‘যৌন হয়রানি’ ধারণাটাই যখন ধোঁয়াশা, প্রমাণ তখন দূর অস্ত

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

“সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট কিন্তু রেপ না। বা অ্যাটেম্পট টু রেপ না। সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট আসলে কী? টাচ? হাত ধরা? আমিও তোমার হাত ধরছি। মানে, হু উইল ডিফাইন সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট? ধরো একটা লম্বা কনভার্সেশনের পার্টিকুলার একটা অংশ নিয়ে কমপ্লেইন করলেই কিন্তু একটা মানুষ দোষী হয়ে যায় না।”

“রাব্বি, স্টপ ডিফেন্ডিং রুশো।”

“আই অ্যাম নট ডিফেন্ডিং হিম, মাহা। পুরো কনটেক্সটটা না জেনে আমি ওকে ক্রিমিনালও বানাতে পারছি না।”

উপরের আলাপচারিতাটুকু নেয়া আশফাক নিপুণ পরিচালিত ‘ভিকটিম’ টেলিফিল্ম থেকে। সরাসরি সেক্সুয়াল হ্যারাসমেন্ট বা যৌন হয়রানির সংজ্ঞা দেয়া না হলেও, এই বিষয়টি যে কী, সে সম্পর্কে প্রশ্ন ঠিকই দর্শকের মনে জন্ম দেয় এই আলাপচারিতাটুকু।

বর্তমানের এসব আলাপচারিতার পাশাপাশি নন-লিনিয়ার স্টাইলের চিত্রনাট্যে নির্মাতা কিন্তু ‘তথাকথিত’ যৌন হয়রানির ‘কনটেক্সট’-ও অতি সূক্ষ্মভাবে দেখানোর চেষ্টা করেন।

আমাদের সামনে যে ঘটনাক্রম তুলে ধরা হয় তা হলো এমন: ফারিয়ার (সাফা কবির) কর্মদক্ষতায় তার বস রুশো (নিশো) খুবই মুগ্ধ। তাই সে ফারিয়াকে প্রস্তাব দিয়ে বসে, কক্সবাজার ট্যুরে অন্য একজনের পরিবর্তে যেন সে যায়, কেননা প্রেজেন্টেশনের সময় তার ইনপুটগুলো অনেক কাজে লাগবে। এরপর আমরা দেখতে পাই ফারিয়া তার ব্যক্তিগত রোমান্টিক সম্পর্কের ব্যাপারেও বস রুশোর সাথে শেয়ার করছে, এবং রুশোর পরামর্শে ফারিয়া তার এক্স বয়ফ্রেন্ডের সাথে ব্রেকআপ করে ফেলছে।

পরবর্তীতে দেখা যায় ফারিয়া রুশোকে টেক্সট করার সময় ভুল করে মেসেজের শেষে উইঙ্ক ইমোজি পাঠিয়ে দেয়, জবাবে রুশোও উইঙ্ক ইমোজিসহ একটি রিপ্লাই দেয়। ফারিয়া জানায় সে ভুলবশত ওই ইমোজি দিয়ে ফেলেছে। তারপরও রুশো আর ফারিয়ার এরপরের আলাপচারিতাগুলো অনেকটা ফ্লার্টের মতো মনে হয়।

এরপর একদিন রাত দশটা অবধি ফারিয়াকে অফিসে বসে কাজ করতে দেখা যায়। রুশোর মুখ থেকে আমরা শুনতে পাই, অফিসে আর কেউ নেই। সে ফারিয়াকে তাড়া দেয়, এবং আমরা শূন্য অফিস থেকে রুশো ও ফারিয়াকে বের হয়ে যেতে দেখি। তাদের মধ্যে পরবর্তীতে কী হয় আমরা জানি না। কিন্তু পরে একদিন ফারিয়া এসে জানায় যে সে কক্সবাজার ট্যুরটায় যেতে পারবে না। কারণ হিসেবে ওই সময়ে তার বাবার হাসপাতালে চেক-আপের বিষয়টি সে রুশোকে জানায়।

