নারীবাদ ও নারীমুক্তির লড়াই: একটি বৃহত্তর নারীঐক্য কি সম্ভব?

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
এইটা একটা বড় আলোচনার বিষয়- উইমেন চ্যাপ্টারের একটা প্রবন্ধে এই আলোচনাটার কোন কুল কিনারা হবে না। সেজন্যে এখানে আমি যে কাজটা করতে যাচ্ছি সেটা হচ্ছে কেবল একটা সূচনা ধরনের আলোচনা মাত্র। এইরকম একটা সূচনা ধরনের আলোচনা কেন এইখানে প্রকাশ করছি, তার উদ্দেশ্য আছে।

উইমেন চ্যাপ্টার তো বাংলাদেশের সম্প্রতি বিকশিত নারীবাদী আন্দোলনের মূল কেন্দ্র ছিল একসময়। একসময় বলছি তার বাস্তব কারণ আছে, সেগুলি আপনারা জানেন। এই পোর্টালটি এখন আর সেইরকম সর্বজনবিদিত কেন্দ্র নয় বটে, কিন্তু এখনও বাংলাদেশের নারীবাদীদের সকলের কাছেই এর গুরুত্ব আছে। আমার প্রত্যাশা হচ্ছে যে বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলনে নানাভাবে বিভক্ত সকলেই, অথবা সকলে না হলেও অনেকেই, এই সূচনা ধরনের লেখাটা পড়বেন এবং সেই থেকে প্রকৃত নারীমুক্তির লড়াই বা চূড়ান্ত নারীমুক্তির লড়াইয়ের সাথে আমাদের বর্তমান নারীবাদী আন্দোলনের সম্পর্ক, সংযোগ, বিরোধ ইত্যাদি সম্পর্কে ওদের মধ্যে চিন্তাটা ফিরে আসবে। এই চিন্তাটা জরুরি- কেন জরুরি সেই কথাটা পরের দিকে আসবে। আমার প্রত্যাশা হচ্ছে, চিন্তার সূচনাটা একবার করা গেলে, আমাদের নারীবাদীরা তো যথেষ্ট পড়াশুনা করেন, ওরা নিজেরাই এটাকে পূর্ণ বিকাশের দিকে নিয়ে যেতে উদ্যোগী হবেন।

প্রথমেই বলে নিতে হয় নারীবাদ ও চূড়ান্ত নারীমুক্তির লড়াই এই দুইটাকে কেন আমরা আলাদা করছি। আলাদা করছি কারণ পশ্চিমা ফেমিনিস্ট আন্দোলন থেকে আমাদের দেশে যে নারীবাদী চিন্তার বিকাশটা হয়েছে সেটাকে বলা যায় মূলত একটা ক্রিটিক্যাল প্রজেক্ট। এই নারীবাদী চিন্তায় বিদ্যমান সমাজে নারী অমর্যাদা বা অবমাননা, নারীর প্রতি বৈষম্য, নারীর অধিকারের অস্বীকৃতি ইত্যাদি চিহ্নিত করা হয় মাত্র। কিন্তু নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য ও নারীর বঞ্চনার সাথে সমাজ বিকাশের ধারার যে সংযোগ এবং এটা থেকে উত্তরণের জন্যে সমাজের যে একটা র‌্যাডিকেল পরিবর্তন দরকার, সেই চিন্তাটা নারীবাদী ধারণার স্পষ্ট কোন সংযোগ নাই।

