সম্পর্কে ‘স্পেস’ থাকা জরুরি

পলি শাহীনা:

পৃথিবীর নানান প্রান্তে ঘটে যাওয়া ভালো কিংবা মন্দ যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো এখনকার দিনে আমরা খুব দ্রুত জেনে যাই, সামাজিক শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা ফেসবুকের মাধ্যমে। খুব বেশিদিন আগের খবর নয় এটি, কয়েকমাস আগের কথা। সৌদি আদালতে এক নারী বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন। খবরটি গতানুগতিক হলেও কারণটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উক্ত নারী উল্লেখ করেছেন, স্বামীর অতিমাত্রায় ভালোবাসায় তিনি হাঁপিয়ে উঠেছেন। চমকপ্রদ এই খবরটি তখন অনেকদিন ধরে ফেসবুকের নিউজফিডে হামাগুড়ি খেয়েছে। এটিও অতি সাধারণ বিষয় ফেসবুক দুনিয়ায়। যেকোনো চাঞ্চল্যকর সংবাদ কিছুদিন ফেসবুকে দোল খায় বেশিরভাগ মানুষের দেয়ালে, তারপর হারিয়ে যায় নতুন কোন খবরের ভিড়ে। মানুষ অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে এমন একের পর এক বৈচিত্র্যময় সব সংবাদে। এক সংবাদ যাবে, অন্য নতুন কিছু আসবে। অন্য সব প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় সংবাদগুলোর মতো চিরাচরিত নিয়মে আমিও ভুলে গিয়েছিলাম, সৌদি আদালতে দায়েরকৃত চমকপ্রদ খবরটির কথা। এতো এতো টক, ঝাল, মিষ্টি খবরের ছড়াছড়ি চারপাশে, চাইলেও তো সব খবর মনে রাখা যায় না। মস্তিষ্কের তো একটা নির্দিষ্ট ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।

সপ্তাহখানেক আগে নিউইয়র্কের পাশের রাজ্য নিউজার্সিতে এক আত্মীয়ের নিমন্ত্রণে তার বাসায় গিয়েছিলাম। খাওয়া-দাওয়া শেষে আলোকিত দুপুরের গায়ে হেলান দিয়ে, যে যার মতো আনন্দে সময় কাটাচ্ছে গল্প, আড্ডায় মশগুল হয়ে। প্রকৃতির উদাস আমন্ত্রণে আজন্ম প্রকৃতিপ্রেমী আমি তাদের ঘরের পেছনের বিশাল আংগিনায় গিয়ে বসি। প্রকৃতিতে এখন শীত ও উষ্ণতার খুনসুটি চলছে তীব্রভাবে। তাদের গাঢ় খুনসুটির সাথে পাল্লা দিয়ে মানুষগুলো কুলিয়ে উঠতে পারছে না। এই শীত তো এই গরম। সেদিন চমৎকার আবহাওয়া ছিল। স্বচ্ছ নীলাকাশের বুক থেকে যেন রুপা গলে গলে পড়ছিল। রূপার নূপুর পায়ে সবুজ পাতারা ছন্দে ছন্দে দুলছিল। ভ্রমরের গুঞ্জন আর ফুলেদের আদরে বিমোহিত আমি ভালোলাগার দোল চেয়ারে দুলতে দুলতে রুপকথার রাজ্যে হারিয়ে যাই।

নিউইয়র্ক শহরের বাইরের বাড়িগুলোর সামনে-পেছনে অনেক প্রশস্ত জায়গা থাকে। নিউইয়র্কের বাইরে গেলে বাংলাদেশের গ্রামের সবুজ ঘ্রাণ পাই, যে ঘ্রাণ আমি প্রাণভরে উপভোগ করি। প্রায়শই ছেলে-মেয়েকে বলি, বড় হয়ে যেন শহরের বাইরে বাড়ি কিনে নেয়। যে বাড়ির চারপাশ জুড়ে বিশাল জায়গা থাকবে। আমি সেখানে সব্জি, ফলমূলের চাষাবাদ করবো, কবুতর-পাখি পালবো। ওরা আমার কথা শুনে হাসে, কিছু বলে না। তবুও স্বপ্ন দেখি, একদিন নিউইয়র্কের জনারণ্য ছেড়ে নির্জনতায় চলে যাবো।

