বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নারী মহলে সেভাবে চর্চিত নয় কেন?

ডালিয়া চাকমা:

বাংলাদেশে করোনার শুরুর দিকে কোনো এক ইন্টেলেকচুয়াল লোককে পোস্ট দিতে দেখেছি, যেখানে তিনি বলেছিলেন, করোনার এই দুঃসময়ে অনলাইনভিত্তিক যেসব আলাপ আলোচনা চলছে সেখানে নারীর উপস্থিতি পুরুষের তুলনায় খুবই নগণ্য। এছাড়াও চারপাশের কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারি লোকে একজন নারী ও একজন পুরুষের কাছ থেকে সম আলাপ প্রত্যাশা করে।

অন্যান্য জেন্ডারের কথা বাদই দিলাম যেহেতু এই সমাজে জেন্ডারের বাইনারি ফ্রেমে অন্যান্য জেন্ডারের মানুষকে এক্সক্লুড করে দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে সমাজের সর্বস্তরেই, তাই তাদের কাছ থেকে সম আলাপ প্রত্যাশা তো দূর কী বাত, তাদের ভাবনা ও জীবনের সমগ্র আলাপের পথই এই সমাজে রুদ্ধতার আলাপ হিসেবে গণ্য। তাই আমার কথাগুলোও আপাতত জেন্ডারের ওই বাইনারির মধ্যেই রাখছি।

মাস ছয়েক আগে আরেকজন ইন্টেলেকচুয়াল ফিগারের পোস্ট আমার নজর কাড়ে যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন একজন নারীর কনভারসেশনে কী কী থাকলে তিনি পুরুষদের কনভারসেশনে জাম্প করতে পারেন। লেখাটি তিনি লিখেছিলেন প্রবাসে বাঙালীদের কোনো এক গেট টুগেদার পার্টি থেকে সঞ্চিত অভিজ্ঞতা থেকে। তবে তিনি যে তরিকা দিয়েছেন তা ছিলো সমগ্র বঙ্গনারীর জন্যই তার সাজেশান, যা বেশ লাইকড এন্ড শেয়ারড হয়েছিলো। তিনি উল্লেখ করেছিলেন, আজকাল আমাদের দেশের নারীরা পুরুষের পাশাপাশি অর্থোপার্জন করছেন ঠিকই, কিন্তু নারীদের আলাপ এখনও সেই সংসার কাঠামোর ফ্রেম ভেঙে আসতে পারেনি। তারা স্পোর্টস নিয়ে আগ্রহী না, তাই পুরুষদের স্পোর্টস নিয়ে আলাপে তারা এক্সক্লুড হয়ে যায়। নারীরা ওয়ার্ল্ড পলিটিকস, পলিটিকাল ডিপ্লোম্যাসি এসবের খবরাখবর রাখে না, যার ফলে পুরুষদের এসব আলাপ থেকেও তারা বাদ পড়ে যায়। তারা লিকার প্রেজেন্টেশনের প্রক্রিয়া জানে না, যা পুরুষদের কোন গ্রুপের কনভারসেশনে ইন করার একটা সহজ উপায়। তিনি তার এলিট লেন্সের মধ্য দিয়ে আপামর বঙ্গীয় নারীর জন্য উপায় বাতলে দিয়েছিলেন কীভাবে তারা আলোচনায় পুরুষের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারে এবং ‘আমরাও পারি’ সেই ভাব নিতে পারে। তো ওই এলিট ও প্রিভিলেজড লেন্সের মধ্য দিয়ে দেখতে ও দেখাতে গিয়ে তিনি বোধহয় ভুলে গিয়েছিলেন একজন ব্যক্তি আলাপ করে তার দৈনন্দিন জীবনের অরিয়েন্টেশন থেকেই। ব্যক্তি যা পড়েন, যা দেখেন, সেখান থেকেই তার ভাবনার খোরাক আসে। খালি ভাবনা আসলেই হয় না, সেই ভাবনা চর্চার একটা জায়গাও থাকতে হয় সমাজে।

জানার এই যে সিস্টেম অব নলেজ সেটা আমাদের পরিবারে-ঘরে কতটুকু চর্চিত বা এলাউড? ঘরের চার দেয়ালের বাইরে একজন পুরুষের যতটুকু এক্সেস, একজন নারীর জন্য সেটা কতটুকু প্রযোজ্য? একাডেমিক প্রতিষ্ঠান কি ঘরের চার দেয়ালের বাইরের সমসাময়িক জগত নিয়ে আলাপ করে? না করে থাকলে তাহলে সেইসব আলোচনা লোকে কোথায় গিয়ে করতে পারে?

