সন্তান ধারণ কিংবা এবরশন: সম্পূর্ণই নারীর সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত

সালমা লুনা:

বাস্তব একটা অভিজ্ঞতা।

এক নারী বছর কয়েক আগে খুব প্রাসঙ্গিক আলাপ কালেই জানালেন, বেশ কয়েক বছর হলো, তিনি তার তিন নম্বর গর্ভাবস্থায় এবরশন করেছেন। তার তখন তেত্রিশ চলছে। স্বামীর বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। দশ আর পাঁচ বছর বয়সী দুটি সন্তানের মা বাবা তারা।
পুত্র এবং কন্যা দুই-ই আছে।
সবদিকেই নিশ্চিন্ত। আরেকটি বাচ্চা নেয়ার মানসিকতা, বয়স বা ইচ্ছা কোনটাই নেই। দুজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর বাচ্চা নেবেন না। তেমনি এক সময়ে হুট করেই একবার পিরিয়ড হলো না সময়মতো। প্রথমে গা করেননি। অন্যকিছু হতেই পারে না, কারণ স্বামী খুবই সচেতন। আবেগঘন মুহূর্তেও সুরক্ষা নিতে ভোলেন না। মোদ্দা কথা দায়িত্বশীল স্বামী অথবা পার্টনার।

কোথাও কিচ্ছু সন্দেহ-ই নেই। তাই পিরিয়ড হচ্ছে না বলে নারী তেমন গা করলেন না। পিরিয়ড এমন আগে পরে হতেই পারে।
বিপত্তি ঘটলো যখন পিরিয়ড বন্ধ হবার দেড় সপ্তাহ যেতে না যেতেই তার মর্নিং সিকনেস শুরু হলো। তিনি দুটো বাচ্চার সময় ভীষণ কষ্ট সহ্য করেছেন এই নিয়ে। পরিষ্কার বুঝে গেলেন সব। ভয়ে ভয়ে ঘরেই পরীক্ষা করিয়ে দেখলেন পজিটিভ!
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।
শুরু হলো তার দুশ্চিন্তা।
তিনি আর সন্তান চান না।
ছেলেমেয়ে দুজনকেই তিনি হেসেখেলে সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে বড় করে তুলতে চান। তাছাড়া দ্বিতীয় প্রেগনেন্সি থেকে বিপি হাই, সুগারের ঝামেলাও দেখা দিয়েছে। এই সন্তান তাই তিনি চান না।

স্বামীর সাথে পরামর্শ করার আগে দু’চারজন বন্ধু, মা বোন এমনকি শ্বশুর বাড়ির নারী সদস্যদের সাথে আলাপ করলেন।
প্রতিটি মানুষ তাকে বললো, তুমি বুঝে দেখ। সন্তান তুমি ধারণ করবে। তুমি যদি রাখতে না চাও সেটি তোমার বিবেচনা।
এরপর স্বামীর সাথে বোঝাপড়ার পালা। স্বামী শুনেই নাকচ করে দিলেন।
তার ঘরভরা সন্তান পছন্দ।
সেখানে তো এ তিন নম্বর মাত্র! কোন ঝামেলাই নেই। তার যথেষ্ট সচ্ছলতা আছে। তিন সন্তান কোন ব্যাপারই না।

নারী ভীষণ বিপদে পড়লেন। স্বামী চান, অথচ তিনি চান না।
ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করলেন। ডাক্তারও বললেন রেখে দিতে। এমন কিছু বয়স না তার। আর আজকাল এসব বিপি সুগার নিয়েও মায়েরা আকছার জন্ম দিচ্ছে বাচ্চা।
ডাক্তার হেসে হেসে এও বললেন, এবার নিয়ে নিন। একবারে লাইগেশন করিয়ে দেব।

তিনি অনেকবার অনেকভাবে ভেবে দেখলেন। মন থেকে কোন সাড়াই পেলেন না। এই বাচ্চা তার ইচ্ছে, তার চাওয়া নয়। সে অন্যের ইচ্ছায় একটা আনওয়ান্টেড চাইল্ড হয়ে জন্ম নেবে। সে হবে শুধুই একটা হিসাব নিকাশের বাচ্চা। ওই দুজনের মতো না। সবচেয়ে বড় কথা উনি মন থেকে মানতেই পারছেন না, তার এমন সুস্থির জীবনে আরেকটা বাচ্চা পৃথিবীতে আনার কথা।

নিজ জেদে অটল রইলেন তিনি।
অবশেষে ভ্রুণ টার্মিনেট অথবা এমআর করা হলো। তিনি স্বস্তি পেলেন।

তাকে নিছক কৌতূহলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোন সমস্যাই হলো না? স্বামী মেনে নিলেন?