অন্যভাবে বললে, নারীর সংকটটা নারীবাদ বহুলাংশেই চিহ্নিত করে বটে, কিন্তু সেখান থেকে চূড়ান্ত মুক্তির পথটা বা গন্তব্যটা নারীবাদ চিহ্নিত করে না। নারীবাদীদের প্রত্যাশা যে বিদ্যমান সমাজ কাঠামো বজায় রেখেই নারীদের সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব। নারীবাদীদের চিন্তার এই সীমাবদ্ধতার কারণ কী? কারণটা হচ্ছে যে নারীবাদী ধারণাটা আমরা পশ্চিমা বিকশিত পুঁজিবাদী দুনিয়া থেকে পেয়েছি। পশ্চিমা পুঁজিবাদী দুনিয়ার শিক্ষিত স্বচ্ছল নারীরা শ্রমজীবী নারীদের মুক্তির লড়াইটা সেইভাবে প্রত্যক্ষ্য করে না এবং সেই কারণে সমাজ পরিবর্তনের চিন্তাটাও ওদের মাথায় আসে না। ডমিটিলা চুঙ্গারার কথা আপনাদের মনে আছে। তিনি যেভাবে চিহ্নিত করেছিলেন, আমেরিকার নারীবাদীদের সাম্যের ধারণা আর বলিভিয়ার শ্রমজীবী নারীদের সাম্যের ধারণা তো এক না। (এই নিয়ে উইম্যান চ্যাপ্টারেই আমার আরেকটা লেখা আছে, নিচে দেয়া হলো)।

না, পশ্চিমা নারীবাদীরা নারীর জন্যে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করেন সেগুলিও বৈধ আছে, সেইগুলিকে আপনি অস্বীকার করতে পারেন না। আর আমাদের এখানে নারীবাদী নারীরা আমাদের সমাজে নারীর যেসব বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করেন সেগুলিও বাস্তব সমস্যাই বটে। গণপরিবহনে প্রতিদিন নারীর প্রতি যে অত্যাচারটা হয়, বা নারীর প্রতি কর্মস্থলে যে সহিংসতা ও বৈষম্য হয় এই সবকিছুই বাস্তব সমস্যা এবং এই সবকিছুরই সমাধান প্রয়োজন। কিন্তু যেই আলোচনাটা আমরা সধারণত করি না, বা প্রতিদিন করি না, সেটা হচ্ছে শ্রমজীবী নারীর সমস্যা, দারিদ্র্য কীভাবে নারীর প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে এবং একটি দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো বা ধরনের সাথে নারীর প্রতি বৈষম্যের সম্পর্ক ইত্যাদি। এই আলোচনাগুলি আমরা যতদিন না শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীর রোজকার সমস্যার সাথে যুক্ত করতে পারবো, ততদিন আমরা বৈষম্য থেকে মুক্তির পথ নির্ধারণ করতে পারবো না এবং সেই পথে নারীর সংগ্রামকে পরিচালিত করতে পারবো না। কেননা বৈষম্যের ধরনগুলি ভিন্ন বটে, বঞ্চনার ধরনগুলি ভিন্ন বটে, কিন্তু নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বঞ্চনা ইত্যাদির মূল কারণ যেখানে নিহিত, সেটা হচ্ছে রাষ্ট্র বা সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো বা ধরন।

পশ্চিম থেকে আসা নারীবাদকে আপনি এই কারণেই পূর্ণাঙ্গ নারীমুক্তির লড়াই হিসাবে বা চূড়ান্ত লড়াই হিসাবে চিহ্নিত করতে পারবেন না। সেজন্যে আমি নারীবাদ ও নারীমুক্তির লড়াই এই দুইটা কথাকে আলাদা করছি- নারীবাদ বা ফেমিনিজম বলতে আমি কেবল পশ্চিমা নারীবাদকেই বুঝাবো আর নারীমুক্তির লড়াই বলতে বুঝাবো সেই রাজনৈতিক লড়াইটিকে, যে লড়াইয়ে না জিততে পারলে নারীর চূড়ান্ত মুক্তি হবে না।

(২)
এই দুইটি পথকে যে আমিই আলাদা করে দেখতে চাইছি, সেটা কিন্তু নয়। গত শতাব্দীর শুরুতেই যখন নারীবাদের প্রথম ওয়েভের সূচনা হয়েছিল, তখনই কমিউনিস্ট নারীনেত্রীরা নারীবাদের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করেছিলেন এবং সেইভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিও আলাদা করে চিহ্নিত করেছিলেন।