পরিবার-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গেলো, রইলো বাকি বন্ধু-বান্ধবদের আড্ডা। ঘর ও প্রতিষ্ঠানের চার দেয়ালের বাইরে নারীদের যাতায়াত সমাজ এখনও মেনে নিতে পারেনি, যা একজন পুরুষের জন্য খুবই স্বাভাবিক। ‘পাড়াবেড়ানি’ নামক নেতিবাচক কনোটেশনটি একজন বহির্মুখী নারীর জন্যই সৃষ্টি, যার পুরুষবাচক শব্দ আপনি সমস্ত ডিকশনারি খুঁজলেও পাবেন না।

এককালে পাড়ায় পাড়ায় তরুণদের মধ্যে পাঠ ও জ্ঞান চর্চার জন্য বিভিন্ন সংগঠন বা ক্লাব চালুর রেওয়াজ ছিলো, যেখানে নারীদের এক্সেস অবাধ না হলেও খুব একটা ক্রিঞ্জড ছিলোনা। ধীরে ধীরে ইউরোসেন্ট্রিক আইডিয়ালিজমের বিপরীতমুখী ঠ্যালায় সেসবের চর্চা সমাজ ও ব্যক্তির মনন থেকেও উঠে গেলো। আজকাল মার্কেট বা রেস্টুরেন্টের অত্যাবশ্যকীয় যে আবশ্যকতা, সেরকম আবশ্যকতা ওইরকম সংস্থা বা সংগঠনের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ অনুভব করে কি? সংগঠন বা ক্লাব নামে যাও বা আছে, সেসবে আর যাই হোক খুবই কদাচিৎ পাঠচক্র হয়। শোনা কথা, আজকাল ওইসব সংস্থা-ক্লাব-সংগঠনের সাথে দলীয় রাজনীতির সম্পৃক্ততা ওপেন সিক্রেট ব্যাপার স্যাপার, যার মধ্যে ঘরের ছেলের সম্পৃক্ততা মেনে নেয়া গেলেও, ঘরের মেয়ের জন্য নাকি তা ‘নষ্টামি’।

যাই হোক আমরা এনলাইটেনমেন্টের ঠ্যালায় আসা প্রযুক্তির কল্যাণে গুগল মামা পেয়েছি। আলাদীনের জিনের মতোই চাইলেই যখন তখন পাওয়া যায়। যা জানতে চাই, সবই হাজির। এই যে ‘হাতের মুঠোয় দুনিয়া’ বলে যে প্রচারণা, তা লোকের শ্রেনী, লিঙ্গ, ক্ষমতা ও সামর্থ্যভেদে কতটা সত্য? একজন অর্থোপার্জনকারী নারীর জন্য সংসারের যে কাঠামো, একজন অর্থোপার্জনকারী পুরুষের জন্যও কি তেমন? সন্তান লালন পালনের দায়িত্ব যেভাবে একজন নারীর উপর বর্তায়, সেভাবে কি একজন পুরুষের উপর বর্তায়? পরিবারে নারী ও পুরুষের অবসর বা ব্রিদিং স্পেস একই কি? দায়িত্ব ও কর্তব্যের পারিবারিক পরিষেবার যে সংজ্ঞায়ন তার সমবন্টন না হওয়াতক ‘একজন নারীর আলাপ পুরুষদের মতো বৃহৎ পরিসরের হওয়া উচিত যাতে তারা সমান তালে পুরুষদের সাথে আর্গুমেন্টে জড়াতে পারে’ – এরকম ভাবনা অত্যন্ত একপেশে এবং অতি অবশ্যই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি ঠিকই বলেছিলেন আমাদের সমাজে স্পোর্টস, পলিটিকস, তথ্য পুরুষদের চর্চা হিসেবেই ধরে নেয়া হয় (যদিও এটা কে ঠিক করে দিয়েছে, কীভাবে হলো আমরা কেউই জানি না)। খুব সচেতনভাবেই পুরুষকূল নিজের ঘরের নারীদের এসব থেকে দূরে রাখেন (এখানে আছে ক্ষমতার রাজনীতি যার চর্চার মধ্য দিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে অন্তরাল করার রাজনীতি চলে)।

‘পুরুষের আলাপ’ বলে এই যে পলিটিকো-সোশিও-ইকোনোমিক কন্সট্রাকশন, এটাকে নারীরাও বিশ্বাস ও পালন করছেন সচেতনভাবেই। যদিও তথ্যের ও আইডিয়ার অবাধ এক্সেসের এই যুগে নারীদের মধ্যে চিরাচরিত সেসব পুরুষতন্ত্র সংজ্ঞায়িত নীতি ভাঙনের প্রবণতা দেখা দিয়েছে অনেকক্ষেত্রেই, কিন্তু সমগ্র পরিসরে তা যেনো খুবই কিঞ্চিত মনে হয়। ছাত্রাবস্থায় রাজনীতিতে নারীর দাপট পুরুষের সমানতালে চলতে দেখা গেলেও, একটা পর্যায়ে তেমনটা আর হয়ে উঠে না। নারী সংসার কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করলে কর্মজীবন-পরিবার এসব নিয়েই পুলসেরাত পার হওয়ার মতো অবস্থা হয়ে যায়, এর বাইরে জানা বোঝা তো আরো দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মজীবী স্ত্রীর স্বাভাবিক ঘুম একজন কর্মজীবী পুরুষের তুলনায় কম। আগে নারী স্ত্রীরূপে সেবিকা হলেও ক্যাপিটালিজমের চাবুকে নারীকে আজকাল ‘নার্স উইথ পার্স’ রোল নিতে হচ্ছে। এইটা পরিবারে নারীর রোলকে আরও জটিল করে তুলেছে। ‘উই কান্ট ব্রিদ’- কথাটা এই জটিল রাজনীতিতে নারীর প্রত্যেকটা মুহূর্তের জন্য ভয়াবহ বাস্তবতা। রাজনৈতিক এক আড্ডা শেষে ফিরতি পথে এক আপু বলছিলেন, ‘আমাদের মতো মেয়েরা কেনো যে সংসারে ঢোকে!’ এই যে কীভাবে আর কেনোই বা সংসার এবং রাজনীতি একজন নারীর জন্য দুইটা আলাদা কন্ট্রাডিকটোরি জগত হয়ে গেলো তার আলোচনা বাদ দিয়ে ‘নারীরা কেবল সংসারের গল্প করে বেশি’ এই টোকেন চালু হলো, তার দায় সমাজকে না দিয়ে কীভাবে নারীর উপর ছেড়ে দেন?

