অবদমন যখন যৌনতার বাইরে কোনকিছুই দেখতে শেখায় না

সুমু হক:

ইদানিং কেবলই মনে হচ্ছে যে এই দেশ, এই সমাজ যেখানে এখনও ব্যক্তি স্বাধীনতা, মিডিয়ার এথিক্স কিংবা মৌলিক মানবাধিকারের মতো বিষয়গুলো এখনও এমনকি “শিক্ষিত” সমাজের একটি বড় অংশের মানুষের কাছে ধোঁয়াশা মাত্র, সেখানে বসে নারীবাদ, মুক্তচিন্তা, কিংবা মানুষে মানুষে সমতার কথা বলা মানে পাথরে ফুল ফোটানোর নিষ্ফল প্রয়াস মাত্র।

শুরুটা বোধহয় আরও গোঁড়া থেকে করা প্রয়োজন। তা নাহলে নদীর ধান ভানতে শিবের গীতের মত সমাজের যেকোন ক্ষেত্রে, যেকোনো সমস্যার সাথেই এই সমাজের ধর্ষকামী মানসিকতার উৎকট প্রকাশ আসল সমস্যা থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে দেবে বার বার।

যেমন ধরা যাক সাম্প্রতিককালের রিজেন্ট হাসপাতাল, জেকেজি এবং একে কেন্দ্র করে সাহেদ, আরিফ এবং সাবরিনার দুর্নীতির ঘটনাটি। যে কেসটির সাথে জড়িয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবনমৃত্যু এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির প্রশ্ন, যে কেসটির পেছনে সরকারের একটি বড় অংশের সক্রিয় মদতের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে, সেই কেসটির তদন্ত, সাহেদ এবং সাবরিনার অপরাধের বিচার নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আমরা তখন ব্যস্ত হয়ে পড়লাম সাহেদের ব্যক্তিগত জীবন, তার পোশাক এবং দৈহিক গড়ন নিয়ে অশ্লীল স্থূল ভাঁড়ামি আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রল করতে।

শুধু এখানেই শেষ নয়, ডা. সাবরিনা, যিনি নিজে একজন চিকিৎসক এবং এই দুর্নীতির সমান অংশীদার তার সৌন্দর্য এবং সামাজিক যোগসাজশের মাধ্যমে তার নানারকম স্মার্ট সাজপোশাকে আকর্ষণীয় সব ছবির দৌলতে, আলোচনা এইবার কেন্দ্রীভূত হলো তাকে ঘিরে। তার অপরাধের ভয়াবহতা, সেই অপরাধে তার অংশগ্রহণ, এই সবকিছুকে ছাপিয়ে বড় হয়ে দাঁড়ালো দুটো বিষয়, তিনি একজন নারী, একজন সুন্দরী নারী, এবং সেই
সৌন্দর্যকে নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রোফাইলে উপস্থাপনে তার ভেতর কোন কুন্ঠা নেই। অতঃপর যা হবার তাই হলো।
রিজেন্ট হাসপাতালের দুর্নীতি, সরকারের সাথে সাহেদের আঁতাত, একজন চিকিৎসক হয়েও চিকিৎসা পেশার এথিক্সকে অসম্মান করে সাবরিনার এই দুর্নীতিতে অংশগ্রহণ এইসব নিয়ে আলোচনা না করে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠলো সাবরিনার চরিত্র কিংবা বলা ভালো চরিত্রদোষ, তার সাজপোশাক এবং তার ব্যক্তিগত জীবন।

আমাদের এই ধর্ষকামী যৌন অবদমনে ভোগা অসুস্থ সামাজিক ধারণায় কার মগজে কতখানি ঢুকবে কিংবা আদৌ কিছু ঢুকবে কিনা জানি না, কিন্তু প্রথমেই কিছু মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করে নেয়া জরুরি বোধ করছি।

প্রথমত, একজন ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ব্যবহার করা ছবি তার ব্যক্তিগত ছবি এবং তা তার ব্যক্তিগত জীবন এনং জীবনযাত্রার প্রতিফলন। তার ওপর ভিত্তি করে তার প্রফেশনাল জীবনের বিচার করা অত্যন্ত অন্যায়। ফেসবুকের প্রতিটি পোস্ট ব্যক্তির নিজস্ব, তার বিনা অনুমতিতে সেই ছবি ব্যবহার করে অশ্লীলভাবে তাকে নিয়ে ট্রল করবার কোন অধিকার কারো নেই! তা সে যত বড় অপরাধীই হোক না কেন! অপরাধীর বিচার হবে আইনব্যবস্থায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা মিডিয়ায় নয়।

দ্বিতীয়ত, একজন প্রমাণিত অপরাধীরও কিছু মৌলিক অধিকার থাকে, এবং বিচারে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার যেমন যথাযোগ্য শাস্তি হওয়া উচিত, তেমনি, তার কোন মৌলিক মানবিক অধিকার লংঘিত হলে, তারও সম্পূর্ণ অধিকার আছে তার প্রতি ঘটে যাওয়া সেই অন্যায়ের বিচার পাবার। সুতরাং দুর্নীতির দায়ে সাবরিনার যেমন বিচার এবং শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তার প্রতি হওয়া অনলাইন হ্যারাসমেন্টেরও যথাযোগ্য শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, অন্তত পৃথিবীর যে কোন সভ্য দেশে তেমনটাই হতো। দুঃখের বিষয়, দেশটি বাংলাদেশ বলে, এবং সাবরিনা একজন নারী বলেই তার অপরাধের বিচার হবার আগেই প্রতিমুহূর্তে অনলাইনে তাকে ধর্ষণ করবার অধিকার রাখে আমাদের বীর বাঙালি পুরুষ সমাজ!

