সাফল্য কী বা সফল-অসফল মানুষ কারা?

সুপ্রীতি ধর:

আজই বন্ধু মনজুন নাহারের সাথে কথা হচ্ছিল এ নিয়ে। আমাদের সাফল্যের মাপকাঠিটি আসলে কী? কী কী হলে বা পেলে আমরা একজন মানুষকে সফল মানুষ বলি? আর কোন কোন জিনিসের অভাবে একজন মানুষ ‘ব্যর্থ’ হয়ে যায়?
কথায় কথায় মনজুন বলছিল, আমরা আসলে একটা নির্দ্দিষ্ট মাপকাঠি তৈরি করে নিয়েছি, যা কিনা কাঠামোগত। তা দিয়েই নির্ধারণ করা হয় মানুষটি সফল নাকি অসফল। যেমন, একটা নির্দ্দিষ্ট বয়সে স্কুলে যেতে হবে, তারপর কলেজ, কোথাও কোনো ফাঁকি চলবে না। আবারও সেই নির্দ্দিষ্ট বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকতে হবে, এদিক-সেদিক হলেই কথার বাণে জর্জরিত হবে ‘এতো বয়স হয়ে গেল, এখন আর পড়ে কী হবে!’ বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করতে হবে সমাজের বেঁধে দেয়া ‘নির্দ্দিষ্ট’ বয়সের মধ্যে, তারপর চাকরিতে ঢুকতে হবে। ছেলে হলে ২৮ বছরের মধ্যেই বিয়ে করিয়ে দাও, আর মেয়ে হলে ২২। দুই বছর যেতে না যেতেই ‘বাচ্চা নাও’, নিতেই হবে, নইলে ‘দেরি হয়ে গেলে আর বাচ্চা হবে না’ এমন কথা শুনতে হবে। বাচ্চাও হলো। সংসারের ছেলেটিকে চাকরিতে শনৈ শনৈ উন্নতি করতে হবে, বছর শেষে ইনক্রিমেন্ট যোগ করতে হবে, চার বছর যেতে না যেতেই গাড়ি কিনতে হবে, তারপর নিদেনপক্ষে একটা ফ্ল্যাটের মালিক তো হওয়া চাই-ই চাই। এদিকে মেয়েটিকে সন্তান লালনপালনের পাশাপাশি সুখি সুখি দেখাতে হবে, শাড়ি-গয়নায় মুড়ে এবং বছরে এক কী দুবার ঘুরতে যাওয়া চাই। আজকাল মানুষ দেশের চেয়ে বিদেশেই ঘুরে বেশি। যে বা যারা বিদেশে যায়, সুন্দর সুন্দর ছবি পোস্ট করে সামাজিক অনলাইনে, তারাই সফল ব্যক্তির কাতারে পড়ে।

এখন আসি তথাকথিত ‘অসফল’দের কথায়। সমাজের বেঁধে দেয়া নিয়ম সে থোরাই কেয়ার করলো, পড়লো কি পড়লো না, মনমতো চাকরি করলো কি করলো না, বিয়ে-সংসার-গাড়ি-বাড়ি কোনটাই ঠিকমতোন হলো না, সে ভয়াবহ রকমের ‘অসফল’ ব্যক্তি। তাকে সমাজের প্রয়োজন নেই, এমনকি পরিবারেরও প্রয়োজন নেই এমন সন্তানের। তখন সে কী করবে? এই যে তার ‘হলো না কিছুই’, সে তখন বিষন্নতায় ভুগবে, চরম হতাশায় আত্মহত্যাও করে ফেলতে পারে।

তো, এই লেখার উদ্দেশ্য কী আসলে? মোটা দাগে তেমন কিছুই না। জাস্ট সফল-অসফলের তথাকথিত সংজ্ঞাটা আবারও একটু ঝালিয়ে নেয়া।

এখন ধরুন, ওপরের সেই সফল ব্যক্তি নিজেকে বা নিজের সংসার ছাড়া পৃথিবীর কারও কোনো কাজেই লাগলো না, কারও অসময়ের সহায় সে হতে পারলো না, হলেও তা নিতান্তই বেকায়দায় পড়ে হওয়া, কেউ বিপদে তার হাতটি ধরতে পারলো না বা হাতটি বাড়িয়ে দেয়ার মতোন মানসিকতাই সেই ‘সফল ব্যক্তি’র তৈরি হয়নি, পরিবারের আর দশজন যখন কষ্টে থাকে, তখন সেই ‘সফল’ ব্যক্তি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ায় কাজে-বিনা কাজে-বেড়াতে। বন্ধুদের কাছে সে ভালো, প্রজ্ঞাবান বন্ধু, তাই তাদেরকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে সে পছন্দ করে কখনও কখনও, কয়েক রাতে লাখ টাকাও খরচ করে ফেলতে পারে বন্ধুদের জন্য, কারণ সমাজ তাকে ‘সফল’ ব্যক্তির পরিচয় দিয়েছে।

