অল্প বয়সেই বুড়ো বানিয়ে দেয় রূঢ় বাস্তবতা

প্রান্তী সারোয়ার:

‘বলার মতো অনেক গল্প আমার আছে। আমি সব সময় ভালোবাসার কাঙাল ছিলাম। সর্বদা চেয়েছি কেউ আমাকে ভালোবাসুক। এখন অসংখ্য মানুষ আমাকে ভালোবাসেন। এটা সম্ভব হয়েছে আমি লিখি বলে। আমার কবিতা, গল্প, উপন্যাস যারা পছন্দ করেন। তারাই আমাকে ভালোবাসেন।’

কথাগুলো যিনি বলেছেন তিনি ভালোবাসার কাঙাল থেকে ধীরে ধীরে ভালোবাসার পাহাড় তৈরি করেছেন। একদিন যিনি ভালোবাসার জন্য কাঙাল ছিলেন, তার চারপাশটায় এখন শুধুই ভালোবাসাময়, যার সৌরভ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে। আর এসবই সম্ভব হয়েছে তার শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে। যার কথা বলা হচ্ছে তিনি ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভুত বিখ্যাত কবি ও ঔপন্যাসিক মায়া আবু আল-হায়াত
তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন লেবাননের বৈরুতে। তবে কাজের জন্য তিনি এখন রামাল্লায় বসবাস করেন। তিনি বর্তমানে প্যালেস্টাইন রাইটিং ওয়ার্কশপের একজন পরিচালক। কবি ও ঔপনাস্যিক পরিচয় ছাড়াও তার অন্য একটি পরিচয় রয়েছে। তিনি একজন প্রকৌশলীও (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার)। তবে প্রকৌশলী কাজের চেয়েও লেখনীতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।

সম্প্রতি আরব নিউজে তাকে নিয়ে প্রকাশ হওয়া এক প্রতিবেদন দেখে আমার চোখ আটকে যায়। সেই প্রতিবেদনের কয়েকটা লাইন দেখে মনের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। মনে হয় বাবা-মায়ের বিচ্ছেদই যেনো একটা সন্তানকে ভালোবাসার কাঙ্গাল করে দেয়।

প্রতিবেদনটি যদিও সাহিত্যের শক্তি নিয়ে লেখা। সেখানে বলা হয়েছে কিভাবে তিনি ধীরে ধীরে সাহিত্য দিয়ে ভালোবাসা অর্জন করেছেন। তিনি মূলত তার ইতিবাচক লেখনী দিয়েই চারিপাশে ভালোবাসার বীজ বপন করেছেন। কিন্তু তাই বলে তিনি রূঢ় বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি। আরব নিউজের সেই প্রতিবেদনে তিনি তুলে ধরেছেন তার ব্যক্তিগত জীবনের অনেক বিষয়। সেখানে তিনি জানান, তিনি বড় হয়েছেন তার ফুফুর কাছে। কারণ তার মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এমনকি ১০ বছর পর্যন্ত তিনি তার বাবাকে চোখের দেখাও দেখেননি। শুধু তাই নয় তিনি ২০ বছর পর্যন্ত তার মাকেও দেখেননি।

এই যে কঠিন রুঢ় বাস্তবতা, এই একটা কারণই একটা শিশুকে অল্প বয়সে বুড়ো বানিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয় এমন সন্তানেরা সত্যি খুব দ্রুত পরিণত হয়, ভালো মন্দ, আশপাশের পরিবেশ সবকিছু খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে তাদের উপর। আস্তে আস্তে হয় তারা পরিণত মানুষ তৈরি হয়, নতুবা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তবে যাই হোক ভাঙ্গা পরিবারগুলোর সন্তানেরা ভালোবাসার খুব কাঙ্গাল হয়। আবেগ, আর কল্পনাই যেনো তাদের একমাত্র মনের খোরাক হয়। বরাবরই ছুটতে থাকে ভালোবাসার পেছনে।

মায়া আবু আল-হায়াত যিনি কিনা বর্তমান সময়ের আরব বিশ্বের কণ্ঠস্বর, তিনি নিজ মুখেই জানিয়েছেন সব সময় তিনি ভালোবাসার কাঙাল ছিলেন। সর্বদা তিনি চেয়েছেন কেউ তাকে ভালোবাসুক। এখন অসংখ্য মানুষ তাকে ভালোবাসেন। এটা সম্ভব হয়েছে তিনি লিখেন বলেই। তার কবিতা, গল্প, উপন্যাস যারা পছন্দ করেন তাঁরাই তাকে ভালোবাসায় ভরিয়ে তুলেছেন।
ব্রোকেন পরিবারের এমন অনেকেই আছেন যারা কিনা শুধু হতাশাকেই বড় করে দেখেন। এক পা এগোতে গিয়ে দশ পা পিছিয়ে যান। মায়ার গল্পটা হতে পারে তাদের এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা। জীবনকে হতাশার বৃত্তে বেঁধে না রেখে ছড়িয়ে দিন ভালো লাগার কোনো কাজে। ভালোলাগার কাজ সবসময় হীন মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করে।

ভালোবাসা অসীম শক্তি। তাই বলবো পৃথিবীটা ভালোবাসাময় হোক, ভালোবাসার সুগন্ধ চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ুক মানুষ থেকে মানুষের মনে। বিভেদ কলহ সব উড়ে যাক, ধরাতে প্রত্যেকটা মানুষ আর যে কষ্ট নিয়েই বাঁচুক, অন্তত ভালোবাসাহীন হয়ে যেনো কাউকে কাঙ্গালের মতো জীবন-যাপন করতে না হয়।

 

লেখক: প্রান্তী সারোয়ার
বার্তাকক্ষ সম্পাদক, সময় টেলিভিশন
ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.