ধুদের সাথে বিভিন্ন গসিপের মাধ্যমে, যে ছেলেরা এমন কিংবা মেয়েরা তো এমনই। কিংবা ছেলেরা সবসময় এটা চায় আর মেয়েরা চায় ওটা। আর এভাবে গড়ে ওঠা ধারণার অধিকাংশই ভুল। এবং এই ধারণা যখন রোমান্টিক রিলেশনশিপে প্রয়োগ করা হয় তখনই দেখা দেয় বিরোধ, বিচ্ছেদ।

আবার এটা দম্পতির ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে। বিয়ের পর দম্পতির একে অপরের বেস্টফ্রেন্ড হওয়া উচিত। কারণ শুধু যে তারা পরবর্তী জীবন একত্রে কাটাবে তাই নয় তারা তাদের জীবনটাই একে অপরের সাথে শেয়ার করে। কিন্তু সেই জীবনসঙ্গীর বেড়ে ওঠা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। সে আসলেই কি চায়, কেন চায় আমি তাও ভালোভাবে জানি না। তার সম্পর্কে আমি যা জানি, তা শুধু গড়ে উঠেছে ফালতু ও যুক্তিহীন কিছু গসিপের উপর। ফলে দেখা দেয় সম্পর্কে টানাপোড়েন, বিবাহবিচ্ছেদও ব্যতিক্রম নয়।

এখন কথা ওঠে আগেকার মানুষ তো এর চেয়েও বেশি রক্ষণশীল ছিল। ছেলেমেয়েদের মাঝে যোগাযোগ এখনকার চেয়েও কম ছিল, তখন বিচ্ছেদও কম ছিল। কিন্তু এখন এই হার ক্রমশই বাড়ছে। আগেকার মানুষ বিশেষ করে নারীরা না চাইলেও বাধ্য হতো সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে। কারণ তাদের অর্থনৈতিক কোনো ক্ষমতা ছিল না। এখনো এমন নারীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। কিন্তু যুগ পাল্টেছে। নারীরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শিক্ষিত এবং তাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্যও বেড়েছে বহুগুণে। তাই যে পার্টনার তাকে বোঝে না, তার চাওয়া বোঝে না, তার কথা সে মুখ বুঁজে শুনবে কেন? কেন সে প্রতিবাদ করবে না?

আর পুরুষকেও দোষ দেয়া যাবে না, যেহেতু সে নারীকে বোঝেনি, তার সম্পর্কে আগে জানেনি, মেশেনি আগে কখনও, ফলে তার আচরণ হবে তাই, যা তার ছেলে বন্ধুদের মুখ দিয়ে সমাজ তাকে বলেছে, তার সামাজিকীকরণ যেভাবে ঘটেছে। ফলে শুরু হয় সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং একটি সুন্দর সম্পর্ক শেষ!

তাই ছেলেমেয়েদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক আমরা আড়চোখে না দেখি। একটা ছেলে একটা মেয়ে শুধু বন্ধু হতে পারে, হতে পারে বেস্টফ্রেন্ড। আর তারা চাইলে জীবনসঙ্গীও হতে পারে। সেটা সম্পূর্ণ তাদের সিদ্ধান্ত। আপনি আমি বলার কেউ না। সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অধিকারও আমাদের নেই। তারচেয়ে, কামনা করি টিকে থাকুক নির্দোষ বন্ধুত্ব, জীবন হোক সুন্দর, সম্পর্ক হোক ভালোবাসাময়।।

লেখক:
শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.