আপনাদের জানা আছে আধুনিক নারীবাদের সূচনার দিনগুলির কথা। বিলাতে এবং ইউরোপের অন্যান্য দেশে নারীবাদী আন্দোলনের সূচনা হয় ভোটের অধিকারের দাবিতে। খুবই ন্যায্য দাবি। ইউরোপে গণতন্ত্রের বিকাশ হচ্ছে, নাগরিকদের ভোটে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আর নারীরা ভোট দিতে পারবে না- এটা তো কোন কথা নয়। ইউরোপের নারীরা ন্যায্য আন্দোলনে নেমেছেন ভোটাধিকারের দাবিতে। এটা হচ্ছে উনবিংশ শতকের শেষের দিকের আর বিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। সেই সময় আবার ইউরোপে কমিউনিস্ট আন্দোলনের এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেরও বিস্তার ঘটছে। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর প্রথম কথাগুলি মনে আছে না? ইউরোপ ভূত দেখছে, কমিউনিজমের ভূত। কমিউনিস্ট আন্দোলন ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনেও তখন নারীদের অংশগ্রহণ প্রতিদিন বাড়ছিল- বিশেষ করে শ্রমজীবী নারীদের অংশগ্রহণ।

তখন কমিউনিস্ট নারীনেত্রীদের সামনে প্রশ্নটা এসেছে যে এই যে ভোটাধিকারের আন্দোলন করছেন নারীবাদীরা, এটাও তো নারীর সমানাধিকারের আন্দোলন, এই আন্দোলনেই কি তবে নারীদের মুক্তি নিহিত? এই আন্দোলনই কি তবে নারীমুক্তির চূড়ান্ত লড়াই? সেসময় নারী কমিউনিস্টরা নির্ধারণ করলেন যে, না, নারীর ভোটাধিকারের আন্দোলন অবশ্যই আমরা সমর্থন করি, কিন্তু কেবল ভোটাধিকারের আন্দোলনে জয়যুক্ত হলেই তো শ্রমজীবী নারীর মুক্তি আসবে না। শ্রমজীবী নারীর মুক্তি সকল শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির সাথে এক সুতোয় গাঁথা। অর্থাৎ সকল শ্রমজীবী মানুষ যদি শোষণের হাত থেকে মুক্তি না পায়, তাইলে যতই ভোটাধিকার আসুক বা অন্য যেসব অধিকারই আসুক, শ্রমজীবী নারীর কপালে মুক্তি নাই।

তখন নারী অধিকার আন্দোলনের দুইটা ধারা সৃষ্টি হলো। একটা তো ফেমিনিস্ট আন্দোলন, যারা পুঁজিবাদী সমাজ বজায় রেখেই নারীর অধিকার আদায় সম্ভব বলে মনে করতো। আরেকটা ছিল সমাজতান্ত্রিক নারী অধিকার আন্দোলন বা নারী মুক্তির লড়াই, যারা মনে করতো পুঁজিবাদী সমাজ বজায় রেখে নারীর চূড়ান্ত মুক্তি হবে না। এই সমাজতন্ত্রী নারী আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন ক্লারা জেটকিন। ক্লারা জেটকিনকে আপনাদের চেনার কথা। আজকে যে প্রতিবছর ৮ই মার্চ তারিখে আমরা আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করি, এই নারী দিবসের প্রস্তাবনা ও প্রবর্তন ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বেই হয়েছিল। ১৯১০ সনে কোপেনহেগেন শহরে বিশ্বের শতাধিক দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে সমাজতন্ত্রী শ্রমজীবী নারীদের একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই নারী দিবসের প্রস্তাবটা গৃহীত হয়, সেইটাই পরে ১৯৭৫ সনে জাতিসংঘ গ্রহণ করে নেয়।