নারী মৃদু হেসে বলেছিলেন, আপা শরীরটা তো আমার। বাচ্চা নেবার অধিকারটাও তো আমার হওয়া উচিত। তাই নয় কি?

তবে স্বামী কিছুদিন নাকি খুব আফসোস করেছেন। আরেকটা বাচ্চাকে তিনি কোলে-কাঁখে নিতে পারতেন। আদর-সোহাগ করতেন। বাচ্চাটা তাকে আধো বোলে ‘বাবা’ ডাকতো। সব শেষ হয়ে গেল- বলে খুব দুঃখ করেছিলেন। এখনও করেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, উনার এই নিয়ে আফসোস দেখে কি আপনারও আফসোস হয়?

ঝিরিঝিরি হেসে নারী বলেছিলেন, দেখেন আপা, আমি দু’দুটো বাচ্চা জন্ম দিয়েছি। আমিই বুঝি আমার কোনটা মঙ্গল। আর শরীর আমার, আমি কষ্ট ভোগ করলে কেউ তো আফসোস করবে না। জন্ম দেয়ার ঝামেলা, পরবর্তী যন্ত্রণা সব আমাকেই বহন করতে হবে।

অবশ্যই সে হসপিটালের বিল দিয়েছে। পাশে থেকেছে, কিন্তু আমার ব্যথার ভাগীদার হতে পারেনি। সে প্রমাণ দিয়েছে বাচ্চা পালনে যথেষ্ট সচ্ছলতা তার আছে। আর হ্যাঁ সে অবশ্যই একজন ভালো বাবা হয়ে বাচ্চা কোলে নিয়ে আদর করেছে।
এবং এটা সে তৃতীয়বারের মতোও উপভোগ করতে চেয়েছে।
আমিও বাচ্চা ভালোবাসি, কিন্তু আমি শুধু ওই কষ্টগুলো তৃতীয়বার আর করতে চাইনি।
কাজেই কে কী বললো আমার কিচ্ছু যায় আসে না।’
কথাগুলো অনেকটাই এমন ছিলো। এতো স্পষ্ট আর মর্মভেদী ছিলো যে এখনো মনে দাগ কেটে আছে।

ন’মাস নিজের জরায়ুতে সন্তানকে ধরে রাখার কষ্ট নারীর। এই লম্বা সময়ে খেতে না পারা, বমি, হরমোনের নানার সমস্যায় জর্জরিত হয়ে কিছু মানসিক সমস্যায় ভোগা তো আছেই। নরমাল ডেলিভারিতে প্রসব বেদনা, সিজারিয়ান হলে অপারেশনের যন্ত্রণা তো আছেই, তারপর বাচ্চা হওয়ার পর দিনরাত বাচ্চা পালা, তাদের কাঁথাকাপড় ধোয়া, খাবার, বুকের দুধ দেবার যন্ত্রণা সহ্য করার ঝামেলা পুরুষকে নিতে হয় না। পেটে বুকে বিশ্রি স্ট্রেচমার্ক, চেহারা নষ্ট হওয়া, উঁচু পেট নিয়ে এবং কোলের বাচ্চাকে ব্রেস্ট ফিডিং করিয়ে করিয়ে ঘর-সংসারের যাবতীয় কাজ করা, খেতে খেতে বাচ্চা কাঁদলে দৌড়ে যাওয়া, আধা গোসল করে বেরিয়ে আসা, ঘুমে জোড়া চোখ খুলে বাচ্চার ডায়াপার চেক করা – কাপড় পাল্টে দেয়া, যখন তখন হাগু বমি সাফ করা, মুখ দেখেই বাচ্চার কষ্ট বুঝে তাকে মানুষ করার কাজগুলোও অধিকাংশ পুরুষকে করতে হয় না।
সে শুধু পৃথিবীর বুকে তার সক্ষমতার প্রমাণ রাখে যে বাচ্চা জন্ম দেয়ার মতো পুরুষত্ব তার আছে। আর অর্থনৈতিক দায়িত্ব নেয়ার মতো গুরুদায়িত্ব সে পালন করে। কাজেই তার আর কোন দায়িত্ব নাই।

বলা ভালো, আর কোন দায়িত্ব আছে বলে সে এবং সমাজও মনে করে না। সন্তান লালনপালনের সকল দায়িত্ব নারীর।
তাহলে বাচ্চা নেয়া বা এবরশন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কেন নারীই যথেষ্ট নয়?
বাচ্চা নেবার বিষয়ে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা, সিদ্ধান্ত নেবার বিষয়ে নিজের অধিকার প্রয়োগের এই শক্তি অনেক স্বাবলম্বী এবং স্বনির্ভর নারীদের জীবনেও প্রায় অনুপস্থিত।

