যখন বিয়েই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য!

শাহরিয়া দিনা:

ঈদের ছুটিতে পত্রিকায় পড়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে দুইটা ঘটনা বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। প্রথমটা হচ্ছে শ্বশুরবাড়ি যেতে রাজি না, তবু জামাইকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, মাঝপথে ব্রিজ থেকে লাফ দিয়ে সে আত্মহত্যা করেছে। দ্বিতীয়টা হচ্ছে, বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে বিষ হাতে অনশনে বসেছে প্রেমিকা। ছবিও দেয়া হয়েছে তার। প্রেমিক যথারীতি পলাতক। তো এই প্রেমিকার বয়স ১৯ এবং আট বছর তাদের প্রেমের বয়স। মানে কী দাঁড়ালো? ১১ বছর বয়স থেকেই প্রেম শুরু!

১১/১২ বছরে প্রেম বুঝবার বা উপলব্ধি করবার মতো কোন বিষয় না নিশ্চয়ই। তো এতো ছোট থাকতেই কেন তাদের ভাবনা এদিকে ধাবিত হচ্ছে ভাবা জরুরি। খেলাধুলার মাঠ নেই, নেই পর্যাপ্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ। পরিবারে কিংবা আশেপাশে এমন কোন আইডল নেই যা তাকে অনুপ্রাণিত করতে পারে জীবনের বড় অর্জনের দিকে কিংবা ভাবাতে পারে ক্রিয়েটিভ কিছু করার জন্য।

প্রথম ঘটানায় আসি। এক দম্পতিকে জানি তারা ফ্যামিলি লাইফে মোটামুটি সুখী, কিন্তু স্বামী ভদ্রলোক শ্বশুরবাড়ির লোকদের পছন্দ করে না, যেতেও চায় না। প্রতি বছর ঈদ ধরনের উৎসবে তাকে শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে তেল, ঘি, ডালডা, বাটার সবই মাখে একবার পদধূলি দেবার জন্য। উনি শেষমেষ যায় ঠিকই। শ্বশুরবাড়ির লোক হাঁফ ছেড়ে বাঁচে, যাক সমাজের সবাই তো দেখলো জামাই এসেছে! পরে যা হবার হবে। তো ভদ্রলোক গিয়ে হাজারটা ভুল ধরবে, তা নিয়ে সারাবছর কচলাকচলি চলবে, আবার বছর ঘুরে ঈদ আসবে, এইভাবেই চলছে গত ১৭/১৮ বছর ধরে।

আরেক নতুন দম্পতি যারা দু’জনেই ডাক্তার। প্রেমের পর খুব কষ্ট করে দুই পরিবারকে রাজি করিয়েছিলেন বিয়েতে। কিন্তু বিয়ের সময় এমন কিছু বিষয় নিয়ে বিবাদ হলো যে বিয়ের পর থেকে দুই পরিবারের মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এরা পরিবার থেকে আলাদা থাকে। ঈদ বা তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে যে যার বাসায় গিয়ে পালন করে। অর্থাৎ ছেলে ছেলের বাবার বাড়ি, মেয়ে মেয়ের বাবার বাড়ি। তাদের দাম্পত্য জীবন আপাতত সুখের, যদিও এক পরিবারের খবর অন্যজন জানে না।

শ্বশুরবাড়ি একজন যেতে না চাওয়া অস্বাভাবিক নয়, তেমনি নিচ্ছে বলে আত্মহত্যা করতে হবে সেটা স্বাভাবিক তো দূর, হাস্যকর কথা।

দ্বিতীয় ঘটনায় যে ছেলে বিয়ের আগেই পালাতে পারে, সে বিয়ের পর আজীবন দেখেশুনে রাখবে এটা ভাবার জন্য চূড়ান্ত রকম নির্বোধ হতে হয়। ভালোবাসা আছে বলেই মেয়েটা বিষের বোতল হাতে বসে আছে মানলাম, কিন্তু অপাত্রে অমৃতও মূল্যহীন, না বুঝলে বা মানতে না পারলে তার জীবন এমনিতেও শেষ।

