প্রেম নিয়ে যতসব ভুল ধারণা

কাজী তামান্না কেয়া:

১) প্রেম করতে হবে বড়লোকের মানে ধনীর ছেলের সাথে। ভুল। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় বান্ধবীদের মুখে এসব ভুলভাল শুনতাম। আমি নিজে এইরকম কিছু বিশ্বাস করতে পারিনি কখনও।

২) প্রেম করলেই বিয়ে করতে হবে। এইটা একটা মারাত্মক ভুল। প্রেম করলেই বিয়ে করতে হবে না। বিয়ে তাকেই করতে হয় যে সংসার নামক গ্যাঁড়াকলে পা দিতে রাজী থাকে ভালবাসার শর্তে। আপনি যদি নারী হন, তবে তেমন সংগীকেই বিয়ে করুন যিনি ঘরের কাজ, বাচ্চার ন্যাপি বদল এই রকম সাড়ে সাতশো বিষয়ে হাত লাগাতে প্রস্তুত থাকে। এমন কাউরে না পাওয়া গেলে একা থাকা সব থেকে ভাল।

৩) প্রেম করা মানে ছেলেরা খরচ করবে মেয়েদের পেছনে। খাওয়াবে, গিফট দিবে, বেড়াতে গেলে সব খরচাপাতি দিবে। আবারও ভুল। প্রেমকালীন খরচাপাতি দেওয়ার দায়িত্ব দুজনেরই। আপনি নিজের টাকায় যা খাবেন না, সেটা অন্যের টাকায় খাওয়ার আশা করতে পারেন না। দামী উপহার পাওয়ার প্রত্যাশা করার নাম ছোটলোকি। আপনি প্রেমিকা বলেই আপনার আকাশ কুসুম চাওয়া কেউ পূরণ করতে বাধ্য নয়।

৪) প্রেমিক যেহেতু গিফট দিয়েছে বা রেস্টুরেন্টে নিয়ে খাইয়েছে, এখন সে চিপাচাপায় নিয়ে সেটা উসুল করবে। এটাও ভুল। আপনার শরীর তখনই কেউ ছুঁতে পারবে যখন আপনি ছোঁয়ার পারমিশন দেবেন। একপক্ষ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে, আরেক জনের কখনোই উচিত হবে না অন্যপক্ষের শরীর স্পর্শ করা। প্রয়োজনে সংগী বদল করেন। সাগরে যেমন অনেক মাছ আছে, জগতে তেমনই অনেক প্রেমিক/প্রেমিকা আছে। একজনের জন্যে জীবন দিতে হবে না।

৫) প্রেম হবে প্লেটোনিক। সেখানে দুইজনে শুধু দুইজনের চেহারা দেখবেন, আর হাত ধরে বসে থাকবেন। হ্যাঁ, এটা ঠিক, তবে পাব্লিক প্লেসে। প্রেমে একটা নির্দিষ্ট সময় পর শরীর আসতে পারে এবং আসাটাই স্বাভাবিক। তবে সেই শারীরিক সম্পর্ক ডিপেন্ড করছে আপনাদের দুইজনের সম্মতির উপরে। আর হ্যাঁ, শারীরিকভাবে মেলামেশা করতে চাইলে সেটা দুপক্ষেরই দায়িত্ব নিয়ে করা উচিত। দুইদিন পর প্রেমিক ভাগলে ‘বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ’ জাতীয় মামলা করতে যাওয়া মানে ‘আপনি লোভী এবং জাতে মাতাল তালে ঠিক’। আর শারীরিক সম্পর্ক হওয়ার পর প্রেমিকা ছেড়ে গেলে সেটা মেনে নিতে শিখুন। প্রেমিকার এলাকায় বা বাড়ির নিচে গিয়ে ফেন্সিডিল-ইয়াবা খাওয়া, হাতের রগ কাটা বা ধর্না ধরে বসে থাকা বা অনশনে বসা, এসব নিতান্তই ছেলেমানুষি, বাংলা সিনেমার রিয়েল লাইফ ভার্শন। এগুলো করবেন না। প্রথম কথা যে চলে যায় সে আপনার পাগলামী পাত্তা দেয় না। সুতরাং, চার নম্বর পয়েন্টে দৃষ্টিপাত করুন মানে সাগরে অনেক মাছ আছে, জগতে অনেক প্রেমিকা আছে, নতুন কাউকে খুঁজে নিন।

