নারীবাদে অগুরুত্বপূর্ণ প্রপাগান্ডা

আর্শি মামনি:

প্রত্যেক মাসে পাঁচটা করে শাড়ি কেনা তথাকথিত শিক্ষিত, সভ্য, এলিট ক্লাসের নারী যিনি নিজেকে ফেমিনিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, তিনি হঠাৎ আজকে শাড়ি কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন, পুঁতির মালা কিনেছেন গোটা কয়েক এবং চুলগুলোকে বেশ ছেঁটেছেন বয়কাট্ করে। এসব করতে ওনাকে এক চুলও কেউ বাধা দেননি। উনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কোনো বাধা মানেন না এবং সমস্তটা ওনার ফেসবুকে পাবলিকের কাছে শেয়ার করা চাই।

আপনার ব্যক্তিগত আনন্দে হস্তক্ষেপ না করে, সোজা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে যে-সমাজের উচ্চস্তরে দাঁড়িয়ে আপনার কাছে যখন সবটা সহজ, লড়াইটা যখন আপনাকে তুলনামূলক কম করতে হয়েছে, বা বর্তমানে কম করতে হচ্ছে, তখন সমাজের নিম্নস্তরের নারীর জন্য আপনার এজেন্ডাটা ঠিক কী?আপনার মতে আপনার দেশের ও সমাজের নারীদের বর্তমান অবস্হা অনুযায়ী তাদের মৌলিক এবং প্রাথমিক অধিকার কী হওয়া দরকার?

প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতে এটাও ভেবে নেওয়া যাক যে-আপনি যখন নিজের যোগ্যতা ও শিক্ষা দ্বারা এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছেন যেখান থেকে আপনার আওয়াজ অনেকজনের মানসিকতা পাল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, সেখানে কিছু হোঁচট খাওয়া মুখ আপনার কাছে এক্সপেক্ট করে অনেক বেশি।
জেরেমি বেন্থাম এর ইউটিলিটারিয়ান তত্ত্বানুযায়ী, যে কোনো প্রাণী বা বস্তুকে হতে হবে উৎপাদনক্ষমতাশীল সম্পন্ন। তবেই সে সমাজে গ্রহণযোগ্য, নচেৎ নয়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ খুব সহজে ধরেই নিয়েছিল যে একমাত্র সন্তানের জন্মদান ছাড়া নারীরা প্রোডাক্টিভ হতে পারে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আরও বলে- এই ক্ষমতা নাকি ঈশ্বর প্রদত্ত। তাই বায়োলজিক্যালি নারীরাই পারে সন্তানের জন্ম দিতে। নারী সম্পূর্ণ হতে পারে একমাত্র সন্তান উৎপাদনের মাধ্যমে।

বেন্থাম এর তত্ত্ব অনুসারে যখন সমাজে একজনকে প্রোডাক্টিভ হতেই হবে, তখন সে তার কর্মক্ষমতা আর শিল্পের দ্বারাও প্রোডাক্টিভ হতে পারে নিশ্চয়। স্বাভাবিকভাবে পুরুষদের ক্ষেত্রেও তো এই এক পন্থা গ্রহণ করা হয়েছে। শিল্প মানেই সবসময় বড় কিছু শিল্পই নয় বরং ছোটোখাটো হস্তশিল্পের সাথে যুক্ত হয়েও নারীরা যথেষ্ট পরিমাণে উৎপাদনে সক্ষম। সমাজের এই ধ্যানধারণা পাল্টানোর জন্য অনেকে মাথা খুঁড়ে গেছেন এবং খুঁড়ছেনও। শিক্ষিত সমাজ হয়ত সহজে এগিয়ে গেছেন। পড়ে আছে এখনও অ-শিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত সমাজ। গ্রামেগঞ্জে, ছোটো শহর কিংবা মফস্বলে এখনও অনেক মেয়েদের এই বিকৃত মানসিকতার সাথে লড়াই করতে হয়। এমনকি অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা দ্বারা ম্যনিপুলেটেড মহিলা এবং উচ্চস্তরের নারী উভয়েই স্ট্রাগলড নারীদের আপন করে নেন না।

উই আর লিভিং ইন অ্য হাইলি ম্যাটেরিয়ালিস্টিক সোসাইটি। এবং এখানে দাঁড়িয়ে পুঁজিবাদী সমাজে আজ অনেক নারী সমতা আনতে পেরেছেন। কিন্তু এই সমতা কী শুধু পুরুষদের সাথে নারীদের? নাকি উচ্চস্তরের নারীদের সাথে নীচুস্তরের নারীদের? নারীবাদে শ্রেণীবিভাজনের এই জটিলতা নিয়ে লড়াই করাও সমাজে খুব গুরুত্বের জায়গা রাখে। সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মানসিক দৃষ্টিতে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে নারীদের অবস্হা এখনও শোচনীয়। অনেকে নিজের অজান্তেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার শিকার হচ্ছেন। কারণ তাদেরকে বিষয়গুলো rationaly ভাবতে শেখানো হচ্ছে না। বলা যেতে পারে তারা ভাবতে পারছে না তাদের priority টা। তার কারণ কিছু অগুরুত্বপূর্ণ প্রোপাগান্ডা এবং ভুল ইন্টারপ্রিটেশন্।

একজন এলিট ক্লাসের নারীর এবং একজন সাধারণ নারীর ন্যুনতম চাহিদা এক নয়। নারীবাদের তৃতীয় স্তরে পৌঁছে যাওয়ার পর একজন এলিট ক্লাসের নারীকে প্রোডাক্টিভ হিসেবে প্রমাণ করতে ও সমাজের সাথে লড়াই করতে হয় না তেমনভাবে। মাসিক আয় এর পরিমাণ যে কোনো সংখ্যার হোক, মোটামুটি কর্মরতা হলেই উনি প্রোডাক্টিভ ও সম্মানযোগ্যা। অন্যদিকে–নিম্নস্তর থেকে উঠে আসা, কোনোরকম একটু-আধটু পড়াশোনা জানা ছোটোখাটো হস্তশিল্পের সাথে যুক্ত এবং আর্থিক দিক থেকে কারোর ওপর নির্ভরশীল নয়–তাকে সমাজ প্রোডাক্টিভও মানে না, তিনি সম্মানযোগ্যাও নন।

যে সময় আপনি শাড়ি কেনা কমিয়ে দিচ্ছেন, মেলায় পুঁতির মালা কিনছেন এবং চুল ছোটো করে কেটে অগুরুত্বপূর্ণ প্রোপাগান্ডা শেয়ার করছেন, ঠিক সেই সময় একজন নারী স্ট্রাগল করছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। নিজেকে প্রোডাক্টিভ হিসেবে দেখানোর জন্য। আর্থিকভাবে নিজেকে সাবলীল করার জন্য। সে তখন আপনার কাছে চায় মানসিক সহযোগিতা। কারণ আপনি এখন সমাজে Icon of rational woman. এখানেই সিস্টারহুডের গূঢ় তত্ত্ব নিহিত।

লেখক:
সাহিত্যের ছাত্রী
সাহিত্য প্রেমী

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.