অস্তিত্ব

নাজনীন পারভিন:

দেবদারু গাছগুলো ন্যাড়া মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। বসন্তের শেষ দিকে প্রতিবছর একই দৃশ্য দেখতে পায় দূর্বা। দিনের আলো মিলিয়ে গেছে বেশ কিছুটা সময় আগেই। সন্ধ্যায় হাঁটতে নেমেছে দূর্বা বেশ অনেকদিন পর। হাউজিং এষ্টেটের ১২ নং বিল্ডিং এর মাথা থেকে ঘুরতেই দাঁড়িয়ে গেল সে। একটা ন্যাড়া গাছের শুকনো কালো ডালের ভেতর দিয়ে পূর্ণ গোলাকার থালা, কমলা রং-এর আলো ছড়াচ্ছে। এই আলোর তীব্রতায় এষ্টেটের রোড লাইটগুলো ম্লান হয়ে গেছে, মিটমিট করে জ্বলছে। পাঁচ তলা বিল্ডিংগুলোকে এক একটা দ্বীপের মতো লাগছে। সন্ধ্যার শেষ আলোটুকু মিলিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগে। ধীরে ধীরে পা বাড়ালো দূর্বা। যখন সে দেবদারু গাছটার নিচে পৌঁছালো আলো আছড়ে পড়লো ওর গায়ের উপর। চোখ বন্ধ করে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়ালো দূর্বা। জোৎস্না ভিজিয়ে দিল তাকে। এর সাথে মৃদু ঠাণ্ডা বাতাস শিহরণ জাগালো। আবার হাঁটতে শুরু করলো দূর্বা। একটু এগিয়ে মোড়ের কাছে আসতেই বকুল গাছের তলা দিয়ে যখন হাঁটছিল, আলো তখন পুরোপুরি মাটিতে পৌঁছাতে পারছিল না ঘন পাতার ফাঁক দিয়ে। হালকা আলো-আঁধারী সৃষ্টি হয়েছে। দূর্বা যেন গহীন কোন জঙ্গলে প্রবেশ করেছে।

রাতের আঁধারে ঘন জঙ্গলে কী করছে দূর্বা? এই জঙ্গলের শেষ কোথায়? দূর্বা কি তবে পথ হারিয়ে ফেলেছে?
– মিসেস খান, কেমন আছেন? অনেকদিন পর বের হলেন মনে হচ্ছে।
প্রতিবেশী আসমা বেগমের কথায় ঘোর কাটলো।
হ্যাঁ, অ-নে-ক দিন পর।

আরও কিছু বলার ছিল আসমা বেগমের। কিন্তু তার আগেই পা বাড়ালো দূর্বা। কে এই মিসেস খান? এটা তো তার নাম না। তার নিজস্ব একটা নাম আছে। যেটা তার বাবা তাকে দিয়েছিল। সময়ের সাথে নতুন নতুন অনেক নামের জন্ম হয়েছে। ওগো, শুনছো, বৌমা, ভাবী, কিংবা রুপকথার মা। এগুলো তার কাছের মানুষের ডাক, বাইরের মানুষ ডাকে মিসেস খান। এতো সব ভিড়ের মাঝে তার নিজের নাম কোথায়? ছোট ভাই-বোনদের কাছে আপুমনি, তাদের বাচ্চাদের কাছে খালামনি বা ফুপি। বাবা-মা হারিয়ে গেছে সেই কবে। মায়ের মৃত্যু শয্যায় বাবা যখন মাকে বার বার দূর্বার মা, দূর্বার মা বলে ডাকছিল, দূর্বার ভেতরটা কেমন খাঁ খাঁ করছিল। দূর্বার মা এই ডাকটা হারিয়ে যাচ্ছিল চোখের সামনে, ওর কিছু করার ক্ষমতা ছিল না। মায়ের সাথে সাথে ডাকটাও মিলিয়ে গেল। বুকের জমাট কষ্টগুলো কখন চোখের নোনা জল হয়ে ওকে ভিজিয়ে দিয়েছে বুঝতেও পারেনি। মায়ের চলে যাওয়া মেনে নিতে পারেনি বলে বাবাও চলে গেলেন। বাবা-মা না থাকলে তাদের আত্মীয়-স্বজনও হারিয়ে যায় সময়ের সাথে সাথে। তারা থাকলে হয়তো তার নিজস্ব নামের চর্চা থাকতো। দূর্বার মনে থাকতো এটা তার নাম, যেটা সে দীর্ঘ ২৫ বছর বহন করেছিল তার বিয়ের আগে পর্যন্ত। বন্ধু-বান্ধবীরা তাকে দূর্বা নামে ডাকে বটে, তবে তাদের সাথেও কী এমন যোগাযোগ রেখেছে দূর্বা। ওর কাছের বন্ধুরা বেশীর ভাগই চাকরি করে কেউ বা পাড়ি জমিয়েছে বিদেশে। নিজস্ব কোন পরিচয় সৃষ্টি করতে পারেনি বলে বন্ধুমহল থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছে। তবুও কালে ভদ্রে ওর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠে:

