মেয়েদের কিছু মনের অসুখ, গুরুত্বহীনতায় মৃত্যুও ঘটাতে পারে

প্রান্তী সারোয়ার:

কোন একটা কৌতূহল নিয়ে আমেরিকা প্রবাসী একজন নারীকে পরী (ছদ্মনাম) ফেসবুকে বন্ধু বানাতে অনুরোধ পাঠালাম। ঠিক দুদিনপর তিনি বন্ধু না বানিয়ে সরাসরি আমায় মেসেঞ্জারে কল করলেন। ওপাশ থেকে তার মিষ্টি কণ্ঠটা শুনেই কেনো জানি তাকে ভালো লেগে গেল। এ যেনো প্রথম দেখায় ভালো লাগার মত। আমিও তাকে চিনি না আর সেও আমাকে চেনে না। তবু ফোনের ওপাশ থেকে কথাগুলো শুনে যুগ যুগ ধরে একে অপরের চেনা-জানা মনে হলো। আসলে আপু, আইডি ফেক কিনা সেটা কনফার্ম হতেই আমাকে কল করেন এবং কথা শেষ করেই বন্ধু তালিকায় জায়গা করে দেন।

ছোটবেলা থেকেই খুব কম মানুষের সাথে যোগাযোগ আমার। তবে যাদের সাথে কথা হয় বা যাদের সাথে মিশি প্রত্যেকেই কেনো জানি আমার জীবনের অংশ হয়ে যায়। তাদের ভালোলাগা মন্দলাগা গুলোও আমাকে খুব ভাবায়। যাইহোক কয়েকদিনের মধ্যেই আপু আমার খুব প্রিয় একজন হয়ে উঠেছেন। প্রায় তার সাথে আমার কথা হয়। এমনও হয় কথা বলতে শুরু করলে ২-৩ ঘণ্টা কোথা দিয়ে যেনো চলে যায়। কথা বলতে গিয়ে তার প্রতিদিনের রুটিন দেখতে দেখতে আমিও তাকে সবটা না হলেও কিছুটা জেনেছি।

দেখতে শুনতে বেশ সুন্দরী, শিক্ষিতা, রুচিশীল আধুনিক তবে ওভারস্মার্ট নয়। সবচেয়ে বড় কথা তিনি খুব আদুরে মা, আর স্ত্রী। কারো উপর রাগ হলে ওয়াশরুমের দরজা আটকে পানি ছেড়ে কান্না করে আবার ফ্রেশ হয়ে হাসিমুখ নিয়ে বেরিয়ে আসেন সেখান থেকে। এগুলো তার কাছ থেকে জেনেছি তা নয়, তার কোনো এক শুভাকাঙ্ক্ষীর মুখ থেকে কথাগুলো আসার শোনা। এরপর কথা বলতে বলতে তার শুভাকাঙ্ক্ষীর চেয়েও যেনো তাকে আমি বেশি ভালো জেনে ফেলেছি এবং কথাগুলোর সত্যতা পেয়েছি। সব মিলিয়ে আপন করে নেওয়ার গুনটা তার ভেতর একদম উপরওয়ালা নিজ হাতে যেন তুলে দিয়েছেন।

ফেসবুকে তিনি মোটেই অ্যাক্টিভ না, এই আসে এই ৩-৪ দিন খবর নেই। তবে অনলাইনে এলেই আমাকে একটা নক দেন। মোটামুটি ভালোই শেয়ারিং-কেয়ারিং চলে। এমনটা করতে করতে প্রায় বছরখানেক চলে গেছে। এই কথার মাঝে কখনওই তিনি তার সংসার নিয়ে সমালোচনা করেননি। তার স্বামী আমেরিকাতে বড় একটা কোম্পানিতে অনেক ভালো পদে চাকরি করেন। সেখানের দুই অঙ্গরাজ্যে তাদের দুটো বাড়ি আছে। যাই হোক প্রথম শ্রেণির লাইফস্টাইল তাদের।

