গৃহকর্মি, বেবি সিটার, চাইল্ড কেয়ার নিয়ে সংশয়

তামান্না ইসলাম:

এ যুগের কর্মজীবী মা-বাবাদের অন্যতম দুশ্চিন্তার কারন বা সংশয় হলো বাচ্চাকে শিশু অবস্থায় গৃহকর্মি, বেবি সিটারের হাতে বা চাইল্ড -কেয়ারের তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দেওয়া কতোটা নিরাপদ। এটি আসলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। নিরাপত্তা ছাড়াও যে ব্যাপারগুলো নিয়ে চিন্তা করতে দেখা যায় সেগুলো হলো বাচ্চার যত্ন, স্বাস্থ্য, খাওয়া, দাওয়া, ঘুম, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, রোগাক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা, শিক্ষা, ডিসিপ্লিন এবং সেই সাথে মায়া, মমতা, স্নেহর পর্যাপ্ততা। দায়িত্বশীল বাবা, মায়ের মনে এধরনের চিন্তা আসা খুব স্বাভাবিক এবং সন্তানের ভালোভাবে বেড়ে ওঠার জন্য অপরিহার্য।
এই সবগুলো বিষয়ের মধ্যে যদিও কোনটাই কোনটার চেয়ে কম নয়, তবে নিরাপত্তা ব্যাপারটা মনে হয় সবচেয়ে জরুরি।

সত্তর আশি বা নব্বইয়ের দশকে দেশে বেবি সিটার, চাইল্ড কেয়ারের প্রচলন ছিল না। সত্যি বলতে কী চাকরিজীবী মায়েদের সংখ্যাই ছিল কম। মায়েরাই সন্তান লালন পালনের প্রধান দায়িত্বে ছিলেন। মুষ্টিমেয় যেসব নারী চাকরি করতেন তারা হয়, মা, শাশুড়ি, বোন, ননদের সাহায্য পেতেন, বা বাসায় সাহায্যকারী থাকতো। এরা অনেকটা পরিবারের সদস্যদের মতোই হয়ে যেত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হতো অনেক বিশ্বাসী। আমি নিজেও ছোটবেলায় বাসায় এমন কিছু স্নেহময়ীদের সাহচর্য পেয়েছি যারা পরিবারের সদস্য না হয়েও পরম বিশ্বস্ততায় ও মমতায় আমাদেরকে লালন-পালনে সাহায্য করেছেন। তবে সময় বদলেছে। আজকাল শুনি বিশ্বস্ত সাহায্যকারী পাওয়া খুব কঠিন। এক্ষেত্রে কিছু প্রতিষ্ঠান হয়েছে যারা বাসায় রেফারেন্সসহ শিক্ষিত বেবিসিটার সরবরাহ করে। এটি একটি ভালো অপশন হতে পারে। প্রয়োজনে ঘরের ভেতরে সিসি টিভি লাগানো যেতে পারে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে চাইল্ড কেয়ার পছন্দ করি একারণে যে, সেখানে নিরাপত্তার ব্যাপারটা কিছুটা নিশ্চিত, তাছাড়া সেখানে কর্মচারীরা এই কাজে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। বাচ্চার শিশুকাল থেকে বিভিন্ন সুঅভ্যাস গড়ে তোলার ব্যাপারে এর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা, ডিসিপ্লিন, পরিচ্ছন্নতা, ভালো ব্যবহার, নিয়মিত শরীর চর্চা, খাদ্যভ্যাস এবং শিশু মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে চাইল্ড কেয়ারের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

অনেকেই ভাবে বাচ্চারা বেবিসিটার বা গৃহকর্মির কাছে থাকলে, চাইল্ড কেয়ারে থাকলে তারা পর্যাপ্ত স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়, তাদের সাথে মা বাবার বন্ধন গড়ে ওঠে না। এই কথাটা ঠিক নয়। যেসব শিশু নানা, নানি , দাদা, দাদি, খালা, ফুপুর কাছে সারাদিন থাকে তাদের সাথে কি মা, বাবার সাথে বন্ধন গড়ে উঠে না? শিশু পর্যাপ্ত ভালোবাসা পাবে কিনা, তার সাথে মা, বাবার দৃঢ় বন্ধন গড়ে উঠবে কিনা তা নির্ভর করে বাবা, মায়ের ঐকান্তিক চেষ্টা, সঠিক চেষ্টা এবং যথা সম্ভব বেশি কোয়ালিটি সময় দেওয়ার উপর। চব্বিশ ঘণ্টা সময় দিলে বরং সেই সময়ের কোয়ালিটি খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

