ব্রেস্ট শেমিং: বুকের আকৃতি কেন নারীর সৌন্দর্যের মাপকাঠি?

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

এক.

সৌমিত্র একজন অসাধারণ শিল্পী ও ভাস্কর। নারীদেহ সম্পর্কে অনুপ্রেরণার জন্য সে খাজুরাহো মন্দিরে যায়, কেননা সেখানে অনেক নগ্ন নারীমূর্তি রয়েছে। সেখানেই তার আলাপ হয় তিস্তার সাথে। প্রেম হয়ে যায় তাদের দুজনের, এবং প্রবল সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তারা সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার। সৌমিত্রকে ভালোবেসে তিস্তা তার অবস্থাসম্পন্ন, অভিজাত পরিবারকে পেছনে ফেলে আসে।

কিন্তু বিয়ের রাতেই সৌমিত্র আবিষ্কার করে, তিস্তা সমতল বুকের অধিকারী, তার বুক অন্য অধিকাংশ নারীর মতো নয়। এতোদিন নারীদেহ নিয়ে মোহগ্রস্ত এবং সেটিকে শিল্পীর চোখে দেখা সৌমিত্র নিজের স্ত্রীর সমতল বুক দেখে চমকে যায়। তার মনে হয়, তিস্তা তাকে ঠকিয়েছে, তার সাথে প্রতারণা করেছে। ফলে তিস্তার প্রতি গভীর রাগ ও ক্রোধ জন্মায় তার। এতোটাই দিশেহারা হয়ে পড়ে সে যে, এক বন্ধুকে এমনকি ডায়াগ্রাম এঁকেও সে ব্যাখ্যা করে তার স্ত্রীর শরীরের ‘খুঁত’ ঠিক কোথায়। সেই বন্ধুর মাধ্যমে বিষয়টি পাঁচ কান হয়ে যায়।

এরপর সৌমিত্র ও তিস্তার সম্পর্কের পরিণতি কোনদিকে এগোয়, এই নিয়েই কাহিনী কৌশিক গাঙ্গুলী নির্মিত ‘শূন্য এ বুকে’ ছবিটির।

দুই.

“আমাদের সময়ের সেই পুরনো আলখাল্লা মার্কা সেমিজ আর কেউ পরে নাকি? এখন বুক থাকবে টানটান, ভরাট। নাহলে সে-মেয়ের দিকে কেউ চোখ তুলেই তাকাবে না। প্রেরণাকে এ কথা বলেছিলেন দিদিমা। বলে নিজের একটি স্তন তুলে দেখিয়ে বলেছিলেন, সময় নষ্ট করে কোনো ছেলে এ জিনিস চটকাতে আসবে? বরং এক ধাক্কা মেরে দৌড়ে পালাবে।

প্রেরণার হাসি পেয়ে গিয়েছিল। আবার লজ্জাও হচ্ছিল খুব। তার বুকের বসন্ত এরই মধ্যে বেশ ভারি হয়ে উঠেছে। ফ্রকের উপর দিয়ে এমনভাবে ফুটে ওঠে, ভীষণ সংকোচ হয় বাড়ির মানুষজনের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেও। খালি মনে হয়, সবাই তার বুকের দিকে তাকিয়ে দেখছে।

খাওয়া-দাওয়ার পর রাতে বিছানায় শুয়ে দিদিমার কথাটা মনে মনে অনেকক্ষণ আউড়েছিল প্রেরণা। স্তন-মাহাত্ম্য অনেকটাই তখন বুঝতে শিখেছে। পাশের বাড়ির রুমঝুমের বুক মসৃণ, অনেকটা ছেলেদের মতো। এজন্য পাড়ার ছেলেরা আড়ালে ওকে নিমাইবাবু বলে ডাকে। রুমঝুম একদিন কথাটা বলে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠেছিল। বারবার খাবলা করে নিজের বুকের ওই অংশটা চেপে ধরেছিল। নিজের ওপরেই ঘেন্নায় যেন তার সর্বাঙ্গ রি-রি করে জ্বলে যাচ্ছিল। কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, আগের জন্মে কী পাপ করেছিলাম, সবার উঠলো, শুধু আমারটাই উঠলো না।

