নারীবাদ, ম্যারিসা ম্যায়ার এবং আমাদের সাবরিনা

ওয়াহিদা নূর আফজা:

১.

ম্যারিসা ম্যায়ারের সেই বিতর্কিত ছবি

২০১৩ সালে ইয়াহুর সিইও (সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তা) ম্যারিসা ম্যায়ার একবার ভোগ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হলেন। সেই ছবির জন্য ম্যারিসা ম্যায়ার খুব সমালোচিত হয়েছিলেন। নারীবাদীদের বক্তব্য ছিল, যেখানে নারীরা চাচ্ছে তাদের অবয়বগত সৌন্দর্যকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের কর্মদক্ষতা আর মেধার মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠা পেতে সেসময়টিতে ম্যারিসা ম্যায়ারের এরকম যৌনাবেদনমূলক ছবিটি কতখানি যৌক্তিক? কোন পুরুষ সিইওকে তো কখনও তাদের শার্টের বোতাম খুলে ছবির মডেল হতে দেখা যায়নি, একজন নারী সিইও কেন এরকম কাজটি করতে গেলেন? হতে পারে ম্যারিসা ম্যায়ার ফ্যাশন পছন্দ করেন – সেক্ষেত্রে তার ফ্যাশন্যাবল ছবি থাকতেই পারে। কিন্তু ইয়াহু (কোম্পানির স্টক সেসময়টাতে খুব খারাপ করছিলো) যখন ভালো করছিল না তখন তিনি নিজের বোনাস বাড়িয়ে নিচ্ছেন আর ভোগ ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ হচ্ছেন – পরস্পর বিপরীতমুখী এই বিষয়গুলো একজন উচ্চপদস্থ নির্বাহী কর্মকর্তার পেশাদারিত্বের দায়িত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সেই কর্মকর্তা যদি হন কোনো নারী তাহলে সমালোচনার মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়।
এখনও সমাজের অনেক মানুষ বিশ্বাস করেন না যে প্রকৃতি অন্ধ, মেধা বা প্রতিভা মানব মস্তিষ্কে প্রবেশ করার সময় বিচার করে না এটি কার – নারী বা পুরুষের? আর কর্মদক্ষতা তো একটি নিজস্ব অর্জন; যে কেউ তা অর্জন করতে পারেন।

জেকেজি’র করোনা টেস্ট কেলেংকারির ঘটনায় আলোচিত ও গ্রেপ্তারকৃত ডা. সাবরিনার ফেসবুকের পাবলিক প্রোফাইলের ছবিগুলো এখন সবার বিনোদনের বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে – পেছনের কারণটি তার পেশাগত নৈতিকতার স্খলন। সাবরিনা যদি তার পেশায়, সেটি চিকিৎসা বা ব্যবসা সংক্রান্ত যাই হোক না কেন, সততার সাথে চমকপ্রদ সাফল্য দেখাতেন তাহলে এই ছবিগুলো আজকে তার এতো হেনস্থার কারণ হতো না। এক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে একবিংশ শতাব্দীর এই সামাজিক মাধ্যমকেন্দ্রিক যুগে শুধু নারী নয়, একজন পুরুষ অনন্ত জলিলও যথেষ্ট হেনস্থার শিকার হন। অনন্ত জলিল যখন শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন তখন তিনি আড়ালেই ছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্র বা জনতার মাঝে নিজেকে তুলে ধরতে চাইলে সেখানে হিসাবটা অন্যরকমভাবে কাজ করে। কোন ব্যক্তির পেশা আর প্যাশন বিপরীতমুখী হতেই পারে, কিন্তু দেখা যাচ্ছে কোন একটির স্খলন হলে সামাজিক মাধ্যমের আদালতে সে ব্যক্তিটিকে নানান দিক থেকে আঘাত করে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এমনটি যে শুধু বাংলাদেশে হয় তা নয়, পাশ্চাত্যেও হয়। তবে পার্থক্য এখানে যে বাংলাদেশের সমালোচনাগুলো তেমন গঠনমূলক হয় না। এটি শুধু একজন ব্যক্তিকে অপদস্থ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আর অপরাধী বা আলোচিত ব্যক্তিটি নারী হলে তো কথাই নেই।


