নারীর মুক্তি আসলে কতদূর?

প্রিয়াঙ্কা দাস মিলা:

নারীমুক্তি বিষয়টা কী? কিছুদিন আগেও একজন নারীর জীবন বলতে রান্নাঘরের পারদর্শিতাকে বোঝাতো। যে নারী যত ভালো রান্না করতে পারে সে তত গুণী। শুধু রান্নাই নয়, সেই সাথে একটা সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব তাকে পালন করতে হয়। শুধুমাত্র অর্থ উপার্জন ব্যতীত। জন্মের পর থেকেই তাকে বোঝানো হতো, সে একটা পরজীবী প্রাণী যার জন্ম হয়েছে এক পুরুষের মাধ্যমে, আর বিয়ের পর বাকি জীবনটা কাটাতে হবে অন্য আরেকটা পুরুষের উপর নির্ভর করে। তার কোন নিজস্বতা নেই, নেই কোন আলাদা অস্তিত্ব। এখান থেকেই জন্ম নেয় “নারী মুক্তির” বিষয়টি। মেয়েরা চায় তাদের অস্তিত্বের জানান দিতে আর তখনই বাধে ঝামেলা। যেসব নারীরা তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে প্রাধান্য দেয় তাদেরই নাম দেয়া হয় “নারীবাদী”। আর তারা যাই কিছু বলুক না কেন তাই হয়ে যায় নারীবাদী কথা। নারীবাদীদের এমন ভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তারা পুরুষ বিদ্বেষী।

এই লাইন দুটো তো সবারই জানা –
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি, চির কল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর”

তার মানে নারী পুরুষ একে অপরের পরিপূরক। কোনভাবেই শক্র নন। বরং তারা মিলে মিশেই জগতের জন্য কল্যাণকর কাজই করবেন।
যারা ভাবেন যে, নারীবাদ মানেই “পুরুষ বিদ্বেষ”, প্রথমত এটা ভুল ধারণা, দ্বিতীয়ত, যারা এটা প্রতিষ্ঠা করতে চায় যে নারীরা পুরুষ বিদ্বেষী, তারা আসলে তাদের অস্তিত্ব বা স্বকীয়তা হারানোর ভয়ে থাকে।

একটা মেয়ে যখন তার যোগ্যতা দিয়ে উন্নতি করতে থাকে সেটা বেশিরভাগ পুরুষেরই চক্ষুশূল হয়ে যায়। কেন হয় চক্ষুশূল?? কারণ একটা ছেলে শিশুকে জন্মের পর থেকেই শেখানো হয় “তুমি পুরুষ, তাই তুমি রাজা” তুমি সিংহাসনে বসবে আর তোমার পাশে বসবে সুন্দরী রানী, যাকে তুমি যা বলবে তাই শুনতে এবং করতে বাধ্য। সে শুধুমাত্র তোমার সিংহাসনের সৌন্দর্য বর্ধন করবে। তার মানে ওই সিংহাসনে যেই বসবে, রানী তারই সৌন্দর্য বর্ধন করবে। এই ধারণার জন্য কিন্তু শুধুমাত্র পুরুষরাই দায়ী, তা কিন্তু নয়। অনেকে নারী বা মেয়েরাও অনেকাংশে দায়ী। অনেক মেয়েই পরজীবী থাকতে ভালোবাসে।

এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও মেয়েদের অবস্থার খুব উন্নতি হয়েছে তা নয়। এখনও একটা মেয়েকে তার ইচ্ছানুসারে কোন কিছু করার অনুমতি মিলে না, শুনতে হয় “বিয়ের পরে” যা ইচ্ছা করিস!! আর বিয়ের পর কী হয় সে আর বলার বাকি রাখে না। সংসার সন্তান আর দায়িত্বের চাপে মেয়ে নিজেকেই খুঁজে পায় না। এখনো ভাবা হয় একটা মেয়ের যদি ভালো ফ্যামিলিতে বিয়ে বা ওয়েল সেটেল্ড ছেলের সাথে বিয়ে হয়, তাহলে তার লাইফ সেট।

