অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ছাড়া মাতৃত্ব নারীর জন্যে অভিশাপ

সুমু হক:

একটি মেয়ে যার পিতা তাকে কোনদিন এই পৃথিবীতে আনতে চায়নি, মা তাকে চেয়েছিলো নিজের জীবনের সব সমস্যার ম্যাজিক সমাধান হিসেবে।
জন্মেই যখন সে তার মার জীবনটাকে জাদুর কাঠি দিয়ে ঠিক করে দিতে পারলো না, উল্টো সে হয়ে দাঁড়ালো তার মার সমস্ত আক্রোশ আর রাগ ঝেড়ে ফেলবার ভাঙা কুলো।
মার জীবনটাকে স্বাভাবিক না করতে মারার মূল্য সে দিয়েছে ২৭ বছর অবধি চলা শারীরিক আর ৩৭ বছর বয়স অবধি চলা মানসিক অত্যাচার সহ্য করে!
সেই মা তখন তার নিজের জীবনের ঝড় সামলাতেই বেসামাল।
নিজেই স্বামীর শারীরিক এবং মানসিক অত্যাচারের শিকার সেই নারীর মা হবার প্রস্তুতি, যোগ্যতা, ক্ষমতা, কোনটাই ছিলো না|
সন্তানটিকে বড় করে তোলা, তাকে পরিবারের ভেতরেই শৈশব থেকে চলা যৌন শোষণ থেকে বাঁচানো তো দূরে থাক, সেই সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াবার শক্তি পর্যন্ত তার কোনদিন ছিল না!

তো সবার অনিচ্ছা আর অবহেলায় পৃথিবীতে এসে পড়া সেই কন্যাটি বেঁচে আছে এবং যার তার দয়ায় দাক্ষিণ্যে যেমন তেমন করে এই পৃথিবীতে ৪০ টি বছর পাড় করে ফেলেছে সেটাই কি তার জন্যে যথেষ্ট নয়! তার আবার স্বপ্ন দেখার অধিকার হলো কবে থেকে!
গত ক’দিন ধরে এবোর্শনের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা শুনছি তো!
আমি সেই মায়ের অনাকাঙ্খিত ভ্রুণটির ৪০ বছর বয়সী ফসল বলছি|

এইরকম পরিস্থিতিতে ভ্রুণটিকে এবর্ট না করে তাকে সম্পূর্ণ পরিণতি দিয়ে পৃথিবীতে নিয়ে আসার চেয়ে বড় পাপ আর কিছুই হতে পারে না!

আমার নানা ছিলেন ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের কোন এক গ্রামের অনাথ ছেলে। ভাগ্যক্রমে তাঁর আশ্রয় জোটে জলপাইগুঁড়ির নবাব সাহেবের এস্টেটে।
সেখানেই ম্যাট্রিক অবধি পড়াশোনা করে চাকরিজীবন শুরু তাঁর। আমার নানু ছিলেন এই জলপাইগুড়ির মেয়ে। বিয়ের পর অনেকটা পথ পার হয়ে তাঁরা স্থায়ী বাসস্থান তৈরি করে বসবাস শুরু করেন দিনাজপুরের বালুবাড়ির “আলিকুটির” নাম একটি বাড়িতে।
সেখানেই আমার মায়ের জন্ম ১৯৫৪ তে।

মার সাথে আমার সম্পর্কে জটিলতার অন্ত নেই, আমাদের স্বভাব খানিকটা এক হলেও, আমাদের চিন্তা-ভাবনা আলাদা, মূল্যবোধ আলাদা এবং এমনকি সাংস্কৃতিক বোধগুলোও পর্যন্ত অনেকটাই আলাদা।
সত্যি বলতে কী, আমাদের মা মেয়ের সম্পর্কটা স্বাভাবিক হতে শুরুই করেছে আমার জন্মের ৩৭ বছর পর থেকে।
এর জন্যে আমি শুধু দোষ দিতে পারি আমাদের সমাজব্যবস্থা, পুরুষতন্ত্র, আমার নানার অদূরদর্শিতা, আমার মামা-মামীদের স্বার্থপরতা, আমার পিতার চারিত্রিক ত্রুটিসমূহ এবং তাঁর পরিবারের সেই অন্যায়গুলোকে সমর্থন করে যাওয়ার প্রবণতাকে।

আমার নানা এবং বড় মামা সেই সত্তরের দশকের গোড়ার দিকে সমাজের প্রথা এবং হাজারো কথার বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য একটি শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে তাঁদের কন্যাটিকে প্রথমে মাস্টার্স অবধি পড়ালে এবং তারপর তাঁর চাকরি জীবনের শুরুটা নিশ্চিত করলেও পর মুহূর্তেই তাঁর ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে তাঁর চূড়ান্ত অপছন্দের পাত্রটির সাথে বিয়ে দিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।
শুনেছি মা নাকি বিয়ের সময় “কবুল” অবধি বলেননি।
বোধ করি মেয়েদের হাত-পা বেঁধে কুয়োয় ফেলে দেয়াটা তখন আর ততটা ফ্যাশনেবল ছিলো না!
তাই এই বিয়ে!
তাঁদের এই অদ্ভুত আচরণের কোন অর্থ আমি আজও খুঁজে পাই না একমাত্র ঘাড় থেকে আমার মায়ের দায়িত্ব নামিয়ে দায়মুক্ত হওয়া ছাড়া।
যদিও এর পর সমস্তজীবন ধরে আমার মাকেই তবে কেন বাবার বাড়ি আর শ্বশুর বাড়ির সমস্ত আত্মীয়স্বজনের দায়ভার বয়ে যেতে হয়েছিল, এবং আজও খানিকটা হচ্ছে, তারও কোন অর্থ আমি আজ অবধি খুঁজে পাইনি।
কিন্তু একটা মেয়েরই তো জীবন, তার আবার অর্থ খুঁজতে যাবে কে!