(৩)
ক্লারা জেটকিন একটা পাক্ষিক কাগজ সম্পাদনা করতেন, জার্মান ভাষার কাগজটার নাম ছিল Die Gleichheit, বাংলা করলে এটার নাম নয় ‘সাম্য’। এই কাগজটাই তখন বিশ্বজনীন সমাজতন্ত্রী শ্রমজীবী নারীদের সংগঠনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ১৯১৪ সন নাগাদ ক্লারা জেটকিনদের এই সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল পৌনে দুই লাখের মতো। ক্লারা জেটকিন এবং ওদের এই সংগঠনটির কথা বিশেষ করে বলতে হয়, তার কারণ এরাই শ্রমজীবী নারীদের মধ্যে বিপ্লবের চেতনাটা জাগ্রত করেছিল সর্বত্র। বিশ্বের প্রথম সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব যেটা হয়েছিল ১৯১৭ সনে রাশিয়ায়, সেই বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল তৎকালীন রাশিয়ার পেত্রোগ্রাদ শহরে নারীদের একটা কর্মসূচি দিয়েই- সেটা ছিল ওদের নারী দিবসের কর্মসূচি।

এই সমাজতন্ত্রী শ্রমজীবী নারীরা নারীর ভোটের অধিকারের দাবিটাকে সামনে রেখেই আন্দোলন করে যাচ্ছিল বটে, কিন্তু ওদের আন্দোলন কেবল ভোটের অধিকারের মধ্যে সীমিত ছিল না। ওদের আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল পুঁজিবাদী সমাজ ভেঙে ফেলা। এইজন্যে ওদের সাথে সেই সময়ের নারীবাদীদের বা ফেমিনিস্টদের পথেরও পার্থক্য ছিল। ফলে একসময় একসাথে চললেও একটা পর্যায়ে এসে সমাজতন্ত্রী শ্রমজীবী নারীরা ফেমিনিস্টদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করে। এইটাকে ক্লারা জেটকিন বলেছিলেন ‘A Clean Break’ বা পরিষ্কার বিচ্ছেদ। এরপর নারীবাদীদের পথ আর সমাজতন্ত্রীদের পথ আলাদা হয়ে যায়। সমাজতন্ত্রী শ্রমজীবী নারীরা মার্ক্সবাদী আদর্শে সমাজ পরিবর্তনের পথে ওদের লড়াইকে পরিচালিত করে, আর সেই লড়াইয়ে শ্রমজীবী নারী ও শ্রমজীবী পুরুষরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেয়। আর ফেমিনিস্ট আন্দোলন সেই ফার্স্ট ওয়েভ থেকে আজকের এই থার্ড ওয়েভ পার হওয়া পর্যায় পর্যন্ত এসে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রিটিক্যাল প্রজেক্টেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

আধুনিক ফেমিনিস্ট আন্দোলন ও নারী অধিকার লড়াইয়ের সেই সূচনাকাল থেকে অদ্যাবধি এই দুইটা ধারা এখনও অব্যাহত রয়ে গেছে। এই বিভাজনটা ১৯৭৫ সনের জাতিসংঘের উদ্যোগে সকলকে নিয়ে যে নারী দশকের সূচনা হয় সেই সূচনাতেও লক্ষ্যণীয় ছিল। ১৯৭৫ সনে মেক্সিকোতে বক্তৃতা দিতে এসে ডমিটিলা চুঙ্গারাকে সেজন্যে আমরা বলতে শুনি যে, ফেমিনিস্টদের আন্দোলন আর শ্রমজীবী নারীর আন্দোলন এক নয়। আমেরিকার নারীবাদীদের দেখে ওদের সাথে কথা বলে চুঙ্গারার মনে হয়েছিল যে, এইসব স্বচ্ছল ঘরের বিত্তবান নারীদের অধিকারের আন্দোলন যেন পুরুষের সাথে সমান তালে মদ্যপান ও বিড়ি খাওয়াসহ ঐসব করার অধিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

চুঙ্গারার এইরকম মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। কারণ ফেমিনিস্টরা যারা আমেরিকা বা অন্যান্য দেশ থেকে গিয়েছিল, ওদের সেসব দাবি-দাওয়া, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ইত্যাদি তিনি শুনেছেন সেসবের মধ্যে তিনি শ্রমজীবী নারীর মুক্তির কথা শুনতে পাননি। তিনি তো জানেন যে পুঁজিবাদ শ্রমজীবী নারীকে যেসব শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে সে কেবল শ্রম শোষণে সীমাবদ্ধ নয়- নারীর প্রতি সকল বৈষম্যই কোন না কোনোভাবে পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামো থেকেই উৎসারিত অথবা পুঁজিবাদ কর্তৃক সুরক্ষিত। অথচ নারীবাদীদের মুখে এই সমাজ বদলের কোন কথাই নেই?

