ইসলামের শত্রু কারা?

শান্তা মারিয়া:

দক্ষিণ এশিয়ায় সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়ে একটা প্রবন্ধ লেখার অনুরোধ জানিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বাংলাদেশের কথা ভাবতেই চোখে ভেসে উঠলো কতগুলো খবর। খবরগুলো ‘খুব গুরুত্বপূর্ণ’ বলে বিবেচিত হয় না কখনও। সাধারণ পত্রিকার মফস্বল পাতায় এক কলাম দুই ইঞ্চি জায়গা পায় কি না পায়, সেগুলো হলো প্রতিমা ভাঙচুরের খবর। প্রতিমা ভাঙচুরের খবর দেখলেই বুঝতে পারি দেশে দুর্গা পূজা আসন্ন। আর কিছু খবর পত্রিকায় বা মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় দেখা যায় না। এগুলো শুধু চোখে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সনাতন ধর্মের অনুসারী বন্ধুদের টাইমলাইনে দেখা যায় কিছু ছবি। মন্দিরের সামনে কে বা কারা কোরবানির গরুর হাড় গোড়, বর্জ্য, রক্ত ইত্যাদি ফেলে রেখে যায়। কখনও কখনও মন্দিরের ভিতরে ঢুকে প্রতিমার গায়ে এসব ফেলে, কখনও ফেলে দেবীর থানে। এসব পোস্টের নিচে মুসলমান বন্ধুরা যখন মন্তব্য করেন তখন প্রায়শই এগুলোকে ঘৃণা জানান। অনেকেই বলেন, এরা প্রকৃত মুসলমান নয়।

আমিও এরকম মন্তব্য করি। করে বিবেকের ভার লাঘব করার চেষ্টা করি। মনে প্রশ্ন জাগে, এরা যদি প্রকৃত মুসলমান না হয়, তাহলে ‘প্রকৃত মুসলমান’ কারা? যারা ‘প্রকৃত মুসলমান’ বলে নিজেকে মনে করছেন তারা কি এদের ‘অপ্রকৃত’, ‘অপ্রকৃতিস্থ’, মুসলমান বলে কখনও ঘোষণা করেছেন? তারা কি কখনও বলেছেন, যারা প্রতিমা ভাঙে, যারা সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন করে, যারা সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দেয়, তাদের সঙ্গে আত্মীয়তা করবো না, তাদের সঙ্গে পাশাপাশি নামাজ পড়বো না, তাদের বাড়িতে খাদ্য পানীয় গ্রহণ করবো না? তাহলে কেমন প্রতিবাদ জানালেন? কেমন আপনি প্রকৃত মুসলমান হলেন?

ইসলাম ধর্ম কী এটা জানার জন্য মহানবীর (স.) বিদায় হজের ভাষণটি পড়লেও চলে। সেখানে স্পষ্টভাষায় ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেখানে শান্তিতে থাকা (যুদ্ধরত নয়) অন্য ধর্মের মানুষদের নিরাপত্তা বিধান করার কথা বলা হয়েছে। সেখানে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হযেছে।

কিন্তু একজন অমুসলিম কখনও আপনার বাড়িতে ঢুকে আপনার কিতাব পড়বে না। তিনি দেখবেন আপনার আচরণ। দুনিয়া কখনও ইসলামের আসল বিধান দেখতে আসবে না, দেখবে মুসলিমের আচরণ।

আপনার আচরণ যদি হয় প্রতিবেশির উপাসনালয় ধ্বংস করা, প্রতিবেশির বাড়িঘরে আগুন লাগানো, মন্দিরে ঢুকে প্রতিমা ভাঙচুর, দেবীর থান আর অন্যধর্মের মানুষের পবিত্রস্থানে গরুর বর্জ্য ফেলা, নোংরামি করা, তাহলে আপনার ধর্মগ্রন্থে মানবতার যতবড় বাণীই থাকুক না কেন কারও কিচ্ছু আসে যায় না। নির্যাতিত মানুষ আপনাকে একজন ‘মুসলমান’ হিসেবেই গালি দিবে। গালি দিবে ইসলামকে। তাহলে ইসলামকে গালি খাওয়ানোর এই ‘মহৎ’ কর্মটি আপনি করলেন বলে অনায়াসে অন্তরে প্রভূত শান্তি লাভ করতে পারেন।