এই “ভালো” র সংজ্ঞা আমি জানি না! মেয়েকে ওয়েল সেটেল্ড করার চিন্তা করে না। আর ঘুরেফিরে সেই একজন পুরুষের অধীনে থাকাটাই হচ্ছে একজন নারীর তথাকথিত মুক্তি! অনেকটা শিকলের মতো। পায়ে শিকল বেঁধে ছেড়ে দেয়া আর বলা “তুমি তোমার ইচ্ছামতো উড়তে থাকো”
তবে এসব বিষয় থেকে বের হতে শুরু করেছে। তবে কেবলমাত্র শহরের কিছু মেয়েরা! গ্রামে-গঞ্জে এখনও অধিকাংশ মেয়ের দশা সেই রান্নাঘরের চৌকাঠ পর্যন্তই। এখন কিছু মানুষ বলবে, ‘রান্না করা কি অসম্মানজনক কাজ”? না, রান্না করা বা সংসারের দায়িত্ব নেয়া কোনভাবেই অসম্মানজনক কাজ নয়। বরং সম্মানেরই। কিন্তু অসম্মানজনক হচ্ছে সংসারের গুরুদায়িত্ব যে পালন করছে তাকে সম্মান না দেয়া। অসম্মান কীভাবে হচ্ছে? খুবই পরিচিত উক্তি “ও কিছু করে না, ঘরে থাকে”। আর যে সব নারী সংসার সামলানোর পাশাপাশি চাকরি করেন, তাদের তো ঘরে বাইরে দুই জায়গায় কথা শুনতে হয়। আমার জীবনে শোনা খুব হাস্যকরউক্তি “লক্ষ্মী আর স্বরসতী একসাথে থাকে না”।

কিছুদিন আগে আমাকে এক কলিগ চিৎকার করে ডেকে বলেছিলেন, “নামাজের সময় আপনারা নিচে নামবেন না, আমাদের ছেলেদের অজু নষ্ট হয়”। কারণ ওনার ছেলেরা মেয়েদের তেঁতুল মনে করে, দেখলেই জিভে জল চলে আসে। দোষ সব তেঁতুলের, যে তার নিজের জিভের পানি কন্ট্রোল করতে পারে না তার কোন দোষ নেই। যেদি ওনার ছেলেরা তাদের জিভের পানি কন্ট্রোল করতে পারবে সেদিন আশা করি নারীমুক্তি সম্ভব, এর আগে নয়। প্রত্যেকটা মেয়েই মানুষ। আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো দুঃখ-কষ্ট আছে। বিশ্বাস করেন, মেয়েরাও কষ্ট পায়, ভেঙ্গেচুরে যায়, ক্ষতবিক্ষত হয়, হাসি আনন্দে মেতে উঠে, খুশি হয়, জ্বর হয়, কান্সার হয়, সেক্স আছে, ভালো খারাপ বোধ আছে। এরা পুতুল না। রক্তে মাংসে মানুষ। হাত কাটলে এদেরও রক্ত বের হয়।

যেদিন প্রতিটা পুরুষ মেয়েদের “মেয়ে” ভাবার আগে “মানুষ” ভাববে, সেদিন প্রতিটা নারী নিজেদের “মানুষ” ভাববে, সেদিন নারীমুক্তি সম্ভব। আর সেদিন নারীদের কোন চাওয়াকে নারীবাদী মনে হবে না।
নারীমুক্তির জন্যই নারীবাদী আন্দোলনের কথাটার জন্ম। যেদিন প্রত্যেকটা মেয়ে নিজের ইচ্ছে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে, সেদিন আর নারীবাদী বলতে কিছু থাকবে না। এভাবে চলতে থাকলে এমন দিন আসতে খুব বেশি দেরি নেই, যেদিন মেয়েরা বিয়ে করে সংসার করার চেয়ে সিঙ্গেল থাকতে বেশি প্রেফার করবে!

পুরুষ থেকে আলাদা হলেই কি নারী মুক্তি? না, তা কখনোই নয়। বরং এমন অনেক পুরুষই আছেন যারা সরাসরি নারীবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত। নারীকে তার প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। তার পছন্দ মতো, স্বাধীনভাবে বাঁচার অধিকার দিতে হবে। কারোও সিংহাসনের সৌন্দর্য বর্ধক হিসেবে নয়। তাকেই সিংহাসনে বসার অধিকার দিতে হবে। তার লাইফ স্টাইল বা লাইফ পার্টনার পছন্দ করার অধিকার তাকেই দিতে হবে। কোন কাজ করবে বা করবে না সেটার সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার দিতে হবে। আর এজন্যই নারীবাদী আন্দোলন।

শেয়ার করুন:
  • 560
  •  
  •  
  •  
  •  
    560
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.