(৪)
আজকে বাংলাদেশে আমরা ঠিক এই দুই পথের মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছি। আমাদের দেশে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে একটা নারীবাদী চেতনার বিকাশ হয়েছে। নানা পথ, নানা মত ও নানা গ্রুপে এরা বিভক্ত বটে, কিন্তু সকলকে যোগ করলে এইসব নারীবাদী বন্ধুদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। আমার হিসাবে আমাদের তসলিমা নাসরিনের হাত ধরে, ওঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে এবং ওঁর অনুপ্রেরণায়ই আমাদের বর্তমান যে নারীবাদী আন্দোলনটা আছে সেটার বিকাশ হয়েছে। এই আন্দোলনটা এখনও পর্যন্ত কমবেশি পশ্চিমা ধারার নারীবাদী আন্দোলনের পথেই আছে। দেশের নারীদের সমস্যা নিয়েও ওরা কথা বলেন বটে, দেশের প্রেক্ষাপটেই ওদের আলোচনা বিস্তার লাভ করে- কিন্তু মূল চেতনাটা পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলির নারীবাদী আন্দোলন থেকেই উৎসারিত। এর একটা ফলাফল হয়েছে যে আমাদের দেশের যে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী নারীরা আছে, ওদের সংকট সমস্যা এবং সেসব সংকট থেকে উত্তরণের আলোচনা আমাদের নারীবাদীদের আলোচনায় সেইভাবে আসে না।

আবার শ্রমজীবী নারীদের সমস্যা সংকট নিয়ে যেসব সংগঠন কাজ করে, বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নগুলি, কমিউনিস্ট পার্টি এরা- এরা আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীবাদীদের সাথে ঐরকম ‘ক্লিন ব্রেক’ ঘোষণা না করলেও আবার ওদের সাথে একসাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে কাজ করেন সেটাও ঠিক না। শ্রেণিগত অবস্থান প্রশ্নে ওদের অবস্থান ঠিকই আছে, যুক্তিযুক্ত আছে বটে- সেই ব্যাখ্যাটা তো খুবই স্পষ্ট আরকি। আবার আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীবাদীরা একটা ‘হ্যাপি টু ব্লিড’ ক্যাম্পেইন বা ভারতের ‘পিঙ্ক চাড্ডি ক্যাম্পেইন’ এর মত কর্মসূচিতে যেভাবে কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সাড়া দেন, আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে নারী শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়ার আন্দোলনে সেইভাবে সাড়া দেওয়া তো দূরে থাক, কণ্ঠ খুলে দুইটা কথাও বলেন না।

শ্রেণিগত অবস্থানের কথা যেটা বলেছি সেটা তো বাস্তব সত্য আরকি। একজন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীবাদী বা একজন স্বচ্ছল ঘরের নারী যিনি নিজেকে নারীবাদী বলেন, তিনি তো শ্রেণিগতভাবে নারী শ্রমিক বা নারী চাষীর সাথে এক শ্রেণিতে পড়েন না। সুতরাং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীবাদী নারী শ্রমিকের পাশে দাঁড়াবেন না এটাই স্বাভাবিক। এমনকি এদের কেউ যদি নিতান্ত মানবিকভাবে নারী শ্রমিকদের দুঃখ দুর্দশায় কাতরও হয়ে থাকেন, তিনিও দেখবেন যে নারী শ্রমিকদের জন্যে কল্যাণের কথা হয়তো বলবেন, কিন্তু অধিকারের কথা চট করে বলবেন না। এই শ্রেণী ব্যাবধান থেকে নারীবাদীদেরকে বের করে আনতে হলে সেই চেতনাটা নারীবাদীদের মধ্যে থাকতে হবে- যে চূড়ান্ত নারীমুক্তি কেবল সীমিত অধিকারের নারীবাদী আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে অর্জন করা সম্ভব নয়।

