নারী ও স্যোশাল ক্যাপিটাল

নাসিমা মুন্নী:

একটা মেয়ে রাস্তা দিয়ে চলাফেরা করার সময় নানা রকম বাজে মন্তব্যের শিকার হয়। দেখা যায়, কোনো মেয়ে বা তরুণীকে তার স্বাভাবিক চলাফেরা বা কাজকর্ম করা অবস্থায় অশালীন মন্তব্য করা হচ্ছে। কখনো ইঙ্গিতপূর্ণ ইশারা দেয়া হচ্ছে, ভয় দেখানো হচ্ছে। অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করে, কোনো অশালীন শব্দ করে, শিস দেয়া হচ্ছে। তাকে বিকৃত নাম ধরে ডাকা হচ্ছে । তার নাম ধরে অকারণে ডাকা হচ্ছে এবং তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তাকে দেখে চিৎকার করা হচ্ছে। যানবাহন বা জনবহুল স্থানে ইচ্ছে করে শরীরের সাথে ধাক্কা লাগানো হচ্ছে। তার দিকে কোনো কিছু ছুঁড়ে দেয়া হচ্ছে। ব্যক্তিত্বে লাগে এমন কোনো মন্তব্য করা হচ্ছে। তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করা হচ্ছে। কখনো পথ আগলে দাঁড়ানো হচ্ছে। চিঠি লিখে পাঠানো হচ্ছে। কখনো প্রেমে সাড়া না দিলে হুমকি প্রদান করা হচ্ছে । পাশাপাশি বর্তমানে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যুগে এর ধরন কিছুটা পাল্টে গেছে। তাই এখন মোবাইল ফোনে, ই-মেইল, ফেসবুকে, মেসেঞ্জারে, হটসআপ, ইমো, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির দ্বারা অভিনব কৌশলে টিজ করা হচ্ছে ।

মানুষ যেখানে ব্যক্তিগতভাবে বিচ্ছিন্ন, পরস্পরের সহযোগিতা যেখানে নিবিড় নয়, সেখানেই বর্বরতা। – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
একটা সময় ছিল, একটা মেয়ে নির্জন রাস্তা দিয়ে একা চলাফেরা করতে ভয় করতো না। দূর- দূরান্তে একা একা পায়ে হেঁটে স্কুল, কলেজে যেত। কখনো কখনো মেয়েটির বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যেত। কোনো অজানা ভয় হতো না। অভিভাবকগণ জানতেন, মেয়েটি নিরাপদে ঘরে পৌঁছবে। কয়েক দশক আগেও রাস্তাঘাটে কোনো মেয়েকে উত্ত্যক্ত করার কথা ভাবতেও ভদ্র ঘরের সন্তানেরা লজ্জা পেতো। এমন অপরাধের খবর অভিভাবকদের কানে গেলে নিজ হাতে শাস্তি দিতেন। প্রতিটি পাড়ায় সামাজিক শাসন ছিল। পাড়ায় মুরুব্বিরা কারোও সন্তানকে অপরাধ করতে দেখলে শাসন করতো। তাইতো তখন কোনো মেয়ে বিদ্রুপের শিকার হতো না। বাজে মন্তব্যের শিকার হতে হতো না। বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অভিভাবকগণ নিরুপায় হয়ে মেয়েদের সঙ্গী হয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মেয়েদের নিয়ে দৌড়াতে হয় স্কুল, প্রাইভেট, কোচিংয়ে।

মেয়েরা যদি চলাফেরার স্বাধীনতা হারায়, আমাদের মেয়েরা যদি পিছিয়ে যায়, যদি সে বন্দি হয়ে রয় ঘরের চৌহদ্দির মধ্যে, যদি তাদের নিয়ে অভিভাবকদের সব জায়গায় যেতে হয়, অভিভাবকদের উৎকণ্ঠায় থাকতে হয়, তবে তাদের শিক্ষাগ্রহণ যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, এতে অর্থনৈতিক উন্নয়নও হতে পারে বাধাগ্রস্ত । উন্নয়নের এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হলে সমাজে নারীর চলার পথ সুগম করতে হবে । এ সমাজ কন্যা সন্তানের বাসযোগ্য ও নিরাপদ রাখতে হবে। এ লক্ষ্যে গ্রহণ করতে হবে উপযুক্ত ব্যবস্থা। তবে এরকম বিস্তৃত অপরাধ সমাজ থেকে দূর করতে সরকারের পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যর সমন্বয়ে ভ্রাম্যমান ফোর্স গঠন করে টহল ব্যবস্থা জোরদার করা যায়। পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব গঠন করেও এসব সমস্যার সমাধান করা যায়।

