সহকর্মি নারী হলে প্রতিযোগিতার ভাবনা কেন কুৎসিত?

প্রান্তী সারোয়ার:

নির্যাতন, প্রতিবাদ, প্রতিকার নিয়ে প্রতিদিনই অনেক সংবাদ দেখি, লেখি। আর সংবাদ নিয়ে কাজ করার সুবাদে একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে, সত্য আর বানোয়াট সংবাদ কোনটি সেটি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছি। উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই, সাজানো একটা ধর্ষণের ঘটনা, যেখানে প্রতিকার চেয়ে মানববন্ধন আন্দোলন, এমনকি মামলাও হয়। কিন্তু ঘটনার পর্যালোচনা করলেই উপলব্ধি করা যায় ধর্ষণের ঘটনাটা আসলে একপক্ষের অভিযোগ। আসলে শারীরিক সম্পর্কটাতে পুরুষসঙ্গীর যেমন দায় আছে, ঠিক একইভাবে ‘ধর্ষণ’ এর শিকার নারীরও তাতে সম্মতি ছিল। দুজনের মনোমালিন্যের কারণে নারীবাদী সমাজের সুবিধার অপপ্রয়োগ করতেই আন্দোলনে নামেন এরকম সুযোগসন্ধানী অনেকে। আর এমন বহু সুযোগসন্ধানীর জন্যই নারীবাদ কথাটা শুনলেই অনেকেই ভাবেন, এমন ইতিবাচক শব্দকে ব্যবহার করে নাম কামানোটা বুঝি এখন ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এই ট্রেন্ডের কারণে রাতারাতি একপক্ষের নিকট চক্ষুশুল হলেও অনেকের কাছে পৌঁছানো সম্ভব।

তবে তর্ক বা নারীবাদী কণ্ঠস্বর জাগিয়ে তুলতে আমার লেখাটি’র উদ্দেশ্য নয়। যদি এই লেখাটি পড়ে একজন মানুষেরও বিবেকবোধ জাগ্রত হয়, মনের ভেতরের পশুত্ববোধটার খানিকটা লাগাম টানেন কেউ, সেখানেই আমার সার্থকতা। দীর্ঘ সমস্যাকে অনেকদিন লালন করে কিছুটা উগ্রে দেয়ার প্রচেষ্টা মাত্র।

‘কোনো বস যখন কোনো পুরুষের কাজের প্রশংসা করেন তখন সেটা কাজের মূল্যায়ন হয়। আর নারীর বেলাতে একই ঘটনা ঘটলে সেই নারীর অবর্তমানে গল্প সাজানো হয়। নারী তার গোপনাঙ্গ দেখিয়ে বসকে কব্জা করেছেন। বিছানা গরম করে সুবিধা ভোগ করছেন। এরকম হাজারো নোংড়া, নোংড়া উপাখ্যান। একটা নারীর উত্থান মানেই সুবিধাভোগ, তার চরিত্রে কালো দাগ দেওয়া, এমনকি চৌদ্দগোষ্ঠীর নাড়ী ভুঁড়ি পর্যন্ত টেনে আনা। এমন কথা যে বা যিনি বলেন তার বা তাদের না হয় রুচিবোধে সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু দলবেঁধে যখন কথাটি শোনেন বা মজা নিতে থাকেন ক্ষণিকের হাস্যরসের খোরাক হিসেবে, একবার ভাবুনতো সেই গল্পের নির্যাস উড়ে গিয়ে নারীটিকে শুধুই ছোট করছেন, নাকি ঠেলে দিচ্ছেন মৃত্যুর দিকে!’

ধারণা বা অনুমান নয় বাস্তব একটা উদাহরণ দিচ্ছি একটি কাজের জায়গায়, ডিপার্টমেন্ট প্রধান হিসেবে কিছুদিন একজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি অবশ্য বয়স্ক ছিলেন। যদিও তিনি বেশিদিন ছিলেন না। তিনি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কেমন ছিলেন সেটি আমার জানার বিষয় না। আমি হয়তো বলতে পারি তিনি আমার সাথে কেমন ব্যবহার করেছেন। তিনি অফিসে চাকরিরত অবস্থায় তার সাথে দেখা হলে সালাম আর কাজ নিয়ে কথা। এর বাইরে তার সাথে আমার কখনও যোগাযোগই হয়নি। বাকিদের সাথে কী করেছেন তাও তারাই ভালো বলতে পারবেন, তবে অন্যদের বেলাতেও আমার জানামতে সবাইকে শ্রদ্ধার চোখেই দেখেছেন। ডিপার্টমেন্টে যারা কাজে কখনও ফাঁকি দেয়নি, অথবা কিছু বললে হাতে কাজের চাপ থাকলেও সাথে সাথে হাসিমুখে কাজটা করে দিয়েছেন বিনয়ের সাথে।