বাড়িতেও এ নিয়ে মা, পাড়ার কাকিমাদের মধ্যে বিস্তর ফিসফাস, হুসহাস। বড়রা নিজেদের মধ্যেই এসব আলোচনা করতো বটে, কিন্তু তাদের কানে ঠিকই সব ভেসে আসতো। মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা, স্তনের গড়ন, আর নানা প্রসঙ্গ এভাবেই বোধহয় পরম্পরাগত প্রথায় নতুন প্রজন্ম বুঝে যায়। রুমঝুমকে পরে স্তন-প্রস্ফুটনের জন্য ব্যাঙ্গালোরের কোনো একটা হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন পর্যন্ত করতে হয়েছিল। তারপর রুমঝুম পরিপূর্ণ নারী রূপ পায়।”

এই অংশটুকু নেয়া হয়েছে সমরেশ মজুমদার রচিত ‘শিশির ভেজা বকুল’ উপন্যাস থেকে। এখানে শেষ বাক্যে বেশ সুন্দর করেই বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, একটি ‘পরিপূর্ণ নারী রূপ’-এর ক্ষেত্রে স্তনের আকৃতি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও উপন্যাসটিতে একাধিকবার আদর্শ স্তনকে বিশেষায়িত করা হয়েছে এভাবে, “সুগঠিত, উন্নত ও নিটোল।”

উপরে একটি চলচ্চিত্র ও একটি উপন্যাসের মাধ্যমে যে উদাহরণ দেয়া হলো, তা কিন্তু একদমই বিস্ময়কর কিছু নয়। বরং নারীদের স্তন সম্পর্কে আমাদের সমাজের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকেই নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে আমাদের সমাজ বলতে শুধু এই বাংলাদেশ কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশই নয়, বলছি গোটা বিশ্বসমাজের কথাই। কেননা পশ্চিমা বিশ্বেও নারীদের স্তন সম্পর্কে এমন মানসিকতাই পোষণ করে থাকে সিংহভাগ মানুষ।

পশ্চিমা বিশ্ব অন্য অনেক বিষয়ে হয়তো আমাদের থেকে যোজন যোজন এগিয়ে গেছে, কিন্তু ‘আদর্শ নারীদেহ’-এর সংজ্ঞায় তাদের সাথে আমাদের একদমই তফাৎ নেই। তারাও আদর্শ নারীদেহের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ মনে করে সুডৌল, ভারি ও টানটান বক্ষকে। তাই তো ২০১৮ সালের প্রাপ্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে স্তনের আকৃতি বৃদ্ধির লক্ষ্যে কেবল ব্রেস্ট অগমেন্টেশনই করিয়েছিলেন তিন লক্ষ নারী। এছাড়াও স্তনের আকৃতি বৃদ্ধির অন্যান্য আরো নানা উপায় তো রয়েছেই। আমাদের দেশেও আজকাল অনেকেই স্তনের আকৃতি বৃদ্ধির জন্য অপারেশন করায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্রেস্ট এনলার্জমেন্ট পিল, অয়েল ও ক্রিমের রয়েছে রমরমা ব্যবসা।

লেখক: জান্নাতুল নাঈম পিয়াল

এখন প্রশ্ন হলো, কেন নারীদের স্ফীত স্তন থাকা এতোটা জরুরি মনে করা হয় গোটা বিশ্বব্যাপী? কোনো প্রকার সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, এর কারণ হলো নারীদেরকে মূলত পুরুষের ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা। পুরো বিশ্ব জুড়েই এ ধারণা কমবেশি প্রচলিত যে নারীর প্রধান কাজ হলো পুরুষের সাথে যৌনকর্মের মাধ্যমে পুরুষকে সন্তুষ্ট করা। এবং যেহেতু অধিকাংশ পুরুষের কাছে স্ফীত স্তনবিশিষ্ট নারীকেই বেশি পছন্দ, তাই এটিই হয়ে গেছে আদর্শ নারীদেহের শর্ত।

