নারী তুমি অর্ধেক আকাশ

বাসন্তি সাহা:

অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত শোভা, অত স্বাধীনতা!
চেয়েছিল আরো কিছু কম,
আয়নার দাঁড়ে দেহ মেলে দিয়ে
বসে থাকা সবটা দুপুর, চেয়েছিল
মা বকুক, বাবা তার বেদনা দেখুক! (আবুল হাসান)

দেখো আজ আকাশটা কী নীল! মেঘগুলো উড়ে যাচ্ছে! একটু আসো না ব্যালকনিতে। এই মেঘ-রোদ দেখে কাটালেই হবে? টাকা তো আয় করতে হয় না! বাড়িতে বসে থাকো। আর মপ দিয়ে ঘর ‍মুছবে না। পরিস্কার হয় না কোনাগুলো। আমার মা যেভাবে মুছতেন সেভাবে মুছবে। মেয়েটি তার পেটে হাত রাখে। তিনটা বাচ্চাই সিজার অপারেশন করে। ছোট বাচ্চাটা মাত্র দু’বছর। নীল আকাশ কেমন ঝাপসা হয়ে যায়!

মেয়েরা আসলে কেমন আছে? এই আমাদের সৃষ্টির অর্ধেক আকাশ! ভালোইতো আছে। লেখাপড়ায়, খেলাধুলোয়, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সাথে পা মিলিয়ে সমানতালে এগিয়ে যাচ্ছে! নারী এখন অনেক বেশি স্বাধীন। যুগ পাল্টেছে, সময় বদলে গেছে। নানারকম গেজেট নারীর গৃহশ্রমকে হালকা করেছে। তবু কোথায় যেনো বোধ, চেতনা, যন্ত্রণা আর সম্মানের জায়গায় নারীর মুক্তি মেলেনি। বেশিরভাগ সংসারেই নারী অধস্তন।
বালিকা বয়স থেকেই পুতুল খেলা, হাড়ি-পাতিল নিয়ে রান্নাবাড়ি, ঘরকন্যার একটা ক্যানভাস তার হাতে তুলে দেয়া হয়। যাও তুমি ছবি আঁকো এখানে তোমার মনের মতো করে। কিন্তু একটা অদৃশ্য গণ্ডিও কেটে দেয়া হয়। তুমি মেয়ে, তুমি এর মধ্যে থাকবে। এর বাইরে যাবে না। যদি যাও, যদি কিছু ঘটে, তুমিই দায়ী হবে।

মাটিতে কথা আঁকে
আঙুলের নিপূন বুননে
কথকথা ভাষা পায় তার,
সারাদিন গাঁথা গানে মুখরিত ,
সেও এক মাটির সংসার। (নৃপেণ চক্রবর্তী)।

আমি নিজেকে প্রায়ই বলি আমি ‘বুদ্ধিমান’। আমার বেশিরভাগ বন্ধুরা আমাকে শুধরে দেন ‘বুদ্ধিমতি’। আমি নাকি ‘মান’ হতেই পারি না ‘মতি’ই হতে হবে। যদিও এখন কিছু জেন্ডার নিরপেক্ষ শব্দ ব্যবহার করা হয় কোথাও কোথাও। তাতে অবস্থান খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলা যায় না।

একটু আগেই দুর্বলতর স্বামীর হাতে দুটো চড় খেয়েছেন। না চিৎকার করেননি। কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরেছিল। মাটিতে পড়তে দেননি। দ্রুতই মুছে ফেলতে হলো। বাচ্চারা দেখবে! চোখ মুছে মডিউলার কিচেন মোছায় মনোযোগ দিয়েছেন। ডাইনিং টেবিলে সুন্দর রানার পেতে সাজিয়েছেন কয়েক ধরনের খাবার। তারপর হাসিমুখে সেলফি তুলে ফেসবুকের পাতায় পোস্ট করেছেন। দিনের বাকি সময়টাতে কাজের ফাঁকে ফাঁকে দেখে নিলেই চলবে কমেন্টসগুলো। তারপর রাত বাড়ে, ছেলে-মেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে ততক্ষণে। এইবার একুট সুযোগ পেলেন। রোজকার মতো একটু কেঁদেও নিতে পারেন। আপনার এই অন্তর্ভেদী বেদনা কেবল আপনার একার।

ভেবেছিল বাহুবল কিছু নয়
বুঝি তপোবলে
জিতে নেবে মানুষের ন্যায্য অধিকার (নবনীতা দেবসেন)।