যখন তিনি বুঝতে পারেন অন্য কাউকে বললে তর্ক বা এটা সেটা বলে এড়িয়ে যাবে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য গুটি কয়েকজন কর্মীর ওপরই তাকে ভরসা করতে হয়েছে। আর তার কারণে কাজের ক্ষেত্রে মূল্যায়ণ যখন করতে বলা হয়েছে, তখন দুএকজন পুরুষকর্মীর পাশাপাশি দু’একজন নারীর নামও চলে আসে। ঠিক তখনই যারা সারাজীবন কাজে ফাঁকি দিয়েছেন তাদের গল্প শুরু হয়ে যায়। এতো বাজে বাজে ইঙ্গিত সেটা আসলে সহ্য করার মত নয় কারোর পক্ষে। কারও শ্বশুড়বাড়ি নিয়ে, কারো বংশ তুলে আর কাউকে দুশ্চরিত্র বলে। অথচ ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে গল্প সাজানো এই মানুষগুলোকে যে ভালো কিছু বলবে তারা কিন্তু কখনও সেরকম কাজই করেনি। কিন্তু কথার বেলাতে এইসব মানুষ যেনো পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করা। এইসব বিষয় নিয়ে আসলে প্রতিষ্ঠানের এইচআরে যাওয়া যায় না। আর অভিযোগ, সমালোচনা সবাইকে দিয়েও হয় না। এটাতো একটা ঘটনা এমন আরো অহরহ ঘটনা আছে।

নারী সহকর্মীকে কাজে হারাতে অথবা তার উন্নতির লাগাম টানতে সম্মানহানির পথটাই যেন সেরা কৌশল। কারণ যাদের কাছে সম্মানের দাম বেশি তারা এই অস্ত্রের আঘাতে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হন। তারা ভাবেন কাজ যাক মান থাক। আর এই সুযোগে হীনমন্য মনের অধিকারি মানুষগুলো তাণ্ডব চালায়, ফের উঠতি কোনো প্রতিভাকে টলানোর নেশায়।

একজন পুরুষের সফলতা মানেই কাজ দিয়ে উঠেছেন। আর একজন নারীর সফলতার কথা উঠলেই পেছনে খোঁজা হয় রগরগে চমকপ্রদ গল্পের রহস্য। আর সেগুলোর পসরা সাজিয়ে নিয়ে বসেন যে যার মতন। এই হীন মানসিকতার বেড়াজালে যে কত প্রতিভা ঝরে পড়ে তার হিসেব নেই। কারণ সবার পক্ষে এই হীন মানসিকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা সম্ভব নয়। অনেকেই হয়তো কথার ভয়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করেন, আর কেউ কেউ হয়তো প্রতিবাদ করেন। তবে যে ধরনেরই মানুষ হোক, ঘটনাও যাই হোক, নিজের নামে খারাপ বা মিথ্যা কিছু শুনলে কষ্ট লাগবে সেটাই স্বাভাবিক। হয়তো কেউ কেউ গায়ে সয়িয়ে নেন আর কেউ কেউ চলে যান নিদারুণ ডিপ্রেশনে। অনেকে তো এই ডিপ্রেশন থেকে মুক্তির পথ হিসেবে বেছে নেন মৃত্যুকে।

