ভাইয়েরা, আপুরা, ঘরে বসে আয় করবো কেমন করে?

কাজী তামান্না কেয়া:

চারপাশে অসংখ্য তরুণ-তরুণী। তারা অনেকেই হন্যে হয়ে একটা চাকরি খুঁজে চলছেন। আপনারা অনেকেই একটু চেষ্টা করে নিজে উঠে দাঁড়াতে পারেন, চাকরির বিকল্প তৈরি করে নিতে পারেন সহজেই। আজ তেমন কয়েকটা উপায় নিয়ে দু’ চার কথা বলবো। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, উদ্যোক্তা হবার কয়েকটা ক্ষেত্রে নিয়ে কথা বলবো।

তার আগে বলে নেই। আমি এখনও উদ্যোক্তা নই। এই লেখার সবকিছু আমার অভিজ্ঞতালব্ধ নয়। তবে বিগত ৫/৬ বছর ধরে আমেরিকায় পড়ালেখা এবং চাকরি করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। এছাড়া চারপাশে কী ঘটছে, আমি তা নিবিড় চোখে পর্যবেক্ষণ করি এবং সেইসব ভাবনা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে পছন্দ করি। সে কারণেই বিষয়টি নিয়ে লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। আজ লিখবো বাংলাদেশ এবং আমেরিকায় ঘটতে দেখেছি এমন কিছু উদ্যোগ নিয়ে, যা সহজেই আপনাকে বেকার থেকে উদ্যোক্তা হতে অনুপ্রাণিত করতে পারে।

১) ডে কেয়ার: চাকরিজীবী মায়েদের চিন্তার শেষ নেই বাচ্চাটি নিয়ে। বুয়ার কাছে রেখে যাবেন, ভরসা কোথায়? আর ফুলটাইম লোকই বা পাবেন কোথায়? শাশুড়ি কিংবা নিজের মা? আমাদের কয়জনের আছে সেই সুবিধা যে তাদের নিজের কাছে এনে রাখবো, বা তারাও থাকতে রাজী হবেন! কতোই না আক্ষেপ! আহা! বাংলাদেশে কবে উন্নত দেশের মতো ডে কেয়ারের সুযোগ সুযোগ-সুবিধা তৈরি হবে? ভাবনা কেন? আপনি নিজেই দিয়ে দিন না একটি ডে কেয়ার!

অনেক নারী ঘরে বসে আছেন। অনেকে আবার বাচ্চা হবার পর চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। নিজের সন্তানের পাশাপাশি অন্য চার-পাঁচটি সন্তানকে সপ্তাহের পাঁচদিন লালন পালন করার দায়িত্ব নিতে পারেন। চালু করতে পারেন নিজের ডে কেয়ার। কোনো ইনভেস্টমেন্ট নেই বললেই চলে এই কাজটি শুরু করতে। একটা রুটিন করুন– সন্তান কখন খেলবে, কখন ঘুমাবে, কখন গোসল করবে, কখন খাবে। ব্যস! চাকরিজীবী মায়েরা তাদের সন্তানকে আপনার ডে কেয়ারে রেখে যেতে পারবেন প্রয়োজনীয় খাবার দাবারসহ। অনলাইনে কিছু ভিডিও দিছে দেখে নিন, শুরু করে দিন নিজের ডে কেয়ার প্রতিষ্ঠান। চাইলে বৃদ্ধ নিবাস বা আরও অন্যান্য সাপোর্ট সেন্টারও গড়ে তুলতে পারেন। আপনার সময়ের জন্যেই আপনি ঘরে বসে ডে কেয়ার থেকে সহজে উপার্জন করতে পারবেন।

২) এয়ারবিএনবি/টুরিস্ট স্পট: ঢাকার আশেপাশে আপনার গ্রামের বাড়ি পড়ে আছে, থাকার লোক নেই? এয়ারবিএনবি করে ভাড়া দিয়ে দিন। এটা কিছুই না, উবারের মতই একটা অ্যাপ। অ্যাপটা নামিয়ে নিন। ক্রেডিট কার্ড যোগ করুন। বাড়িটি লিস্ট করে দিন অ্যাপে।

বাড়িটিকে ট্যুরিস্ট স্পট করেও ভাড়া দিতে পারেন। ঢাকার কাছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জের অনেক বাড়ি এখন টুরিস্ট স্পট বা গেস্ট হাউজ হিসেবে ভাড়া পাওয়া যায়। দেশি টুরিস্ট, স্কুল কলেজের বার্ষিক পিকনিকগুলো আয়োজন হতে পারে এখানেই। নাটক, সিনেমার জন্যেও ভাড়া দেওয়া যায়।

ওহ, ঢাকার আশেপাশে বাড়ি না হলেও ক্ষতি নেই। পুরো দেশের যেকোনো জায়গায় আপনার প্রপার্টি থাকলেই এই ব্যবসা আপনি ঘরে বসে করতে পারেন। বাড়ি নেই? তাতেও সমস্যা নেই। আপনার ফ্ল্যাটের গেস্ট রুমটা পড়ে আছে? ওটাকে এয়ারবিএনবিতে ভাড়া দিতে পারেন। নিরাপদ এই মাধ্যমটি থাকার হোটেলের বিকল্প। যারা থাকবেন, তারা পারিবারিক পরিবেশে নিরাপদভাবে আপনার রুমটি ভাড়া নিতে পারবেন। আপনি পাবেন বাড়তি ইনকাম। ভেবে দেখতে পারেন। এয়ারবিএনবি চালু হবার পর সারা দুনিয়ার হোটেল ব্যবসা প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছে, যেমন উবার চালু হবার পর প্রাইভেট ট্যাক্সি ব্যবস্থা প্রতিযোগিতায় নেমেছে, সেই রকম।