আমার এক বন্ধু ছোটবেলায় পাখির মতো মিষ্টি করে কথা বলতো। লেখাপড়ায়, কবিতায়, গানে সে এগিয়ে যাচ্ছিল। বাবা-মা ও চারপাশের মানুষ ভেবেছিল বড় হয়ে সে একদিন ‘কেউ’ হবে! জিতে নেবে অনেক পুরষ্কার। তারপর একদিন বিয়ে হয়ে গেলো। তারপর থেকে সে একটা কবিতাও পড়েনি কোথাও। একটা গানও গায়নি। সে কোথাও পৌঁছায়নি। তার কণ্ঠস্বর কোথাও পৌঁছায়নি। তার হাতেও এখন ঘরকন্নার পুতুল খেলা আর সেলফি।

আমার নয় বছরের মেয়ে তিস্তা আমাকে বলে, মা তোমার রোজ রোজ রান্না করতে ভালো লাগে? আমার যদি না লাগে তাহলে তোমরা খাবে কী? আর ভাতটা তো নিজের হাতে খেতে পারো। মায়ের হাত কাটলেও কেন খাইয়ে দিতে হবে? তখন বলবে, মা তোমার হাতে খেতে ভালো লাগে। এটা কি সত্যি? না মাকে আফিম খাইয়ে ভোলানোর মতো! আমার এগুলো করতেই হবে যদিও আমি একটু কেবল তখন চুপ করে বসে থাকতে চেয়েছিলাম।
হাউসওয়াইফ মায়েদের জীবনের একটা বড় সময় কাটে স্কুলে আর কোচিং সেন্টারের বারান্দায়। অন্য মায়েদের সাথে। এই একটা মুক্তি জানালা। যেখানে সে অকারণে হেসে উঠতে পারে।

কর্মজীবী মায়েরা অর্থনৈতিক মুক্তি পেলেও সংসারের কাজ তাকে মুক্তি দেয়নি। গৃহকোনের সবটুকু কাজ তার, সন্তানের দায়িত্ব তার লেখাপড়ার দায়িত্বও তার। তাই দরকার হয় আলাদা হেলথ ড্রিংক এর। সাথে সাথে বেড়েছে স্ট্রেস, ওভারিতে সিস্ট আর এন্ড্রোমেট্রিওসিস। একটা-দুটো বাচ্চা। স্বাধীনতার পিল খাচ্ছেন। ইস্ট্রোজোনের ব্যবসা জমজমাট। এর সাথে বেড়েছে স্তন ও জরায়ু মুখের ক্যান্সারের ঝুঁকি।

সফল নারীও কী তার প্রচলিত ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন? পেপসিকোর সিইও ইন্দ্রা নু্য়ী তার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, যেদিন তিনি বাড়ি ফিরে পেপসিকোর সিইও নির্বাচিত হওয়ার খবর বাবা-মাকে দিচ্ছিলেন, মা তাকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, যাও আগে দুধ নিয়ে এসো, ওসব পরে শুনবো। আমার হাসবেন্ড তো আগেই ফিরেছে, ওকে বলনি কেন? ও ক্লান্ত ছিলো। শোনো পেপসিকোর তুমি প্রেসিডেন্ট হতো পারো, কিন্তু এ বাড়িতে তোমার পরিচয় তুমি একজন মা। একজন স্ত্রী।

আমার এক কলিগ তার স্যালারি নিজে কখনও খরচ করতে পারেন না। পুরোটাই তুলে দিতে হয় তার হাসবেন্ডের হাতে। কারণ হাসবেন্ড তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে কাজ করার উপযুক্ত করেছেন। তাই টাকা তার প্রাপ্য। টাকার দাবি জানালে শুনতে হয়, এই যে সেজেগুঁজে শাড়ি, মালা পরে বাইরের পুরুষের সাথে হাসাহাসি করতে পারছো, এটাই তো অনেক। টাকার দরকার কী! খেতে পরতে তো দিচ্ছি। আশাপূর্ণা দেবীর সুর্বণলতারা আজও ঘরে ঘরে নিজের মতো করে বাাঁচার জন্য ডানা ঝাপটায়।

আমার বাড়িতে যদি কখনো আসো
একটি প্রদীপশিখা এনো
আমার জন্য একটি খোলা জানালা এনো
আমি জানালায় দাঁড়িয়ে জমানো দীর্ঘশ্বাসগুলো পুড়িয়ে ফেলবো।

লেখক পরিচিতি:
প্রকল্প পরিচালক
দর্পণ সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র।
[email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.