হ্যালো, দূর্বা, সব ভালো তো?

কোভিড-১৯ গোটা পৃথিবীর হিসেব পাল্টে দিয়েছে। খুব ছোটবেলায় একটা নাটক দেখেছিল দূর্বা, বিটিভিতে। তখন অবশ্য সম্বল বলতে একটা চ্যানেলই ছিল। কলেরা রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়। আজ এতো বছর পর ঠিক সেই রকম অনুভূত হচ্ছে। আজ আমাদের দেশের ১২০তম দিন সংক্রমণের, মৃত্যু ২১০০ আর পৃথিবীর মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ। ঢাকা শহর অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেছে, শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ, চাকরি চলে গেছে অগণিত মানুষের। বাসা ভাড়া মেটাতে না পেরে স্বপ্ন ছেড়ে, শহর ছেড়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরছে- তবে এবারের ফেরাতে নাড়ীর কোন টান নেই, নেই কোন উত্তেজনা। অনেকে গেছে বাবা-মার কাছে, এতো দীর্ঘ ছুটি পেয়ে। দূর্বার সেই অর্থে যাবার কোন জায়গা নেই। বাঁচুক- মরুক এখানেই থাকতে হবে।বাবা-মার অগস্ত্য যাত্রার সাথে সাথে অনেক কিছুই বিদায় নিয়েছে জীবন থেকে। তাই পৃথিবী যখন করোনা জ্বরে জর্জরিত, মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হতে হতে হচ্ছে, তখনও দূর্বার ফোন খুব একটা বাজে না তার কুশলাদী জানতে।

দূর্বা তার চল্লিশোর্ধ বয়সে এরকম দুর্যোগ আর দেখেনি। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে, প্রতিদিন মৃত্যুর নতুন রেকর্ড হচ্ছে, আবার তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের সাথে আর একটি দেশের নতুন প্রতিযোগীতা মৃত্যুর রেকর্ড ভাঙ্গা।এরা হচ্ছে পৃথিবীর সেই সব দেশ, যারা সুযোগ পেলেই এক হাত দেখে নেয় অন্য দেশকে তারাই আজ এই মহামারী ঠেকাতে হিমসিম খাচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যাবস্থার কখনোই উন্নত করার প্রয়োজন মনে করেনি কর্তৃপক্ষ, কারণ তারা হাঁচি- কাশি দিলেই পৌঁছে যান বামরুনগ্রাদ বা মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে। আজ তার দাম দিতে হচ্ছে সবাইকে। পাঁচ তারকা হোটেলের সতো সুসজ্জিত উন্নত হাসপাতালগুলোও কোন আশা যোগাতে পারছে না। এর মধ্যে যোগ হয়েছে, নানা ধরনের দুর্নীতি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পঁচন ধরেছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত। কেটে ফেলে রাখার মতো অবস্থায় আর নেই। যাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আমাদের চাইতে অনেক উন্নত তারাও পেরে উঠছে না।পৃথিবীটা যেন একটা মৃত্যুপুরী।

শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান এখনোও বন্ধ, অফিস-আদালত খুলেছে স্বল্প পরিসরে। খুব বেশি দরকার না পড়লে এখনও বাইরে যাওয়া নিষেধ। রূপকথা আর তার বাবা দুজনই বাসায়। রূপকথা ব্যস্ত তার অনলাইন ক্লাস, বন্ধুদেরে সাথে ভিডিও আড্ডা নিয়ে, ওর বাবা অফিসের কাজ, নিউজ আর ফোন নিয়ে। দূর্বা ওদের দুজনকে একসাথে বাড়িতে পেয়ে নানা ধরনের খাবার বানানো নিয়ে ব্যস্ত। স্বাভাবিক সময় হলে ওদের দুজনকে একসাথে বাড়িতে পাওয়া খুবই দুষ্কর। রূপকথার স্কুল, কোচিং, গানের ক্লাস, আর্ট আর ওর বাবার অফিস, দেশের বাইরের ট্যুর, রাতে ক্লাব- এই নিয়েই সময় চলে যায় কোনদিক দিয়ে দূর্বা বুঝতেও পারে না।

দূর্বা বাবা আর মেয়ের মধ্যে সেতুর মতো। ওদের কখন কী দরকার সব প্রস্তুত রাখে দূর্বা। এতেই ওরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। রূপকথা ঘুম থেকে উঠেই দেখবে স্কুলড্রেস, টিফিন, পানি সব গোছানো। মিজান চোখ খুললেই বিছানার পাশে গ্রিনটি আর খবরের কাগজ, বাথরুমের গিজার অন করা, টাওয়েল দেয়া, গোছল থেকে বের হলেই অফিসের কাপড়, ঘড়ি, জুতা, টাই সবকিছু জায়গামতো। বিয়ের পর থেকে এভাবেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে মিজান। কোন কিছুই একবারের বেশি দুবার বলতে হয়নি কখনো। মিজানও চেষ্টা করেছে দূর্বার প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে দিতে। কিন্তু চাহিদা একেবারেই নেই দূর্বার। নিজের জন্য কেনার চাইতে স্বামী আর মেয়ের জন্য বেশি আগ্রহ। খুব শখ করে কেনে ঘর সাজানোর জিনিস। তাই একটা ক্রেডিট কার্ড করে দিয়েছে দূর্বাকে, যেন ওর যা প্রয়োজন তা কিনতে পারে, কারও কাছে হাত পাততে না হয়, এমনকি মিজানের কাছেও না।

করোনার কারণে কাজের লোক ছাড়িয়ে দেয়া হয়েছে প্রায় তিন মাস হলো। সব কাজ একহাতে করতে বেশ ক্লান্ত লাগে আজকাল, বয়স হচ্ছে বোঝা যায়। রান্না শেষ করে মব দিয়ে ঘর মুছতে মুছতে খবর দেখছিল সে। প্রতিদিন মারা যাচ্ছে রথি-মহারথিরা, হঠাৎ খবরের একটা বিষয় কানে লাগলো। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন মারা গেছেন, তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন দেখানো হলো। কখন তার দাফন, কোথায় দাফন সব বর্ণনা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিন আগে একজন মন্ত্রীর স্ত্রী মারা গেলেন, একলাইনে তার খবর শেষ। কারণ তার নিজস্ব কোন পরিচয় ছিল না! মব করতে করতে থেমে গেল দূর্বা, লিভিং রুমের সোফায় বসে পড়লো। নিউজ প্রেজেন্টার তার পরবর্তী খবর পরিবেশন করে চলেছেন।

দূর্বা ভাবতে লাগলো মন্ত্রীর রাজনৈতিক জীবনে তার স্ত্রীর ভূমিকা কতটা সেটা শুধু তার কাছের লোকেরা বলতে পারবে। হয়তো বা তিনি সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন, তাই মন্ত্রীর রাজনীতি করার রাস্তা সহজ হয়েছিল। কিন্তু আমরা স্যালুট করবো ফ্রন্টলাইন যোদ্ধাদের। পেছনের গল্প শোনা বা জানার সময় কোথায়? দূর্বা ভাবলো, বেশির ভাগ মেয়েরাই তো গল্প সৃষ্টি করার পেছনে কাজ করে, কিন্তু গল্পে তাদের অস্তিত্ব কোথায়? কেউ বা কালে ভদ্রে তাদের কথা উচ্চারণ করে, বেশিরভাগ মানুষ তা করার প্রয়োজন বোধ করে না। এটাও ঠিক পৃথিবীর সব মানুষের জীবন মহা মূল্যবান হবে না।

