করোনায় বাড়ছে বাল্যবিবাহ ও ঝরে পড়ার হার: ভুক্তভোগী কিশোরীরা

ইসরাত জাহান তানজু:

সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসের তাণ্ডবে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী দেশগুলো যখন বিপর্যস্ত ও মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের অবস্থা আরও করুণ। দুর্বল স্বাস্থ্যসেবা, সীমাহীন দুর্নীতি, দরিদ্র অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগে অনিশ্চিত যখন মানুষের ভবিষ্যৎ, এমনি সময়ে বেড়ে গেছে বাল্যবিবাহের হার ও স্কুলগামীদের ঝরে পড়ার প্রবণতা। আর এর সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী কিশোরীরা।

যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম “টেলিগ্রাফ” এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনা মহামারির পর প্রায় এক কোটি শিশু আর স্কুলে যেতে পারবে না। শিক্ষা তহবিল কাটছাঁট ও দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার কারণেই এমনটি ঘটবে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক দাতব্যসংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মহামারির কারণে বর্তমানে প্রায় ১৬০ কোটি শিক্ষার্থী স্কুলের বাইরে। সংক্রমণ শেষে স্কুল খুলে দিলেও গরিব শিশুরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। বিশেষত মেয়েরা স্কুল থেকে ঝরে পড়বে। কারণ আমাদের প্রচলিত সমাজ কাঠামোয় ছেলেদেরকেই শিক্ষা অর্জন ও উপার্জনে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে করোনার অভিঘাতে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার নিম্ন মধ্যবিত্তে আর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার দারিদ্র্যের কাতারে চলে এসেছে। দারিদ্র্যের হার বেড়ে গিয়ে ২২ থেকে ৩৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে স্বাভাবিক অবস্থায় যেখানে মেয়েদের শতভাগ শিক্ষা নিশ্চিত করতেই সরকারকে বেগ পেতে হচ্ছে, সেখানে করোনা পরবর্তী ভঙ্গুর অর্থনীতিতে শিক্ষাখাতের সংকুচিত বাজেটে আশংকাজনক হারে কমবে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। করোনার কারণে বাংলাদেশে ৩ কোটি ৬৭ লাখ শিশু স্কুলে যেতে পারছে না। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মাধ্যমিক পর্যায়ে ৪১ ভাগ মেয়ে শিক্ষার্থী ও ৩৩ ভাগ ছেলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। অতিরিক্ত অভাব অনটন, গৃহস্থালি কাজে সহায়তা ও বাল্যবিবাহের কারণে আশংকাজনক হারে বাড়বে ঝরে পরা কিশোরীর সংখ্যা।

অন্যদিকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে এই সংকটের মধ্যে বাল্যবিবাহ বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, বাল্যবিবাহের তথ্য নিয়মিতই তাদের কাছে আসছে, আর তা আগের চেয়ে অনেক বেশি। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস এন্ড ডাইভার্সিটি বিভাগের এক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ১৩ শতাংশ জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে তাদের এলাকায় বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংস্থাটির ১১ টি শাখায় ৫৫৭ জন প্রতিনিধির ৭২ জন এসময় ৭৩টি বাল্যবিয়ের ঘটনা দেখেছে।

আন্তর্জাতিক সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল কুড়িগ্রাম জেলার বাল্যবিবাহের বিষয়টি নজরদারি করে। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে জেলায় বাল্যবিবাহের সংখ্যা ছিল ৮ শতাংশ ও এপ্রিল মাসে ৯ শতাংশ। মে মাসে মোট বিয়ের ১১ শতাংশ হয় বাল্যবিবাহ। আবার নিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা কমে গিয়ে বেড়েছে অনিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা। কমেছে বাল্যবিবাহ ঠেকানোর ঘটনাও। ফেব্রুয়ারি মাসে ঠেকানো হয় ১৪ টি ঘটনা, মে মাসে ঠেকানো হয় মাত্র দুটি। এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে ছুটির ফাঁদে নাটোরের গুরুদাসপুরে চাপিলা ইউনিয়নের একটি বিদ্যালয়ের ১৩ জন শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়।

আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন, বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী মার্চ থেকে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে ২১ টি বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে।মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হেল্পলাইনে আসা অভিযোগের বরাত দিয়ে সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, জোর করে বিয়ে দেওয়ার ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বেড়েছে এই সংখ্যা।

বাল্যবিবাহ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বিভিন্ন গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় গ্রামীণ পরিবারগুলোতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকেরা দেশে ফিরেছেন। আমাদের গ্রামীণ সমাজ বাস্তবতায় প্রবাসে কাজ করা ছেলেদের পাত্র হিসেবে চাহিদা অনেক বেশি। তাই এই সুযোগে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে অনেকটা দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন অভিভাবকরা। অন্যদিকে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিও কম হচ্ছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে অনেকে। আবার এই সময়টাতে মানুষের চলাফেরাও কমে গিয়েছে। তাই খুব বেশি মানুষকে আপ্যায়ন করতে হচ্ছে না বলে খরচও কমে গেছে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, লকডাউনে গৃহবন্দি নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও যৌন নির্যাতন বেড়ে গেছে। কন্যা সন্তানের নিরাপত্তার জন্যও অনেক অভিভাবক বিয়ে দেওয়াকে বেছে নিচ্ছে।

ব্র্যাকের গবেষণায় বলা হয়েছে, ৮৫ শতাংশ বাল্যবিবাহ হয়েছে মেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণে। ৭১ শতাংশ হয়েছে মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে। বাইরে যাওয়া ছেলে হাতের কাছে পাওয়া ৬২ শতাংশ বিয়ের কারণ ছিল।

“বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭”- অনুসারে মেয়েদের বিয়ের ন্যুনতম বয়স ১৮ আর ছেলেদের ২১। তবে বিশেষ ক্ষেত্রে এবং সর্বোত্তম স্বার্থে, আদালতের নির্দেশে ও বাবা-মায়ের সম্মতিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে ও মেয়র বিয়ে হতেও পারে। যদিও আইনের এই বিশেষ ক্ষেত্রটুকু অনেক বেশি আলোচিত-সমালোচিত বিতর্কিত হয়েছে। ২০১৩-১০১৫ সালে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ব্র্যাক, ইউনিসেফ, আইসিডিডিআরবি ও প্ল্যান বাংলাদেশের পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, আইনত নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ বাল্যবিয়ের হার কম-বেশি ৬৩ শতাংশ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মেয়ের বিয়ের গড় বয়স ১৫.৩। তবে ভয়ের ব্যাপার হলো, এখনও ১০ বছরের নিচে মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। আর ১২ বছরের আগেই বিয়ে হচ্ছে ২.২৬ শতাংশের।

জাতিসংঘের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বজুড়ে এক দশকে বাল্যবিবাহের হার কমেছে ১৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায়। এই হার এখন ৫০ শতাংশ থেক ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা ৫০ শতাংশের ওপরেই রয়ে গেছে। যদিও জাতিসংঘ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুসারে বিশ্ব নেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ অবসানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এদিকে বাল্যবিবাহ যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে কিশোরীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি আবার অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে বেড়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা। অদৃশ্য ভাইরাসের সংক্রমণ, ত্রুটিপূর্ণ চিকিৎসা ব্যবস্থা, অনিরাপদ ভবিষ্যৎ ও পারিবারিক নানা সহিংসতায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছে নারীরা।

এমন পরিস্থিতিতে সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো কিশোরীদের ঝরে পড়া রোধ করতে উপযুক্ত পরিকল্পনা নেয়া। শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি করা। বিশেষত নারী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি ও খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করা। দরিদ্র কিশোরদের বিশেষ সামাজিক সেবার আওতায় আনা। তাদের সকল ধরনের নিরাপত্তা জোরদার করা।

অন্যদিকে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে অভিভাবক কিশোরীদের মাঝে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বাল্যবিবাহের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে স্থানীয় নেতা ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গকে সরকারিভাবে বিশেষ নোটিশ পাঠানো হতে পারে সরকারের পদক্ষেপগুলোর অন্তর্ভুক্ত।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.