স্কুলে এইম ইন লাইফ রচনা সবাই লিখে। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ শিক্ষক হতে চায়, সত্যি কথাটা কেউ লিখে না বোধহয়। আসলে আমাদের দেশের বেশিরভাগের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বিয়ে করা, বিশেষ করে মেয়েদের। সিনেমার মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আচমকা ধাক্কা; মনের মধ্যে লা লা লা সুর বেজে উঠা এমন রোমান্টিক স্বপ্ন দেখা খারাপ কিছু না। কিন্তু বিপত্তি তখনই যখন সবকিছু তুচ্ছ করে এমনকি জীবন বাজি ধরে প্রেম অথবা বিয়ের জন্য।

আমরা মজা করে ছোট বাচ্চাদের আদর করে জিজ্ঞেস করি, বাবু, তুমি কাকে বিয়ে করবা? বাবুও জেনে যায় বিয়ে আমাকে করতেই হবে। বাবু থেকে বুড়ো বিয়ে ফ্যান্টাসিতে ভোগে সবাই। একটু বড় হলে পড়াশোনা শেষে চাকরি পেলেই, আচ্ছা তুমি বিয়ে করছো না কেন? বিয়ে কবে করবা? পছন্দ আছে কেউ? অবধারিত প্রশ্ন ঘুরেফিরে এগুলাই।

বয়স বেড়ে যাচ্ছে বিয়ে করছো না এখনো! কিছু আত্মীয়-পরিচিত এমনভাবে বলবে যেন আজরাইল আপনার দুয়ারে দাঁড়িয়ে, উনারা তা দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু আপনি দেখছেন না। উনাদের অবশ্য প্রশ্ন করে না কেউ যে, আপনি বিয়ে করে কোন মহৎ কর্ম সম্পাদন করেছেন? এবং আপনার জীবন কোন ফুলের বাগান? প্রশ্নের যার দিকে ছুঁড়ে দেয়া হয় সে ভেতরে কুঁকরে যায়। আর্থিক, মানসিক প্রস্তুতি না থাকলেও বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যায়।

আগে প্রেম ছিল লুকিয়ে-চুরিয়ে করার জিনিস, আর আজকাল স্কুল থেকেই বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ড থাকাটা গর্বের ব্যাপার। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ‘বাবু খাইসো’ প্রজন্মের কাছে শো-অফের বিষয়। শহর কিংবা গ্রাম সবখানেই চলছে এই প্রেমের মহামারী। রাজকুমার, ডালিম কুমার বা শাহাজাদী রাজরানীর যুগ নাই তো এরা একেকজন হয় প্রেম-কুমার/প্রেম-কুমারী। প্রেম শাশ্বত সুন্দর। প্রেম করাও খারাপ কিছু নয়, কিন্তু আর সবকিছু ছেড়ে যখন ফার্স্ট প্রায়োরিটি হয়ে ওঠে এই প্রেম, তখন তা ব্যাধি।

জীবন ছোট। এক জীবনে কত কী দেখার বাকি, কত কী করার আছে! নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, সমাজের জন্য, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার মতো। জীবন একটা সফর, আমরা তার পথিক। এখানে আমাদের সঙ্গী হয় অনেকেই। কারও প্রতি থাকে দায়িত্ব-কর্তব্য, কারো প্রতি স্নেহ-মমতা। এখানে মাঝপথে কেউ হারিয়ে যেতে পারে, কেউ গন্তব্য পরিবর্তন করতে পারে, কেউ বা অবিচল ঝড়-ঝঞ্ঝায় থেকে যাবে ছায়ার মতো। হাত ধরে পাশে হাঁটবে। পরিস্থিতি যাই হোক, পথ চলতেই হবে। নিজেকে থামিয়ে দেয়া যাবে না। সময় চিনিয়ে দেবে কে পাশে থাকার যোগ্য, আর কে পরিত্যাজ্য।

একবার কলকাতার এক সাংস্কৃতিকমনা ছেলে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, আচ্ছা বিয়েটা কি জীবনে খুব দরকারি? প্রশ্নটা সহজ, উত্তরটাও খুব কঠিন না নিশ্চয়ই। দেরিতে বিয়ে করে অথবা একদমই বিয়ে না করার জন্য কেউ মরে যায়নি কোথাও, কিন্তু অল্প বয়সে বিয়ে করে অশান্ত দাম্পত্যে থেকে মরেছে, খুন হয়েছে বহুজনে। বিয়ে জীবনের অংশ, কিন্তু বিয়েই একমাত্র লক্ষ্য নয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.