‘এম্পায়ার জিংক স্ট্রাইক’- একটি ভিন্নধর্মী ফেমিনিস্ট ইভেন্ট

নুজহাত জাহান:

সময়টা আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগের, স্থান আমেরিকার নিউ মেক্সিকোর জিংক টাউন। এমন একটা সময় যখন নারীবাদ বা ফেমিনিজমের ধারণা একেবারেই অপরিপক্ক। নিউ মেক্সিকোর জিংক খনিতে কাজ করা ‘ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ মাইন্, মিল এন্ড স্মেল্টার ওয়ার্কার’ এর অন্তর্ভুক্ত শ্রমিকদের করা একটি আন্দোলন তখন খুব সাড়া ফেলে দেয়।

আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে ১৭ ই অক্টোবর, ১৯৫০ সালে এবং তা ১৯৫২ সালের জানুয়ারির ২৪ তারিখ পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ঐ শহরের অধিকাংশ জিংক খনি এম্পায়ার জিংক কোম্পানির অধীনে ছিল। এসকল খনিতে কাজ করতো অ্যাঙ্গলো ও মেক্সিকান শ্রমিকরা। তবে মেক্সিকান শ্রমিকদের সংখ্যা ছিল বেশি। এম্পায়ার জিংক কোম্পানি এই শ্রমিকদের প্রতি প্রচণ্ড শোষণমূলক আচরণ করতো, বিশেষ করে মেক্সিকান শ্রমিকদের প্রতি তাদের বৈষম্যমূলক আচরণ ছিল চোখে পড়বার মতোন। কোম্পানির এমন বৈষম্যমূলক আচরণ ও নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে মেক্সিকান শ্রমিকরা তাদের কাজ বন্ধ রেখে যে আন্দোলনের ডাক দেয়, সেটিই ‘এম্পায়ার জিংক স্ট্রাইক’ নামে পরিচিত। যেসকল বৈষম্যমূলক আচরণের উপর ভিত্তি করে এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে তাহলো মেক্সিকান শ্রমিকদের পারিশ্রমিক অ্যাঙ্গলো শ্রমিকদের তুলনায় কম ছিল, মেক্সিকান শ্রমিকদের পোর্টাল-টু-পোর্টাল পে করা হতো না, খনির ভিতরে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি বিদ্যমান ছিল এবং মেক্সিকান শ্রমিকদের অ্যাঙ্গলো শ্রমিকদের মত পেইড হলিডে প্রদান করা হতো না।

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যা শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের সাথে সরাসরি জড়িত ছিল না। যেমন, এসকল শ্রমিকরা তাদের পরিবারের সাথে যেখানে বাস করত তা কোম্পানির অধীনে গড়ে ওঠা কোম্পানি টাউন নামে পরিচিত ছিল। এখানেও মেক্সিকান শ্রমিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ লক্ষ্য করা যায়। অ্যাঙ্গলো শ্রমিকদের ঘরে সরাসরি পানির পাইপের ব্যবস্থা ছিল যা মেক্সিকান শ্রমিকদের ঘরে ছিল না। মেক্সিকান শ্রমিকদের স্ত্রী, মা, বোন ও পরিবারের অন্যান্য নারী সদস্যদের দূরবর্তী পানির পাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করতে হতো। এছাড়া গরম পানির ব্যবস্থাও তাদের ছিল না। ফলে মেক্সিকান নারীরা আন্দোলনের সময় এই ব্যাপারগুলো শ্রমিক ইউনিয়নের সামনে তুলে ধরেন। কিন্তু শ্রমিকরা তাদের এই বিষয়গুলোকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

অন্যদিকে আন্দোলন চলতে থাকে। মেক্সিকান শ্রমিকরা সুসংগঠিতভাবে দিনভর পিকেটিং করতে থাকে এবং তাদের পরিবারের নারী সদস্যরা রান্না, বাচ্চা লালন-পালন ও গৃহস্থলির যাবতীয় কাজ করতে থাকেন, যা ঐতিহ্যগতভাবে ‘নারীর কাজ’ হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছিল। ধীরে ধীরে নারীরা পিকেট লাইনে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কফি সরবরাহ করতে শুরু করেন। এভাবে খাদ্য সরবরাহ, চিঠির মাধ্যমে জনগণকে আন্দোলন সম্পর্কে অবহিত করা ইত্যাদির কাজের মাধ্যমে কয়েকদিনের ভিতর এই আন্দোলনে সাপোর্ট সিস্টেম হিসেবে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। এরই মধ্যে কোম্পানি আন্দোলন থামাতে পুলিশ মোতায়েন, এরেস্ট, স্ট্রাইকব্রেকারস ও বিভিন্ন রকম চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে। কিছুদিন পর কোর্ট থেকে শ্রমিকদের পিকেটিং লাইনে যাওয়ার উপর আইনি নিষেধাজ্ঞা আসে। পিকেট লাইন না থাকা মানে আন্দোলন হেরে যাওয়া। অবস্থা বেগতিক দেখে শ্রমিক ইউনিয়ন এর জরুরি সভা ডাকা হয়। সভায় নারীরা প্রস্তাব করে যে নারীরা এবং কিছু ক্ষেত্রে শিশুরাও পিকেটিং করবে, কারণ তারা ইউনিয়নের সদস্য নয়। তাই তাদের প্রতি সরাসরি আইনি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবে না এবং আন্দোলন চালু রাখা যাবে। কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে এই কাজ নারীদের ‘জেন্ডার রোল’কে সমর্থন করে না। তাই অধিকাংশ পুরুষ এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। অপরদিকে এই প্রস্তাবের বিকল্প কোন উপায় কারো জানা ছিল না। তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় নারীরা পিকেটিং করবে কিনা তা নিয়ে ভোটাভুটির সিদ্ধান্ত হয় এবং বলা হয় যে সেই ফলাফলের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এবার আরেক সমস্যা দেখা দিল। ভোট দেয়ার অধিকার কেবল পুরুষ শ্রমিকদের ছিল, যেহেতু এটা ইউনিয়নের সভা ছিল। কিন্তু নারীরাও ভোট দেয়ার জন্য জোর করতে লাগলো, কেননা এই আন্দোলন তাদের জীবনকেও সমানভাবে প্রভাবিত করেছিল। অবশেষে নারী-পুরুষ উভয়ের ভোটে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে নারীরাই পিকেট লাইন সামলাবে। পরেরদিন থেকে নারীরা পর্যায়ক্রমে পিকেটিং শুরু করে এবং পুরুষেরা ঘরে থেকে প্রথমবারের মতো রান্না-বান্না, পানি সংগ্রহ ও গরম করা, বাচ্চার দেখাশোনা এবং অন্যান্য কাজের দায়িত্ব পালন করা শুরু করে। অর্থাৎ চিরাচরিত ‘জেন্ডার রোল’ উল্টে যায়।