তাহলে কর্মজীবী বাবা, মায়েদের যাদের কোন আত্মীয় স্বজনের সাহায্য পাওয়া সম্ভব না, তাদের কী করা উচিৎ? সর্বপ্রথম বিশ্বস্ত সাহায্যকারী যার রেফারেন্স আছে তেমন কেউকে খুঁজে বের করা বা চাইল্ড কেয়ার সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিতে হবে। বাচ্চার জন্মদানের আগে থেকেই এই কাজটি শুরু করা যায়। সেইসাথে যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে সেই সাহায্যকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, উচ্চ শিক্ষিত না হলেও চলে, কিন্তু কিছু মানবিক মূল্যবোধ, ভালো আচরণ, পরিষ্কার পরিছন্নতা, নিয়মানুবর্তিতা এবং সেই সাথে স্নেহশীল কিনা সেগুলো যাচাই বাছাই করে নিতে হবে।

তবে বাচ্চার দায়িত্ব যার উপরেই দিন না কেন এমনকি যদি হয় নিজের বাবা মায়ের উপরেও, যার সন্তান, শেষপর্যন্ত দায়িত্ব তার। যতই ব্যস্ত হন না কেন, মা – বাবা হয়ে যাওয়ার পর প্রতিমুহূর্তে মনে রাখতে হবে সন্তানের প্রতি আমার দায়িত্ব আছে। বাইরের কাজ যতটা সম্ভব কম সময়ে পারদর্শিতার সাথে শেষ করে বাকি সময়টা সন্তানকে দিতে হবে। শিশু অবস্থা থেকেই মানব শিশু স্নেহ বোঝে। এবং সবসময় খেয়াল রাখতে হবে সাহায্যকারীরা আপনার আশানুরূপ যত্ন করছে কিনা, এ ব্যাপারে হেলাফেলা চলবে না। ক্লান্ত থাকলেও কাজের শেষে ঘরে ফিরে নিজের সন্তানকে সময় দিতে হবে প্রয়োজনে অন্য কাজ বা দায়িত্ব কেটে ছেঁটে। এ ব্যাপারে বাবা এবং মায়ের দুজনেরই ভূমিকা রাখা দরকার। যে সংসারে বাবা মনে করে সন্তান লালন পালন শুধু মায়ের দায়িত্ব, সে সংসারে মায়ের পক্ষে চাকরি করা দুরূহ।

সব মিলিয়ে যদি কোনভাবেই কোন সাহায্য না পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে ৯৯% ক্ষেত্রে মায়েরা কাজ ছেড়ে দেয়, এই মানসিকতার আমি যুক্তি পাই না। যদি না বাবার আয় মায়ের চেয়ে অনেক বেশি হয়। যদি দুজনেই কিছুটা কম্প্রোমাইজ এবং স্যাক্রিফাইস করে কিছু করা যায় সেটা করাই ভালো। যেকোনো একজনের কর্মক্ষেত্রে লম্বা বিরতি পড়ে গেলে তার জন্য কাজে ফিরে যাওয়া কঠিন। তবে যে যখনই বিরতি নিক না কেন, মাথায় রাখতে হবে এটা অস্থায়ী অবস্থা, কাজে সে ফিরবেই। প্রথম থেকে এই মনোভাব থাকলে কাজে ফেরার তাড়া থাকে এবং সেটা সম্ভব হয়। মা হয়ে কতো মেয়ে যে শেষপর্যন্ত গৃহবধূ হয়ে নিজের পরিচয়টুকু হারিয়ে ফেলে। আপনার সন্তানের জন্য আপনি আদর্শ। যাকে মানুষ করতে গিয়ে নিজের আত্ম পরিচয়টুকু হারালেন, সে যদি ভবিষ্যতে পড়ালেখা করে শিক্ষিত হয়ে আপনার মতো ঘরে বসে থাকে আপনার ভালো লাগবে?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.