কবুতর পোষার শখ আমার ছোটবেলা থেকেই। আমাদের ঘরের চতুর্দিকে কবুতরের বাসা ছিল। তাদের বাক-বাকুম শব্দের অনিন্দ্য সুন্দর সুরে রোজ ভোরে ঘুম ভাংতো আমার। মনে আছে, একবার নানু আমাকে উপহার হিসেবে একজোড়া শুভ্র সাদা কবুতর দিয়েছিলেন। নিজের হাতে খড়কুটো দিয়ে পরম মমতায় ওদের জন্য ঘর বানিয়েছিলাম। ছোট্ট বুকের সবটুকুন আদর, যত্নে কবুতর জোড়াকে খাঁচায় পুষেছিলাম। যেদিন মনে হলো কবুতর জোড়া পোষ মেনেছে, সেদিন তাদের খাঁচা থেকে মুক্ত করে দিলাম। খাঁচার দুয়ার খুলতেই তারা উড়ে যায় মুক্ত আকাশে। আমি তাদের পথের দিকে তাকিয়ে থাকি। একসময় উড়ে উড়ে ওরা আমার দৃষ্টির আড়ালে হয়ে যায়। আমি ওদের অপেক্ষায় থাকি। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুপুর পেরিয়ে সন্ধ্যা নামে। ওরা আর ফিরে আসে না আমার কাছে। তবুও আমি আশায় ছিলাম, হয়তো একদিন ভালোবাসার টানে ফিরবে আমার কাছে এই ভেবে। আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। দিন, সপ্তাহ, মাস গড়িয়ে যায়, ভালোবাসার টানে ওরা ফেরেনি। চোখ জোড়া ঝাপসা হয়ে আসে। শৈশবের অবুঝ মনকে প্রবোধ দিয়েছিলাম এই বলে, হয়তো আমার আদর, যত্নে ঘাটতি ছিল। ওদের চাওয়ার মতো করে ভালোবাসতে পারিনি। জীবনের এই বেলায় এসে আজও সে কবুতর জোড়ার ভালোবাসায় আমি একাই হাবুডুবু খাচ্ছি, কিন্তু ওরা আমাকে ভালোবাসেনি। একতরফা ভালোবাসা বড়ই নির্মম। অবশ্য একতরফা কোনকিছুই ভালো নয়। যাই হোক, ওদের উজ্জ্বল চোখগুলো মনের গহীনে এখনো জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।

তেজোময়ী দুপুরের সূর্য ততক্ষণে ম্লান হয়ে পড়েছে। ঝিরিঝিরি শীতল বাতাস বইছে। আত্মীয়ের পোষা কবুতর জোড়ার চোখের গভীর মায়ায় তলিয়ে যাই। তাদের স্থির চোখ জোড়া আমায় চুম্বকের মতোন টেনে নিচ্ছে। কিছু বলতে চাইছে। আমি তাদের চোখের ভাষা বুঝতে মনোনিবেশ করি। পাতা ঝরার দিন এখনও আসেনি, তবুও পায়ের কাছে পড়ে থাকা ঝরা পাতাগুলোর দীর্ঘশ্বাস বুকে এসে বিঁধচ্ছে। পাতা ঝরার দিন সবসময় আমাকে ব্যথিত করে। এই সময়ে নিঃসঙ্গতায় হারিয়ে ফেলি নিজেকে। যে নি:সঙ্গতার নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই।

প্রকৃতির বুকে গভীর প্রশান্তিতে ডুবে থাকা, আর অতীতের স্মৃতি রোমন্থনের সখ্যতায় সম্ভিত ফিরে পাই ভেতরের ঘর থেকে আত্মীয়ের ডাকে। চা খেতে ডাকছেন। ঘরে ঢুকতেই কানে ভেসে এলো কয়েক মাস আগে সৌদি আদালতে দায়েরকৃত ঘটে যাওয়া সংবাদটির কথা। কয়েকজন মিলে পুরনো সে ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে বেশ রসিয়ে গল্প করছেন। চা খাচ্ছি আর তাদের গল্প শুনছি। যে যার মতো যুক্তি দিয়ে কথা বলছেন। আমি শুনছি, ভেতরে প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, কিন্তু কিছু বলতে পারছি না। আমি জানি এঁদের আড্ডায় কথা বলা আর উলুবনে মুক্তা ছড়ানো একই কথা। আমি তাঁদেরকে বহু বছর ধরে চিনি। তাঁদের মন-মানসিকতা জানি। তাঁদের বিশ্বাস যে কোনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেই ছাড়বে, অন্যপক্ষের কথা শুনবে না।