বলা বাহুল্য, আমার মার এর পরের জীবনটা মোটেও সুখের হয়নি।
আর জীবনের এই সমস্ত সমস্যার সমাধান হিসেবেই বোধহয় তিনি চেয়েছিলেন একটি ফুটফুটে পুতুলের মত সন্তান যে কিনা ম্যাজিকের মত মুহূর্তেই তার জীবনটা পাল্টে দেবে!
এমনই তাঁর কপাল, বিনিময়ে তিনি পেলেন আমাকে।
পুতুলের মতো দেখতে তো আমি নই-ই।
আমাকে পেয়ে তাঁর সমস্যা কমার বদলে বেড়েই চললো।

বাবার না চাওয়া সত্ত্বেও আমি তাই এই পৃথিবীতে এলাম।
আমার একমাস বয়সে বাবা মাকে চাকরিতে ফেরত যেতে বাধ্য করলেন বাজার খরচ বন্ধ করে দিয়ে।
মায়ের অপরাধ তিনি আর কয়েকটা মাস বেশি সময় ছুটিতে থাকতে চেয়েছিলেন।
এটা শুধু অনেকগুলো গল্পের একটা, বাকি গল্পগুলো অন্য কোন স্থানের জন্যে তোলা রইলো।

তারপর আরও অনেক ট্রমা, অনেক ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্যে দিয়ে আমি বড় হয়ে উঠতে লাগলাম। তারপরে আমি আবার হলাম ভয়ানক জেদি, বদরাগী।
আমার দাদি এবং বড় ফুপু এতদিন মিষ্টি হাসির নিচে আড়াল করে আমার মার সাথে যেসব চূড়ান্ত অসভ্য এবং অমানবিক ব্যবহার করে যাচ্ছিলেন, প্রায় বারো কি তেরো বছর বয়স হতে না হতেই আমি মুখে মুখে তার জবাব দিতে শিখে গেলাম।
শিখে গেলাম মার অন্যায় শাসনের মুখোমুখি রুখে দাঁড়াতেও।
কারণ সমস্ত পৃথিবীর কাছ থেকে পাওয়া ফ্রাস্ট্রেশন উগড়ে দেবার তাঁর আর তো কোন জায়গা ছিল না!

আমি তাঁকেও এখন আর বিশেষ দোষ দিই না।
আমার মা এতো প্রটেকটিভ একটা পরিবেশে জীবন এবং বাস্তব সম্বন্ধে এমন রূপকথাসুলভ ধারণা নিয়ে বড় হয়েছিলেন, কিংবা বলা ভালো যেভাবে তাঁর পরিবার তাকে বড় করেছিল, তাতে তাঁর পরবর্তী জীবনের কোনরকম স্ট্রাগলের জন্যে প্রস্তুত হওয়াই তাঁর পক্ষে ছিল অসম্ভব।
বাংলাদেশে আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের ৯৯% ভাগ মেয়ের অদৃষ্টই এরকম।
আর তাঁর পক্ষে আরও বেশি অসম্ভব ছিল আরও একটি নতুন জীবনের অর্থাৎ আমার দায়িত্ব নেয়া।

সে যাই হোক, অনেক বছর, অনেক তর্ক-বিতর্ক, হাজার হাজার ঘন্টার কাউন্সেলিং, অনেক পড়াশোনার পর এখন আমি তাঁর সেই অপ্রস্তুতিকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে দেখতে এবং তাঁর এবং আমার জীবনের এলোমেলো অবতরণের পেছনে দায়ী আসল অপরাধীদেরকে দেখতে এবং তাদের মুখোমুখি রুখে দাঁড়াতে পারি।
আমরা যে ইতিমধ্যেই পেছনের সব অভিমান ভুলে পরস্পরের বন্ধু হয়ে গেছি তা নয়, এতোগুলো বছর পার হয়ে শুরুটা অন্তত করতে পেরেছি কেবল|

তাই বলছি, নারীমাত্রেই মাতৃত্বের জন্যে প্রস্তুত নন, আর মাতৃত্ব কখনোই নারীর জীবনের সব সমস্যার ম্যাজিক সমাধানও নয়।
নিজের জীবনে কোনদিন বিন্দুমাত্র কোন সংকটের ভেতর দিয়ে না গিয়ে থাকলে অন্যের জরায়ু এবং সেই জরায়ুর স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা বন্ধ করুন।

আমি একজন ভুক্তভোগী বলছি, শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ছাড়া মাতৃত্ব কখনও কখনও নারীর জন্যে শুধু নয়, তার সন্তানের জন্যেও অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়, এবং তেমন মাতৃত্বের চাইতে স্বেচ্ছায় গর্ভপাত হাজার গুণে শ্রেয় এবং কাম্য।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.