তিন অক্ষরের মানুষ

ফারজানা সুরভি:

হেনাকে কখনো ওর পুরো নাম জিজ্ঞাসা করিনি। হাসনাহেনা থেকে হেনা এসেছে কি? মাথা নিচু করে হাঁটতো সবসময়। ফাঁটা ঠোঁটের কোণায় বারো মাসের মধ্যে ছয় মাস জ্বরঠোসা। হেনার নিশ্চয়ই খুব জ্বর আসতো। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে ঘেমে যেত। কখনো তার শরীরে ফুলের গন্ধ পাওয়া যেত না। হাসনাহেনার ঘ্রাণ শুধু গাড়ি থেকে নেমে টুকটুক করে হাঁটা ক্রিস্টালের মতো চকচকে মেয়েদের গায়ে থাকে।

মাঝে মাঝে তার চশমার ডাঁটি বেঁকে যেত। তখন সে দুই হাতে চেপে চেপে নিজে নিজে চশমা মেরামতের চেষ্টা করত। আরেকটা চশমা কিনতে গেলেই টাকা খরচ হবে শুধু শুধু। হেনা একদিন একটা কাগজ ফটোকপি করতে দোকানে গিয়েছিল। তখন পাশ থেকে বেশ ভদ্র চেহারার একটা ছেলে বলে, “কাক-ও একটা পাখি। এইটাও একটা মেয়েমানুষ।” চেহারা খারাপ হওয়ার অপরাধবোধে ফটোকপি না করিয়েই সে দোকান থেকে চলে যায় হেনা। রিকশার ভাড়া বাঁচাতে সে হেঁটে হেঁটে টিউশনিতে যেত। রোদে সে দিন দিন আরো কালো হতে থাকে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, এসব কারণেই শুভ তাকে ভালোবাসে না। নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে তার লজ্জা হত। আশেপাশের মেয়েদের পেডিকিউর করা নখে ফ্রেঞ্চ পলিশ। গোড়ালিতে রূপার নুপূর। এইসব সাজগোজ করতে তার লজ্জা লাগত। মনে হত, কোনদিন কেউ বলে বসবে- কাক হয়ে সে ময়ূরের পাখনা লাগাতে চাইছে। শুভ বন্ধুদের সাথে বসে সিগারেট খেতে খেতে কায়দা করে বলত, মেয়েরা তার জন্য যে কোন কিছু করতে রাজি থাকে! উদাহরণ হিসেবে সে হেনাকে দেখাতো। শুধু একটা ফোন! তার একটা ফোন পেলে, ঢাকা শহরের বীভৎস ট্র্যাফিক পার হয়ে মেয়েটা চলে আসবে। এরকম পোষা মেয়ে মানুষ দেখলে পোষা কুকুরের কথা মনে পড়ে। ‘তু তু তু’ করে আঙ্গুল নাচালে ঝাঁপিয়ে পড়বে কুকুর। ভুলে যাবে মালিকের দেয়া সকালের লাথি।

হেনা এইসব দেখে অন্ধ থাকার ভান করতো। সে জানতো, শুভ তাকে ভালো বন্ধু ভাবে। সে মানতো, মাটির পুতুল বালকদের হৃদয় কাড়ে না। মেলার মধ্যে বিক্রি হয় গ্রামের কোন বৌয়ের কাঁচা হাতে বানানো পুতুল। বালক সেই পুতুল ভেঙ্গে ফেলে মেলা শেষ হওয়ার আগেই। শপিং মলে দামি ক্রিস্টালের পুতুল পাওয়া যায়। চকচকে পুতুল। সে পুতুল দেখলে বালকেরা বাড়িতে নিয়ে যায়। পুতুলের মালিকানা দাবি করে। তবু হেনা বসে থাকতো কলা ভবনের সিঁড়িতে। পাশে শুভ। এরকম অনাকর্ষণীয় একটা মেয়ের পাশে বসতে তার লজ্জা লাগতো। কিন্তু হেনার কাছ থেকে মাসের সিগারেটের খরচ আর ফোনের ফ্লেক্সিলোডের টাকাটা নিতে তার ভালো লাগতো।