আমাদের সামাজিক যে মূল্যবোধ ছিল, তা আগের মতো নেই। আগে পড়ায়-মহল্লায়, গ্রামে-গঞ্জে অদৃশ্য এক সামাজিক নিরাপত্তা ছিল। সেটাই আমাদের সামাজিক সম্পদ ছিল। কোনো মেয়ে বাইরে চলাফেরা করার জন্য কোনো অভিভাবক সাথে যাওয়ার প্রয়োজন হতো না। একটা মেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে হয়তো স্কুলে যাচ্ছে, পড়ার উঠতি বয়সী ছেলে থেকে বাবার বয়সীরাও তাকে সহযোগিতা করতো। তারা জানতো মেয়েটা কার মেয়ে বা বড় ভাই থাকলে কার বোন। মেয়েদের প্রতি একটা সম্মান কাজ করতো। কোনো মেয়ে দাঁড়িয়ে রিকশা খুঁজতেছে দেখলে, পাড়ার কেউ রিকশা ডেকে দিত। রিকশাটা গর্তে পড়ে আটকে গেছে দেখলে, রিকশার পেছনে ধাক্কা দিয়ে রিকশা তুলে দিত। এখন রিকশা গর্তে পড়েছে দেখলে হৈ হৈ করে হেসে ওঠে। উঠতি বয়সী ছেলেরা হয়তো ফুটবল খেলছে, পাশ দিয়ে কোনো মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে, ইচ্ছে করে বলটা তার গায়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে । কোনো মেয়ে একা স্কুলে হেঁটে যাচ্ছে , তার পিছু নিচ্ছে তার সমবয়সী কিছু ছেলে। হয়তো প্রেম নিবেদন করছে।

আপনার মেয়ে নেই, ছেলে আছে। তাতে কি আপনি নিশ্চিন্ত? আপনার ছেলে বাইরে গিয়ে কি করছে, কোনো মেয়ের বাবা-মায়ের ঘুম হারাম করছে কিনা? কোনো মেয়ের স্বপ্ন ভাঙার কারণ হচ্ছে কিনা? তা দেখার দায়িত্ব আপনার। সমাজে ক্রমশ এর মাত্রা বাড়তে বাড়তে তা একসময় ধর্ষণ, হত্যার মতো জঘন্য অপরাধে পরিণত হয়। রিশা, তিশা, তনু, সাবরিনা, নুসরাতদের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা, যার সূত্রপাত ইভটিজিং। তাই সময় এসেছে আপনার ভাববার এবং ছেলে সন্তানকে সঠিক শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্বও আপনার।

স্কুল ছুটির পর গার্লস স্কুলের সামনে বা স্কুল যাওয়ার পথটিতে দেখা যায় বয়েজ স্কুলের ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে । ছেলেগুলো হয়তো মেয়েটির দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছে । বা মেয়েটিকে টিজ করছে, মেয়েটি লজ্জায়, রাগে কুকড়ে যাচ্ছে । হয়তো মেয়েটি মুখ ঢাকার চেষ্টা করছে। এসবই ছেলেরা করছে বয়ঃসন্ধির সময়। এ সময় শরীর ও মনের ব্যাপক পরিবর্তন হয়। তা শুধু ডাক্তার না, একজন শিক্ষিত সচেতন মানুষ মাত্রই জানে। এসময় হরমোনাল পরিবর্তন, শারীরিক পরিবর্তন তার মনোজগতও পরিবর্তন করে। শরীর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে মনোজগতে সবকিছু অস্থির, অন্যরকম, অচেনা, অস্বস্তিকর লাগে। সে নিজেও বুঝতে পারে না আর তাই এতে অভ্যস্থও হতে পারে না। অনেক অজানা জিজ্ঞাসা তার মনে আসে, যার উত্তর দেবার জন্য কেউ নেই। তারা হয়ে ওঠে আবেগপ্রবণ। শরীর এত দ্রুত বদলাতে থাকে যে তাল সামলানো কঠিন হয় বা প্রায়ই পারা যায় না। এ সময় ভালোবাসা, স্নেহ, ঘৃণা, রাগ, ভয় ও দুশ্চিন্তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আত্মপ্রকাশ ঘটে। এসব আবেগ কখনো কখনো সংঘাতে রূপ নেয়। এ সময় সংকোচ বা গোপনীয়তা তার ভিন্ন উপায়ে কুশিক্ষা বা অশিক্ষা লাভের পথই খুলে দেয়। স্কুলে এসব শিক্ষা অনেক দেশে চালু হলেও আমাদের পরিবারে বা স্কুলে কোথাও এধরনের শিক্ষা নেই। নারী-পুরুষের প্রতি যে সহজাত আকর্ষণের সাথে সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবীয় আবেগ এবং এর নিয়ন্ত্রণ এসব শেখানো খুব দরকার।

