লেবাস

ফাহমিদা খানম:

মুখে নিজেদের নির্লোভ বলা আর জীবনের সবক্ষেত্রে সেটা মেনে চলার মাঝে এখন আলোকবর্ষ দূরত্ব, কীসের লোভ নাই আমাদের? অর্থের লোভ, ক্ষমতার লোভ, নিজেকে উপরে উঠানোর লোভ, নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে নিশ্চিত জীবনের নিরাপত্তার লোভ! অথচ এই লোভের থাবায় অন্যদের যে পথে বসিয়ে দিচ্ছি সেইসব বোধ মনে হয় সেঁকেলে হয়ে যাচ্ছে!

এতো নৈরাজ্য, মূল্যবোধের অবক্ষয়, অনাচার দেখে দেখে নির্বিকার থাকার অসাধারণ মন্ত্রটা জানা নাই বলে অসম্ভব বিরক্ত হই, রক্তের মধ্যে কিলবিল করে প্রতিবাদের শুঁয়োপোকা, কিন্তু মুখ খুলতেও ভয়, যে দেশে আত্মপ্রচারের লোভ মানুষকে পেয়ে বসে তাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না আর যেখানে টাকা দিয়ে সবকিছু সহজলভ্য হয় সেখানে মানুষ বুঝে টাকা হলো টাকা ,তা সেটা যেভাবেই আসুক না কেনো!

চারদিকে তাকালে ভয় লাগে – অন্যকে ঠেলে ফেলে নিজেকে উপরে নিয়ে যাবার প্রতিযোগিতায় সবাই ছুটছে, যোগ্যতার মাপকাঠি হয়ে গেছে গৌণ। কী শিখছে, কী নিচ্ছে পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের থেকে? আত্মপ্রচারের লোভ আর নিজের সত্ত্বাকে বিকিয়ে কীভাবে উপরে উঠতে হবে এই তো! দিনে দিনে কি আমরা অনুভূতিহীন, অসাড় হয়ে যাচ্ছি না? যখন কেউ এই জেনারেশন নিয়ে বাজে কথা বলে আমি খুবই অবাক হই, কারণ পুরাতন পৃথিবীর চশমা পরে বিচার করার আগে আয়নায় নিজেদের দেখি কি আমরা? আমাদের দ্বৈত সত্ত্বা কি ওদেরকে বিভ্রান্তিতে ফেলেনি? বইয়ে পড়েছে এক, বাস্তবে জেনেছে আরেক – আমরা কি ওদেরকে সঠিক শিক্ষাটা দিতে পেরেছি? ন্যায়-নীতি, নৈতিকতা বোধ থাকাটাও এখন অন্যায়, একটা বিশাল অংশের মাঝে ভয়াবহ পচন ধরেছে — সেখানে মানসিক সুস্থতা মানে ঠগ বাছতে গা উজাড়।

লেখক: ফাহমিদা খানম

এখন প্রায় মানুষই স্বার্থের কঠিন চাদরে নিজেকে মুড়িয়ে চলে, নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা, বিবেকের চাইতেও স্বার্থপরতা সবার সিনায় সিনায় প্রবাহিত হয়। আগে মানুষের দ্বৈত চেহারা ছিলো – এখন যে কয়টা সে নিজেও জানে না, আমি তো চারপাশে লেবাসধারী দেখি – মানুষ কই? সৎ, সাহসী, নির্মোহ মানুষ খুঁজে বেড়াই, কিন্তু সবাই কৃত্রিমতার ভারে নুইয়ে পড়া। পোশাক – আর কথাবার্তায় নয় সত্যিকার অর্থে আদর্শ মানুষ কই? চিন্তা –ভাবনা, মননশীলতায় কতোটা আধুনিক হতে পেরেছি আমরা?

আমি তো দেখি ধর্মান্ধতা আর গোঁড়ামিতে ভরা মানুষ! এরা দিব্যি নিজের সবকিছুই অন্যের উপরে চাপিয়ে দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে – নিজের বাইরে এদের জগত নেই, মানুষ নেই, ধর্ম নেই অথবা স্বীকার করতে আগ্রহী না, আর যাই হোক এটাকে নিশ্চয়ই আমি এগিয়ে যাওয়া বলতে পারছি না। কিছু মানুষের চিন্তার জগতটা ক্রমশই ছোট হচ্ছে – পরিধি হয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র ধর্মকেন্দ্রিক যেখানে মানবিকতা বড় গৌণ। মানুষ হলো মানুষ এটাই কি পরিচয়? মানুষ হওয়া কি এতোই সহজ? দুর্ভাগ্যের ব্যাপার এদেশে কেউ মানসিক সুস্থতা নিয়ে ভাবে না, কথাও বলে না, অথচ এটার ভয়াবহতা বুঝতে পারছি কি? যে মানুষ দুর্নীতি নিয়ে বড় বড় কথা বলছে – সেই মানুষগুলোর সত্যিকার মুখোশ খুলে পড়ার পর বিস্ময় বা হতবাকের ক্ষমতাও আর থাকে না, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এতো ভয়াবহ নির্লজ্জতা দেখে ভয়ে কুঁকড়ে যাই। যে দেশে চামচামি করে অযোগ্যরা লেবাস পরে নিজেদের আখের গুছানোর ধান্ধায় থাকে সেই দেশের পচন শুরু হয়েছে অনেক আগেই, দুইদিন পর পর শুধু একেকজনের উপরের খোলস ভেঙ্গে পড়ে মাত্র!

