নারী কবে ‘বস্তু’ থেকে মানুষ হিসেবে গণ্য হবে?

জেসমিন আরা:

ছেলেবেলা থেকে যে বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলতো, সেটা ছিল মেয়ে বা নারীকে কেন বস্তু হিসেবে গণ্য করা হয়। আমারা মানে মেয়েরা চারপাশের পরিবেশ থেকেই বিষয়টা বুঝে যাই অনেক অল্প বয়স থেকেই। প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর অনেক আগে থেকেই মেয়েরা জানতে পারে সমাজে তার অবস্থান, তার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। ছোটবেলায় সমবয়সী পুরুষ খেলার সাথীদের কাছ থেকেই প্রথম শুরু হয় নিজের অবস্থান সম্পর্কে জানা। মেধা, মননে কোথাও ঘাটতি না পেলে ছেলেটি তার শ্রেষ্ঠত্ব আর শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে মারধর, না হয় গালিগালাজ। আমরা ছেলেবেলায় বোধ হয় অনেকেই ভাইদের হাতে মার খেয়েছি, যদিও অনেকক্ষত্রে ভুলটি আমাদের ছিল না।

আমার এখনও মনে আছে, খাগড়াছড়িতে আব্বা যখন মহকুমা প্রশাসক ছিলেন, আমার বন্ধুরা সব ছিল আদিবাসী সমাজের বিভিন্ন গোত্রের ছেলেমেয়ে। ক্লাস ফাইভে প্রথম হবার পর আমার সহপাঠী চাকমা ছেলেটি যে দ্বিতীয় হয়েছিল গর্ব করে শুনিয়েছিল, “তুমি তো গাছে উঠতে পারো না, সাপ আর জোঁক দেখলে ভয় পাও, সাঁতার জানো না, পাহাড় থেকে লাফ দিয়ে খালে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারো না,” এরকম অনেক কিছু। মেধায় ওর চেয়ে বেশি হলেও, শক্তিতে মোটেও ওর সমকক্ষ নই সেটাই বুঝিয়েছিল আমাকে। এরকম পরিস্থিতিতে মেয়েরা কী করে? নিজের জন্মকেই দোষারোপ করে, মনে মনে বলে, “কেন আমায় ছেলে বানিয়ে জন্ম দেয়নি প্রভু!” আর ওরকম ছোট্ট বয়েস থেকেই ছেলেটি নিজেকে একটা মেয়ের ওপর তার শক্তির জোরটাকেই বড় করে ভাবতে শিখে যায়। তাই মেয়েরা আর দশটা জিনিসের মতো বস্তুতেই পরিণত হয় তার কাছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস এর একটা প্রতিবেদন পড়ে পুরনো সেই প্রশ্নটা আমাকে আবারো ক্ষতবিক্ষত করে তুলেছে, “কবে বস্তু নয়, মেয়েরা মানুষ বলে গণ্য হবে?” প্রতিবেদনের খবরটি মিশরের, একজন একুশ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রের বিরুদ্ধে একাধিক নারীর যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলায় গ্রেফতার করার কথা। মিশরের তথাকথিত বিত্তবান পরিবারে ছেলেটির জন্ম এবং যে সবসময়ই নামকরা ও অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনা করেছে। ২০১৬ এ মিশরের অন্যতম সম্মানিত ও সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিশ্ববিদ্যালয়, “আমেরিকান ইউনিভারসিটি” থেকে প্রথম বর্ষেই বহিষ্কৃত হয় যৌন নিপীড়নের অভিযোগে। তারপর অনলাইনে স্পেনের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করে। গত বছর এক সেমিস্টারের জন্য সে স্পেনে ক্লাস করতে যায় এবং একইরকম আচরণের কারণে সেখান থেকেও বহিষ্কৃত হয়। সে ভয়ভীতি ও জোর খাটিয়ে নিপীড়নে বাধ্য করেছে সবাইকে। ছেলেটির বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, রেইপ, ব্ল্যাকমেইল, অশোভনীয় যৌন আচরণ, অশ্লীল টেক্সট, ইত্যাদি। আসলে সমাজ-ব্যবস্থা অর্থাৎ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি এইসব নিপীড়কে সহায়তা করে থাকে। নিশ্চয়ই ছেলেটি তার পরিবার, না হয় পারিপার্শ্ব থেকে যে শিক্ষা লাভ করেছে তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছে তার কাজে। মিশরের অতি সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে দেখা যায়, তাহরির স্কয়ারে ২০১৪ এ প্রেসিডেন্টের শপথ নেবার দিন প্রকাশ্যে গণ-ধর্ষণের শিকার হয়েছিল একজন নারী। ২০১৩ সালের জাতিসংঘের জরিপ অনুযায়ী মিশরের ৯৯ ভাগ মেয়েই যৌন নিপীড়নের শিকার হয় কোন না কোন সময়।

