করোনাকালে নতুন মাত্রা পেয়েছে নারীর প্রতি সহিংসতা

সাদিয়া আফরিন:

বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে আমরা করোনাকালে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা সম্পর্কে জানতে পারছি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক জরিপে বলা হয় করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৩১% এবং শুধু মে মাসেই মোট ১১,৩২৩ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছে। এরমধ্যে ১১,০২৫ জন গৃহস্থালী সহিংসতার শিকার হয়েছে, ২৩৩ জন যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে, ৪৮ জন ধর্ষনের শিকার হয়েছে/ধর্ষনের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে এবং ১৭ জন খুন হয়েছে। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে মে মাসে মোট ৮৬ জন নারী খুন হয়েছেন তাদের স্বামীদের হাতে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের রিপোর্টটিতেও দেখা গেছে যে বেশিরভাগ নারীই সহিংসতার শিকার হয়েছেন তাদের স্বামী ও স্বামীর পরিবারের সদস্যদের দ্বারা।

করোনা মহামারীতে নারীর প্রতি সহিংসতাকে কেউকেউ নারীর জন্য ‘ডাবল প্যান্ডেমিক’ হিসাবে দেখছেন। করোনার সময়ে নারী নির্যাতন কি বেড়ে গেছে? এই আলোচনায় যাওয়ার আগে আমি স্বাস্থ্যনৃবিজ্ঞানী পল ফারমারের মহামারী সংক্রান্ত ভাবনা তুলে ধরতে চাই। পল ফারমার সমাজের বিদ্যমান অসমতার সাথে মহামারীর সম্পর্ক দেখেন। তিনি মনে করেন কোন একটি মহামারী সমাজের সকলের জন্য একইরকম ফলাফল নিয়ে আসে না, বরং সমাজের বিদ্যমান অসমতা নির্ধারণ করে কার উপর নির্দিষ্ট মহামারীর কি প্রভাব পড়বে। ফারমারের এই আলোচনা নারীর প্রতি করোনাকালীন সহিংসতা বোঝার জন্য খুবই জরুরি।

বিষয়টি অবশ্যই উদ্বেগজনক যে করোনা মহামারীর মতো একটি পরিস্থিতিতে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, যখন মানুষের সহমর্মিতা অনেক বেশি প্রয়োজন তখন নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। দেখা গেছে স্বল্পআয়ের অনেক নারীরা কাজ হারিয়েছেন, হারাচ্ছেন, তাদের স্বামিরা কাজ হারাচ্ছেন। তাদের হয়তো বাসাভাড়া বাকী, হাতে সঞ্চয় নেই, উপরন্তু ঋণ আছে, দু-তিনটি সন্তান আছে, তাদের ভরণপোষণ করা কষ্টকর হয়ে গেছে। একইভাবে মধ্য ও উচ্চবিত্তের কর্মজীবি নারীদের অনেকেই এখন ঘরে বসে অফিস করছেন, তাদের স্বামীরাও করছেন, সন্তানদের অনলাইন পড়াশোনার তদারকি করছেন, আবার অনেকে যারা কর্মজীবি নন কিন্তু তাদের স্বামীরা বাড়িতে বসে অফিস করছেন, অথবা স্বামীরা কাজ হারাচ্ছেন। কর্মজীবী অথবা গৃহিনী এই দুই দলের নারীই হয়তো ঘরের কাজে কারও সহায়তা পাচ্ছেন না, উপরন্তু কেয়ারগিভার হিসাবে পরিবারের শিশু, বৃদ্ধসহ সকলের যত্ন নিচ্ছেন, অফিস ও বাসা উভয় পরিসরের কাজের চাপ নিচ্ছেন। এরইমধ্যে নারীর মাসিক হচ্ছে, কেউ কেউ গর্ভবতী হচ্ছেন, সন্তান প্রসব করছেন, কেউবা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন। এসবকিছুর সাথে তাদের জীবনে যুক্ত হচ্ছে সহিংসতা।