‘কাউকে জ্ঞান বিতরণের আগে জেনে নিও যে তার মধ্যে সে জ্ঞানের পিপাসা আছে কিনা। অন্যথায় এ ধরনের জ্ঞান বিতরণ করা হবে এক ধরনের জবরদস্তি। জন্তুর সাথে জবরদস্তি করা যায়, মানুষের সাথে নয়। হিউম্যান উইল রিভল্ট’ – শ্রদ্ধেয় আহমেদ ছফার এই মহামূল্যবান উক্তিটি সবসময় মেনে চলি আমি।

তাদের যুক্তিগুলো শুনতে শুনতে আমার শব্দগুলো বিশালকার এক ভাবনার সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকে।

বেশ অনেক বছর আগের কথা। তখন আমি কোন ক্লাশে পড়ি তাও মনে নেই আজ আর। আমার দূর সম্পর্কের এক খালা ঢাকায় থাকেন। পেশায় শিক্ষিকা। গ্রামে বাপের বাড়িতে বেড়াতে এলে বিকালবেলা আম্মার সংগে এসে গল্প করেন। একদিন বিকেলে আম্মার সংগে খালার কথাগুলো শুনে ভীষণ ধাক্কা খাই মনে মনে। কথার আগাগোড়া কিছুই বুঝি না। ছোট ছিলাম বলে আম্মাকে জিজ্ঞাসা করার সাহসও পাইনি। কিন্তু প্রশ্নগুলো আমার মনের অন্দরমহলে থেকে যায়।

আম্মার সংগে খালার কথাগুলো ছিল এমন, ‘বুবু মাঝেমধ্যে স্বাধীনভাবে শ্বাস নিতে ছুটে আসি গ্রামে বাপের বাড়িতে। জানেন তো একমাত্র মেয়ের বিয়ে নিয়ে কতটা খুঁতখুঁতে ছিলাম। মেয়ের ব্যক্তিগত পছন্দ ছিল না বলে অনেক ছেলে দেখেছি, বাদও দিয়েছি। অসম্ভব স্বপ্নবিলাসী মেয়েটির জন্য একদিন আমরা রুপকথার ডালিম কুমারের মতো ছেলে পেয়ে যাই। মহা ধুমধাম, হৈ-হুল্লোড়ে বিয়ে হয়। জানি না বুবু, কীভাবে কী হলো? মেয়ে এখন বাসায় চলে এসেছে আমার কাছে। মেয়ের অভিযোগ, জামাই ঘরের কুনোব্যাঙের মতো সারাদিন তার কানের কাছে ঘ্যাংগর ঘ্যাংগর করে। জামাই এর এমন ভাব মেয়ের পছন্দ নয়। জামাই সারাক্ষণ পেছনে লেগে থাকে বাইরের কাজকর্ম ফেলে। একাকি বই পড়তে মেয়ের ভালো লাগে। ঠিক বই পড়ার সময় জামাই এসে বসে বলবে চা খেতে। হয়তো বাবা-মায়ের সাথে মেয়ে কথা বলছে, তখন জামাই এসে চুলে বিনুনি কাটবে। বন্ধুর সাথে শপিং এ যাবে, একটু সময় কাটাবে, তখনও জামাই চায় সংগে থাকতে। রান্নাঘরেও গাব গাছের আঠার মতো লেগে থাকবে। পছন্দের গান শোনা, মুভি দেখতেও পারে না। নিরিবিলি থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করা চুপচাপ মেয়েটার কাছে এগুলো অস্বস্তিকর লাগছে। জামাই’র ভালোবাসার যন্ত্রণায় মেয়ের জীবনে ব্যক্তিগত কোন সময় নেই বললেই চলে। মেয়ের ভাষায় এগুলো ভালোবাসার যন্ত্রণা। ভালোবাসার নামে আসলে এসব শৃংখলেরই নামান্তর। জামাইকে অনেক বুঝিয়েও কোন ফল পায়নি। মেয়ে এমন বন্দিদশা থেকে পরিত্রাণ পেতে একদিন বিকেলে ব্যাগ গুছিয়ে সোজা আমার বাসায় চলে আসে।’