বাংলাদেশের সাধারণ সংখ্যাগুরু মানুষ কতটা সাম্প্রদায়িক সেটার একটা উদাহরণ দেই। সত্তর ও আশির দশকে আমার শৈশব কেটেছে। তখন প্রায়ই শুনতাম আমাদেরই খেলার সাথী সনাতন ধর্মের কোন শিশুকে অন্য ছেলেমেয়েরা গরুর মাংস খাইয়ে দিয়েছে। শিশুটিকে বলেছে ‘মুসলমান না হলে তোকে খেলায় নিবো না। তুই গরুর মাংস খা তাহলে তোর সঙ্গে খেলব।’ প্রায় প্রতি মাসেই একটি বা দুটি এমন ঘটনা ঘটতো। পাড়ায় এমন ঘটনা ঘটলে তেমন কোন সালিশ বিচার হতো না। স্কুলে ঘটলে শিক্ষক অপরাধী শিশুদের অভিভাবককে ডাকতেন। ধমকটমক দিয়ে ছেড়ে দিতেন। কোথাও অপরাধীদের স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে শুনিনি। তার মানে এটাকে গুরুতর কোন অপরাধ বলে ধরাই হয়নি। এতো গেল শিশুদের কথা। বড় বয়সে, চাকরিতে ঢুকেও দেখেছি কোন হিন্দু সহকর্মীকে(নারী হলে তো কথাই নেই) কৌশলে, লুকিয়ে গরুর মাংস খাওয়ানোর মতো ইতরামি করতে। আবার কখনও কখনও সেই সহকর্মীকে গেরুর মাংস খেতে প্ররোচিত করতেন অনেকে। ‘কি হবে, খাও না’ ‘আরে খেলে কিছু হয় না’, ‘আপনি তো আধুনিক মানুষ বলে জানতাম, একটুকরো খেয়ে দেখুন কত মজা’ ইত্যাদি মন্তব্য তো প্রায়ই করতে শুনেছি। যারা এইসব মন্তব্য করে, তাদের সবসময় বলতাম, ‘আপনাকে যদি কেউ শুয়োরের মাংস খাওয়ায়, বা খাওয়ার জন্য প্ররোচিত করে, আপনার কেমন লাগবে?’

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুর উপর নির্যাতন হচ্ছে, তারা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে একথা যদি প্রিয়া সাহা বা অন্য কেউ বিদেশে গিয়ে বলে, তখন আমাদের খুব গায়ে লাগে। আমি নিজেও প্রিয়া সাহার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছি। কিন্তু সত্যিই যে সংখ্যালঘুরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে, সেকথা কি আমি অস্বীকার করতে পারি? শাক দিয়ে মাছ আর কত ঢাকবো? ৩১ শতাংশ থেকে সংখ্যালঘুরা কেন ৮ শতাংশ হয়ে গেল, সে সত্যের দিকে কত আর চোখ বন্ধ করে থাকবো? জেগে জেগে আর কত ঘুমাবো? আমি নিজেও আন্তর্জাতিক অনেক সেমিনারে বলেছি, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। কিন্তু বিদেশে নিজের দেশ বিষয়ে ভালো ভালো কথা বললেই কি দেশপ্রেমের সবটুকু পরিচয় দেয়া পরিপূর্ণ হয়? আমি নিজে যদি এদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এতটুকু ভূমিকা না রাখি, একটুও প্রতিবাদ না করি তাহলে কীসের আমি দেশপ্রেমিক হলাম?

এদেশের সংখ্যালঘুরা যদি সম্প্রীতির স্বর্গেই থাকবেন তাহলে তারা দেশ ছেড়ে যাচ্ছেন কেন? শখে, ঠ্যালায়, ঘুরতে? ছলে, বলে তাদের সম্পত্তি দখল করা হচ্ছে না একথা কি অতি বড় ভণ্ডও স্বীকার করতে বাধ্য নন?