এ সময় মেয়েদের তো ভালো লাগে। এটা হলো বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ। কিন্তু মেয়েদের তো শ্রদ্ধাও করতে হবে। জানা থাকতে হবে মেয়ে বন্ধু, ছেলে বন্ধু- সব মানুষকে প্রথমে শ্রদ্ধা করতে হবে। সুন্দর মেয়ে দেখলেই প্রেম করে বন্ধুদের দেখিয়ে দেবে – এর মতো গাধামি আর কিছুই যে নেই, নিজেকেই নিজে বোকা বানানো ছাড়া কিছুই না, এটাও জানতে হবে। এ সময় মোবাইল ফোনে নিষিদ্ধ কিছু দেখে বিকৃত ধারণা লাভ করে। ফ্যান্টাসি করতে গিয়ে, বাহাদুরি করতে গিয়ে বিপদে পড়ে। ছেলেরা অনেক বেশি করে। মেয়েরা কম। তাই এ সময়ে দরকার সঠিক বিষয়ে জানা। যাতে নিজেও ভুল না করে বসে বা অন্য কারো ভুল থামাতে পারে। আবার না বুঝেই কারো ভুলের শিকার না হয়ে বসে। ছেলেমেয়েরা এই শিক্ষা যেমন পরিবার থেকে পেতে পারে তেমনি বিদ্যালয় থেকেও। আমাদের বাচ্চাদের মাধ্যমিক শ্রেণিতে এ বিষয়ে পাঠ্যপুস্তকে কিছু ধারণা আছে। কিন্তু আমার পরিচিত কিছু অভিভাবকদের জানা আছে, তাঁরা বইয়ের এসব পৃষ্ঠাগুলো পিন দিয়ে আটকিয়ে দেয় বা গাম দিয়ে পৃষ্ঠাগুলো বন্ধ করে দেয়, যেন বাচ্চারা পড়তে না পারে। অভিভাবকদের ধারণা, এসব জানলে বাচ্চারা খারাপ হয়ে যাবে। এদিকে ক্লাসেও শিক্ষকগণ এসব বিষয়ে ব্যাপকভাবে পড়ান না। আলোচনাও করেন না। এতে ছেলেমেয়েদের এ বিষয়ে অজ্ঞতা থেকেই যায়। অজ্ঞতা থেকেই বিপত্তি ঘটে।

আমাদের দেশের শিশুদের কথাগুলো বাবা মায়েরা ঠিকমতো মনোযোগ দিয়ে শোনে না। অনেক মায়েরা আছেন ঘরে বসে থাকলেও বাচ্চাদের সাথে স্কুলে যায় না। প্রাইভেটে যায় না। কোনো খোঁজ খবর নেয় না। শুধু পড়াশোনাই জীবন নয়, এর বাইরেও তাদের অনেক বড় জীবন আছে। নানা দিকে তাদের পদচারণা আছে। ভুল আছে, শুদ্ধ আছে, যার প্রভাব তাদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ জীবনের ওপর পড়তে পারে। এ সময়ে ছেলেমেয়েরা কত রকম সমস্যার মধ্য দিয়ে যায়। কোনো কোনো সময় পরিবারের সদস্যদের বকাবকি ও নিপীড়নমূলক আচরণের কারণে এরা বাইরে জগতে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। এ সময় সন্তানের পাশে থাকা দরকার। ধীরে ধীরে তাদের মগজে ইতিবাচক বিষয়গুলো জানান দেয়া খুব দরকার । সন্তানের দেখাশোনা করার ক্ষেত্রে বাবার ভূমিকা এখানে খুব নগন্য। বাবাদেরও যে সন্তানের সাথে সময় কাটানো দরকার, তা একেবারেই দেখা যায় না। এটা বুঝতে কারোরই কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, সুখী বাবা-মা মানেই সুখী বাচ্চাকাচ্চা। আর সুখী বাবা মায়েরাই পারে বাচ্চাদের সুন্দর আগামী বিনির্মাণ করতে। বাচ্চাদের ভালোবেসে, মাথায় হাত বুলিয়ে কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ শেখাতে। আমার দুরন্ত দামাল ছেলে দুটোর পেছনে সারাদিন দৌঁড়াতে থাকাটা যদিও আমার জন্য ক্লান্তিকর কিন্তু আমি সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দেই সে সুযোগটা তিনি আমাকে দিয়েছেন।

অস্থির সময় পার করছি আমরা। আমাদের পারিবারিক মূল্যবোধগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একমাত্র পরিবার থেকেই নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে পুত্র সন্তানদের শিক্ষা দিতে হবে। একটি সন্তান যে পারিবারিক আবহে বড় হয়, তার প্রভাব পড়ে তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে প্রতিটি পরিবার। কারণ পরিবার থেকেই ভালো মন্দের তফাৎ বা নৈতিক শিক্ষার প্রাথমিক ধারণা পেয়ে থাকি আমরা। তাই ছোট সময় থেকেই ছেলেকে নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে হবে।

নাসিমা মুন্নী
উন্নয়নকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 188
  •  
  •  
  •  
  •  
    188
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.