এইসব আলাপ ব্যতিরেকেই ওইসব এলিট বা প্রিভিলেজড লেন্সের মধ্য দিয়েই অনেক রকমের তরিকা দেয়া যায়, যাতে আর কোনোকিছু না হলেও ক্যাওস তো হয় নিশ্চয়ই। আমরা বরং প্রশ্ন তুলতে পারি, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নারী মহলে সেভাবে চর্চিত নয় কেনো। করোনাকালীন ঘরবন্দী পুরুষদের জন্য যেরকম অবসর তৈরি করেছে, একজন নারীর জন্য কি সেটা প্রযোজ্য? এইসব নুয়েন্স আমলে নিয়ে ‘মেয়েলোকের বুদ্ধি’, ‘এসব বাইরের ব্যাপার স্যাপার তুমি বুঝবে না’ সমাজে প্রচলিত এইসব ফ্রেজ যতদিন পর্যন্ত বদলানো যাচ্ছে না, ততদিন নারীরাও ‘সংসারের সিলি টক’ ছেড়ে বাইরের দুনিয়ার আলাপ করবে এই প্রত্যাশা অনুচিত।

এই সমাজে নারীদের এই ইন্টারসেকশনাল অভিজ্ঞতা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার জন্যই সত্য। যদিও বা পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক কাঠামোয় সামর্থ্য ও ক্ষমতা কিছুক্ষেত্রে শ্রেণি চরিত্র বদলে দিচ্ছে, যেখানে অনেক ট্যাবু কিংবা ব্যারিয়ার ভাঙা অপেক্ষাকৃত সহজ। তবে আমাদের মতো ডেভেলপিং কিংবা লেস ডেভেলপড কান্ট্রির জন্য ওইসব সুবিধা আঙুর ফল টক হিসেবেই বেশি গণ্য করা হচ্ছে।

এবার আসি মাস ছয়েক আগের আলাপ কেনো আজ টানলাম। ইনবক্সে অনেকেই জানতে চেয়েছেন বাড়ি আসার পর থেকে আমি লাপাত্তা কেনো, কী নিয়ে এতো ব্যস্ততা? ঘরের কাজে ব্যস্ত আছি – আমার এই কথাটা একজন নারী যেভাবে অতি সহজে ‘বুঝে নিতে’ পেরেছেন, সেটা আমি কোনো পুরুষকেই ‘বোঝাতে’ পারিনি। তাদের না বুঝতে পারাটা তাদের ডিজঅরিয়েন্টেশনের ফলাফল।

পুরুষের প্রিভিলেজড অবস্থান থেকে তারা আমাকে ইনসিস্ট করেছেন, এর মধ্য থেকেই জানতে হয়, ভাবতে হয়, বলতে হয়, লিখতে হয়। ধারণা করি জানার ওই উৎস কিংবা সেইটা কীভাবে এক্সেসড হয় সেটা তারা না বুঝেই বলেছেন। কারণ আমি হাজারও তাড়নাতেও সেটা সম্ভব করতে পারিনি বা পারছি না। বাস্তবতা ও তাড়নার এই বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার ফলতঃ যে যন্ত্রণা সেটা ব্যক্তিগত বলে চালিয়ে দিতে চাইলেও আমি জানি এটা আমার চারপাশের অধিকাংশ নারীর জন্যই সত্য। শেয়ারড এক্সপেরিয়েন্স আমাকে কিংবা আমাদেরকে এই বোধগম্যতা দিয়েছে। যাদের সেই অভিজ্ঞতা নেই, তাদেরকে আসলে কী বলা যায় জানা নেই আমার। কারণ যে শেয়ারড অভিজ্ঞতা নারীদেরকে এক কাতারে করে, ঠিক সেই অভিজ্ঞতাই পুরুষদের থেকে নারীদের দূরত্ব তৈরি করেছে। এই দূরত্ব ঘোচাতে কী দরকার সেসব নিয়ে আলাপ হওয়া দরকার সমাজে। তারপর নাহয় ‘পুরুষদের মতোই বাইরের দুনিয়া নিয়ে ভাবা’ যায় কীনা তা আলাপ করা যাবে।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.