শুভ একদিন হেনাকে রিকশাতে বসে চুমু খায়। প্রেম ছিল না। প্রতিশ্রুতি ছিল না। তবু চুমু খায়। এই দাবির উৎস হেনার একতরফা ভালোবাসা। সেদিন সারা রাত মেয়েটি পানি খায় নি। পানি খেলে ঠোঁট থেকে স্পর্শ মুছে যাবে। শুভ ক্রমাগত দাবি বাড়িয়ে চলে। হেনা দাবি পূরণ করতে থাকে।

যেদিন শুভ ফেসবুকে বিয়ের ছবি পোস্ট করে, হেনা কাঁদে। এরকমই তো হওয়ার কথা ছিল! তবু মনে হয়েছিল, মানুষ বদলায়। হয়তো শর্তহীন ভালোবাসা শুভকে প্রেমিকে রূপান্তর করবে। ফেসবুকে যুগল ছবিতে ক্রিস্টালের পুতুলের মতো একটি মেয়ে বউ সেজে আছে। ক্রিস্টালের বউয়ের মাথার ঘোমটা মিথ্যামিথ্যি ঠিক করে দিচ্ছে শুভ। এরকম হয়েই থাকে। তবু হেনার কান্না পায়। জোরে কাঁদার মতো তার নিজস্ব ঘর নেই। তাই বাথরুমে কল ছেড়ে কাঁদে। তার ফাঁটা ঠোঁট আরো ফেটে যায়।

পরদিন টিউশনিতে যাওয়ার সময়ে হেনা হাঁটে না। রিকশা ডাকে। নিজস্ব আরামের জন্য টাকা খরচ করতে তার ভালো লাগে। টিউশনি থেকে ফেরার পথে “এই খালি” বলে আরেকটি রিকশা ডাকে। তখন গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দঙ্গল থেকে একজন বলে, “এই কালি! এই কালি”। সেই প্রথম হেনা ঘুরে তাকায়। রিকশার হুড তুলতে তুলতে গালি দেয়, “শুয়োরের বাচ্চা!” গালি শুনে রিকশাওয়ালা চমকে তাকায়। ইস্ত্রি করা সালোয়ার কামিজের কোণা ঠিক করতে করতে সে এবার গালি দেয়, “কুত্তার বাচ্চা!”।

বাসায় ফিরে হেনা ফেসবুকে লগ ইন করে। সে জানে, শুভ বদলাবে না। কয়েক মাস পরেই তাকে মেসেজ পাঠাবে। লিখবে, তার ক্রিস্টালের বউ তাকে কত কষ্ট দিচ্ছে। হেনা ছাড়া তাকে কেউ আসলে কখনো বুঝেনি! হেনা হাসে। হাসতে হাসতে বলে, “সব শালা শুয়োরের বাচ্চা!” সেদিন প্রথম হেনার নিজেকে ভালো লাগে। বাঁকা চশমার ফাঁক দিয়ে সে আয়না দেখে। ক্রিস্টালের পুতুল নয়, আয়নায় সে একটি মাটির পুতুল দেখে। রোদে পুড়ে যাওয়া শক্ত মাটির পুতুল। প্রথমবারের মতো সে নিজেকে ভালোবাসে। ব্যবহৃত হতে হতে নিজের ছায়াকে হারিয়ে ফেলেছিল হেনা। দুই শব্দের একটি গালিতে তার মুখে থুতু জমে। দলা দলা থুতু সে বেসিনে ছুঁড়ে মারে। মানুষের উদ্দেশ্যে।

সে জেনে যায়, মানুষ শব্দটি তিন অক্ষরের। এর ক্ষুদ্রতা মাপতে দুই শব্দের একটি গালিই যথেষ্ট। দুই শব্দের গালি তাকে শক্তি দেয়।

শেয়ার করুন:
  • 764
  •  
  •  
  •  
  •  
    764
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.