কয়েকদিন কথা হয় না, মাঝে মেসেজে একবার বলেন, আপু, আমি খুব ডিপ্রেশনে আছি তোমায় পরে বলবো। এর ২-৩ দিন পরে একদিন আমি অফিসে, সকাল ১১ টার দিকে হঠাৎ তার ফোন আসে। ফোনটা ধরে ২-৩ মিনিট কথা বলার পরই মনে হলো তার কিছুটা সময় আর কিছু কথা বলা দরকার। অফিসের কাজ ফেলে নীরব জায়গায় চলে যাই। প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কথা বলি, খুব কাঁদছিল সেদিন। আর তার কথাগুলো শুনে আমার শুধু মনে হচ্ছে মেয়েদের জীবনটাই বুঝি এমন। আর যদি ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়ে হয় তাহলে তো কথাই নেই। ব্রোকেন ফ্যামিলির মেয়েদের জীবন বুঝি জাহান্নামের মতই।

(কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে। সেই ব্যতিক্রমী মেয়েদের জীবন-যাপন আমার চেতনার মধ্যে পড়ে না।)

আপুও আমেরিকাতে চাকরি করতেন, কিন্তু পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে আর স্বামীর কথায় চাকরি ছাড়তে তিনি বাধ্য হয়েছেন। কারণ তার স্বামীর বড় পদের চাকরির কাছে তার পদটা হয়তো খুব মানানসই ছিল না। এখন বয়স খুব বেশি তা নয়, তবে দীর্ঘদিন চাকরি না করতে করতে পারবেন না কিছু করতে এমন ধারণা সৃষ্টি হয়েছে তার। তার সংসারে কোনো ঝামেলা হোক তা তিনি চান না। আর তাই স্বামীর কু-চাহিদা মেটানোর জন্য নিজের বাড়িতেও তিনি যেতে পারেন না। কারণ তার স্বামী চান না যে তিনি মায়ের বাড়িতে যান। আর সেই স্বামী কিনা তাকে যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করে।

আসলে এমন কিছু ঘটনা আছে যেটা পুরুষরা চোখে দেখেও মনে ধারণ করতে পারেন না। এমন কিছু কথা হয়তো বলেই ফেলেন যাতে সঙ্গীর আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নিতে মনটা প্রতিনিয়ত খোঁচাতে থাকে। আমেরিকার মত দেশে থেকেও আপু, তার মা-আর বোনের জন্য কোনো টাকা বা উপহার দিতে পারেন না। অথচ আত্মীয়-স্বজন তাকে বয়কট করেছেন। সে এত ধনী অথচ সাহায্য করে না ভাবনায়। তার মা বোনকে বয়কট করেছে আমেরিকা প্রবাসী মেয়ে বুঝি লুকিয়ে টাকা পয়সা দেয় আর তারা সেটা স্বীকার করে না বলে। আর ওপাশ দিয়ে মেয়েটি সুখে থাকার অভিনয় করতে করতে ক্লান্ত আর ডিপ্রেসড।

অনেক ঘটনা যা লিখতে গেলে অনেক বড় হবে তাই, আর সবটা বললে হয়তো তার প্রাইভেসি নষ্ট করা হবে। তাই ছোটখাটো কিছু ঘটনা বলি, তার স্বামীর টাকা-পয়সার কম নেই অথচ আপুর খরচের স্বাধীনতা নেই। যখন দেশে আসেন ভাইয়া হয়তো তার দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের জন্যও প্রচুর গিফট কিনছেন, সেখানে আপুর মা-বোন আর পরিবারের কথা বলেনও না। হয়তো সর্বোচ্চ ১০ ডলারের একটা চকলেটের রো-তে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলেন এখান থেকে তোমার যেটা পছন্দ তার এক প্যাকেট নিয়ে নিও। অপমান-যন্ত্রণা আর আত্মসম্মানে আপু সেটাও নিতে পারেন না। আমেরিকা থেকে খালি হাতেই যান তার পরিবারের কাছে। তার নিজের জন্য কিছু কিনতে গেলেও স্বামীর কৈফিয়তে জর্জরিত হন তিনি। হাই সোসাইটে থাকেন বলে কষ্টগুলো নীরবেই সহ্য করতে হয় তাকে।

