আদিবাসী ভ্রমণ শিক্ষা জরুরি কেন?

ডালিয়া চাকমা:

ফেসবুকের হোম পেইজ স্ক্রল করতে করতে কিছু গা শিউরে উঠা ছবি চোখে পড়ে। বিস্তারিত পড়ে বেশ চিন্তায় পড়ে যাই। বিকৃত আদিবাসী সাজে এক বাঙালির ছবি। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার তৈদুছড়া ঝর্ণা দেখতে গিয়ে এরকম সাজে তোলা হয়েছে ছবিগুলো। পাহাড় ভ্রমণের চিত্র যদি হয় এই, তবে এর পেছনের প্রেক্ষাপট ভয়ংকর অবশ্যই। সেদিন ‘ট্যুরিস্ট গেইজ’ বা ‘ভ্রমণকারীর দৃষ্টিভঙ্গি’ টার্মের সাথে পরিচিত হই। জানতে পারি ভ্রমণকারী আসলে তাই দেখে যা সে দেখতে চায়। দেখার এই ব্যাপারটা তাই যেমন পুরোপুরি মানসিক, তেমনি সামাজিকভাবে বিনির্মায়িত (socially constructed)। দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গি সমাজ কর্তৃক আরোপিত হওয়াতে এটা ভাইরাসের মতোই সংক্রামক। এসব ব্যাপার এড্রেস করা না গেলে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। ‘Extraction’ মুভিতে বাংলাদেশকে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা থেকেই কিন্তু এই ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায়। ভিন্ন সংস্কৃতির বাস্তবতা ও অন্যদের কাছে সেই সংস্কৃতি নিয়ে সংস্কারের মধ্যকার এই যে দূরত্ব একে তাই আমলে নেয়া উচিত।

বাঙালীকেই এরকম আদিবাসী সাজিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

বেশ ক’মাস আগে একটা পোস্ট করেছিলাম ইন্ডিজেনাস ট্যুরিজম নিয়ে। একটা ট্যুর গ্রুপ থেকে বান্দরবান ট্যুরে গেলে কতিপয় নিচু মানসিকতার লোকে বাজে পোস্ট করে যেটা কোন একভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। সেই প্রেক্ষিতেই লেখাটা লিখেছিলাম। মনে হয়েছিলো আদিবাসীদের সংস্কৃতিকে এইভাবে ডিহিউম্যানাইজড করার পেছনে মূলধারার জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে বিচ্ছিন্নতা কাজ করে সেটাকে রিকগনাইজ করা দরকার। আদিবাসীদের প্রতি নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন সেটা যাচাই করে নিয়ে ভ্রমণে গেলে আচরণ কেমন হওয়া উচিত সেটা নিয়ে লিখেছিলাম এবং তা কয়েকটা ট্যুর এন্ড ট্র্যাভেলিং গ্রুপেও পোস্ট করেছিলাম। মজার ব্যাপার হচ্ছে সেটা কোনো গ্রুপেই এপ্রুভ করা হয়নি। আমার কাছেও স্পষ্ট হয়ে গেলো ট্র্যাভেলিং বা ট্যুর গ্রুপগুলোর পাহাড় পর্বত পর্যটনের মূল উদ্দেশ্যটা আসলে কী।

আজকাল ফেসবুকের কল্যাণে ভুড়ি ভুড়ি ট্র্যাভেলিং বা ট্যুর গ্রুপ ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে। পারফেক্ট ফটো অপরচুনিটি হিসেবে লোকের মধ্যেও ট্যুর ব্যাপারটা বেশ ট্রেন্ডি হয়ে উঠেছে। নতুন জায়গা দেখার পাশাপাশি নিজেকে দেখানোর একটা চমকপ্রদ চল শুরু হয়েছে। অথচ ভ্রমণের কোর যে আইডিয়া সেটা না ভেবেই শো অফের আতিশয্যে তারা সেই স্থানের ইতিহাস- সংস্কৃতি- মানুষকে এক কথায় সেখানকার নৃবিজ্ঞানকে না জেনেই ট্রিপ দিচ্ছে। একটা স্থান মানে তো কেবল প্রকৃতি নয়, সেখানে মানুষ আছে, প্রাণ আছে, তাদের ঐতিহ্য-ইতিহাস-ধর্ম-বিশ্বাস-মূল্যবোধ আছে। মানুষের ও প্রাণের সেই যোগ বাদ দিয়ে কেবল প্রকৃতিকে দেখতে চাওয়াই কী এখানকার পর্যটনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত!