ফলে দেখা যাচ্ছে যে, নিম্নবিত্তের একজন নারী (গৃহকর্মির কাজ করতেন অথবা গার্মেন্টেসে কাজ করতেন) এবং মধ্য ও উচ্চবিত্তের (গৃহিণী/কর্মজীবী) নারীর শ্রেণি নির্বিশেষে গৃহস্থালী সহিংসতার শিকার হওয়ার কারণ অভিন্ন, তার লিঙ্গীয় পরিচয়। এই লিঙ্গীয় পরিচয় একটি ব্যবস্থার নির্মাণ, পিতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থা, যার কেন্দ্রে থাকেন পুরুষ/পিতা/ছেলে, নারী বা অন্যান্য লিঙ্গিয় পরিচয় সেখানে গৌণ বা প্রান্তিক। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা মানেই পুরুষের প্রতি সিস্টেম্যাটিক্যালি বায়াসড। সুতরাং পিতৃতন্ত্রে যা কিছু ঘটবে কমবেশি পুরুষের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং নারীর বিপক্ষে যাবে। এরই ধারাবাহিকতায় পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থায় নারীর প্রতি সহিংসতা একটি প্রাত্যহিক ঘটনা হিসাবেই আমরা চারপাশে ঘটতে থাকে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে যে ১৬৭২ জন নারী এই লকডাউনে জীবনে প্রথমবারের মত সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং যে সমস্ত নারী গৃহস্থালী সহিংসতার শিকার হয়েছেন তাদের মধ্যে ৪৫% মানসিক, ৩৩% অর্থনৈতিক, ১৯% শারীরিক এবং ৪% যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গৃহবন্দীত্বের এসময়ে যারা সহিংসতার শিকার হচ্ছেন তারা হয়তো আতংকের মধ্যে থাকছেন যে তাদেরকে যে কোন সময় আবারো সহিংসতার শিকার হতে হবে। সাহয্যের জন্য কোথাও যেতে পারছেন না, আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কাছে রিপোর্ট করতে পারছেন না, মানসিক কাউন্সেলিং নেবার কথা ভাবতে পারছেন না কারণ তাদের স্বামীরা হয়তো ঘরেই অবস্থান করছে। এসবকিছুই নারীর করোনাকালীন সহিংসতার অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতার সামাজিক অনুমোদন দেয়া হচ্ছে এই বলে যে পুরুষ ঘরে থাকতে থাকতে ক্লান্ত, কারণ সে ঘরে থাকতে অভ্যস্ত নয়। তার কাজ চলে গেছে। আয় বন্ধ। সংসার চালাতে পারছেন না তাই সহিংস হয়ে উঠছেন। অথচ লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, একজন নারী বরং একজন পুরুষের চাইতে অনেক বেশিই চাপের মধ্যে আছেন। তিনি কিন্তু স্বামীর গায়ে হাত তুলে তার চাপ কমাচ্ছেন না। সুতরাং আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে কার মানসিক চাপের সামজিক মূল্য বেশি। এটি আমাদের চর্চারই অংশ। আমরা প্রতিদিনই নারীর প্রতি সহিংসতার সামাজিক অনুমোদন দেই এবং একে স্বাভাবিক করে তুলি। এই স্বাভাবিকীকরণ ঘটে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে আমরা যেটা করি সেটা হলো ভিক্টিম ব্লেমিং। যেমন, আমরা বলি –
সে স্বামীর সাথে তর্ক করেছিলো তাই মার খেয়েছিলো
সে স্বল্পপোষাক পরেছিলো তাই যৌন হয়রানীর শিকার হয়েছিলো
সে রাতে বাইরে গিয়েছিলো তাই ধর্ষিত হয়েছিলো