৩) নিরাপদ খাদ্য/অর্গানিক ফুড উৎপাদন: একজন লোক রেখে নিজের গ্রামের বাড়ি বা ঢাকার কাছে যে জমিটুকু কিনে রেখেছেন, এক সময় বাড়ি করবেন বলে, সেখানে সব্জি ফল লাগাতে পারেন। আজকাল বহু অনলাইন প্রতিষ্ঠান অর্গানিক ফুড বিক্রি করে। আগোরা, মীনা বাজার বা এ রকম আরো সুপার শপ আপনার পণ্য কিনে নিয়ে যাবে। বাজারজাত করার ঝামেলা আপনার না করলেও চলবে।

বছর দশেক আগে শ্রীমংগলে এক বাড়িতে থেকেছিলাম– ‘ঢাকাইয়া মহিলার বাড়ি’ নামে সেই বাড়িটি পরিচিত। অফিস রিট্রিটে শ্রীমংগল গিয়েছিলাম। একসাথে এক হোটেল বা গেস্ট হাউজে রুম পাওয়া যাচ্ছিল না। ইউটিউবে সে তার বাড়ির একটা ভিডিও দিয়ে রেখেছে। ভিডিও দেখে আমরা যোগাযোগ করি এবং বাড়ির দু তিনটি রুম ভাড়া নেই। বাড়ির পাশের ঝিরি থেকে ভেসে আসা পানির শব্দ, আর মাটির চুলায় রান্না করে খাবার পরিবেশন করা– এই দুটি দেখেই আমরা ঐখানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। বাড়ির এখানে-ওখানে বাড়িওয়ালির পরিবারের সদস্যদের ছবি, লাইব্রেরি, খাবার টেবিল। দেখে মনে হয়েছিল নিজের কোন আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে এসেছি। একদম আনকোরা লাগেনি ব্যাপারটি। গেস্ট হাউজের চেয়ে কোন অংশে ব্যতিক্রম মনে হয়নি। বাড়ির সদস্যরা হয়তো বছরে দু’চার দিনের জন্যে আসে। বাড়ির মালকিন ভদ্রমহিলা বাকি দিনগুলো ভাড়া দিয়ে পয়সা আসার সুন্দর একটা ব্যবস্থা করে নিয়েছেন। কী দারুণ উদ্যোগ!

আপনার নিজের কোন বাড়ি ঘর জায়গা জমি নেই? কোন সমস্যা নেই। একটা পুকুর লিজ নিতে পারেন। মাছ চাষ করুন। দুই হপ্তা পর পর মাছ বিক্রি করুন। গতকালের পত্রিকায় দেখলাম চারুকলা থেকে পাশ করে গরুর খামার দিয়েছে একটি ছেলে! সম্মানে মাথা নুয়ে এসেছে। আপনিও পারেন সে রকম কিছু করতে। সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে দিন খামারে। ঢাকায় বসেই দেখভাল করতে পারবেন। সিস্টেম একই। নিজে করতে না চাইলে দু একজন পার্টটাইম লোক নিয়ে নিন। আমাদের আছে ১৭ কোটি মানুষ। পার্ট টাইম কাজ করার লোকের অভাব নেই।

৪) অনলাইনে শাড়ি, চুড়ি, জামা, জুয়েলারির ব্যবসা তো নতুন নয়। সেগুলি আর বলার কী আছে! বহু মানুষ আজকাল অনলাইনে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস বিক্রি করছে। এই করোনাকালে টি শার্ট, পাঞ্জাবী থেকে শুরু করে বিছানার চাদর পর্যন্ত সবাই অনলাইনে কিনেছে। সুতরাং সেইসব পথ তো খোলাই আছে।

নাবিলা নূর নামে এক অনলাইন সেলিব্রিটিকে ফলো করি। বাংলাদেশী মেয়ে। এমেরিকায় থাকে। সে তার এমেরিকান স্বামীকে নিয়ে গড়ে তুলেছে নিজের জামাকাপড় বেচাবিক্রির প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশি টি শার্ট নিজের ব্রান্ড নামে বিক্রি করছে। এর পাশাপাশি তার যাপিত জীবন নিয়ে বিভিন্ন ইউটিউব ভিডিও বানায়। মানুষ সেসব দেদারসে দেখে। কন্টেন্ট থেকেও তার আয় উপার্জন মন্দ নয়। চাইলে সেগুলি আপনিও করতে পারেন।

৫) শিক্ষা নিয়ে বসে না থেকে কিছু একটা শুরু করুন। দেখবেন দু-তিন বছরে দাঁড়িয়ে গেছে সেই উদ্যোগ। অনলাইনে কোরবানির সিজনে কেউ গরু বিক্রি করছে, কেউ মেহেদী লাগিয়ে দিচ্ছে, কেউবা রান্না করে খাবার ডেলিভারি দিচ্ছে। মোট কথা কোন না কোন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে নিজেদের চেষ্টায়। যারা সেসব কিছুই করছেন না, নিজের সাইকেল বা মোটর বাইকটি নিয়ে পণ্য ডেলিভারিতে লেগে যেতে পারেন। এমাজনের প্রতিষ্ঠাতা সারা দুনিয়ার অন্যতম সেরা ধনী পণ্য বেচাবিক্রি করে।

অর্থাৎ আপনি যে কাজে দক্ষ, আপনার যা করতে ভালো লাগে, সেটাকেই অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। জগতের কোনো কাজই ছোট না, শুধু শুরু করার স্পৃহা থাকতে হবে। তবে আর দেরি কেন?

শেয়ার করুন:
  • 201
  •  
  •  
  •  
  •  
    201
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.