বাংলাদেশের মতো সবদিক দিয়ে দরিদ্র একটা দেশে ভ্রমণের জন্য পার্বত্য এলাকা শীর্ষে থাকে সবসময়ই। তাই এখানেই প্রয়োজন ছিলো সবচেয়ে বেশি সচেতনতার। কেবল পার্বত্য এলাকাই নয়, আদিবাসী আছে এমন সব জায়গাতেই এটা প্রয়োজন। অথচ ট্যুরিজমের কেবল প্রফিট মেকিং এর ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিয়ে আদিবাসীদের ভূমি বাদে বাকি সবকিছুকেই ঊন করে দেয়া হয়েছে।

আদিবাসীদের পরিচয়ের যে স্বতন্ত্রতা সেটাকে এক্সোটিফাই করার মধ্য দিয়ে পরিচয়ের ঋণাত্মক রাজনীতি খেলা হয় রাষ্ট্রীয়ভাবে। রাষ্ট্র যেভাবে আদিবাসীদের উপস্থাপন করে সেটা এক কথায় ডিহিউম্যানাইজেশন। যার প্রতিফলন এই ট্যুরিস্ট বিজনেস। একে এক কথায় বলতে পারি, ‘হিউম্যান জু’। সাজেকে গেলে প্রকৃত আদিবাসীর দেখা মেলা ভার। আর এদিকে ছবি তোলার জন্য ট্যুরিস্টরা আদিবাসীদের জামা কাপড় পরে নিজেরাই আদিবাসী সেজে বসে থাকে।

বাঙালীকেই এরকম আদিবাসী সাজিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

হিউম্যান জু বা মানব চিড়িয়াখানা ব্যাপারটার আরেকটা উদাহরণ দিই। পটুয়াখালী যাওয়া হয়েছিলো একবার। জানতাম এককালে পটুয়াখালীর অধিকাংশই ছিলো রাখাইন জাতির। এমনিতেই তো ভূমি অধিগ্রহণের রাজনীতি আগে থেকেই ছিলো যার ফলে অনেক রাখাইন দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন, কুয়াকাটার সৌজন্যে ট্যুরিস্ট স্পট করার প্রকল্পের পর সেই উচ্ছেদের প্রজেক্ট আরও জোরালো হলো। রাখাইনদের সংখ্যা এমনই তথৈবচ যে গুটিকতক রাখাইন পল্লী অবশিষ্ট আছে সেগুলোকে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করে দিয়েছে। রাখাইনদের দ্বারা এককালে প্রতিষ্ঠিত এক মন্দিরে গিয়ে দেখলাম গেটের বাইরে পুলিশ দাঁড়ানো, ভেতরে টিকিট কাটার বক্সেও পুলিশ বসে আছে টাকার বিনিময়ে টিকিট দিতে। মন্দিরের ভেতরে বাইরে লোকে গিজগিজ করছে। আর মন্দিরের বিশাল বৌদ্ধমূর্তি আর তার সামনে এক রাখাইন কিশোর জবুথবু হয়ে আছে। দুজনকেই আমার প্রান্তিকবাসী মনে হচ্ছিলো। ওই কিশোর মোমবাতি আর সুগন্ধি কাঠি সামনে নিয়ে বিষণ্ণভাবে বসে ছিলো। বোধহয় তার অভিজ্ঞান তাকে জানিয়ে দিয়েছে ট্যুরিস্ট হিসেবে যারা গেছে, তারা কেউই বুদ্ধমূর্তির সামনে মোম নিয়ে নতজানু হতে যায়নি। তারা গেছে ‘মানব চিড়িয়াখানা’ দেখতে।

পরিচয় উপস্থাপনের এই যে রাজনীতি, এটা চাইলে অন্যভাবেও হতে পারতো। আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতি রক্ষায় আন্তরিক বহুজাতিক রাষ্ট্রগুলোতে আদিবাসীদের এলাকা ভ্রমণের সাথে সরাসরি আদিবাসীদেরকেই যুক্ত রাখা হয়, যাতে তারা সেখানকার প্রকৃত সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে তুলে ধরতে পারে। এতে নিজেদের নলেজও শেয়ারড হয়। এই আদান প্রদানের ফলে ট্যুরিস্ট ও ন্যাটিভদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্ক তৈরি হয়, সাংস্কৃতিক সচেতনতা (cultural awareness) সৃষ্টি হয়।

ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য কিন্তু এটাই- নতুন কিছু দেখা ও জানার মধ্য দিয়ে পুরানো সংস্কারকে আনলার্ন করা। কিন্তু আমাদের মন্দ ভাগ্য এই যে এখানকার ডি ফ্যাক্টো সেনাবাহিনীর তৎপরতায় ও রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে আদিবাসীদেরকে সেই এক্তিয়ার দেয়া হয় না। যার ফলে যারা ভ্রমণে আসেন তারা কেবল দেখার ও নিজেকে দেখানোর সুযোগ পান, জানার নয়। ট্যুরিস্টরা যে প্রিএস্টাব্লিশড নলেজ নিয়ে আসেন, সেটা সেরকমই অপরিবর্তিত থাকে। ফেসবুকের এইটাও একটা মজার দিক অবশ্যই। লোকের মানসিকতাকে একটা বৃহৎ পরিসরে এস্টিমেট করা যায়। যেমনটা এই ভয়ংকর ছবিগুলো থেকে স্পষ্ট। এই ছবিগুলো কেবল এই ব্যক্তির নয়, মেইনস্ট্রিমের অধিকাংশেরই মানসিকতার প্রতিফলন। তাই একে আমলে নিয়ে এর পরিবর্তন আবশ্যক।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.