আমরা একজন নারীকেই সবসময় কাঠগড়ায় তুলি, কারণ আমরা মনে করি পুরুষরা সহিংস হতেই পারে। আমরা দিনের পর দিন একটি বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও প্রথার মধ্য দিয়ে নারী-পুরুষের সম্পর্ক (ক্ষমতাহীন বনাম ক্ষমতাবান) দেখতে অভ্যস্ত হই এবং আমাদের ভাবনা/কার্যকলাপ দিয়ে প্রতিনিয়তই তার পুনরুৎপাদন করি। ফলে আমরা ভিক্টিমকেই দোষারোপ করতে থাকি এবং নিজেরাও চলমান ব্যাবস্থার অংশে পরিণত হই।

এই প্রক্রিয়ার দ্বিতীয় ধাপে আসে জেন্ডারিং ও স্টেরিওটাইপিং। ভিক্টিম ব্লেমিং করতে গিয়ে আমরা এটা ভীষণভাবে করতে থাকি। জেন্ডারিং এবং স্টেরিওটাইপিং বিষয়টি হলো একধরনের লেবেলিং, অর্থাৎ নারী ও পুরুষকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাকে কিছু ছকের মধ্যে ফেলে দেয়া। এটি একধরনের সামাজিক নির্মাণ। নারী ও পুরুষের সম্পর্ককে একটা বাইনারী অবস্থানে দাঁড় করিয়ে প্রতিনিয়ত আমরা স্টেরিওটাইপ তৈরি করতে থাকি যার মাধ্যমে নারী ও পুরুষ সম্পর্কিত ধারণাগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিস্তৃতি লাভ করে। যেমন, পুরুষ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, নারী ক্যাটক্যাটে/ঝগাড়াটে। পুরুষ সবল তো নারী অবলা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে একটা বৈশিষ্ট আরেকটির বিপরীত এবং সব ধরনের স্টেরিওটাইপিং-এর ক্ষেত্রে পুরুষ বরাবরই সাবজেক্ট এবং নারী অবজেক্ট, পুরুষ উত্তম এবং নারী অধম/কম মর্যাদাসম্পন্ন।

ফলে যে সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষ অধিক মর্যাদাসম্পন্ন হয় এবং সেই অবস্থান থেকে যখন নারীর প্রতি সহিংস হয় তখন পুরুষ আসলে বোঝেইনা তার কোন আচরণটি সহিংস হচ্ছে, তেমনি নারীও বোঝেনা সে সহিংসতার মধ্যে বসবাস করছে। কারণ সেও ধরে নেয় ‘উত্তম পুরুষ’ যা করবে তাই ‘স্বাভাবিক।’ এমনকি যদি কোন নারী বোঝে এবং সহিংস সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায় তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সেই সম্পর্কের মধ্যে ধরে রাখার লোকের অভাব হয়না আমাদের সমাজে। পারিবারিক পরিসরে আমরা প্রায়শই শুনে থাকি, ‘স্বামী গায়ে হাত তুলেছে কী আর এমন হয়েছে। পুরুষ মানুষ এমন একটু-আধটু করেই।’

অন্যদিকে যেসকল নারীরা সহিংস সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায় তখন সেটিকে কেউ স্বাগত জানায় না, বরং নারীকেই দোষারোপ করে। ফলে আমাদের সমাজে ডিভোর্সড নারী মানেই ‘খারাপ নারী’ এমন একটি ধারণাও প্রতিষ্ঠিত আছে। এইযে ‘পুরুষ মানুষ এমন একটু-আধটু করেই’ এবং ‘ডিভোর্সড নারী, খারাপ নারী’ এধরণের স্টেরিওটাইপিং ও জেন্ডারিং ঠিক করে দেয় সমাজে কার অবস্থান কি এবং কার কি আচরণ হওয়া উচিত। পরিবার বা গৃহস্থালী এই স্টেরিওটাইপগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

