হারজিৎ

সোহানা খাতুন:

-‘দ্যাখ রেবা, আমি তোরে পষ্ট কইরা কইয়া দিতাছি, এইসব বেলেল্লাপনা এইখানে চলবো না। এরপর আর কখনও যদি ওই পোলা এই বাড়িতে আসে, তাইলে আমি বাড়ি ছাইড়া চইলা যাবো।’ বলেই আসমা বেগম ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলেন। রেবা বোকার মতো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইলো। প্রতিদিনই কিছু না কিছু নিয়ে তাদের খিটমিট লেগেই রয়েছে। রেবার কোন কাজই যেন আসমা বেগমের পছন্দ হয়না। আর পারছে না রেবা। মাঝে-মধ্যে মনে হয় এখানে আর থাকবে না। অন্য কোথাও বাসা ভাড়া নেবে। কিন্তু দিনশেষে মায়ের ওই ঝালমেজাজ দেখার জন্যই ওর মন কেমন করে। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে অফিসে বের হওয়া পর্যন্ত, আবার অফিস থেকে বাসায় ফিরলেই শুরু। রেবার অভ্যেস হয়ে গেছে, কিন্তু আজ একটু বেশিই হয়ে গেল।

মনন ওর খুব ভালো বন্ধু। সুখে, দুঃখে সবসময়ই ওকে পাশে পেয়েছে রেবা। এইতো গেলো বছর মায়ের হার্টের একটা বড় অপারেশন হলো। অফিসের কাজ ফেলে হসপিটালে দৌড়াদৌড়ি, ওষুধ-পত্র কিনে আনা, সময়-অসময়ে ডাক্তার-নার্সদের ডেকে আনা, সবকিছু করেছে মনন। তবুও কেন যেন মা মননকে দুইচোখে কাটেন না। এ নিয়ে প্রায়ই মায়ের সাথে রেবার ঝগড়া বাঁধে। মননকে জড়িয়ে যা তা বলেন তিনি রেবাকে। তবে আজ সত্যিই রেবা মা’র কথায় খুব কষ্ট পেয়েছে। ওর এগারো বছরের মেয়ে রুলি সব শোনে। কে জানে হয়তো নিজের মায়ের বিরুদ্ধে ওর মনে একটা বিদ্বেষও তৈরি হয়! এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না।

রেবা আসমা বেগমের ঘরের দরজায় মৃদু টোকা দিয়ে বললো- ‘মা, শুনছো? আমি আজই এখান থেকে চলে যাবো, তুমি আর রাগ করো না, এসো, ইফতার করে নাও।’
এরকম হুমকি রেবা আগেও দিয়েছে। তাই আসমা বেগম বিচলিত হলেন না, দরজা না খুলেই চেঁচিয়ে বললেন, ‘এখনই যা তুই। দরজা খুইলা যেন তোর মুখ আর দেখতে না হয়।’

-‘এখন এই সন্ধ্যেবেলা কীভাবে যাবো মা? ইফতারের পরই আমি চলে যাবো। তুমি অন্তত পানিটা একটু মুখে দাও।’ ওপাশ থেকে আর কোন সাড়া পাওয়া গেল না। রেবা আরও কয়েকবার ডাকলো, কিন্তু লাভ হলো না। হাল ছেড়ে দিয়ে সে রুলিকে ইফতার সাজিয়ে দিয়ে নিজে শুধু শরবতটা খেয়ে ঘরে গেল। এই মুহূর্তে এমন কোন জায়গার কথা মনে পড়লো না যেখানে মেয়েকে নিয়ে সপ্তাহখানেকের জন্য উঠতে পারে। মননকে জানাবে? নাহ্, থাক। বেচারা এমনিতেই যত ঝামেলায় থাকে, ওকে আর এসবের মধ্যে টানার দরকার নেই। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রেবা খাটের নিচে থেকে ট্রলি ব্যাগ দুটো বের করে ধূলা ঝাড়তে লাগলো।