কিছু ঘটনা বলে আপু কাঁদছে আর বলছে জানো, আমার মাঝে মাঝেই মনে হয় আমার বাবা থাকলে হয়তো জীবনটা এমন হতো না, তিনি আমার স্বামীকে বলতেন তোমার সাথে রাখবো না আমার মেয়েকে। আমার মেয়েকে এমন অপমান করার স্পর্ধা কী করে হয় তোমার! কিন্তু সেটা নেই, আর কোনো গার্জিয়ান নেই বলেই যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করার সাহসটা পাই। কারণ পরিবারে এখন যারা আছে তারা আমাকে কখনও আলাদা হতে সাপোর্ট করবে না। আমার সাপোর্টটা খুব দরকার, কিছু না হোক একটু ভরাসার কথাটাই দরকার।

এরকম ছোটখাটো হাজারও অপমান একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই অনুভূতিগুলো যে স্বামীরা বোঝেন না তাদেরও মাথায় রাখা উচিত তার নিজের মেয়ের সাথেও এমন ঘটনা কিন্তু ঘটতে পারে। স্ত্রী পর কেউ নয়। সারাক্ষণ আপনারই বাসার কাজ করে, আবার প্রতিনিয়ত আপনার মানসিক আর শারীরিক শান্তিরও খোরাক হন। কত যত্নে রাখে সেটা পাশে থাকে বলেই হয়তো আন্দাজ করতে পারেন না। কয়েক বছর পূর্বে ব্যাচেলর জীবনের কথা ভাবুন তো, কেমন ছন্নছাড়া জীবন কাটাতে হতো, বুয়ার হাতের খাবার আর নোংরা ছারপোকা লাগা পোশাকে দিন পার হয়ে যেতো!

একজন স্বামীর পরিবার স্বজন, বন্ধু আছে, একজন স্ত্রীর কি থাকতে পারে না? তার হাত খরচের টাকা চাইতে কেনো হবে? মাস গেলে নিজে আন্দাজ করে তার হাতে তুলে দিতে পারেন না? আপনার টাকা আপনার স্ত্রী গোছাবে ছাড়া ওড়াবে না। (ব্যতিক্রম নারীদের কথা এখানে টানছি না)। আর পরিবারেরও একটা মেয়েকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা উচিত। সে কত বড়লোকের কাছে থাকে ডিভোর্স হলে মানুষ কী বলবে এসব না ভেবে মেয়েটার কথা ভাবা উচিত। এরকম সময়ে একটা মেয়ে হয়তো একটু ভরসা খুঁজে। সেটা না পেলে আত্মহত্যাও করে বসতে পারে। তাই সমাজ কী বলবে, মেয়ের ভবিষ্যতে কী ঘটবে সেসবে চিন্তা না করে মেয়ের বর্তমান নিয়ে ভাবুন মেয়েটা সত্যিই কী চাইছে! ভুল হলে বোঝান, আর সঠিক ডিসিশন হলে তার কথাটার গুরুত্ব দিন, সমাধান না দিতে পারলেও মেয়ের পাশে ঢালের মতো হয়ে দাঁড়ান।

একটা আদর্শ মেয়ের দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে কখনও বিচ্ছেদের রাস্তায় পা বাড়াতে চায় না। একটা মেয়ের জীবন শেষ করতে সমাজ, পরিবার, আর স্বামীর ভূমিকাই যথেষ্ট আর কিছুর দরকার পড়ে না। আবার একটা মেয়ের জীবন সুন্দর আর সুখে ভরে দিতে শুধু স্বামীর ইতিবাচক ভূমিকাই যথেষ্ট।
এরকম ঘটনা শুধু আপুর সাথে ঘটছে তা নয়, অহরহ মেয়েদের বিয়ে পরবর্তী জীবনের সমস্যা এটাই। হয়তো কারো কারো ক্ষেত্র সমস্যাটা কম বা বেশি অথবা ভিন্ন। কিন্তু অধিংকাংশ ক্ষেত্রেই বিয়ের পরে মেয়েদের জীবনে ভর করে এরকম অনেক মানসিক যন্ত্রণা। তাই সকলের মানবিক হওয়াটা জরুরি।

প্রান্তী সারোয়ার
বার্তাকক্ষ সম্পাদক, সময় টেলিভিশন
ইমেইল: [email protected]

শেয়ার করুন:
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.