ফলে দেখা যাচ্ছে যে করোনার মত একটি পরিস্থিতিতে মানুষ যখন দিশেহারা, কর্মসংস্থান নেই, চলাচল সীমিত, চিকিৎসাসহ সকল জরুরসেবা সীমিত সেরকম একটি সময়েও নারী সহিংসতার বাইরে নয়। ‘স্টে এট হোম’ বা ‘সোশাল ডিস্ট্যান্স’ দাম্পত্য সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা মহামারীর লেন্স দিয়ে দেখতে পাচ্ছি কিভাবে প্রতিদিনকার জীবনে পারিবারিক সহিংসতা বিরাজ করে। যেখানে সারাক্ষণই বৈষম্য ও লড়াই ক্রিয়াশীল। এই বৈষম্য ও লড়াই কাঠামোগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নিয়মতান্ত্রিক। প্রাতিষ্ঠানিক এই অর্থে যে এটি পরিবার ও সমাজের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে এইসমস্ত বৈষম্য/অসমতা নানাভাবে চর্চিত হয়। যেমন, পিতৃসম্পত্তি কন্যা সন্তানেরা পুত্র সন্তানের চাইতে কম পাবেন। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য যা আমাদের সমাজে বহুবছর যাবত আইনীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে একটি সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে। করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা তাই দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক সামাজিক চর্চার প্রতিফলন।

ফলে নারীর প্রতি সহিংসতার একটি সামাজিক প্রেক্ষাপট আছে, সামাজিক অনুমোদন আছে। বিদ্যমান ব্যবস্থায় নারীর প্রতি সহিংসতার ব্যাপকতা এতো বেশি যে করোনা পরিস্থিতিতে এই সহিংসতা বেড়েছে বলার চাইতে বলা যুক্তিযুক্ত যে, এটি একটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। পল ফারমারের ধারণা থেকে বলতে হয় যে করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা বিদ্যমান কাঠামো এবং অসমতা থেকেই তৈরি। যে নারীরা প্রথমবার সহিংসতার শিকার হয়েছে আজ অথবা কাল তারা হয়তো সহিংসতার শিকার হতোই, করোনা সেটিকে এগিয়ে এনেছে। এমন এক জীবনযাত্রার মধ্যে করোনা এসে পড়েছে যে ব্যবস্থাটি বহুদিন যাবত জারি আছে। ফলে আমরা করোনাকালে নারীর প্রতি যে সহিংসতাকে দেখতে পাবো তা নারীর প্রতি সহিংসতার আলাদা একটি ধরন।

করোনাকালে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধে আমাদেরকে তাই করোনাকালীন বাস্তবতাকে অনুসরণ করতে হবে। অনেকেই এখন ঘরবন্দী বা বাইরে যাচ্ছে কম। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকটাই প্রযুক্তি নির্ভর। জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহনের সুযোগ সীমিত। এসময়ে সহিংসতা থেকে নারীকে সুরক্ষার জন্য নারীর স্বাস্থ্য ও অধিকার নিয়ে কাজ করে যে সকল প্রতিষ্ঠান(সরকারী/বেসরকারী)তাদের যৌথভাবে মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমগুলো চালিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে রেডিও, টেলিভিশন ও সোশাল মিডিয়াকেও তথ্য প্রচারে ব্যবহার করতে হবে। সরকারী/বেসরকারী সকল হেল্পলাইন এবং বিদ্যমান সহায়তাগুলো সম্পর্কে নারী ও কমিউনিটিকে অবহিত করতে হবে। যেমন, ১০৯ যেটি নারীর প্রতি সহিংসতা রিপোর্ট করার জন্য সরকারের ডেজিগনেটেড হেল্পলাইন নাম্বার। তেমনি জরুরী সেবার জন্য আছে ৯৯৯, স্বাস্থ্যসেবার জন্য আছে ১৬২৬৩ বা স্বাস্থ্যবাতায়ন এসব নিয়মিত সম্প্রচার করতে হবে। থানা পর্যায়েও একটি নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নাম্বার চালু করতে হবে। সবাইকে জানাতে হবে কী কী কারণে হেল্প লাইনে ফোন দেয়া যাবে, হেল্পলাইন থেকে কী কী সহায়তা পাওয়া যাবে, কোন নারী সহিংসতার শিকার হলে কী ধরনের সাহায্য সে প্রশাসন থেকে পাবে, কোথায় শেলটার হোম আছে, কোন এনজিও আইনি সহায়তা দিবে ইত্যাদি।