স্থুলভাবে যৌন নিপীড়ন বা অসদাচারণ বলতে বোঝানো হয় কোন অনভিপ্রেত বা কাম্য নয় এমন ব্যবহার, যা কোন রকম অনুমতি ছাড়াই জোরপূর্বক, কিংবা বলপূর্বক কারোর প্রতি করা হয়ে থাকে। এই নিপীড়ন ঘটতে পারে পরিচিত-অপরিচিত, আত্মীয়-অনাত্মীয়দের দ্বারা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এরকম নিপীড়নের শিকার হতে পারে। তবে পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় বেশিরভাগ নিপীড়ন ঘটে থাকে নারীর ওপরই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মেয়েই যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। আর পৃথিবীব্যাপী শতকরা সাতজন যেকোনো বয়সী মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয় প্রতি বছর। বাংলাদেশের শতকরা প্রায় আশি ভাগ মেয়েই বিভিন্ন জায়গায় যেমন, রাস্তাঘাট, যানবাহন, বাজার, শপিং মল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ঘরেও যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে।

গত কয়েক বছরেরে জরিপে দেখা যাচ্ছে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে যৌন নিপীড়ন। শুধুমাত্র ২০১৯ সালেই কমপক্ষে এক হাজার সাতশ’ নারী ধর্ষণ, গণ-ধর্ষণ, ও ধর্ষণের পর মেরে ফেলার শিকার হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের মতে, ২০১৯ সালে এক হাজার চারশ’ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যেখানে ২০১৮ সালে সেটা ছিল সাতশ’ বত্রিশ জন। একটি অনলাইন পত্রিকা থেকে জানলাম, একজন মাদ্রাসা অধ্যক্ষের শিশু নির্যাতনের কাহিনী। কোমলমতি এসব শিশু যারা এখনও পাপপুণ্য, ভালমন্দ, ন্যায়-অন্যায়, অর্থাৎ জীবনের সরল কিংবা জটিল কোন বিষয়েই এতোটুকু জ্ঞান অর্জন করেনি, তাদের নিষ্পাপ শিশুকালটাকেই তছনছ করে দেয়া হলো। কী করে এমন একেকটা শিশুকে ভোগ্যপণ্য হিসেবে ভাবতে পারে একজন পুরুষ? আমার অভিযোগ সমগ্র পুরুষ জাতির প্রতি নয়, সেই অসুস্থ ও বিকৃত পুরুষ গোষ্ঠীর প্রতি। আর সেই সমাজের প্রতি, যেখানে সুপরিকল্পিতভাবে মেয়েদের নিচু করে রাখার প্রক্রিয়াকে চালু রাখায় সহায়তা করা হয়।

এখনও পরিবার, সম্প্রসারিত পরিবার, প্রতিবেশী, তথা সমাজের মানসিকতা একটুও বদলায়নি। পরিবার থেকেই একটি কন্যা শিশুকে ভিন্ন নজরে দেখা হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যখন বাবা-মা গর্ব ভরে মেয়ের ভালো পাত্রে বিয়ের কারণ হিসেবে মেয়ের বাহ্যিক সৌন্দর্যের কথা বলে আত্মপ্রসাদ লাভ করেন, তারাও কি নিজ কন্যাটিকে বস্তুর মতো ব্যবহার করলেন না? আবার যে বাবা-মায়ের কন্যার বিয়ে হতে দেরি হলো, কিংবা বিয়েই হলো না, তা সে যতই গুণী, জ্ঞানী, আর যোগ্যই হোক না কেন, তাকে কুৎসিত বলতে, তাকে হেয় করতে একটুও দ্বিধা করে না সমাজ। আজও ছেলের গায়ের রং যাই হোক না কেন, সুন্দরী আর ফর্সা বউই কামনা করে। বউটি যতই যোগ্য হোক না কেন, শ্যামলা, কিংবা চাপা বর্ণের খোঁটাটা ঠিকই হজম করতে হয় তাকে।