আজ প্রায় পাঁচ বছর হলো সে আসমা বেগমের কাছে উঠেছে। বাড়ির জমিটা আসমা বেগমের বাবা তার জামাইকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। রেবার বাবা তার উপরি উপার্জন থেকে এই ছোট্ট একতলা বাড়িটা করেছিলেন। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আসমা বেগম একাই থাকতেন। বাবার পেনশনের টাকায় তার ভালোভাবেই চলে যায়। রুলির বাবার সাথে ডিভোর্স হয়ে যাবার পর মেয়েকে নিয়ে রেবা আসমা বেগমের কাছে আশ্রয় নেয়। প্রথমদিকে রেবা ভেবেছিল মায়ের কাছে সে নিঃসঙ্কোচে থাকতে পারবে। তাছাড়া সে নিজে চাকরি করে। ভাত-কাপড়ের জন্য তাকে তো আর মায়ের মুখাপেক্ষি হতে হবে না। মাও একা থাকেন। ওরা সঙ্গে থাকলে হয়তো খুশিই হবেন। কিন্তু কেন যেন আসমা বেগম শুরু থেকেই রেবার এই সিদ্ধান্তগুলো মেনে নিতে পারেননি। তার ধারণা, রেবা তার স্বেচ্ছাচারী স্বভাবের কারণে স্বামী-সংসার ছেড়ে চলে এসেছে। সেই তার স্বামীর সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি।

মননের এবাড়িতে আসা যাওয়া শুরু হলে তাঁর সে ধারণা আরও বদ্ধমুল হয়। এজন্য তিনি কথায় কথায় রেবাকে খোঁচাতেন। মননের সাথেও রেবার সম্পর্ক যে শুধুই বন্ধুত্বের, তা নয়। অন্তত মননের দিক থেকে তো নয়ই। একই কলেজে পড়ার সুবাদে ওদের অনেকদিনের পরিচয়। তখন থেকেই রেবার প্রতি মননের একধরনের অদ্ভুত মুগ্ধতা কাজ করতো। রেবাও যে বুঝতো না তা নয়, কিন্তু মনন তার ভালোলাগা কখনও প্রকাশ করেনি বলে রেবাও আর তেমন একটা গা করেনি। এমন তো কতই থাকে, কতজনকে পাত্তা দেবে সে। এরপর রেবার বিয়ে হয়ে গেল, মননও তার মন থেকে মুছে গেল। ছাড়াছাড়ির পর নিজের বাড়িতে ফিরে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল রেবা। ভেবেছিল ছোটবেলার ফেলে যাওয়া স্মৃতিগুলোর মাঝে নিজেকে আবার নতুন করে আবিষ্কার করবে। কিন্তু তার সেই অভিলাষ আসমা বেগমের নিত্যদিনের তীর্যক ঝাঁঝালো কটুক্তিতে তিক্ত হয়ে উঠেছে।

অবশ্য এতোকিছুর মাঝেও মননের সাহচর্য ওর মনে এক ধরনের প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়। তবে সেটা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জাগতিক অনুভূতির অনেক উর্ধ্বে। মননের মাঝে তার স্বাধীনচেতা মনের অব্যাক্ত অভিলাষগুলো অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। রেবার দমবন্ধ গুমোট জীবনে মনন যেন এক পশলা হিমেল বৃষ্টি। এই বেলা অবশ্য মনন আর তার ভুলের পুনরাবৃত্তি করেনি। রেবা ফিরে আসার এক বছরের মাথায় সে তাকে তার অনুভুতির কথা জানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু রুলি, আসমা বেগম, সমাজ এরা কীভাবে নেবে, তাই ভেবে রেবা শুধু বলেছিল, ‘কচুপাতায় কি কখনও জল আটকায়, মনন?’ উত্তরে মনন বলেছিল, ‘না, তবে কচুপাতাকে একটু কায়দা করে মুড়িয়ে নিলে তাতে কিন্তু অনেকটা জল ধরে।‘

রেবা আর কিছু বলতে পারেনি। স্বামীকে ছেড়ে আসার যে সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে তা সমাজের প্রচলিত ধারার বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা। সেই যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি তার। ঘরের বাইরে বেরুলেই লোকজনের কপট মায়াভরা মুখে একটুখানি ‘চুকচুক’, আর পরক্ষণেই আড়ালে গিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়া, এসব দেখতে দেখতে রেবা ক্লান্ত। ভেতরে ভেতরে যেন একটু দুর্বলও হয়ে পড়েছে। এমন আর একটা সিদ্ধান্ত সহসা নেবার মতো সাহস তার মধ্যে এখনও তৈরি হয়নি। বিশেষ করে রুলি মননকে গ্রহণ করতে পারবে কিনা সেটাই রেবার প্রধান ভয়। রুলিই এখন তার সব। ওকে নিয়ে কোন ঝুঁকি সে নিতে পারবে না।