ইভটিজিং এর বিচার হয়, ধর্ষণ করলে বিচার হয়। তবে একজন নারী সহকর্মীকে মানসিক নির্যাতন করলে দৃষ্টান্তমূলক বিচার আসলে হয় না। কারণ কিছু নির্যাতনের নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকে না। এমনকি অনেক নারী সহকর্মি তো মুখ ফুটে কিছু বলতে পর্যন্ত পারেন না। চাকরিরত একজন পুরুষ অনায়াসে কাজের ফাঁকফোঁকরে আড্ডা দিতে পারেন। নারীরা পারেন না, তা কিন্তু নয়। কারণ অফিস শুধু কাজের জায়গা নয়, এটাও কিন্তু মানসিক শান্তির বড় একটা স্থান দখল করে থাকে। ঠিক তেমনি অনেক ডিপ্রেশনের উৎসস্থলও হয়ে যায় কাজের জায়গাটাই।
ভালো বন্ধু বা ভাইয়ের মতো সম্পর্ক হওয়ার পরেও নারী সহকর্মির সঙ্গে বসে এক কাপ চা খেতে পারেন না অনেকেই। আর তার পেছনেও একটাই কারণ কখন জানি পবিত্র সম্পর্কগুলোতে লেপ্টে দেয়া হয় মিথ্যা আর কুরুচিপূর্ণ কথার কালি।

অফিসে নারী-পুরুষ উভয়কে কাজের জন্য নেওয়া হয়। কিন্তু কিছু নারী যেমন কাজের বাইরে গিয়ে অসদুপায়ে সুবিধা ভোগ করেন, তেমন পুরুষের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়। নারী হয়তো সুবিধা পেতে তার নারীত্বকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করেন। পুরুষও কিন্তু তার ব্যতিক্রম নয়, পুরুষের যেহেতু নারীত্ব নেই, তাই সে তেল বা তোষামোদ অথবা কুটকৌশলে ফায়দা লুটে নেয়। সুবিধা যে বা যারা নেয় তাদের বিষয়টা আলাদা, এটা ঘটে আসছে আর ভবিষ্যতেও হয়তো ঘটতে থাকবে। এসব যারা করেন তারা কিন্তু কথার ধার ধারেন না। আর তাদের নিয়ে মন্দ কথাতেও তাদের কিছু এসে যায় না। মাঝখানে কথার তীরে বিদ্ধ হয় সৎ কিছু মানুষ।

যারা আসলে কাজ করতে আগ্রহী, মেধা, সততা, নিয়মানুবর্তিতা, কাজের প্রতি যাদের অসীম শ্রদ্ধা।
কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। তাই বলে এই প্রতিযোগিতায় এগোতে নারী কর্মীকে মানসিক নির্যাতনের মতো হীন অস্ত্রটাই কেনো ব্যবহার করতে হবে? যে নারীকে আজ আপনি দুটো কথা শুনিয়ে ভাবছেন এগিয়ে থাকছেন। ঠিক আয়নার ওপাশটা ঘুরান, দেখবেন অন্য অফিসে হয়তো আপনার কোনো প্রিয়জনই আরেকজনের দ্বারা একই নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আর আপনার নির্যাতনের কারণে কেউ যদি ডিপ্রেশনে আত্মহত্যা করেন, আপনার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সেই ভুক্তভোগী নারী হয়তো কোনো আন্দোলন করলেন না, তাহলেও কি প্রাণ কাড়ার দায় সত্যিই এড়াতে পারবেন?

কাজ করতে এসে প্রতিযোগিতা হোক কাজ নিয়ে, ব্যক্তিগত বিষয়কে কেনো টানেন? কাজের জন্য না হয় মাস গেলে পয়সা পাবেন, আর সেই কাজের ক্ষেত্রে এগোনোর জন্য নিজের সত্ত্বাকে অপমান করলে তার দাম কি অফিস মেটাবে?

প্রত্যেকে তার সন্তান, ভাইবোন, স্ত্রী অর্থাৎ সকল প্রিয়জনের সফলতা কামনা করেন। আজ যদি নিজ উদ্যোগে এই হীন মানসিকতা না ছাড়েন, বলা যায় না, আপনার থেকেই কুশিক্ষা নিয়ে আপনারই কোনো জুনিয়র হয়তো আপনারই প্রিয়জনকে এই একই অস্ত্রে খুন করতে পারেন। সুতরাং মানবিক হোন, কথা দিয়ে আঘাত নয় বরং কথা দিয়ে ভালোবাসা অর্জনের চেষ্টা করুন। কারণ আপনার প্রিয়জনও অন্যকারো নারী সহকর্মী হয়তো।

প্রান্তী সারোয়ার
বার্তাকক্ষ সম্পাদক, সময় টেলিভিশন

শেয়ার করুন:
  • 269
  •  
  •  
  •  
  •  
    269
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.