পেট্রো-ডলার যখন মানুষকে একাকি করে দেয়!

ফাহমিদা জেবীন:

“সময়-ই টাকা, টাকা-ই সময়”– পুঁজিবাদের এই মূলমন্ত্র আত্মস্থ করতে গিয়ে আজ আমরা সোশ্যাল স্ট্যাটাস কিনতে চাই ডলার দিয়ে। সেই পথের সাধক হয়ে কুটিলত্ব আয়ত্ব করতে করতে অচল থেকে অতি সচল হয়ে এক সময় খুব সহজেই অর্জন করে ফেলি অন্যের পিঠে ছুরি বসানোর সুক্ষ্ম বিদ্যা। যেখানে আমরা আমাদের এই সুক্ষ্ম কুকর্ম গুণে অন্যের ভালোবাসা, বিশ্বাস আর আস্থার জায়গাটিতে বিষ গুলে দিয়ে নিজেরাই নিজেদের (নিজ জাতির) সাথে কন্ট্রাডিক্ট করি। অন্যের কাঁধে পা রেখে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখি। আমরা এখন আর আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পাই না। কারণ আমাদের ঘরের আয়নাগুলোর অবস্থান এখন গুদাম ঘরে। ফলে খুব সস্তা মূল্যেই সোশ্যাল স্ট্যাটাসকে ক্রয় করে পকেটে পুরতে পারছি।

বেঁচে থাকার জন্যে বিশেষ করে ভালো থাকার জন্য টাকার প্রয়োজন আছে বৈকি। কিন্তু সে অংকটা কি আনলিমিটেড? যার জন্য আবেগের রোলার কোস্টারে দোদুল্যমান কিছু অসহায়, নিষ্পেষিত মানুষকে বলি দিয়ে দিতে হয়? সুখ কেনার নেশায় মত্ত হয়ে যেকোনো পথে, যেকোনো মূল্যে সুখ কেনা চাই। আর এভাবে আমাদের আত্মা কলুষিত হতে হতে শয়তানের হাতেও সস্তা দরে বিক্রি হয়ে যায়। তারপর একদিন ভুলেই যাই অনন্তযাত্রার কথা। ভুলে যাই সেই যাত্রার পথে থাকবে না কেউ, থাকবে না কিছু। থাকবে শুধু ছাই কিংবা সাড়ে তিন হাত মাটি। এ নিয়ে বলতে গেলে অবশ্য একটা বই লেখা শেষ হলেও কথা ফুরাবে না। তাই আসল কথায় আসি।

পত্র-পত্রিকা বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার আশীর্বাদে রিজেন্ট হাসপাতালের তথাকথিত “লিজেন্ড” তথা পরিচালক সাহেদ করিমের বর্তমান করুণ পরিণতির কথা প্রায় এর মধ্যে সকলেরই জানা। যার অতীত ও বর্তমান জীবনের ‘তুলনামূলক পার্থক্য’ স্পষ্ট করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে সব বয়ান করে যায়। মানুষ সব ভুলে গিয়ে সবাইকে টপকিয়ে তালগাছ হয়ে যেতে চায়। যেখানে তাকে সাধারণেরাতো ছুঁতে পারেনা ঠিকই কিন্তু তার কর্মফল? মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই কর্মফল বেটা কিন্তু কোনভাবেই পিছু ছাড়েনা।

আব্বা মারা গেলেন, পাশে পেলেন না পুত্র সাহেদকে। বউটিও চলে গেলেন। আর বড় বড় তারকা, সাংবাদিক, নেতা-নেত্রী কেইবা আছে আজ তার। সেকি তবে পেরেছে টাকায় নিজের ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে? যুগে যুগে ইতিহাস পর্যালোচনা করতে দেখা যায়, টাকার জন্য যে মানুষ পশুর চেয়ে অধমের খাতায় উঠে আসে, তার শেষ পরিণতিটা হয় ঠিক এভাবেই- ঘৃণা, ঘৃণা আর ঘৃণায়।

তবে এটা ঠিক যে, ইচ্ছা করার সাথে সাথে যারা পান না, তারা স্বাভাবিকভাবেই নিজের চাহিদার লাগাম টানতে শিখে যান। যার মধ্যদিয়ে তিনি শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতম হয়ে উঠেন। আর সামর্থ্য থাকার পরেও যদি কেউ সেই লাগাম টানতে পারেন তবে তো কথাই নেই। সেখানেই জিতে যায় মানবতা। ‘প্রয়োজন’ আর ‘দরকার’ এই দুটোর তফাৎটি বোঝার বোধ অবশ্য অনেক শিক্ষিতেরও থাকে না। তাই তাদেরও অনেক সময় সব মিলিয়ে সবকিছু হয়ে যায় লাগামহীন। কিন্তু এই লাগামটিকে মাঝে মাঝে টেনে ধরে অসহায় মানুষগুলোকে সহায় করার মতো নির্মল আনন্দ আর কী হতে পারে!

সাহেদ কে, কী ছিল, কী করেছে, কেনই বা করেছে এ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন, বলছেন। বলাটাই যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু আমি অবশ্য ব্যক্তি সাহেদকে নিয়ে নয়, বরং তার কর্মফল তথা তার জীবন থেকে শিক্ষা নেবার বিষয়টি নিয়ে মূলত বলতে চাইছি। কারণ তাকে নিয়ে আর নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছি না। কেননা মল-মূত্র ঘাটলে কেবল দুর্গন্ধই ছড়ায়।

ইতিহাস, প্রকৃতি বারংবার আমাদেরকে ভুলগুলো শুধরানোর সুযোগ করে দেয় মূলত এই সাহেদদের দিয়ে। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মানুষের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিলেন যে, “মানুষ সেই প্রাণী যে কিনা দেবতা নয়, আবার পশুও নয়”। আমরা মানুষ, দেবতাতো হতে পারবো না; তবে পশু হয়ে যাবো তাই কী করে হয়?

পবিত্র কোরআন মাজিদে একটি আয়াতে বলা হয়- “নিশ্চয়ই আপনার রব কিছুই ভুলেন না”। সৃষ্টিকে আহত করে মানবতার মূলোৎপাটন করে মানব কখনোই মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। আর এক্ষেত্রে ভয়ংকর কথাটি হলো, আঘাতপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি সময়ের মলমে সবকিছু ভুলে গেলেও তার রব কিন্তু কিছুই ভুলেন না। উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ, বাক্যের অডিও-ভিডিও রেকর্ড তাঁর কাছে মজুদ। তাই প্রতিশোধ যদি বান্দা নিত, তবে আর কতটুকুই বা নিত! কিন্তু শাস্তি যখন প্রকৃতি প্রদত্ত হবে, তবে তা নিশ্চয়ই কঠোর! তাই একান্তভাবেই চাই, সৃষ্টির সেবার মধ্য দিয়ে স্রষ্টার সেবার পথ খুঁজে নিয়ে “মানব” হয়ে উঠুক “মানুষ”। যে কিনা ওপারে গিয়েও সব পেশা, বয়স ও ধর্মের অনুসারী মানবমনে রাজত্ব কায়েম করে বেঁচে থাকবে তার কীর্তির মাঝে। যেখানে যুগে যুগে পৃথিবীকে অশান্ত করে তোলতে আর সাহেদেরা জন্ম নিবে না; জন্ম নিবে মানবিকতা! তাইতো বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বলিষ্ট কন্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল –

“আরতির থালা, তসবির মালা আসিবেনা কোন কাজে। মানুষ করিবে মানুষের সেবা, আর সবকিছু বাজে”।

ফাহমিদা জেবীন
E-mail: [email protected]

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.