ফারিয়ার কক্সবাজারে যেতে আপত্তির পর থেকেই তার প্রতি রুশোর আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। ফারিয়া নতুন একটি প্রজেক্টের প্রেজেন্টেশন তৈরি করে রুশোর কাছে নিয়ে যায়। আগেরবার তার যে ধরনের কর্মনৈপুণ্যে রুশো বিমোহিত হয়েছিল, এবার সেই একই ধরনের কাজেই রুশো রেগে যায়। খুব বাজেভাবে ফারিয়াকে অপমান করে বসে সে।

এটুকুই ছিল রুশো আর ফারিয়ার চার বছর আগের ফ্ল্যাশব্যাক। আপাতদৃষ্টিতে আমাদের কাছে মনে হতে পারে, এই ঘটনাগুলোয় কোথাওই সরাসরি রুশো কর্তৃক ফারিয়া যৌন হয়রানির শিকার হয়নি। আমাদের এমন মনে হওয়ার কারণ উপরে রাব্বি চরিত্রটির সংলাপের মাঝেই নিহিত আছে। সে যৌন হয়রানির উদাহরণ হিসেবে “টাচ, হাত ধরা”-র কথা বলেছিল। এছাড়াও অবাঞ্ছিতভাবে কাউকে জড়িয়ে ধরা কিংবা মৌখিকভাবে কাউকে নিগ্রহকেও আমরা যৌন হয়রানি হিসেবে ধরে নিই। কিন্তু রুশো ফারিয়ার সাথে যা যা করেছে বলে নির্মাতা আমাদেরকে দেখিয়েছেন, সেগুলো কি যৌন হয়রানি ছিল?

এ প্রশ্নের জবাব পেতে দেখা যাক যৌন হয়রানির সংজ্ঞা আসলে কী। Equal Employment Opportunity Commission (EEOC)-এর দেয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী (যেটি জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত) যৌন হয়রানি বলতে বোঝায়:

“Unwelcome sexual advances, requests for sexual favors, and other verbal or physical conduct of a sexual nature when:

· Submission to such conduct is made either explicitly or implicitly a term or condition of an individual’s employment, or

· Submission to or rejection of such conduct by an individual is used as a basis for employment decisions affecting such individual, or

· Such conduct has the purpose or effect of unreasonably interfering with an individual’s work performance or creating an intimidating, hostile, or offensive working environment.”

এরপর “Unwelcome Behavior” বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা বলেছে,

“এটি খুবই জটিল একটি বিষয়। এটি সবসময়ই যে ‘অনিচ্ছাসত্ত্বেও’ হবে, তা নয়। কোনো অপমানজনক বা আপত্তিকর কাজে একজন ভুক্তভোগী সম্মতি দিতে পারেন, রাজি হতে পারেন এবং সক্রিয়ভাবে সেই কাজে অংশও নিতে পারেন। কিন্তু তারপরও সেই যৌন ব্যবহারটি অনভিপ্রেত (Unwelcome) হিসেবে বিবেচিত হবে, যদি অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিটি সেটিকে অনভিপ্রেত বলে অনুভব করেন। ওই অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি কোনো ডেটের প্রস্তাব, যৌন-সম্পর্কিত মন্তব্য বা রসিকতাকে স্বাগত জানিয়েছেন কি না, তার সবটাই সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।”

এখানে ‘সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতি’ (Circumstance) হিসেবে আমরা বলতে পারি আর্থিক সুবিধা, কর্মসংস্থানের সুযোগ ইত্যাদিকে। অর্থাৎ, কর্মক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি কর্তৃক আরেকজন ব্যক্তি আপত্তিকর যৌন ব্যবহারে সায় দিতেই পারেন নিজের আর্থিক লাভ কিংবা পদোন্নতির আশায়। কিন্তু তারপরও, ওই ব্যক্তি সায় দেয়া সত্ত্বেও, যদি কাজটিকে অনভিপ্রেত মনে করেন, তাহলে সেটি যৌন হয়রানি হিসেবেই বিবেচিত হবে।

এখন দেখা যাক Equal Employment Opportunity Commission এর মতে যৌন হয়রানি হতে পারে কোন কোন ক্ষেত্রে:

· Actual or attempted rape or sexual assault.
· Unwanted pressure for sexual favors.
· Unwanted deliberate touching, leaning over, cornering, or pinching.
· Unwanted sexual looks or gestures.
· Unwanted letters, telephone calls, or materials of a sexual nature.
· Unwanted pressure for dates.
· Unwanted sexual teasing, jokes, remarks, or questions.
· Referring to an adult as a girl, hunk, doll, babe, or honey.
· Whistling at someone.
· Catcalls.
· Sexual comments.
· Turning work discussions on sexual topics.
· Sexual innuendos or stories.
· Asking about sexual fantasies, preferences, or history.
· Personal questions about social or sexual life.
· Sexual comments about a person’s clothing, anatomy, or looks.
· Kissing sounds, howling and smacking lips.
· Telling lies or spreading rumors about a person’s personal sex life.
· Neck massage.
· Touching an employee’s clothing, hair, or body.
· Giving personal gifts.
· Hanging around a person.
· Hugging, kissing, patting, or stroking.
· Touching or rubbing oneself sexually around another person.
· Standing close or brushing up against a person.
· Looking a person up and down (elevator eyes).
· Staring at someone.
· Sexually suggestive signals.
· Facial expressions, winking, throwing kisses, or licking lips.
· Making sexual gestures with hands or through body movements.

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমরা যৌন হয়রানি বলতে সাধারণত যেগুলোকে বুঝে থাকি, সেগুলো না হলেও, ‘ভিকটিম’ টেলিফিল্মের রুশো চরিত্রটি অন্য অনেক কাজই করেছে, যেগুলোকে যৌন হয়রানি বলা যেতে পারে (আবার না-ও পারে, নির্ভর করছে যাকে উদ্দেশ্য করে এগুলো করা হচ্ছে সে এগুলোতে সম্মত কি না তার উপর)। যেমন:

· ব্যক্তিগত বিষয়ে প্রশ্ন করা। একজন ব্যক্তির কেন মন খারাপ এ বিষয়ে আগ্রহ দেখানো হয়তো কোনো অপরাধ নয়। সেটি সাধারণ মানবিকতা বা সৌজন্যবোধ। কিন্তু প্রেমিকের সাথে সমস্যা হচ্ছে শুনে আগ বাড়িয়ে সেই সম্পর্কে পরামর্শ দেয়া, ব্রেকআপ করতে বলা অনেকের জন্যই অনভিপ্রেত ঘটনা হতে পারে। (Personal questions about social or sexual life)

· ‘ভুলবশত’ উইঙ্ক ইমোজি চলে আসার পর নিজেরও ওই একই ইমোজি ব্যবহার করা, এবং সেটির সূত্র ধরে ফ্লার্ট করতে শুরু করা। (Unwanted letters, telephone calls, or materials of a sexual nature)

· অন্তত দুইবার রুশোর ফারিয়াকে ‘ডেট’-এর জন্য জোর করা। একবার কফি খাওয়ার জন্য নিয়ে যাওয়া, আরেকবার ‘অনেক রাত হয়েছে’ বলে লিফট দিতে চাওয়া। (Unwanted pressure for dates)

এই তিনটি দৃষ্টান্তের কোনোটিকেই হয়তো খুব ‘বাড়াবাড়ি রকমের যৌন হয়রানি’ বলা যেত না, যদি না পরবর্তীতে রুশোর কিছু কাজের মাধ্যমে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যেত যে সে সম্ভবত ফারিয়ার কাছ থেকে কোনো ‘ফেভার’ আশা করছে। আমরা দেখেছি, কক্সবাজার যাওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই রুশো ফারিয়ার সাথে অসদাচরণ শুরু করে, এবং তারই ধারাবাহিকতায় ফারিয়ার প্রত্যাশিত পদোন্নতিও আটকে যায় বলেই আমরা ধারণা করতে পারি। এই ঘটনাটি খুব সূক্ষ্ম ইঙ্গিত দেয় যে ফারিয়ার প্রতি রুশোর কোনো গোপন কামনা ছিল, যা চরিতার্থ না হওয়ার ফলেই প্রতিহিংসার বশে সে কর্মক্ষেত্রে ফারিয়ার জন্য প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে।

