ভালবাসার সম্পর্ককে আটকে নয়, আগলে রাখুন

কৃষ্ণা দাস:

ভাল লাগার যেকোনো কিছুই আমরা আগলে রাখতে ভালবাসি। যত্নে, গুছিয়ে, একটু সবার নজর বাঁচিয়ে রাখাটার মধ্যেও অনেক আপন অনুভূতি লুকিয়ে থাকে৷ শিশু জন্ম থেকে বেড়ে উঠা, সবটাতেই মা বাবা থেকে পরিবারের সবাই শিশুটিকে যত্ন সহকারে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেন। পোষা প্রাণী থেকে বাড়ির চারধারে বেড়ে উঠা গাছগাছালী সবই আমরা যত্নে গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করি। কারণ একটাই, এগুলো প্রত্যেকটার সাথেই আমাদের ভাললাগা আর ভালবাসা জড়িত।

এই সবার বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে যে কথাটা সবচে বেশি বেশি আসছে তা হচ্ছে যত্ন। সন্তান জন্মের পর একজন মা এবং পুরো পরিবার তিল তিল করে তাকে বেড়ে উঠতে সাহায্য করেন, আদরে, যত্নে, শাসনে। নিয়মমাফিক সন্তান যখন বড় হয় তখন সে তার স্বাধীনতা চায়, স্বাভাবিক আমরাও চেয়েছি৷ এই স্বাধীনতা দিতে আমরা অনেক বাবা-মা বেশিরভাগ সময়ই দ্বিধান্বিত হয় কারণ আমাদের সমাজের অনেক খারাপ দিক দেখা আছে কিন্তু তাই বলে তো তাকে আজীবন আমরা আমাদের ছায়াতলে রেখে তার স্বাবলম্বিতার দরজা বন্ধ করে দিতে পারি না। তাকে অতি অবশ্যই স্বাধীন হওয়ার পথ খুলে দিতে হবে, বারবার হয়তো পরবে, ঠকবে, ধাক্কা খাবে কিন্তু এই সমাজের আর কঠিন বাস্তবতার সাথে খাপখাওয়ানো শিখে যাবে। তবে আগেই বলে রাখা ভাল, স্বাধীনতার কথা বলেছি স্বেচ্ছাচারিতা কিন্তু না।

পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায়, (পুরুষতান্ত্রিক এই মানসিকতা নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই বিদ্যবান থাকতে পারে) অনেকেই তার জীবনসঙ্গী কিংবা হবু জীবনসঙ্গীকে ভালবাসা বা আগলে রাখার নামে অনেক সময়ই তা মানসিক এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা শারীরিক নির্যাতনের দিকে নিয়ে যায়। বিশেষ করে পুরুষরা তাদের স্ত্রী কিংবা প্রেমিকাকে কথায় কথায় “এটা করা যাবে না, ওদিকে তাকানো যাবে না, এতো বেশি হাসা/কাঁদা যাবে না,” ইত্যাদি ইত্যাদি হরেক রকম প্যারা দিতে থাকেন। কথায় আছে, রশি যত টাইট করে বাঁধবে, তত তাড়াতাড়িই তা ছিড়ে যাবে। রশি বাঁধায় সমস্যা নাই, সমস্যা কতটা বাঁধতে হবে তার একটা সীমানা ঠিক রাখা।

নারীরাও এদিকে কম যান না, স্বামী/প্রেমিকের ফোন চেক করা থেকে শুরু করে সারাদিনের টাইম-টেবিল সব ঘড়ি ধরে কাঁটায় কাঁটায় মাপতে বসে যায়। সমস্যার সূত্রপাত কিন্তু এসব কারণেই ঘটে। দেখা যায় প্রেম করে বিয়ে কিংবা বিয়ের পরে প্রেম সে যাই হোক না কেন! সন্দেহ আর অতিমাত্রায় শাসন সুন্দর সম্পর্কগুলোকে আলগা করে দেয়, অনেকটা শিকড়বিহীন গাছের মতন। সম্পর্কের শেকড়বাকড় যাই বলি না কেন, তা হচ্ছে বিশ্বাস আর আস্থা। সন্দেহ নামক ঘুণপোকা তা ক্রমে ক্রমে ফাঁপা করে দেয়, বুনিয়াদ একসময় ভেঙ্গে পড়ে।

যেকোনো সম্পর্কে কিছুটা ‘পজেসিভনেস’ থাকতেই পারে, তাই বলে তা যেন সন্দেহপ্রবণ, বাতিকগ্রস্ত করে না তোলে সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া উচিত। এই পজেসিভনেসের উৎপত্তি কোথা থেকে? মূলত কাউকে ভাললাগা থেকে অনেক সময় আমরা আপনাতেই রক্ষকের ভূমিকা পালন করি, এর থেকে জন্ম নেয় কিছু কিছু ইনসিকিউরিটি, যা মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। আমাদের মনের অনেকগুলি স্তরের মধ্যে সবচেয়ে ভেতর দিকের স্তরটির নাম ‘ইদ্’৷ এই স্তরে আমাদের নানা ধরনের অসামাজিক বা নিষিদ্ধ ইচ্ছের বসবাস৷ মানুষ নৈতিকতা ও শিক্ষার কারণেই এই সমস্ত ইচ্ছেগুলোকে অবদমিত করে ‘ইগো’ বা ‘সুপার ইগো’ স্তরে প্রায় একটা সামাজিক ও মার্জিত মুখোশ পরে জীবন-যাপন করে৷ আমাদের পুরুষতন্ত্র ও মধ্যবিত্ত সংস্কৃতি সম্পর্কের সঠিক দিকনির্দেশনা আর সীমানা চিহ্নিত পুরোপুরি এখনো করতে পারে না। সেক্ষেত্রে আমাদের অবচেতন মনে তার প্রতি আকর্ষণ বা যৌনতার ইচ্ছা থেকেই একটা পজেসিভনেস বা অধিকারবোধ তৈরি হয়৷ এই সত্যটা মেনে নিলে আমরা নিজেরাই নিজেদের কাছে ছোট হয়ে যেতে পারি৷ সেই ভয়ে অনেক সময় সম্পর্কটাকে আমরা সম্ভাব্য সামাজিক একটা নাম দেওয়ার চেষ্টা করি৷ কিন্ত্ত ভেতরের সেই নিষিদ্ধ ইচ্ছা থেকে বেরতে পারি না৷ এই দুই টানাপোড়েন থেকে বেরিয়ে এলেই সমস্যার সমাধান হবে৷

মানসিক যে দ্বন্দ্ব সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে। দ্বন্দ্ব শেষ হলেই সমস্যার সমাধান খুব সহজেই হবে। পাশাপাশি ভালবাসার সম্পর্কগুলো সুন্দর আঁকড়ে আর আগলে রাখুন। কোন সম্পর্কই টিকিয়ে রাখবার দায়ভার শুধু মাত্র কোন একজনের থাকে না। একজন সম্পর্ক টিকাতে জানপ্রাণ দিতে থাকবে আর অন্যজন নিজেকে সুপ্রিম ভেবে অধিকার আর কর্তৃত্ব খাটাতে থাকবেন, অতি অবশ্যই এমন ক্ষেত্রে আজ না হোক কাল সম্পর্কে চির ধরবেই। দু’জনের সমান প্রয়াশেই একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হয়, কাজেই তা ধরে রাখার দায়িত্বও দু’জনের।

শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.