(৫)
এই চেতনাটা- পশ্চিমা অর্থে নারীবাদী থেকে পরিপূর্ণ নারীমুক্তির লড়াইয়ের সৈনিকে উত্তীর্ণ হওয়ার চেতনাটা- এটা ছড়িয়ে দেওয়া খুব সহজ কাজ নয় বটে, কিন্তু খুবই জরুরি একটা কাজ। কেননা যতদিন পর্যন্ত না সমাজ বদল হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আপনি যতই ফেমিনিস্ট আন্দোলন করতে থাকেন, মুক্তি তো হবে না। আপনি যতই লিখবেন ফেমিনিস্ট লিটারেচার বাড়তে থাকবে, বইয়ের পর বই যুক্ত হবে, শোষণ বঞ্চনার রূপ পরিবর্তন হতে থাকবে- কিন্তু মুক্তি হবে না। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা নারীকে কেবল একটি পণ্য বিবেচনা করে, পুঁজিবাদে নারীর অবস্থান ঐটাই- পণ্য। আপনি শ্রমিক হলেও পণ্য, সাংবাদিক হলেও পণ্য, অধ্যাপক হলেও পণ্য। আর এইটাই তো আপনার শৃঙ্খল- সমাজ আপনাকে মানুষ বিবেচনা করে না, সমাজের চোখে আপনি কেবলই একটি পণ্য বা, কলোকিয়াল ভাষায় বললে, মাল। তাইলে চূড়ান্ত মুক্তি পেতে হলে তো আপনাকে সমাজটাই ভাঙতে হবে।

নারীবাদীদের কাছে এই কথাটা নিয়ে গেলে ওরা এটা না বোঝার কথা নয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীবাদীদের বেশিরভাগই অধিকার সচেতন এবং লড়াকু মানসিকতা ধারণ করেন। ন্যুনতম একটা মানবিক চেতনা ওদের মধ্যে রয়েছে। সমাজ বদল না হলে যে নারীর চূড়ান্ত মুক্তি ঘটবে না সমাজবিজ্ঞানের এই অমোঘ বাস্তবতাটা তো ওদের না বোঝার কথা নয়। সেই সাথে আবার নারীবাদীদের দাবি দাওয়াগুলিকেও নারীমুক্তির লড়াইয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে হবে। আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীবাদীরা যেসব ইস্যু নিয়ে মাঝে মাঝে ক্যাম্পেইনের মতো তৈরি করেন সেগুলি হয়তো শ্রমজীবী নারীর জন্যে গুরুত্বের বিচারে আশু জরুরি কোন দাবি মনে নাও হতে পারে। ক্ষুধার্ত নারীর জন্যে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য, স্বাস্থ্যসম্মত মাসিকের অধিকার খুব জরুরি মনে নাও হতে পারে, কিন্তু দাবিটা তো নিতান্ত গুরুত্বহীন নয়।

শ্রেণির সীমানা পার হয়ে নারী ঐক্য বা মেলবন্ধন এটা খুবই জরুরি এবং অসম্ভব কিছু নয়- খুবই সম্ভব। ভেবে দেখুন, এটা ঘটানো গেলে নারীমুক্তির লড়াইটা কতোটা বেগবান হবে?

এই সিরিজের আগের কিছু লেখার লিংক:

১. ডমিটিলা চুঙ্গারা এবং নারীবাদী আন্দোলন https://womenchapter.com/views/34623

২. নারীবাদী আন্দোলনে ‘পিঙ্ক চাড্ডি’ পরিপ্রেক্ষিত https://womenchapter.com/views/35026

 

লেখক পরিচিতি: এডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.