মননও গোঁ ধরে বসে আছে। রুলিকে সে যেভাবেই হোক বোঝাবে। তাই সে হাজার কাজের ব্যস্ততার মাঝেও রুলির সাথে সময় কাটায়। ওকে স্কুল থেকে আনা-নেওয়া, ওর সাথে গল্প করা, বই পড়া, পার্কে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, আইসক্রিম, চকোলেট ইত্যাদি কিনে দেওয়া, আরও নানাভাবে মনন রুলির সাথে ভাব গড়ে তোলার চেষ্টা করে। রুলি মননকে পছন্দ করে কিনা তা ওর মুখ দেখে বোঝা যায়না। রেবা একদিন মজা করে বলেছিল- ‘হ্যাঁরে রুলি, মনন মামাকে তোর কেমন লাগে?’
রেবা ভেবেছিল রুলি খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বলবে যে মননকে তার খুব পছন্দ। পক্ষান্তরে ও বই থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, – ‘হুম।’
– ‘হুম কিরে? ভালো লাগে, না খারাপ লাগে?’
রুলি আর কোন উত্তর না দিয়ে আবার বইয়ের পাতায় ডুবে গিয়েছিল। রেবা আর কিছু না বলে উঠে চলে এসেছিল।
আজ তাই মনে মনে সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে, এখানে আর না। মা, রুলি কেউ যখন মননকে চায়না, তখন মননের কথা সে আর ভাববেনা। আর রোজকার অশান্তি বন্ধ করতে চাইলেও এখান থেকে চলে যাওয়ার বিকল্প নেই।
রেবা ঘর থেকে ট্রলিব্যাগগুলো টেনে ডাইনিং-এ রেখে রুলিকে বলল- ‘খাওয়া শেষ করে রেডি হয়ে নাও মা।’
– ‘কোথায় যাবো মা?’
– ‘এখনো জানিনা মা, তুমি রেডি হয়ে নাও।’
ভেতর থেকে আসমা বেগম মা-মেয়ের কথা শুনে দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। সামনে রাখা ট্রলিব্যাগগুলো দেখে ওনার মুখ শুকিয়ে গেল।
– ‘কই যাইতাছস?’
– ‘দেখি কোথায় যাওয়া যায়।’
– ‘রুলিরে টানতাছোস ক্যান?’
– ‘বারে! আমার মেয়ে আমার সাথে যাবেনা?’
-‘না, তুই কোন জাহান্নামে যাইতে চাস যা। রুলি যাইবনা। তোর মত নষ্টা মাইয়ার লগে থাকলে রুলিডাও নষ্ট হইয়া যাইবো।‘
রেবা রাগত স্বরে বললো- ‘মানে!’
আসমা বেগম গলা দ্বিগুণ চড়িয়ে বললেন-

– ‘মানে আবার কি? তুই ক্যান আমারে ছাইড়া যাইতাছোস আমি জানিনা ভাবছোস? তুই তো যাইতাছোস ঐ মননের লগে ফষ্টিনষ্টি করার লাইগা। এইহানে আমার সামনে এইগুলা করতে পারোসনা। এইজন্যে যাইতাছোস, যাতে কেউ দেখারও না থাকে, কেউ কিছু কওয়ারও না থাকে।’
রেবা কান চেপে ধরে বললো- ‘উফ্, অনেক হয়েছে, মা! এ্যাই রুলি বের হ!’

– ‘রুলিরে নিয়া গেলে আমি কিন্তু বিষ খামু!’
রেবার তাতেও কোন ভাবান্তর হলো না। ট্রলিব্যাগগুলো টেনে নিয়ে বের হতে গেলো। কী বলে রেবাকে নিরস্ত করা যাবে ভেবে না পেয়ে আসমা বেগম তার মোক্ষম অস্ত্রটি ছুঁড়ে দিলেন- ‘অহন বুঝছি, রুলির বাপে তরে ক্যান ছাইড়া দিছে। বউ পর পুরুষের লগে নোংরামি করলে কোন ব্যাডামানুষ কি তা সহ্য করতে পারে? মননের লগে তর মাখামাখি দেইখাই জামাই তরে ঘাড় ধাক্কা দিয়া বাইর কইরা দিছে।’
রেবা আচমকা ব্যাগ রেখে বিদ্যুৎবেগে আসমা বেগমের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো-