অন্যদিকে তার এই লাখ টাকা খরচ চেয়ে চেয়ে দেখে একই পরিবারের সবচেয়ে ‘অসফল’ ব্যক্তিটি। তার দুহাত খালি থাকে, এক হালি কলা কিনতেও তাকে ‘সফল’ আত্মীয়ের কাছে হাত পাততে হয়। এ কেমন পরিহাস? শার্টের বোতাম ছিঁড়ে গেলে নতুন বোতাম লাগিয়ে নেয়, নয়তো ‘সফল’ আত্মীয়টি তার বিশাল আলমারির কোনাকাঞ্চি থেকে মাঝে মাঝে দু’একটা শার্ট বের করে দেয় পরার জন্য। ‘অসফল’ ব্যক্তিটি তা নিয়েই খুশি হয়। কিন্তু এই যে সফল আর অসফল, দুজন ব্যক্তি সহোদরও হতে পারে। তাদের মায়ের তখন দীর্ঘশ্বাস পড়ে। মা চেয়ে চেয়ে দেখে আর ভাবে, এ সবই কর্মফল।

আরেকজন ‘অসফল’ নারীর গল্প বলি। বিয়ে নামক প্রহসনের প্রথমদিন থেকেই বুঝে যায় মস্তবড় একটা ভুল করে ফেলেছে সে। কিন্তু বেরিয়ে আসার পথ পায় না। এরই মাঝে ভয়াবহ অত্যাচার নেমে আসে তার জীবনে। যোগ হয় ম্যারিটাল রেইপ। দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার সাথে সাথে মেয়েটি ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে। রাতের অন্ধকারকে বড় ভয় হয় তার। সেই অন্ধকার গভীর হতে হতে যখন ফিকে হতে থাকে, তার কান্নার রেখাও ধীরে ধীরে শুকাতে থাকে। সূর্যের সাথে সাথে সে আবারও হাসি টানার চেষ্টা করে ঠোঁটে। আগের রাতের নির্যাতনে ঠোঁট ফেটে চৌচির, তাতেই মলম লাগিয়ে, মেক আপ কিট দিয়ে ক্ষত ঢাকার প্রাণান্ত চেষ্টা সে চালায়। একসময় দুই বাচ্চা নিয়ে সে মাটির নাগাল পায় দুই পায়ের নিচে। সব ঝেরে ফেলে বেরিয়ে আসে। টান টান করে উঠে দাঁড়ায় মেয়েটি। যখন সে যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট ছিল তখনও যেমন সমাজ তাকে মেনে নেয়নি, বরং শাণিত বাক্যবাণে জর্জরিত করেছে, যখন সে আজ সটান দাঁড়িয়ে গেল, তখনও সমাজ সমালোচনামুখর। কথা শুনতে হয়, ‘নিশ্চয়ই চরিত্রহীন’, ‘নিশ্চয়ই অন্য আয়ের ব্যবস্থা আছে’, ‘নিশ্চয়ই পুরুষ বন্ধু আছে’। এসবই মেয়েটিকে ঘিরে আলোচনার বিষয় হয়।

এমনও মন্তব্য আসে, ‘জীবন তো শেষ, এখন আর চেষ্টা করে কী হবে?’ মেয়েটা শুনেও না শোনার ভাণ করে। পথ চলতে শুরু করে, কারণ জানে এই পথ পিচ্ছিল, কর্দমাক্ত, তবুও থামা যাবে না। থামার উপায়ও নেই। তিন-তিনটি মুখ, তিনটি জীবন একা তার কাঁধে। ভীষণ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এক জীবনে বহু ভুলভালের মধ্য দিয়ে পাড়ি দিয়ে একসময় সে অনেকের চোখে ‘সফল’ হয়ে উঠে, কিন্তু সমাজের সেই তথাকথিত নিকটজনদের কাছে ‘অসফলই’ রয়ে যায়। আজ বহু নারীর সে সহায়। তার হাতটি ধরে বহু নারী এগিয়ে চলার সাহস পায়। তার কাঁধে এখন হাজারও নারীর ওজন।

বাস্তবিক অর্থে গাড়ি-বাড়ি-দেশ-বিদেশ ঘোরার সামর্থ্য সেই ‘অসফল’ নারীর না হলেও, প্রেমময় জীবন না পেলেও ভালবাসার অভাব এবার আর হয় না। বহু মানুষ থাকে তাকে ঘিরে, সে এখন আকাশ দেখে, মেঘেদের খেলা দেখে, ফুলের সৌন্দর্য দেখে, বীজ থেকে অঙ্কুরোদ্গম দেখে সে খুশি হয়, প্রাণ সঞ্চারের আনন্দ সে ভাগাভাগি করে নেয়। সে বুঝতে চেষ্টা করে অন্যদের কষ্টগুলো, আর সর্বাত্মক চেষ্টা চালায় কষ্ট দূর করার পথগুলো তৈরি করে দিতে, মাঝে মাঝে ‘সফল’ আর ‘অসফল’ এর ফারাকটাও সে বুঝতে চেষ্টা করে।

মেয়েটি এখন নিজেকে ‘সফল’ই ভাবে, যদিও সমাজ তাকে সেই স্বীকৃতি দেয় না। সমাজ তাকে এখন ‘মাতৃত্বের’ কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। মেয়েটি বুঝতে চেষ্টা করে তার নিজের মাকে, যে মা কোনদিন শারীরিক বা অর্থনৈতিক সাপোর্ট বা ভালবাসা দেখানোর সুযোগ না পেলেও ঠিক ঠিক সময়মতোন মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে যেতেন ঢাল হয়ে, সেই মাতৃত্ব আর তার মাতৃত্বের তফাতটুকু বুঝতে প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে যায় মেয়েটি।

প্রিয় পাঠক, এখন আপনারাই ঠিক করে নিন, কেমন সফল আপনি হতে চান? নাকি অসফল জীবনই কাটিয়ে দেবেন নিচের মেয়েটির মতোন?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.