গর্ভপাতের আইনি অধিকার : নারীর গর্ভ ও সিদ্ধান্তের ওপর নারীর অধিকার

শীলা চক্রবর্ত্তী:

গর্ভপাতের আইনি অধিকারের সাথে মূলত যে বিষয়গুলি সম্পৃক্ত তা হলো নারীর শরীর, গর্ভ এবং সিদ্ধান্তের ওপর তার নিজের অধিকার। কোনো জেনেটিক ডিস‌অর্ডার হোক, প্রসূতির জীবনহানির আশংকা হোক, ভবিষ্যত সন্তানের বিকলাঙ্গ হবার আশংকা হোক, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির জন্য অপারগতা হোক অথবা অন্য যেকোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হোক, গর্ভপাতের আইনি অধিকার নারীর হাতে থাকা জরুরি। এটি তার সিদ্ধান্তের স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত।

গর্ভধারণের পরে একজন নারীর শরীরে বিভিন্ন জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। তার কোনো জেনেটিক ডিস‌অর্ডার বা অসুখ থাকতে পারে, যেটা হয়তো আগে জানা ছিলো না, কিন্তু জানার পর দেখা গেল গর্ভস্থ শিশুর শরীর বা মস্তিষ্কে এই ডিস‌অর্ডারের ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে, অথবা হয়তো শিশুটি বিকলাঙ্গ বা জড়বোধসম্পন্ন হবার আশংকা থাকতে পারে। এছাড়া গর্ভবতী নারীর নিজের শারীরিক হানি বা প্রাণসংশয়ের আশংকা থাকতে পারে। অনেক দম্পতি নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যে সন্তান জন্ম দিয়ে তাকে পালন করার সামর্থ্য তাদের নেই, অত‌এব তাকে পৃথিবীতে না আনাটাই শ্রেয়। অনেকক্ষেত্রে আর্থ সামাজিক অবস্থান হঠাৎ করে বদলে যাওয়াও কারণ হতে পারে। যেমন এখন অতিমারী পরিস্থিতিতে অগণন মানুষ তাঁদের সংস্থান হারাচ্ছেন।

আমাদের উপমহাদেশের প্রচলিত পরিবার ব্যবস্থায় বিপুলসংখ্যক নারী তাদের বিয়ে, যৌনতা, সন্তানধারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে নিজেরা মতামত দেবার অবস্থানে থাকেন না। বহু পরিবারে তাদের অবস্থান হয় শোপিস বা ডোরম্যাট হিসেবে। এই ক্ষেত্রগুলোতে সন্তানধারণের সিদ্ধান্ত মূলত পরিবারের অন্যান্যদের ইচ্ছেয় নিয়ন্ত্রিত হয়। আমাদের প্রাচীন মহাকাব্যগুলোর দিকে তাকালেও দেখা যায় কীভাবে সন্তান উৎপাদনের বিষয়গুলো শাশুড়ি, স্বামী প্রমুখদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতো। নারীর নিজের ইচ্ছে-অনিচ্ছে সেখানে অপ্রাসঙ্গিক, অথচ ব্যবহৃত হবে তার‌ই শরীর, বংশ রক্ষা পাবে শ্বশুরকুলের। এইসব ক্ষেত্রে নারীর বয়স, শারীরিক সামর্থ্য, ক্ষমতা, পুষ্টি, এই বিষয়গুলোকে অধিকাংশ‌ই হেলাফেলা করা হয়, গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে গর্ভধারণকালে নারীরা নানান শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হন, অবস্থা অনেকক্ষেত্রেই এমন জায়গায় পৌঁছায় যে হবু মা ও শিশুর প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে এই অবস্থায় গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। তবু দেখা যায় অশিক্ষাজর্জর পরিবার তাতে রাজী হচ্ছেন না, তাদের বংশধর চাই, গর্ভিণী নারীটির জীবনসংশয় তাদের কাছে ধর্তব্যের মধ্যেই আসে না। চিকিৎসক বলছেন, গর্ভপাত জরুরি, পরিবার চাইছে না, নারীটির নিজের মত দেবার অধিকার নেই – এই অবস্থায় মা ও শিশু দুজনের‌ই প্রাণসংশয় হয়ে দাঁড়ায়, এবং হয়‌ও, এমন ঘটনা কিছু বিরল নয়। এই অবস্থায় সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকারটি গর্ভবতীর নিজের হাতে থাকা অত্যন্ত জরুরি, কেননা জীবনটা তার, সংশয়টাও তার, সিদ্ধান্তটিও তার হ‌ওয়াই যথাযথ।