নারী যদি খুব স্পষ্ট করে তার অধিকার বিষয়ে জ্ঞান রাখেন এবং সেটিকে স্পষ্টচ্চারণ করতে পারেন তবেই এটি সম্ভব হয়।

সেই কবে তসলিমা নাসরিন লিখেছিলেন, জরায়ুর স্বাধীনতা নিয়ে।
যার ভুল ব্যাখ্যা এখনও করে চলেছে সমাজের অসুস্থ মানসিকতার একাংশ। তারা বোঝায় এই স্বাধীনতা মানে নারীর যথেচ্ছ যৌনাচারের স্বাধীনতা। সকল পুরুষকে তার জরায়ুতে প্রবেশের সুযোগ দেয়ার স্বাধীনতা। এসব বলে তারা সমাজকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তোলে। নারীর বিরুদ্ধে উস্কে দেয়।
আসলে তারা যে জিনিসটা গোপন করতে চায় তা হলো নারীর সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতাকে অস্বীকার করা। এইসব ভুলভাল ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজকে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে পারলে দাবিয়ে রাখা যায় নারীকে।

নারীকে তার ইচ্ছা অনিচ্ছা, সুখ সুবিধা ভুলিয়ে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিংবা শরীরী সক্ষমতার বাইরে সন্তান ধারণ করিয়ে বশ করে রাখতে চায়। তাই নারী যখন নিজ জরায়ুর উপর অধিকার চায় তখন ক্ষিপ্ত হয় সমাজ সংসার। নারীর নিজের ইচ্ছানুযায়ী সন্তান ধারণের সিদ্ধান্ত নেয়াকে তাই তারা অস্বীকার করতে চায়।

যেসব পাঠক এই লেখা পড়েই একটা কনক্লুশনে চলে আসবেন, এই লেখিকা এবরশন চায়। এ তো মহাপাতকী! গালির নহর বইয়ে দেবেন। তাদের উদ্দেশ্যে বলবো, জ্বী, আমি এবরশনের পক্ষে। তবে আমি লাইফেরও পক্ষে। আমি আসলে কেবলই নারীর নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পক্ষে। তার অধিকারের পক্ষে।
সেই গর্ভপাত আমি অবশ্যই চাই যেখানে নারী শরীরে ও মনে একেবারেই প্রস্তুত না একটি ইচ্ছুক শরীরী মিলনে সৃষ্ট ভ্রুণকেও ধারণ করতে।
অর্থাৎ সমাজের চোখে বৈধ শরীরী সম্পর্কের জেরেও যদি সন্তান আসে সেটিও নারীর ইচ্ছার স্বাধীনতা হওয়া উচিত। অবৈধ হলেও যদি সে সন্তানকে জন্ম দিতে চায় তবে এতেও সমাজের চোখ রাঙানো চলে না। কূলটা, ব্যাভিচারিণী ডাকা চলে না।

শরীরের স্বাধীনতা ভিন্ন বিষয়। সেসব অতি বিশদে আলোচনার দাবি রাখে।

আমি শুধু সন্তান ধারণে ও জন্মদানে নারীর সিদ্ধান্ত নেয়া না নেয়া একান্তই তার অধিকারের বিষয়ে বলছি।
এবরশনের অধিকার নারীর এবং একমাত্র নারীরই হওয়া উচিত। আর কারো নয়। অবশ্যই তার সঙ্গী পুরুষটির এ বিষয়ে জানবার পূর্ণাঙ্গ অধিকার আছে। আছে আলোচনা করার অধিকারও। ডাক্তারও মতামত দিতে পারেন স্বাস্থ্যগত কোন বিষয় থাকলে। কিন্তু আর কারো, বিশেষ করে পরিবার বা সমাজের তো কোনই অধিকার নাই এ নিয়ে কথা বলার। এটি সম্পত্তির অধিকার নয়। আইন করে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এটি সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে চর্চার বিষয়।
এটি নিজের শরীরের উপর নিজের অধিকারের বিষয়।

নারী সন্তান রাখবে নাকি রাখবে না এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সে! যিনি সন্তান ধারণ করবেন, শরীরের মালিক যিনি, এবিষয়ে সকল অধিকারই তার। কাজেই সে সেটি করতে না চাইলে, তার সেই ‘না’ মানতেই হবে।
আর শেষ কথা হচ্ছে এবরশন আসলে সকাল বিকাল করার মতো কাজ না। বিশেষ অবস্থা হলেই এমন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তেমন যাতে প্রয়োজন না হয় সেদিকে নারী পুরুষ উভয়েরই সচেতন থাকা উচিত।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.