আমি নিজে একজন প্র্যাকটিসিং মুসলমান। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি, কোরআন শরীফ পড়ি, কোরবানিও দেই। কিন্তু আমার তো কোনদিন মন্দির, মসজিদ, গির্জা বা কোন উপাসনালয় ভাঙচুর করার, নোংরা করার ইচ্ছা জাগে না। কখনও তো মনে হয় না গরুর হাড়গোড় নিয়ে মন্দিরের সামনে ফেলে আসার। যার যার ধর্ম সে সে পালন করুক। সমস্যা কোথায়? অন্য সম্প্রদায়ের মানুষকে গালাগাল করে, অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়ে, তার ধর্ম নষ্ট করার সুচতুর কৌশল করে কি আপনি কাউকে মুসলমান বানাতে পারবেন? বরং আপনার মানবিক সুন্দর আচরণ দেখে অন্য ধর্মর কেউ মুসলমান হতে চাইলেও হতে পারে।

বাংলাদেশের মানুষের আরেকটি প্রবণতা আছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর কোন নির্যাতনের কথা বললেই তারা বলেন, ‘ভারতের মুসলমানের তুলনায় এদেশের হিন্দুরা অনেক ভালো আছে’। এই তুলনাটা কেন? ভারতের মুসলমানরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন বলে কি এদেশের হিন্দুদের উপর নির্যাতনটা জাস্টিফায়েড হয়? নাকি এদেশের হিন্দুরা রাতের আঁধারে ভারতে গিয়ে তাদের মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালিয়ে চুপি চুপি আবার এদেশে ফিরে আসে? ভারতে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হলে সেটা ভারতের সমস্যা। বাংলাদেশের নয়। মুসলিম ব্রাদারহুডের কারণে যদি আপনার মন খারাপও লাগে তাহলে সেটার প্রতিবাদ করুন। কিন্তু অন্য দেশে মুসলমান নির্যাতনের শিকার হচ্ছে বলে আপনি নিজের দেশের সংখ্যালঘুর কোনরকম অধিকার হরণ করতে পারেন না। এটুকু যুক্তি পাগলেও বোঝে, কিন্তু আপনি বোঝেন না।

আমি যদি বলি, আপনি যখন মন্দিরে গিয়ে গরুর বর্জ্য ফেলেন, যখন প্রতিমা ভাঙচুর করেন, যখন হিন্দুদের গালি দেন, অমানবিক আচরণ করেন, তখন একজন মুসলমান হিসেবে আমি লজ্জা বোধ করি, আপনি আমার ধর্মানুভূতিতে আঘাত করেন তখন আপনি কি জবাব দেবেন? আপনার বর্বর আচরণের কারনে সারা বিশ্বে মুসলিমরা ছোট হয়ে যায়। আপনার জঙ্গীবাদের কারণে সারা বিশ্বে ইসলাম নিন্দিত হয়। আপনার কুআচরণের কারণে সারা বিশ্বে ইসলাম একটি বর্বর, জংলি ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়। আপনি যদি অশান্তি সৃষ্টি করেন তাহলে ‘ইসলাম শান্তির ধর্ম’ বলে গলা ফাটালেও কেউ সেটা বিশ্বাস করে না। করতে পারে না।

একজন মুসলমান হিসেবে, ইসলামের একজন অনুসারী হিসেবে আমি আপনাকে ইসলাম অবমাননার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাই। আপনিই ইসলামের শত্রু। যে ইসলামের নামে অন্য ধর্মের মানুষকে হত্যা করেছে, ইসলামের নামে সমাজের শান্তি বিনষ্ট করেছে, ইসলামের নামে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের উপর নির্যাতন চালিয়েছে, নিজের পরিবারের ও সমাজের নারীর উপর নির্যাতন চালিয়েছে, শিশুদের মধ্যে সা্ম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়িয়েছে তারা প্রত্যেকেই ইসলামের শত্রু।ইসলাম অবমাননার অভিযোগে আমি আল্লাহর দরবারে আপনাদের নামে বিচার দিলাম। আমি বিশ্বমানবতার কাছে, সকল মুসলমান ভাইবোনের কাছে আপনাদের প্রতিহত করার আহ্বান জানালাম।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.