– ‘ও, তাই? তাহলে বাবা যে তোমাকে প্রায় প্রতিরাতে কোমরের বেল্ট খুলে পেটাতো, সেটা কি রশিদ মামার সাথে তোমার নোংরামির কারণে?’
হঠাৎ এমন কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন আসমা বেগম। সোফার হাতলটা ধরে কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়েই ধপ্ করে সোফায় বসে পড়লেন। পুরনো ব্যাথাটাকে খুঁচিয়ে দিয়েছে রেবা। এমন যুৎসই পাল্টা আক্রমণ আশা করেননি তিনি। চোখে আঁচল চেপে কান্না শুরু করলেন। রেবা খানিক্ষন ইতস্তত করে মায়ের পাশে গিয়ে বসলো। দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল ও। ছিঃ ছিঃ, মা’কে এমন কথা কিভাবে বলতে পারলো সে! তাও রুলির সামনে! রুলি কি করবে বুঝতে না পেরে দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকলো।

রেবা মায়ের গায়ে আস্তে আস্তে হাত বুলাতে লাগলো। আসমা বেগমের কান্না একটু স্তিমিত হলে রেবা বললো- ‘তুমি তো সবই জানো মা, তবু এসব কেন বলো? বিয়ের পর তো মননের সাথে আমার কোন যোগাযোগই নেই। ওর সাথা আমার আবার দেখা হয়েছে এখানে আসার পর।’ একটু থেমে রেবা আবার বললো, ‘আমি জানি, আমি যদি রুলির বাবার সব ধরনের উদাসীনতা মেনে নিয়ে ওর সাথে ঘর করতাম, তবেই তুমি খুশি হতে। সবাই খুশি হতো। কিন্তু আমার আত্মসম্মান আমাকে তা করতে দেয়নি মা। তোমার মতো আমিও যদি তার সব শারীরিক আর মানসিক অত্যাচার সহ্য করে ওখানেই পরে থাকতাম তাহলে আমি আদর্শ বউ হতাম ঠিকই, কিন্তু আমার আদর্শ যে সে আদর্শের কাছে হার মেনে যেত। মামাতো বোনের সাথে রুলির বাবার আগে থেকেই ভাব ছিল, কিন্তু ওর বাবার জোড়াজুড়িতে ও আমাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। সেই আক্রোশ থেকে হেন অত্যাচার নেই যা সে আমার উপর করেনি। আমি ওর সেই মামাতো বোনের সাথেও কথা বলেছিলাম। লাভ হয়নি। বলেছি তোমরা বিয়ে করে নাও। তা ওরা করবেনা। ওরা ওদের সম্পর্ক এভাবেই চালিয়ে যাবে। দিনরাত এসব সহ্য করে চলেছি আর তোমার কথা ভেবেছি। নিজেকে প্রশ্ন করেছি যে আমার জীবনটাও কি তোমার মতই হবে? নিজের আত্মসম্মান, অহমিকা সব বিসর্জন দিয়ে আমাকেও কি চিরায়ত নারীরুপের ধ্বজা প্রদর্শন করতে হবে? আমার ভেতরের ‘আমি’ তাতে সায় দিলনা মা। তাই সব ছেড়েছুড়ে চলে এলাম। তুমি সবই জোনো, তবুও কেন এরকম বলো?’

– ‘কারণ, তরে আমার হিংসা হয়।’