অনেক সময়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ঠিকঠাক কার্যকর না হ‌ওয়াও অবাঞ্ছিত গর্ভধারণের কারণ ঘটে। অধিকাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিই ঠিকঠাক কাজ করে না, অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই সেফ আনসেফ পিরিয়ড আন্দাজ করে জুটিরা মিলিত হন। ওরাল পিল সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি, কিন্তু দীর্ঘদিন সেবনে স্বাস্থ্যের ওপর নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বিধায় অনেকেই এড়িয়ে চলেন। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এছাড়া পরিকল্পিত মিলন সবসময়ে সম্ভব হয় না। শিক্ষিত সমাজের বাইরে কতোজন নারী আইপিল 72 ইত্যাদি অপরিকল্পিত মিলনের পর অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ এড়ানোর উপায়ের খোঁজ রাখেন তাতে সন্দেহ আছে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্গুমেন্ট হিসেবে বিভিন্ন মামলায় যে প্রশ্নটি উঠে এসেছে, সেটি হলো ফোর্সড সেক্স বা ধর্ষণের ফলে যদি কোনো নারী গর্ভধারণ করেন, তিনি গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে নিতে পারবেন না কেন! এছাড়া যেহেতু সমাজ বিবাহ বহির্ভূত শরীরী মিলন ও গর্ভধারণকে অবাঞ্ছিত হিসেবে দেখে, তাই অনেকেই দাম্পত্য সম্পর্কে নেই এমন পরিস্থিতিতে গর্ভবতী হয়ে পড়লে গর্ভপাত করানোই শ্রেয় মনে করেন। এছাড়া অনেক সময়ে গর্ভধারণকালীন‌ই অনেক দম্পতি বিবাহবিচ্ছেদের মধ্য দিয়ে যান। সেক্ষেত্রেও গর্ভবতী নিজে বা দম্পতির উভয়ে মিলে গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন! অবশ্যই এখানে নারীর সিদ্ধান্ত বেশি গুরুত্ব পাওয়া জরুরি, কারণ গর্ভ বা শরীর নারীর।

পৃথিবীর মোট ৫৬ টি দেশে নারীর গর্ভপাত আইনসিদ্ধ। ভারতে কুড়ি সপ্তাহ পর্যন্ত গর্ভপাত আইনসিদ্ধ, অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনারের কাছে। এর বেশি দেরি হলে গর্ভপাতের জন্য আদালতের বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন, কারণ এতে গর্ভবতীর শারীরিক ক্ষতি বা প্রাণসংশয়ের আশংকা থাকে। এছাড়া গর্ভবতীর মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনায় আনা দরকার।

গর্ভপাত আইনসিদ্ধ করা হয় The Abortion Act 1967 এর মাধ্যমে, ব্রিটেনে। কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই গর্ভপাতের প্রচলন ছিলো। খ্রিস্টপূর্ব ১৫৫০ সাল নাগাদ প্রাচীন মিশরে গর্ভপাতের প্রচলন ছিলো। প্রাচীন গ্রীস এবং রোমে গর্ভপাত প্রচলিত ছিলো। সেসময় মূলত গর্ভবতীর প্রাণসংশয়ের আশংকা থাকলে গর্ভপাত করানো হতো। এরপর সময়ের সাথে সাথে পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশে গর্ভপাত আইনসিদ্ধ হয়। বিভিন্ন দেশে গর্ভপাতের সময়সীমা ভিন্ন ভিন্ন।

খ্যাতনামা ইংরেজ লেখক ও নারী অধিকারের প্রবক্তা ম্যারি স্টোপস একসময়ে জনসমক্ষে গর্ভপাতের প্রবল বিরোধিতা করতেন। পরিবর্তে তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষে জোরালো স‌ওয়াল করতেন। একসময়ে তাঁর ক্লিনিকগুলোতে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র না দেখালে বা যথাযথ কারণ না দর্শালে মিলতো না গর্ভপাতের ছাড়পত্র। পরবর্তীতে এই বিরোধের জায়গা থেকে তিনি সরে আসেন এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গর্ভপাতের অধিকারের সমর্থক হয়ে ওঠেন। তাঁর নামাঙ্কিত ক্লিনিক চেন তাঁর জীবদ্দশা থেকেই সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় নিরাপদে গর্ভপাত করানোর ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছে।