আম্মা একঝলক তৃপ্তির হাসি দিয়ে খালাকে বললেন, এটি তো খুবই আনন্দের বিষয়। জামাই মেয়েকে অনেক ভালোবাসে, যত্ন নেয়। খালা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, কী জানি বুবু, মেয়েতো বলে এসব ভালোবাসার নামে মানুষিক অত্যাচার বৈ তো অন্য কিছু নয়। মেয়ের কথা হলো, সম্পর্কে স্পেস থাকা জরুরি। খালা চা, বিস্কুট খেয়ে বিদায় নিলেন। আমার অবুঝ মস্তিষ্কে ঘুরতে থাকে, সম্পর্কে স্পেস থাকা জরুরি মানে কী? অনেক ভেবেচিন্তেও কোন উত্তর পেলাম না সেদিন।

সে প্রশ্নের জবাব পেলাম বড় হয়ে নিউইয়র্ক শহরে আমার এক পরিচিতার জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে। বছর দশেক আগের কথা। ঝলমলে আলোকিত সকাল। ঘুম ভেংগে রৌদ্রজ্বল আকাশ দেখছি আর চা খাচ্ছি। লাটিমের মতো ঘুরে ঘুরে শূন্যে ভেসে ভেড়াচ্ছে পাখীদের দলবদ্ধ সারি। এমন স্নিগ্ধ সুন্দর সকালে হঠাৎ চোখে পড়লো, চোখ মুছতে মুছতে এলোমেলো হেঁটে যাওয়া সুমি আপার দিকে। তার মন খারাপ আমাকে ছুঁয়ে গেলো। হাসিখুশি, প্রাণবন্ত সুমি আপাকে এমন বিধ্বস্ত দেখতে পেয়ে বাসায় ডাকলাম চা খেতে। সেই ছোটবেলায় দেখা মা-খালার মতো আমিও চা, বিস্কুট নিয়ে সুমি আপার সংগে গল্প করতে শুরু করলাম।

তার চোখগুলো লাল, ফোলা। স্পষ্ট বোঝা যায় অনেক কেঁদেছে, সারা রাত ঘুমায়নি। সকালে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফিরছেন৷ উনি খুব সুন্দর করে গুছিয়ে কথা বলেন। আমি তার কথা শুনতে ভালোবাসি। খুলনার মেয়ে সুমি আপার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার সূত্র তার এমন মোলায়েম কন্ঠস্বর। অবশ্য, এই সুন্দর করে কথা বলাও নাকি আজ তার অশান্তির কারণ। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সুমি আপা নিজেই বলতে লাগলেন, ‘কখনও সখনও সুন্দর হওয়াটাও মেয়েদের জীবনে অভিশাপ বয়ে আনে। বিয়ের পর বেশিরভাগ মেয়েরাই চরম অবহেলা করে থাকে নিজেকে। নিজের শখ, আহ্লাদ, ভালোলাগা কিছুই যেন আর মূল্য পায় না বিয়ের পর। একসময় গলা ছেড়ে গান গাইতাম, ছেড়েছি। বই পড়া ভুলে গেছি। বাগান করার শখ ছিল, সময় পাই না। নিজের পছন্দের খাবার কবে রেঁধেছি মনে নেই। বেড়াতে যাওয়া সে তো স্বপ্নের মতো। নিজের আত্মাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। মন বলে যে কিছু আছে তাও ভুলে গেছি। দায়িত্বের নিচে চাপা পড়ে নিজেকে হত্যা করেছি। এখন মনে হয় বিয়ে মানে নিজেকে হত্যা করার প্রজেক্ট ছাড়া আর কিছু নয়। ‘