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলোনা রেবা। অবাক হয়ে বললো- ‘কী হয়! হিংসা!’
– ‘হ, হিংসা করি আমি তরে। তোর মতন সাহস আমি ক্যান করতে পারিনাই তার জন্যে হিংসা। রশিদ ভাইয়ের লগা আমার বিয়া ঠিক হইছিল। আমরা দুইজনেই দুইজনের পছন্দ করতাম। কিন্তু পোড়া কপাল! বিয়ার আগের রাত থেইকা তুমুল বৃষ্টি। রাইতের মইদ্যে সব পানিতে ডুইবা একাকার। রশিদ ভাইগো বাড়িত থাইকা আমাগো বাড়িত আইতে বড় একখান খাড়ি পার হইতে হয়। খাড়িতে পানির স্রোত দেইখা বরযাত্রি আর খাড়ি পার হওনের সাহস করলোনা। তর নানায় ছিল জেদি মানুষ। বিয়া ভাঙতে দিবনা। তর বাপে তখন ছুটিতে আসছিল। আব্বা তর বাপেরে এই বাড়ি ভিটাখান লেইখা দেওয়ার কতা কইয়া আমারে বিয়া করতে রাজী করায়। তর বাপে সবই জানতো। রশিদ ভাই এরপর কয়েকবার আমার শ্বশুড় বাড়িতে গেছে। যতবারই গ্যাছে, বারবার অপমান হইয়া ফিরা আইতে হইছে। তাও যাইতো সে। আমার টানে। হ্যায় জানতো না যে যেদিন হ্যায় যাইতো, হেইদিন তর বাপে আমারে চুলের মুঠি ধইরা দেওয়ালে মাথা ঠুকাইয়া ঠুকাইয়া রক্ত বাইর কইরা দিত। একদিন না পাইরা আমি নিজে রশিদ ভাইরে খুব অপমান করলাম। হেইদিন রাইতেই খাড়ির পানিতে রশিদ ভাইয়ের লাশ পাওয়া গেল। কিন্তু হেই মরা মানুষডারেও তর বাপে রেহাই দিত না। হ্যার সাথে আমারে জড়াইয়া যা তা কইতো। প্রতিদিনের রাগ ওইখানে যাইয়াই ঠেকতো। মাইর সহ্য করতে না পাইরা কতদিন ভাবছি বিষ খামু, কিন্তু তর মুখের দিকে তাকাইয়া আর পারি নাই। এইজন্য তরে দেইখা আমার হিংসা লাগে। তর মতন সম্মানবোধ আমারও ছিল। শুধু তর মতন সাহস আর শক্তি ছিল না। তুই আমারে বারবার মনে করাইয়া দ্যাস যে আমি কত দুর্বল। আমি হাইরা গেছি।’ কথা শেষ করে ফোঁপাতে থাকেন আসমা বেগম।

সব শুনে রেবা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। মানুষের স্বভাবের আর কতরকম দিক এই এক জনমে দেখবে সে? মায়ের এই অনুভূতিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে বুঝতে পারলোনা রেবা। মা-মেয়ের গণ্ডি পেরিয়ে দু’জন যেন আজ দুটো স্বতন্ত্র্য নারীরূপে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এ কোন টানাপড়েনের মধ্যে পড়লো সে? ভাবতে ভাবতে হঠাৎই যেন এক নৈসর্গিক উপলব্ধিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো রেবার চোখমুখ। মায়ের গালদুটো দু’হাতের তালুতে নিয়ে চোখে চোখ রেখে গলার স্বরে মায়া ছড়িয়ে বলল- ‘আমার পাগলী মা! ওটা হিংসা নয়, মা। ওটা তোমার গর্ব, তোমার অহংকার। আসলে আমি ভুল বলেছি। আমাকে রুলির বাবার অত্যাচার সহ্য করে ওখানে পড়ে থাকতে দেখলে তুমি খুশি হতেনা মোটেও। ভেতরে ভেতরে তুমি শেষ হয়ে যেতে। তোমার ভাবনাও একদম ভুল মা। তুমি দুর্বল নও। আর হেরে তো একেবারেই যাওনি। বাবার এতো অত্যাচার সহ্য করেও তুমি কেন পড়ে ছিলে, মা? আমার জন্যই তো? আমি যাতে পড়াশুনা করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারি, তোমার মত আমাকেও যেন কোন হার মেনে নিতে না হয়, সেজন্যই তো? যে সাহস আর শক্তি তুমি আমার মধ্যে দ্যাখো তা তো তোমারই দেয়া উপহার মা। তবে কেন তুমি আমাকে দেখে কষ্ট পাও? আমার জিত যে তোমারই জিত মা, আমিই তোমার জিত!’

(সমাপ্ত)

সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে TESOL-এ দ্বিতীয় স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এরপর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এন্ড টেকনোলজি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ও নর্দার্ন ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশে পূর্ণ ও খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি ফ্রিল্যান্সার অনুবাদক, পাঠ উপকরণ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষক হিসেবে ব্রিটিশ কাউন্সিল এবং অন্যান্য এনজিও সংস্থার সাথে যুক্ত আছেন।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.