বিচ্ছেদের কারণে প্রাক্তন স্ত্রীকে হেনস্তার প্রতিবাদ করতে পারবেন না অপূর্ব?

জান্নাতুল নাঈম পিয়াল:

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন ছোট পর্দার জনপ্রিয় অভিনেতা জিয়াউল ফারুক অপূর্ব। সাবেক স্ত্রী নাজিয়া হাসান অদিতিকে জড়িয়ে বানোয়াট খবর প্রকাশের অভিযোগ করতে নিরুপায় হয়ে থানায় গিয়েছেন তিনি। যদিও দিনকয়েক আগে ঘোষণা দিয়ে অনলাইন পোর্টালগুলোর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত তা করেননি তিনি। বরং ২৫ জুলাই বিকেলে উত্তরা পূর্ব থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তিনি।

তার এই মামলার প্রেক্ষাপট হলো তাকে ও তার সাবেক স্ত্রী অদিতিকে ঘিরে বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টালে বিভ্রান্তিকর খবর প্রকাশ। এমনকি বেশ কিছু ইউটিউব চ্যানেলেও বিব্রতকর ও বিভ্রান্তিকর সব তথ্য প্রকাশ করা হয়, যেখানে বলা হয় যে অপূর্ব-অদিতির সংসার ভাঙার পেছনে নাকি কাজ করেছে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম।

নিঃসন্দেহে অপূর্ব যা করেছেন, তা প্রশংসার দাবিদার। বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার পরও, সাবেক স্ত্রীকে নিয়ে প্রকাশিত ‘কুরূচিপূর্ণ’ সংবাদের প্রতিবাদ করেছেন তিনি, এবং সেটির বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয়ও নিয়েছেন। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এটি একটি বিরল ঘটনাই বটে।

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, অপূর্ব’র এই অবস্থানকে ভালোভাবে দেখছে না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাংশ। তাদের হাস্যকর বক্তব্যের সারকথা হলো এই যে: যার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে, তার জন্য এতো ‘দরদ’ কেন অপূর্ব’র? তার সম্মান নিয়ে যদি অপূর্ব এতোটাই চিন্তিত হন, তাহলে আর বিবাহ বিচ্ছেদটা হলো কেন! শুধু যে পুরুষরাই এ ধরনের মন্তব্য করছে তা কিন্তু নয়। অনেক নারীকেও দেখলাম এক্ষেত্রে তাল মেলাতে।

তাদের এ ধরনের বক্তব্যকে একটু গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায় তাদের মানসিকতা। তাদের মতে, স্বামী-স্ত্রী নিজেদের একান্ত ব্যক্তিগত কোনো কারণে সম্পর্কে ইতি টানতে পারবে না। আর যদি বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েই যায়, তাহলে আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনো পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা যাবে না! যেহেতু বিচ্ছেদের পর একে অপরের দিকে কাদা ছোঁড়াছুড়িই আমাদের দেশে প্রচলিত, তাই এর ব্যতিক্রম কিছুকে তাদের সহ্য হচ্ছে না। তারা মানতেই পারছে না যে বিচ্ছেদের পরও দুইজন মানুষ একে অন্যের সম্মানের কথা চিন্তা করতে পারেন, নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পরস্পরের পাশে দাঁড়াতে পারেন।

তাহলে তাদের মতে অপূর্বর এখন কী করা উচিৎ ছিল? অনুমান করছি, তারা মনে করে অপূর্বর উচিৎ ছিল তার সাবেক স্ত্রীর নামে ঘটে চলা কুরূচিপূর্ণ কথাবার্তা দেখেও মুখ বুজে তা সহ্য করা, কিংবা সেগুলোকে আরো উসকে দেয়া, যা তিনি ইতঃপূর্বে করেছিলেন প্রভার বেলায়। সেটি যদি তিনি করতেন, তাহলে তিনি ঠিক থাকতেন। কিন্তু যেহেতু এবার তিনি প্রাক্তন স্ত্রীর সম্মান রক্ষার্থে রুখে দাঁড়িয়েছেন, তাই কয়েকজনকে দেখলাম কমেন্টে তাকে ‘হিজড়া’ বলেও অভিহিত করেছে। অর্থাৎ, বিচ্ছেদের পর সাবেক স্ত্রীকে নিজে হেনস্তা করা, কিংবা অন্য কেউ হেনস্তা করলে সেটিকে নীরব অথবা সরব সমর্থন করলে (যেমনটি তিনি আগেও করেছেন) তার পুরুষত্ব থাকত। এবার ব্যতিক্রম কিছু করাতেই তার পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