কয়েকদিন পর পুলিশ পিকেটিং করতে থাকা নারীদের উপর আক্রমণ, এরেস্ট, এমনকি তাদের শিশুদেরও এরেস্ট করে কারাগারে প্রেরণ করা শুরু করে। কিছুদিনের মধ্যেই কারাগার নারী আন্দোলনকারীদের দিয়ে ভর্তি হয়ে যায়। তারা সেখানে খাদ্য ও অন্যান্য ব্যাপার নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করা শুরু করে। ১৯৫১ সালের পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের এমন গণহারে কারাগারে যাওয়া সচরাচর কোন ঘটনা ছিল না। এতোকিছুর পরেও আটককৃত নারীরা সংঘবদ্ধ থাকতে ভুলেনি। অপরদিকে সমালোচনার মুখে এবং অবস্থা ঠিক রাখতে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ আটককৃতদের কারাগার থেকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তিতে কোম্পানি কয়েক দফা চেষ্টা চালিয়েও আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাথে সমঝোতায় আসে। শ্রমিকদের প্রায় সকল দাবি-দাওয়া নিশ্চিত করা হয় এমনকি তাদের ঘরে গরম পানির ব্যবস্থাও করা হয়।

নুজহাত জাহান

এই ঘটনা দুইটি নতুন উপলব্ধির জন্ম দেয়, প্রথমত, আন্দোলনের শুরুতে হাউজিং সংক্রান্ত নারীদের দাবিগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, ইউনিয়নের পুরুষ শ্রমিকরা ‘জেন্ডার রোল’ বিনিময়ের মাধ্যমে তা বুঝতে পারে। দ্বিতীয়ত, কমিউনিটির যেকোনো আন্দোলনে পুরুষদের ন্যয় নারীরাও যে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে, তা সকলে উপলব্ধি করতে পারে। এটি কেবলমাত্র একটি দাবি আদায়ের আন্দোলন ছিল না, বরং এই ঘটনা শ্রমিকদের নিপীড়ন সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, সমাজে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এর উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং সকলকে একটি ইক্যুয়াল সমাজ ব্যবস্থার ধারণা প্রদান করে।

কেবলমাত্র পুরুষ শ্রমিকদের নিয়ে শুরু হলেও নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া এই দাবিদাওয়া আদায় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমাজে নারী-পুরুষ উভয়ের একত্রিত অংশগ্রহণ রেসিজম, সেক্সিজম, ক্লাস কনফ্লিক্ট এর মতো যেকোনো সামাজিক সমস্যার সমাধান এনে দিতে সক্ষম।

উল্লেখ্য যে, এই আন্দোলনের কাহিনী অনুসারে ১৯৫৪ সালে ‘সল্ট অফ দ্য আর্থ’ নামে একটি সিনেমা তৈরি করা হয় যা অনেক সমালোচনার শিকার হয়। এমনকি এই সিনেমার ডিরেক্টর, প্রডিউসারসহ আরও অনেককেই কমিউনিস্ট পলিটিক্সের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ব্ল্যাকলিস্টেড করে রাখা হয়। ১৯৫৪ সালের এটি একমাত্র সিনেমা যা আমেরিকাতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এম্পায়ার জিংক স্ট্রাইকে অংশ নেয়া আসল আন্দোলনকারীরাই এই সিনেমায় অভিনয় করেন। ৯৪ মিনিটের এই সিনেমা মুক্তির অনেক বছর পর ফেমিনিস্টদের অনবরত চেষ্টার ফসল হিসেবে ১৯৯০ এর দশকে সমালোচকদের কাছে প্রশংসিত হয় এবং জনপ্রিয়তা লাভ করে। ৬৬ বছর পুরাতন হলেও বর্তমান সমাজেরই কিছু কিছু ক্ষেত্রের প্রতিচ্ছবি যেন ভেসে ওঠে সল্ট অফ দ্য আর্থ সিনেমায়!

 

লেখক: নুজহাত জাহান
BSS & MSS in Criminology, University of Dhaka.

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.