যেসব নারী সমতল স্তনের অধিকারী, কিংবা যাদের স্তনের আকৃতি ‘আশানুরূপ বড়’ নয়, তাদেরকে বলা হয়ে থাকে ‘ফ্ল্যাট চেস্টেড’। এবং তাদের নিয়ে হাসি-তামাশাও নেহাত কম করা হয় না। ‘শূন্য এ বুকে’ ছবির মতো তাদের সাথে যৌনক্রিয়ায় যেমন পুরুষরা খুব একটা আগ্রহী হয় না, তেমনই ‘শিশির ভেজা বকুল’ উপন্যাসের মতোই আড়ালে আবডালে, কিংবা অনেক ক্ষেত্রে সামনাসামনিও, ‘পুরুষালি’ হিসেবে অভিহিত করা হয় তাদেরকে। কোনো পুরুষকে যেমন ‘মেয়েলি’ বা ‘নারীসুলভ’ বলা তার জন্য অপমানজনক, কোনো নারীকেও ‘পুরুষালি’ বলা ঠিক ততটাই অপমানজনক। এবং এই অপমান করা হয় যেসব কারণে, তার মধ্যে অন্যতম হলো তার স্তনের আকৃতি।

আবার সবসময় যে স্তনের আকৃতি ছোট হওয়ার জন্যই নারীদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, তা কিন্তু নয়। অনেকক্ষেত্রে স্তনের আকৃতি ‘প্রত্যাশার চেয়ে’ বড় হওয়া, কিংবা টানটান হওয়ার পরিবর্তে ‘ঝুলে পড়ার’ কারণেও নারীদেরকে পদে পদে অপদস্ত হতে হয়। খুব অল্প বয়সেই যেসব মেয়ের স্তনের আকৃতি বড় হয়ে যায়, তাদের গোটা জীবনকেই যেন বিষিয়ে দেয়া হয়। আকারে ইঙ্গিতে তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোনো ছেলের সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক আছে কি না। ভাবখানা এমন যেন স্তনের আকৃতি বড় বা ছোট হওয়া শারীরিক সম্পর্কের সাথে সম্পর্কিত, প্রাকৃতিকভাবে কোনো নারী বড় স্তনের অধিকারী হতে পারে না! ফলে যেসব কিশোরীর স্তনের আকৃতি সমবয়সীদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় হয়ে যায়, তাদেরকে সবসময় একটা অকারণ হীনম্মন্যতা বা অপরাধবোধে ভুগতে হয়, এবং সেগুলো তাদেরকে বাকি জীবনভরও তাড়া করে বেড়ায়। যেন স্তনের আকৃতি বড় হওয়াটা তাদের অপরাধ।

অর্থাৎ স্তনের আকৃতি ছোট হওয়ার মতোই, স্তনের আকৃতি অত্যাধিক বড় হওয়ার বিষয়টিকেও ঘুরে ফিরে সেই পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কের প্রসঙ্গেই টেনে নেয়া হয়। কারণটাও অভিন্ন: নারীকে পুরুষের ভোগের বস্তু বলে মনে করা।

অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে যদি চিন্তা করা যায়, নারীদের স্তনের কাজ পুরুষদের আকৃষ্ট করা নয়, বরং সন্তান জন্মের পর তাদেরকে দুধ খাওয়ানো। এবং সন্তানকে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ানোর কিংবা দুধ উৎপাদনের পরিমাণের ক্ষেত্রে যেহেতু স্তনের আকৃতি বড় বা ছোট হওয়া কোনো সমস্যা নয়, সেক্ষেত্রে কোনো নারীর স্তনের আকৃতি কেমন, সে বিষয়ে আলোচনা পুরোপুরি অবান্তর।

আমরা যে বিশ্বাস করি একসময় মানুষ অসভ্য, বর্বর থাকলেও এখন তারা ভদ্র-সভ্য হয়ে উঠেছে, সেটি আসলে ভ্রান্ত ধারণা। কেননা আসলেই যদি মানবজাতির চিন্তাধারা ও জীবনাচরণের মানে উন্নতি ঘটত, তাহলে আজকের দিনেও তারা নারীদেরকে তাদের স্তনের আকৃতি কিংবা অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিচার করত না। আর শুধু নারীদের কথাই বলছি কেন, পুরুষ কিংবা হিজড়া, রূপান্তরকামী, নন-বাইনারি, কাউকেই তাদের শরীর দ্বারা বিচার করা হতো না। বরং এটি মেনে নেয়া হতো যে প্রতিটি মানুষের শরীরই প্রকৃতিপ্রদত্ত, এবং সেই শরীর যেমনই হোক না কেন, তা সুন্দর।

লেখক: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.