তার কথাগুলো শুনে তাজ্জব বনেে যাই। প্রশ্ন করি এভাবে কেন ভাবছেন? সুমি আপা আবার বলতে শুরু করেন, ‘বাচ্চা, সংসার নিয়ে অনেকগুলো বছর গৃহবন্দী হয়েই কাটিয়ে দিলাম। বিদেশে বাবা-মা, আপনজন বলতে তো কেউ নেই পাশে। বাচ্চারা এখন বড় হয়েছে। তোমার হারুন ভাই ১৬/১৭ ঘন্টা কাজ করেন। আমার সংগে প্রয়োজনীয় কথা বলারও সময় পায় না। অবসর সময়ে বুকের গহীনে ছোটবেলার শখ গান গাওয়া মাথা চাড়া দিয়ে উঠে। গান গাইতে মাঝেমধ্যে বের হই। বলতে পারো এটি ব্যক্তিগত ভালোলাগার বিষয়। নিসঙ্গ জীবনে বেঁচে থাকার আশ্রয়। গতকাল এক বন্ধুর সংগে গান গাওয়ার প্রসংগে কথা বলছিলাম দেখে সে রেগে যায়। অশালীন মন্তব্য করে। ঘর এবং বাইরের কাজ ছাড়া বাকি সবকিছুই খারাপ তার কাছে। তার ভাষায়, বিয়ের পর আমার ব্যক্তিগত জীবন বা ভালোলাগা বলে কিছুই থাকতে পারবেনা। ভীষণ হাঁপিয়ে উঠে গতরাতে বলেছি, প্রতিটি মানুষের জীবনে নিজের সময় থাকা জরুরি। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। এই একঘেঁয়ে চরম স্বাধীনতাহীন জীবন আর চাই না।’

সুমি আপার এমন বিঃধ্বস্ত অবস্থার যন্ত্রণাকাতর কথাগুলো শুনে আমার ছোটবেলার সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলাম। সুমি আপা বিদায় নেন। তাঁর চলে যাওয়ার পথের দিকে নির্বাক আমি চেয়ে থাকি।

সৌদি আদালতে দায়ের করা ওই নারীটির মামলা মোটেও অযাচিত ছিল না। এটিই বাস্তবতা। অতিরিক্ত কোন কিছুই ভালো না। ভালোবাসা বা যে কোন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্য। ভালোবাসার বাড়াবাড়িও যন্ত্রণায় রুপ নেয়। পোলাও-মাংস খুব প্রিয় হলেও প্রতিদিন খেতে ভালো লাগে না। কোথায় যেন পড়েছিলাম, প্রিয়জনের সব কথা জানতে নেই, বিশেষভাবে যে কথা জানলে পরে কষ্ট হবে, সম্পর্কে অবনতি ঘটবে, সে কথা না জানাই শ্রেয়। প্রতিটি মানুষ আলাদা। তাদের ভালোলাগা, পছন্দগুলোও আলাদা হয়। দুই মেরুর দু’জন মানুষ যখন একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করেন, তাদের উচিৎ একজন আরেক জনের ভালোলাগা, ভালোবাসা, পছন্দের বিষয়গুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, আলাদা সময় বের করা। কেউ কারো ব্যক্তিগত সময়ে হস্তক্ষেপ না করা। একজন মানুষকে বাইর থেকে যতটা দেখা যায় সে আসলে ওইটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, নিজের জগতে সে একজন উজ্জ্বল, সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মানুষ।।

মানুষের ব্যক্তিগত দিকগুলোর পরিচর্যার জন্য নিজের একান্ত সময় প্রয়োজন। মানুষ রহস্যময় জীব। মানুষের মনের অবস্থা পরিবর্তন হয় দ্রুত। একজনের মনের উপর আরেক জনের হাত নেই। সবকিছুই একটা নির্দিষ্ট সময় পর ঠিক হয়ে যায়। সময় দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম ওষুধ। আর এই ঠিক হয়ে যাবার জন্য তার নিজস্ব সময় খুব দরকার। এককথায়, যে কোন সুন্দর, মসৃণ সুসম্পর্ক রক্ষায় ‘স্পেস’ থাকা অতীব জরুরি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.