নিজেকে নিয়ে কোনদিন ভাবেনি দূর্বা। আগে ভাবতো বাবা-মার কথা আর এখন মেতে আছে সংসার নিয়ে। একটা প্রেম পর্যন্ত করলো না বাবা-মায়ের কষ্ট পাবে এই ভেবে। কত ছেলে তাকে পছন্দ করতো ছাত্র জীবনে। সবাইকে কষ্ট দিয়ে বাবার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করেছে। খুব একটা ভুল করেনি দূর্বা।মিজান একজন দায়িত্ববান স্বামী, মেয়ের ব্যাপারেও যথেষ্ট সচেতন, সর্বোপরি একজন ভালো মানুষ। দূর্বা নিজে যে একজন আলাদা সত্ত্বা সেটা নিয়ে কোনদিন ভাবেনি। ওর নিজস্ব কোন জগৎ কিংবা ভালো-লাগা, মন্দ-লাগা থাকতে পারে তা কখনও চিন্তাতেও আসেনি। আজ খবর দেখতে দেখতে মনে হলো -সত্যিই তো কোভিড -১৯ যদি তাকে গ্রাস করে তাহলে কী হবে? পৃথিবী থেকে চলে যেতে হবে। রুপকথা হারাবে তার মা, মিজান কষ্ট পাবে – হয়তো ভালোবাসার জন্য, বা এতোদিনের অভ্যস্ততার জন্য। ভাই-বোন মন খারাপ করবে কিছুদিন, তারপর যে যার জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। আলাদা করে কোন পরিচয় নেই বলে তার মৃত্যুতে কোন হইচই হবে না। পৃথিবীর মৃত্যুর মিছিলে একটা সংখ্যা বাড়বে মাত্র।

সত্যিই তো অনেক হলো অন্যের জন্য বাঁচা, এবার বাঁচা যাক নিজের জন্য। নাই বা থাকলো নিজস্ব কোন পরিচয়, নিজের খুশি কিংবা আনন্দের জন্য তো কিছু সময় বের করা যেতেই পারে। ঘর মোছা শেষ করে গোছলে ঢুকে গেল। গোছল শেষ করে আয়নার সামনে দাঁড়ালো, অনেক দিন পর শাড়ি পরেছে দূর্বা। লকডাউনের চক্করে পরে ওজন বেশ খানিকটা কমেছে, যেটা সে অনেকদিন ধরে ডায়েট আর ব্যায়াম করেও কমাতে পারেনি। হঠাৎ খেয়াল করলো মিজান ল্যাপটপ ছেড়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চোখ পড়তেই বলে উঠলো:

-মাঝে মাঝে শাড়ি পরলেও তো পারো, বেশ লাগে তোমাকে।
খেতে এসে মাকে দেখে খুশিতে জড়িয়ে ধরলো রুপকথা।
-তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে মম, অ্যাম আই রাইট ড্যাড?
-ইয়েস মাই ডিয়ার, আই হ্যাভ অলসো টোল্ড হার।
-মা তুমি কেন মাঝে মাঝে শাড়ি পরো না, আর একটু সাজো না?