তবে হ্যাঁ, অপূর্বের এবারের অবস্থান প্রশংসার দাবিদার হলেও, এ কাজের পিছনে তিনি যে যুক্তি দেখিয়েছেন, সেটি নিয়ে কিন্তু বিতর্কের অবকাশ থেকেই যায়। তিনি ফেসবুকে যে স্ট্যাটাসটি দিয়েছেন, সেখানে বারবার একটি কথা বলেছেন যে অদিতি এখন আর তার স্ত্রী না থাকলেও, তার সন্তানের মা, এজন্যই সেই সন্তানের মায়ের সম্মান নিয়ে কেউ নোংরা খেলায় মাতলে তাকে তিনি ছেড়ে দেবেন না।

তার এই বক্তব্যও খুবই সমস্যাজনক। অদিতি তার সন্তানের মা বলেই শুধু তিনি এতটা আন্তরিক? যদি অদিতি তার সন্তানের মা না হতেন, যেমন প্রভা ছিলেন না, তাহলে কি তিনি এবারও নিশ্চুপ থাকতেন? যদি তিনি এমন মানসিকতার অধিকারী হয়ে থাকেন, তাহলে তারও বেশ অনেকটা ধিক্কার প্রাপ্য। কারণ ‘সন্তানের মা’ কথাটায় খুব আবেগ থাকলেও, এবং শুনতে চমৎকার হলেও, পরোক্ষভাবে এটিও বুঝিয়ে দেয়া হয় যে ‘সাবেক স্ত্রী’ হিসেবে অদিতির সম্মান রক্ষা তার জন্য খুব বেশি জরুরি নয়। আর শুধু সাবেক স্ত্রী বলছি কেন, একজন নারীর সম্মান রক্ষাও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। বিষয়টি তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কেবলই নারীটি তার সন্তানের মা বলে।

অপূর্ব, অপূর্বকে নিয়ে এখন যারা ট্রল করছে, কিংবা সামগ্রিকভাবে আমাদের সমাজের প্রত্যেকেরই এই ধরনের অসুস্থ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যেকোনো নারীর সম্মানহানিই নিন্দনীয় একটি ব্যাপার। তার সাথে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে বলেই তার প্রতি সম্মান ধরে রাখা যাবে না, আর গেলেও নিছকই সন্তানের মা হিসেবে, নতুবা তার সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে ফেলতে হবে, এমন বর্বর ও অসভ্য মানসিকতাকে বিদায় বলার সময় এসেছে।

মনে রাখা দরকার, একজন ব্যক্তি নারী হোক বা পুরুষ, কেউ তার সম্মানহানি করলে সেটির প্রতিবাদ করতে হবে। সেই প্রতিবাদের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রভাবক বিষয়কে (এখানে যেমন প্রভাবক হলো ‘সন্তানের মা’) টেনে আনা যাবে না। এবং অতি অবশ্যই, আমাদের সমাজে সেই সুস্থ মানসিকতার চর্চা করতে হবে, যেখানে সেলিব্রিটি কিংবা সাধারণ মানুষ কেউই, বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়া স্বামী/স্ত্রী কিংবা প্রেমিক/প্রেমিকাকে অপমান না করে, তার নামে কুৎসা না রটায়, এবং অন্য কেউ এগুলো করলেও মুখ বুঁজে মেনে না নেয়।

তথ্যসূত্র:

https://www.prothomalo.com/entertainment/article/1671121/%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%B9%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%A5%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A7%9F-%E0%A6%97%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%85%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC

https://www.dailyinqilab.com/article/309914/%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%95-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%80%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%A8%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AD%E0%A7%81%E0%A7%9F%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%82%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%A6-%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%A8-%E0%A6%85%E0%A6%AA%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC

কোন ধরনের ভনিতা না রেখেই বলছি গত দুইদিন থেকে দেখা যাচ্ছে কিছু কিছু ভুঁই ফোঁড় ধরনের অনলাইন পত্রিকা কোন ধরনের তথ্য…

Posted by Md. Ziaul Faruque Apurba on Thursday, July 23, 2020

 

লেখক পরিচিতি: শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
  • 255
  •  
  •  
  •  
  •  
    255
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.