থানা পর্যায়ে সহিংসতা প্রতিরোধে নারী পুলিশ অফিসারের নেতৃত্বে নির্যাতনের কেইস লিপিবদ্ধ করার জন্য একটি ডেস্ক রাখতে হবে, কমিউনিটি লিডারদের নিয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ প্লাটফর্ম তৈরি করতে হবে। যাতে তারা সহিংসতার শিকার নারীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে পারে, বিশেষ করে নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের ক্ষেত্রে। কমিউনিটি টু শেলটার হোম/হাসপাতাল/পুলিশ স্টেশন একটা রেফারেল ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং কমিউনিটিতে এ ব্যাপারে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ব্যাবস্থা থাকতে হবে। বিশেষ করে প্রাথমিক চিকিৎসা ও মানসিক চিকিৎসা সহায়তা। মানসিক কাউন্সেলিং এর জন্য একটি রেফারেল সিস্টেমও তৈরি করতে হবে। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে এক্ষেত্রে নিযুক্ত করা যেতে পারে যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সহিংসতার শিকার নারীদেরকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য ও আইনী সেবা গ্রহনে পরামর্শ প্রদান করতে পারবে। সহিংসতার শিকার নারীকে আর্থিক সহায়তা দিতে হবে কারণ স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল নারী স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহন করতে সক্ষম হবেনা।

সর্বোপরি সমাজের বিদ্যমান লিঙ্গীয় অসমতাকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় নিয়ে আসতে হবে। এজন্য আমাদেরকে প্রতিনিয়ত প্রশ্ন করতে হবে সকল জেন্ডার স্টেরিওটাইপ ও স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াকে যা নারীকে দূর্বল ও পুরুষকে শক্তিশালী ভাবতে শেখায়, ভিক্টিম ব্লেমিং করতে শেখায় এবং সেই মানসিকতা গড়ে তোলে যা একজন ব্যক্তিকে নারী সহিংসতার পক্ষে নিয়ে যায়।

শৈশব থেকেই লিঙ্গীয় সমতা চর্চায় পরিণত করতে হবে। শিশুরা বড় হতে হতেই শোনে কে ‘বংশের বাতি’ বা ‘ছেলেরা মেয়েদের মত কাঁদেনা।’ এসমস্ত জেন্ডার স্টেরিওটাইপ থেকে শিশুদের মুক্ত রাখতে হবে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র থেকে একেএকে লিঙ্গীয় অসমতা দূর করতে হবে। শিশু যদি তার চারপাশে লিঙ্গীয় আধিপত্যবাদ না দেখে তার মনেও আধিপত্য সম্পর্কে ধারণা জন্মাবে না।

এজন্য ম্যাক্রো লেভেলেও কাজ করতে হবে। সকল পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে, প্রোগ্রাম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জেন্ডারকে বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ লিঙ্গীয় সম্পর্ক সমাজ কাঠামো বিযুক্ত কোন ধারণা নয়। এটি বরঞ্চ সমাজ কাঠামো ও বৈষম্যের অপরাপর উপাদানগুলোর সাথেও সম্পর্কযুক্ত। যেমন, আদিবাসী বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীর করোনাকালীন সহিংসতার অভিজ্ঞতা হয়তো ভিন্নরকম হবে তার সামাজিক পরিচয়ের কারণেই। ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ বিষয়ক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে অনেকবেশি কনটেক্সটচুয়াল হতে হবে। ভাবতে হবে কোন নারীর জন্য কি ধরণের পলিসি দরকার; ট্রায়াল এন্ড এরোর পর্যবেক্ষণ করতে হবে, পাইলটিং করতে হবে পলিসি প্রণয়নের পূর্বে এবং এর ফলাফলের উপর ভিত্তি করে পলিসি বাস্তবায়ন করতে হবে।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

(লেখাটি দৈনিক সমকাল এ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বিস্তারিত আছে এই লেখাটিতে।)

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.