দূর্বা কারো কোন কথার জবাব না দিয়ে খাবার দিয়ে দিল প্লেটে। খেতে খেতে মিজানের দিকে তাকিয়ে বললো:
-তুমি তো আমাকে আগে তোমাদের অফিসের প্রোগ্রাম হলে উপস্থাপনা করতে বলতে, আমি কখনো হ্যাঁ বলিনি। এখন থেকে ভাবছি করবো।
-সেটা তো খুবই ভালো কথা। তুমি তো ভালো ছিলে উপস্থাপনায়। তুমি নিজে থেকেই তো ছেড়ে দিলে।
– মম, খুব ভালো হবে আবার উপস্থাপনা শুরু করলে, এখন তো অনেক টিভি চ্যানেল তুমি চেষ্টা করলেই কোথাও না কোথাও হয়ে যাবে। আমার বন্ধুরা খুব খুশি হবে মম তোমাকে উপস্থাপনা করতে দেখলে। এমনিতেই ওরা তোমার ফ্যান।
-তাই নাকি রুপকথা, তোর মায়ের অনেক ফ্যান। তোর ছেলে বন্ধুরা না মেয়ে বন্ধুরা- কারা মায়ের ভক্ত?
– সবাই ড্যাড, মম এর রান্না, কথা বলা, ড্রেস আপ, এভরিথিং দে লাইক।
– তোর মম তো দেখি এলরেডি স্টার।
বাবা -মেয়ের দুষ্টমিতে কান না দিয়ে মিজানকে বললো:
-আর ভাবছি, সব ঠিক হয়ে গেলে, বন্ধু-বান্ধবীদের ডাকবো। কখনো তো ওদের ডাকা হয়নি।
-আর ইউ ওকে দূর্বা? ইজ এভরিথিং অলরাইট?- মিজান বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলো।
– ইয়েস মাই ডারলিং, আই এম কমপ্লিটলি ওকে, মোর দেন এভার।

সন্ধ্যায় মানিককে ফোন করলো দূর্বা। মানিক দূর্বার সবচেয়ে ছোটবেলার বন্ধু। ক্লাস ওয়ান-টু একসাথে পড়েছে। তারপর ইউনির্ভাসিটিতে সর্বোসাকুল্যে দুই-তিন বার দেখা হয়েছে। সেদিন হঠাৎ দূর্বাকে ফোন করে ওর খোঁজ খবর নিল, জানতে চাইলো ওকে এক কাপ চা খাওয়াবো কিনা? আজ-কাল করে আর ডাকা হয়নি মানিককে। আজ নিজ থেকে ফোন দিল:

-কী রে মানিক, হবে নাকি এক কাপ চা?
– এটা আমি কার সাথে কথা বলছি? গত ছয় মাস আগে সামান্য এক কাপ চা খেতে চেয়েছিলাম, তোর কোন পাত্তাই পেলাম না। এক কাপ চা যে এতো মূল্যবান হতে পারে জানা ছিল না। যাক শেষ পর্যন্ত দাওয়াত পেলাম, তাও এই করোনা মহামারীতে।
সমস্ত কাছের বন্ধুদের খবর নিল, জানলো কে কেমন আছে – এই দুর্যোগে। সবাইকে বললো, যে কোনো দরকার হলে যেন ওকে জানায়। আর শেষ করলো একটা কথা দিয়ে-
– বেঁচে থাকলে দেখা হবে – ইনশাল্লাহ।

দুদিন পরে আজ আবার হাঁটতে বের হয়েছে দূর্বা। দেবদারু গাছগুলো নতুন পাতায় ভরে গেছে। কচি কলাপাতা রঙে ছেয়ে গেছে গোটা হাউজিং। শুধু পাতার রঙের যে কত বিচিত্রতা থাকতে পারে করোনা আসার আগে তা জানা ছিল না দূর্বার। দুদিন আগেও গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল মৃত, যেন একটা কংকাল দাঁড়িয়ে আছে। আজ সেখানে প্রাণের সমারোহ, নতুনের আহবান। আমরাও একদিন করোনা যুদ্ধ জয় করে ঘুরে দাঁড়াবো, পৃথিবী নতুন সাজে সাজবে, এই কচি পাতার মতো।

-মিসেস খান, এখন কি নিয়মিত হাঁটতে শুরু করেছেন?- আসমা বেগমের কথায় থেমে গেল দূর্বা।
– ক্যান ইউ কল মি বাই মাই ট্রু নেম দূর্বা?
আবার হাঁটতে শুরু করলো দূর্বা, শুরু হলো তার নতুন ভাবে পথ চলা, নিজের মতো বাঁচতে শেখা।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.