তৃতীয়ত, সাবরিনার এই ফেসবুকের ছবিগুলো নিয়ে আলোচনা চলতে চলতেই হঠাৎ আলোচনায় চলে এলো আরেকটি বিষয়, প্রাক্তন প্রেমিকার ন্যুড ছবি দিয়ে প্রাক্তন প্রেমিকের তাকে ব্ল্যাকমেইল করবার ঘটনা। এবং যথারীতি, এক্ষেত্রে ওই ব্ল্যাকমেইলের প্রাক্তন প্রেমিকের বিচার না চেয়ে আমরা উঠে পড়ে লাগলাম মেয়েটির পেছনে! কেন সে তার প্রেমিককে ছবিগুলো দিয়েছিলো! আর সবকিছুর মত সময়ের সাথে সাথে প্রেম এবং যৌনতার সম্পর্কও অনেকটাই পাল্টে গেছে এখন, পাল্টে গেছে সেই সম্পর্কের প্রকাশের ধরন।

সম্পর্কের ক্ষেত্রে মেয়েরা এখন আর প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয়ভাবে গ্রহণ করে যায় না, তারাও নিজেদের মানসিক এবং শারীরিক চাহিদাগুলোর প্রকাশে যথেষ্টই সক্রিয়। এবং যে কোনো সুস্থ স্বাভাবিক মানবিক সম্পর্কে এমনটাই হওয়া উচিত। দুপক্ষকেই সেখানে সমানভাবে সক্রিয়, একে অন্যের চাহিদার প্রতি সহানুভূতিশীল, নিজের প্রয়োজনগুলোকে সঙ্গীর কাছে খুলে বলার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী এবং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

এখনকার সময়ে প্রেমের সম্পর্কে সেক্সটিং, একে অন্যের ন্যুড ছবি শেয়ার করা কিংবা নিজেদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি রেকর্ড করে রাখাটা খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। যে কোন সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কিংবা বিশ্বাস থাকলে এমনটা করা খুবই স্বাভাবিক। সম্পর্ক ভেঙে যাবার পর সেই দুজনের ভেতর কোন একজন যদি এই ছবিগুলো ব্যবহার করে অন্যজনকে ব্ল্যাকমেইল করতে থাকে, তার জন্যে সেই ব্ল্যাকমেইলের শাস্তি আমরা চাইবো। কিন্তু কখনো, কোন অবস্হাতেই এর জন্যে ওই ভিকটিমটিকে দায়ী করব না। কারণ একজন মানুষ হিসেবে সে কখন কার সঙ্গে কোন ধরনের সম্পর্কে জড়াবে, সেটা একান্তভাবেই তার নিজস্ব ব্যক্তিগত অধিকার।

আমাদের মতো দেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আমাদের মেয়ে, বন্ধু কিংবা বোনদের কারো সাথে এমন সম্পর্কে জড়াবার আগে সাবধান করবো, প্রয়োজনীয় সাবধানতা অবলম্বন করতে বলবো অবশ্যই। কিন্তু সে যদি এমন সম্পর্কে জড়াতে চায়, কিংবা এমন কোনো ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়, তাহলে আমাদের উচিত অন্য কোন কিছু না ভেবে তার পাশে দাঁড়ানো।

আমরা আমাদের সমাজে যৌনতাকে ট্যাবু করে রাখি বলেই এইসমস্ত নোংরা ব্ল্যাকমেইলাররা এইসব বিষয়কে কেন্দ্র করে মেয়েদেরকে ব্ল্যাকমেইল করে যেতে থাকে। যেদিন আমরা সমাজ থেকে এই যৌনতার ওপর থেকে অনর্থক পর্দাটাকে তুলে ফেলতে পারবো, যেদিন থেকে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের শেখাবো, যে এটা কোন নোংরা বিষয় নয়, বরং জীবনের খুব স্বাভাবিক একটি অংশ, যেদিন থেকে আমাদের ছেলেরা পর্ন নয়, যৌনতা বিষয়ে জানবে এবং শিখবে খোলামেলাভাবে বই পড়ে কিংবা স্কুল থেকে, যেদিন থেকে আমাদের মেয়েরা নিজেদের দেহ নিয়ে সংকোচ কিংবা আতংক নয়, বরং আত্মবিশ্বাস নিয়ে বড় হয়ে উঠবে, সেদিন থেকে আর এই নিয়ে আমাদের অযথা আতংকিত হতে হবে না। আমি নিশ্চিত ধর্ষণের হারও তখন কমে যাবে অনেকটাই।

আর হ্যাঁ, সেদিন থেকে সাবরিনাদের বিচার হবে তারা লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে বলেই, তারা এক একজন নারী বলে, কিংবা তাদের পোশাকের জন্যে নয়!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.