বুদ্ধি -বিবেচনা বিবেকের চাইতেও স্বার্থপরতা এখন সবার, সভ্য মানুষ নিজের স্বার্থে সবকিছুই করতে পারে, এমনকি নিজের দেশকে ছোট করতেও তাদের বিবেকে বাঁধে না –সেই বোধই এদের নাই, কষ্ট লাগে আমাদের আগের জেনারেশন নিজেদের জীবন তুচ্ছ করে আমাদের স্বাধীনতা দিয়েছে আর এসব কুলাঙ্গারদের জন্যে আমাদের সেই পরিচিতি ভিন্নভাবে হচ্ছে — অকৃতজ্ঞ এসব মানুষের কাছে দেশ তাদের মা নয়, তাই পারে দেশের সম্মান বিকাতে।

এখানে মন খুলে কিচ্ছু বলা যায় না – ভিন্নধর্মী বন্ধু মারা গেলে মন খারাপ করে স্ট্যাটাস দিলে কিছু মানুষ নিজ দায়িত্বে এসে গালিগালাজ করে যায়, এতো নীতিবানদের দেশে কেউ তার ব্যক্তিগত মতবাদ জানালে সে নাস্তিক হয়ে যায় – এই এক ফেসবুকে এতো এতো জ্ঞানী আর নীতিবান মানুষ আছে যা অন্য কোথাও আছে কিনা সন্দেহ! এই দেশে কিছু মানুষ টাকার জন্যে নিজেকে বিকায় সাথে বিকায় মুল্যবোধ আর মানবিকতা আর এখানে টাকা থাকা মানেই সে সম্মানীয়, তা সেটা যে পথেই আসুক না কেন! সবাইর সহনশীলতা আশ্চর্যজনক কমে গেছে, কেউ কিছু পুরোটা না জেনে না, বুঝেই হয়ে যাচ্ছে বিচারক! মূল্যবোধের এতটা অবক্ষয় হইছে যে, কিছু মানুষ নিজেদের স্বার্থেই অন্যদের ক্ষতি করেও লজ্জিত হয় না, বরং তাদের দুনিয়া শুধুই আমি কেন্দ্রিক — তাদের টাকার উৎস দেখলে মনে হয় অমরত্বের সন্ধান পাওয়া মানুষ এরা। অন্যদের হক মেরে, নিজের ভাগ্যটা বদলাতেই যেনো জন্ম তাদের, দেশ সেবার কথা দূরে থাক এখন সবাই-ই নিজেদের আখের গুছাতেই ব্যস্ত।

সৎ, নির্মোহ, আদর্শ মানুষ খুঁজে বেড়াই যাকে দেখে এই জেনারেশন অনুপ্রাণিত হবে – চারদিকে এখন চোরের মা আর চোরদের জয় জয়কার, সবখানে তাদের নিয়ে স্তুতি চলে — দক্ষ নাট্যমঞ্চে একের পর এক পর্দা উন্মোচন হয় আমরা জনগণ মুগ্ধ হয়ে দেখি – কিছু বলার উপায় পর্যন্ত নাই! একটা ঘটনার রেশ হতে না হতেই আরেকটা সামনে এসে পড়ে আর আমরাও নতুন খবরের অপেক্ষায় থাকি, কোনোকিছু দাগ কাটলেও প্রতিবাদী হবার পথ সিলগালা করেই বন্ধ, তাই হয়তো কারও মধ্যে আর সহিষ্ণুতা দেখি না – সবাই সবকিছু জানে, সবাই বিচারক, কিন্তু কেউই কিছু শিখতে আর নিতে রাজি না। দয়া, মানবিকতা, উদারতা – এসব দূরে কোথাও লজ্জায় নির্বাসনে গেছে, অথবা বইয়ের পাতায় আটকে আছে অথবা মিউজিয়ামে বন্দী হয়ে আছে, এখন সবাই লেবাসধারী আর মুখোশ পরা।

# সুখের কথা আমরা পিছনের দিকে হাঁটতে শুরু করেছি।

শেয়ার করুন:
  • 243
  •  
  •  
  •  
  •  
    243
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.