টেলিফিল্মের শেষাংশে ফারিয়া চরিত্রটি বলে, সে দুইবার যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। উপরে সম্ভাব্য যেসব যৌন হয়রানির কথা বলা হলো, সেগুলোকে যদি সে নিজে হয়রানি বলে না-ও মানে, তবু তার দুইবার হয়রানির শিকার হওয়ার জায়গা কিন্তু থেকেই যায়। প্রথমবার যেদিন রাত দশটা পর্যন্ত সে অফিসে ছিল, এবং রুশো তাকে লিফট দিতে চেয়েছিল। দ্বিতীয়বার সে হয়রানির শিকার হয়ে থাকতে পারে অনলাইনে। কেননা রুশো তার স্ত্রী মাহাকে বলেছিল, সে নাকি ফেসবুকে ফারিয়াকে ব্লক করে দিয়েছে। কিন্তু ঘটনা উল্টোটাও হতে পারে। হয়তো ফারিয়াই রুশোকে ফেসবুকে ব্লক করেছে, রুশোর কোনো অনভিপ্রেত আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে।

সুতরাং ‘ভিকটিম’ টেলিফিল্মে রুশো চরিত্রটি যে আসলেই দোষী বা গিলটি, সে বিষয়ে আসলে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না। কিন্তু তারপরও যদি কারো মনে প্রশ্ন থাকে যে কেন তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণ করা গেল না, সে উত্তর আমরা পেয়ে যাই রাব্বি নামক মাহার ব্যারিস্টার বন্ধুটির সংলাপ থেকেই।

যেহেতু যৌন হয়রানি ধারণাটি নিয়েই বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বব্যাপী অনেক ধোঁয়াশা রয়েছে, এবং এই হয়রানিকে প্রমাণ করা কঠিন, সে কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে হ্যাশট্যাগ মি টু মুভমেন্টে ওঠা যৌন হয়রানির অধিকাংশ অভিযোগই শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করা যায়নি। একই কথা প্রযোজ্য ‘ভিকটিম’ টেলিফিল্মে ফারিয়ার সাথে হওয়া ঘটনায়ও।

আমরা দেখেছি, তার বস রুশো তার সাথে যেসব কাজ করেছে, তাতে সে সরাসরি আপত্তি করেনি। ফলে সেগুলোর জন্য রুশোকে ‘অপরাধী সাব্যস্ত’ করা যায় না। অথচ ফারিয়া যে কাজগুলো করতে বাধ্য হয়নি, সেটিও কিন্তু বলা যায় না। অফিসে নিজের চাকরি টিকিয়ে রাখা বা পদোন্নতির আশাতেই হয়তো সে অস্বস্তিবোধ সত্ত্বেও একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এগুলো মেনে নিয়েছে, সহ্য করে গেছে। ফলে EEOC প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী সে অবশ্যই যৌন হয়রানির শিকার, যদিও অধিকাংশ দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী তার অভিযোগ প্রমাণ করা যাবে না।

যা-ই হোক, ‘ভিকটিম’ টেলিফিল্মের কাহিনী কিন্তু একদমই এটি প্রতিষ্ঠিত করা নয় যে রুশো চরিত্রটি দোষী নাকি নির্দোষ। টেলিফিল্মের নামকরণ থেকেই বোঝা যায়, গোটা ঘটনায় ভুক্তভোগী আসলে কে, সেটিই এই টেলিফিল্মের মুখ্য উদ্দেশ্য। এবং কেউ যদি টেলিফিল্মটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখেন, তাহলে সম্ভবত বুঝতে অসুবিধা হবে না কে সেই ভুক্তভোগী বা ভিকটিম। তারপরও, যেহেতু এই টেলিফিল্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের টেলিভিশনে প্রথমবারের মতো “যৌন হয়রানি কী” প্রশ্নের অবতারণা ঘটানো হয়েছে, তাই এই বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টিকে সবার জন্য সুস্পষ্ট ও বোধগম্য করে তোলা জরুরি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.