একটা মেয়ে যদি নিজ যোগ্যতায় নিজের জীবনযাপনের সামর্থ্য অর্জন করতে পারে তাকে কেন তার চেয়ে কম যোগ্যতার কোন একটি পুরুষের সাথে ঘর বাঁধতে হবে? তার জীবনের সিদ্ধান্ত তো সে নিজেই নিতে পারে। আমাদের সমাজ বলবে, নিরাপত্তার জন্যই মেয়েটির বিয়েটা দরকার। সেখানেই আমার প্রশ্ন, সমাজ কেন দৃষ্টিভঙ্গি পালটিয়ে নারী-পুরুষকে সমান চোখে দেখতে চাইছে না? যুগ যুগ ধরে ছেলেদের ব্যাচেলার মেসের প্রচলন চালু আছে। এখন যদি একদল সুশিক্ষিত, যোগ্য মেয়ে একটা মেসে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে বস্তুবাদী সমাজের মাথাব্যথা শুরু হয়ে যায়। মেয়েদের সব যোগ্যতা ম্লান হয়ে যায় তার নারী হয়ে জন্মাবার কারণে। তাকে নিয়ে অলিক, অবাস্তব, বা কল্পিত কাহিনী শুরু হয় সমাজ আর সংসারে।

ছোটবেলা থেকে মেয়েদের প্রতি কিছু কিছু শব্দ ব্যবহার আমার কাছে ভীষণ খারাপ লাগে। অনেকদিন আগের একটি ঘটনা। আমি তিতুমির কলেজে পড়ি, আমাদের বাসা মগবাজারে। তখনকার দিনের ছয় নম্বর বাসে মহাখালী যাই। একদিন ব্যবহারিক ক্লাস শেষে সন্ধ্যার কিছু আগে যখন ফার্মগেট পর্যন্ত এসেছি, একটি মেয়ে সম্ভবত আমার চাইতে একটু বড় ছিল, বাস থেকে নেমে যাবার সময় হেল্পার ছেলেটিকে ধমকে ছিল পিঠে হাত রাখার জন্য। মেয়েটি নেমে যাবার পর বাসের যাত্রীরা মানে, বিভিন্ন বয়সী পুরুষেরা তাকে নিয়ে কমেন্ট করতে শুরু করলো। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষ বললো, “যেমন ‘মাল’, তেমন তার ব্যবহার।” তখন সিনেমার ভিলেনদের মুখে এমন ডায়ালগ শুনেছি। ভীষণ খারাপ লেগেছিল সেদিন, কিন্তু কিছু বলার সাহস পাইনি ঐ বয়সে। মেয়েরা মাল, মানেটা কি? তারা কি ফ্যাক্টরিতে তৈরি কোন পণ্য, তাই তারা একটা ‘মাল’?

মিডিয়া জগত মেয়েদের পণ্য বানানোর কাজে অন্যতম ও ব্যাপক ভূমিকা রেখে থাকে। বিজ্ঞাপনে নারীকে উপস্থাপন করা হয় পণ্য হিসেবে। ফেয়ারনেস ক্রিম না মাখলে বিয়ে, বা চাকরী না হওয়ার কি সম্পর্ক, আমি ভেবে পাইনা। একটা মেয়েকে কি শুধুই দৃষ্টিনন্দন হতে হবে? তার পরিচয় কি শুধুই তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই ধরণের বিশ্বাসগুলোকে পাকাপোক্ত করে দেয় এসব বিজ্ঞাপন। মেয়েদের যোগ্যতা আর দক্ষতা কি কোন মাপকাঠি নয়? মিডিয়ায় এ ধরনের বস্তুবাদী ধারনাকে উপস্থাপন করে আরও বেশি বস্তুতে পরিণত করা হয় নারীকে।

সমাজ, তথা সমাজের অধিবাসীদের মানসিক উৎকর্ষ সাধন, বা প্রচলিত ধারণাগুলোকে পালটাতে না পারলে বস্তু থেকে মেয়েরা আর মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। রাষ্ট্রকে প্রণয়ন করতে হবে মেয়েদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ। ২০১২ এ মালয়েশিয়ায় বেড়াতে গিয়ে দেখেছি মেয়েরা অবাধে দিনে ও রাতে মোপেড চালিয়ে কাজে যাচ্ছেন, বা কাজ থেকে বাড়ি ফিরছেন, আশপাশে কোথাও কোন উৎসুক চোখ দেখিনি তাদের দিকে। নিউ ইয়র্ক শহরেও কাজের প্রয়োজনে খুব ভোরে কিংবা গভীর রাতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে নির্ভয়ে যাতায়াত করে মেয়েরা। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং পারিপার্শ্বিকের উন্নয়ন ও সংস্কার করে মেয়েদের মানুষের মর্যাদা না দিলে সমাজ, সভ্যতা পিছিয়ে পড়বে। শারীরিক কাঠামোগত ভিন্নতার কারণে সমাজে মেয়েরা আর কতকাল বঞ্চনার শিকার হবে?

লেখক: জেসমিন আরা, নিউ ইয়র্ক

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.