সম্প্রতি আমেরিকার বিভিন্ন প্রদেশে যেকোনো অবস্থাতেই গর্ভপাত সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর প্রতিবাদে #youknowme হ্যাশ ট্যাগ দিয়ে উত্তাল হয়ে উঠেছে সমগ্র মার্কিন মুলুক। এই সিদ্ধান্তটি সরাসরি নারীর অধিকারে অন্যায় হস্তক্ষেপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গর্ভপাতের বিরুদ্ধে সাধারণ জনমানসের মূল্যবোধে যে বিরাট দেয়াল তোলা আছে, তার মূল কারণ ধর্মীয়। বেশকিছু প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মতে, গর্ভপাত মহাপাপ, নরহত্যার শামিল। এছাড়া আমাদের উপমহাদেশীয় মূল্যবোধে মাতৃত্ব এক মহান বিষয়। তৃতীয় শ্রেণীর চলচ্চিত্রগুলো দেখে দেখে আমাদের বিরাট অংশের দৃঢ় বিশ্বাস, মা নিজের জীবনসংশয় থাকলেও সন্তান জন্ম দেবেন, গর্ভপাতের চিন্তা মনে আনাটাও মাতৃত্বের এই মহান ধারণার পরিপন্থী। মাতৃত্বের এই আরোপিত মহান ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে গর্ভপাতকে নঞর্থক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা থেকেও আমরা বেরিয়ে আসতে পারবো। মাতৃত্ব একটি জৈবিক ঘটনা, এতে জড়িত থাকে গর্ভবতীর শারীরিক মানসিক সুস্থতার প্রশ্ন, ভবিষ্যৎ শিশুর সুস্থতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। তাই অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তকে অসম্মান করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। বিষয়টি সামাজিক নয়, ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

আমাদের বিরাট একটি অংশের ধারণা, গর্ভপাতের ফলে পরবর্তীতে সন্তানধারণে সমস্যা হয়। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, এটি একেবারেই ভুল ধারণা। একজন দক্ষ মেডিক্যাল প্র্যাকটিশনারের কাছে, পরিচ্ছন্ন পরিবেশে যথাযথ সাবধানতা বজায় রেখে গর্ভপাত করালে গর্ভবতীর শারীরিক হানি অথবা পরবর্তীতে গর্ভধারণের সমস্যা হয় না। সেইসাথে কতোগুলো বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। গর্ভপাতের পরে নারীটিকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম, পর্যাপ্ত জল পান ও পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে হবে, শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় বিরাম, সতর্কতা ও অন্যান্য কিছু বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে কিছুদিন চলতে হবে। আমাদের দেশের বিরাট অংশের মেয়েরা এমনিই রক্ত স্বল্পতা, দুর্বলতা, অপুষ্টি ইত্যাদি সমস্যায় ভোগেন। গর্ভপাতের পরে যাতে এইগুলো মারাত্মক আকার ধারণ না করে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। এছাড়া গর্ভপাত যদি সংখ্যায় প্রচুর ও নিয়মিতভাবে করানো হয়, তার কুপ্রভাব শরীরে পড়তে বাধ্য, সেদিকটাও খেয়াল রাখা জরুরি।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ের বাইরে শরীরী মিলন এবং গর্ভধারণ যেহেতু এখনো কলঙ্কের নামান্তর, তাই দাম্পত্য সম্পর্কে নেই এমন নারীরা গর্ভধারণ করলে এ অবস্থায় অনেকেই বিষয়টি গোপন রাখতে চান, গোপনেই মিটিয়ে নিতে চান। ফলে প্রকাশ্যে কোনো নামজাদা ভালো মেডিক্যাল প্রফেশনালের কাছে যেতে পারেন না। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে আজেবাজে জায়গায় গিয়ে গর্ভপাত করান এবং নিজের বিপদ ডেকে আনেন। অনেকে অনভিজ্ঞ হাতুড়ের কাছে গর্ভপাত করাতে গিয়ে প্রাণটিও খুইয়ে বসেন। গর্ভপাত করাতে গিয়ে শেকড়বাকড় যোনিপথে প্রবেশ করিয়ে দেয়া বা উল্টোপাল্টা ওষুধ খাইয়ে দেয়ার ফলে ক্রমাগত রক্তক্ষরণে মৃত্যুর ঘটনা নেহাত কম নয় গ্রামাঞ্চলে। ওই সামাজিক কলঙ্কের ভয়ে মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও চিকিৎসকের কাছে যান না অনেকেই। এভাবে সোশ্যাল স্টিগমার ভয়ের শিকার হয়ে অনেক নারী অকালমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

নারীর গর্ভের সন্তান তিনি জন্ম দেবেন, তা সে ছেলে ভ্রুণ হোক বা কন্যা ভ্রুণ … নাকি পরিস্থিতি বিশেষে জন্ম না দিয়ে গর্ভপাত করাবেন, সে সিদ্ধান্ত হোক তার নিজের। পরিবার, স্বামী, সমাজ, রাষ্ট্র, ধর্ম কারোর নয়। নিজের শরীরের ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা নারীর ক্ষমতায়নের জন্য অপরিহার্য।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.