৬) প্রেমের সম্পর্ক সহকর্মী বা বসকে জানানো যাবে না। বস জানলে প্রমোশন হবে না, বা অন্যান্য ঝামেলা করবে। এটাও ভুল। আপনার পারসোনাল লাইফ নিয়ে বসের মাথা ঘামানো উচিত না। যদি কোন বস ঘামায়, সোজা বলে দিন, অফিসের পর আপনি কী করছেন সেটা আপনার ব্যাক্তিগত বিষয়। ছোট একটা এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করছি। আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে একদিন বাসে করে ফিরছিলাম। তখন ভার্সিটিতে পড়ি এবং প্রাইভেট টিউশনি করি। আমার স্টুডেন্টের বাবাও একই বাসে ছিল, আমি উনাকে দেখিনি। আমি চার ঘন্টার এক লম্বা পরীক্ষা দিয়ে ফিরছিলাম এবং ক্লান্ত বলে ঝিমুচ্ছিলাম। ভদ্রলোকের পরের দিন (যেদিন পড়াতে গিয়েছিলাম) এসে বললেন, তিনি আমাকে আমার ভাইয়ের সাথে বাসে দেখেছেন। সেদিন আমি উনাকে কিছু বলতে পারিনি। এখন হলে বলতাম, সাথে আমার বয়ফ্রেন্ড ছিল, ভাই নয়।

৭) প্রেম করছেন, বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড বিয়ে করার কথা বললে আমতা আমতা করে? এখন কিছু সমস্যা আছে, কিছুদিন পরে বিয়ে করবে এই রকম কথা বলে? আপনি কি ভাবছেন- এতোদিন প্রেম করেছে যখন, নিশ্চয়ই সমস্যা কেটে গেলে বিয়ে করবে? ভুল। এই দোটানায় থাকা পাব্লিক কোনদিন আপনার সাথে ঘর বাঁধবে না। আর যদি লুকিয়ে চুরিয়ে বিয়ে করতে রাজী হয়ও, সেই সম্পর্ক টেকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। মনে রাখবেন, ‘বিয়ে লুকিয়ে করা যায়, সংসার লুকিয়ে করা যায় না’। বিয়ের কথায় আমতা আমতা করা লোক বা লুকিয়ে বিয়ে করতে চাওয়া লোক বেশিরভাগ দুই নাম্বার। তাদের সাথে সম্পর্কে জড়ানোর আগে ভালমতো খোঁজ খবর নিয়ে এরপর সম্পর্ক নিয়ে আগে বাড়া উচিত।

৮) যে ছেলে তার বেস্টফ্রেন্ডদের কাছে আপনার কথা বলেনি, তাকে কি বিশ্বাস করা উচিত? সে বলেছে, ফ্রেন্ডরা জানলে বাসায় বলে দিবে। ভুল। সম্পর্ক করা কোন লুকানো বিষয় নয়। যে ছেলে আম্মুর দোহাই দিয়ে আপনার কথা বন্ধুদের কাছে অস্বীকার করে, সে আপনার মতো আরো পাঁঁচজনের সাথে একই কাজ করছে, লিখে রাখুন। তার কাছ থেকে কমিট্মেন্ট আশা করা উচিত নয়। আমার ব্যক্তিগত মতামত, এই রকম সম্পর্ক জীবনে জটিলতা বাড়ায়।

৯) প্রেম ভেঙ্গে গেলে সবাই আপনাকে খারাপ বলবে। নিশ্চয় আপনার কারণে সম্পর্ক ভেঙ্গেছে। ভুল! সম্পর্ক থাকা যেমন স্বাভাবিক, ভেঙ্গে যাওয়াও স্বাভাবিক। টেইক ইট ইজি।

১০) আপনারা কমিটেড রিলেশনে আছেন, কিন্তু এখনই বিয়ে করতে চাচ্ছেন না। আপনাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক আছে। আপনারা কি জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করবেন? প্রশ্নটা বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় একটু সেনসিটিভ। তাই একটা উদাহরণ দিয়ে বলার চেষ্টা করছি- আমি তখন ওয়াশিংটন ডিসিতে চাকরি করি। আমার এমেরিকান কলিগ বললো, ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে আন্ডারগ্রেডে পড়াকালীন ওর সম্পর্ক শুরু। ওরা দুজন দুজনের প্রতি কমিটেড এবং কন্ডম ব্যাবহার করতে পছন্দ করতো না। তাই আমার কলিগ আইইউডি (ইন্ট্রা ইউটেরান ডিভাইস) বা কপারটি পরেছিল জরায়ুতে। আইইউডি একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি, যেটাতে হরমোন নেই। আমার কলিগ এই পদ্ধতিটি ব্যবহার করা শুরু করেছিল নিজেদের ব্যক্তিগত জীবন উপভোগ করা এবং পড়াশোনা, ক্যারিয়ার ইত্যাদি সুন্দরভাবে সমাধান করার জন্যে। মনে করবেন না, এমেরিকা বলে এটা সম্ভব। এমেরিকায় এখনও শতভাগ শিশুর টীকা নিশ্চিত করা যায়নি। অনেক স্টেইটে এবরশন লিগ্যাল না। উন্নত দেশ হলেও এমেরিকায়ও নিজেদের ভালো নিজেদের বুঝতে হয়।

সর্বশেষ টপিক, বিয়ে কি করতেই হবে? না, বিয়ে করতেই হবে এমন কোন কথা নেই। বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশী নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়, ম্যারিটাল রেইপের সংখ্যাও আশংকাজনকভাবে বেশি। জীবনে শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ থাকাই বড় কথা। বিয়ে না করেও সুখী হওয়া যায়, সেটা পুরুষ নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই সঠিক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.