পেশা, নীতিবোধ, এবং সামাজিক ভাবমূর্তি সবই একসূত্রে গাঁথা। একজন ক্যাটরিনা কাইফের পেশার মূল উপজীব্য হলো গ্ল্যামার এবং যৌনাবেদন – মিস কাইফ কিম্বা সানি লিয়ন পুরুষদের (ক্ষেত্রবিশেষে নারীদেরও) মনোরঞ্জনের জন্য অনেক রকম ছবিই তুলতে পারেন; বাংলাদেশের বিশাল ভোক্তাগোষ্ঠী এসব ছবি দেখে কোন প্রশ্ন তোলেন না। তারাই আবার ভদ্রস্থ শাড়ি পরিহিত রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার কথা শুনে এ বরেণ্য শিল্পীকে হিজাব পরার উপদেশ দেন।
এরকম একটি সমাজ ব্যবস্থায় শুধুমাত্র করোনার জাল সনদপত্র তৈরি করার অপরাধের জন্যই চিকিৎসক সাবরিনা যথেষ্ট নিন্দিত হওয়ার কথা, সেক্ষেত্রে তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পাবলিক প্রোফাইলের ছবিগুলো আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে। কেউ ফ্যাশন পছন্দ করেন এটি কোনভাবেই তার অপরাধ হতে পারে না। চিকিৎসক সাবরিনার ফ্যাশন নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এর আগে কোন কথা হয়নি। একজন চিকিৎসক বা ব্যবসায়ী হিসেবে তার পেশা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরই বাংলাদেশের রক্ষণশীল সমাজ এখন এই গুজবে উৎসাহিত হচ্ছে যে নারীরা আসলে মেধা নয়, নিজেদের যৌনাবেদন ব্যবহার করে পুরুষদের চাকরিগুলো দখল করে নিচ্ছে। তাই একজন পেশাজীবী নারীর ব্যক্তিগত জীবন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতোটুকু প্রকাশ করা উচিত তা নিয়ে কথা বলা মানে এই নয় যে তা নারীবাদের অন্তরায়, বরং নারীদের মেধা প্রশ্নবিদ্ধ না হওয়ার একটি প্রয়াস মাত্র।


আসলে এই একবিংশ শতাব্দীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখনও একটি পরীক্ষাক্ষেত্র। শুধুমাত্র ফ্যাশনেবল ছবি পোস্ট করেই এখানে লাইকের বন্যায় ভাসমান যশ, খ্যাতি অর্জন করা সম্ভব। তবে দীর্ঘমেয়াদে তা কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে। অরিগন ষ্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মনস্তত্ত্বের শিক্ষক গবেষণা করে দেখেছেন যে নারীদের মধ্যে যারা ফেসবুকে যৌনাবেদনমূলক ছবি পোস্ট করেন, তাদেরকে হালকা স্বভাবের বলে বিবেচনা করা হয়। বেশি আকর্ষণীয় লাগছে নাকি একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে – ফেসবুকে নিজেদের উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে মেয়েরা বা নারীরা এখন কোনটি বেছে নেবে?

অনেকে বলবে দুটোই, আবার অনেকের মতে বেশি আকর্ষণীয় উপস্থাপন মেধার অন্য দিকটিকে মেঘাচ্ছন্ন করে ফেলতে পারে। পাশ্চাত্যে তো এখন চাকরিদাতাদের শতকরা ৩৭ ভাগ চাকরি দেওয়ার আগে ফেসবুক প্রোফাইল পরীক্ষা করে নেয়।

আসলে সময়টি বড়ই অস্থিতিশীল। কাকে রোল মডেল হিসেবে বেছে নেওয়া হবে? “বিউটি এন্ড ব্রেইন” বলে নারীদেরকে আরও প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। যে কোনো একটি ক্ষেত্রেই উৎকর্ষতা অর্জনের জন্য অনেক সময় এবং উৎসর্জন প্রয়োজন। একজন ক্যাটরিনা কাইফকে সুন্দর থাকার জন্য কতো অর্থ আর সময় বিনিয়োগ করতে হয় তা জানলে যে কারোও চোখ কপালে উঠবে; স্বাভবিক নিয়মেই পেশাজীবী নারীর সে সময়টি নেই। আর অকারণে সময় নষ্ট করলে মানুষ গভীরভাবে চিন্তা করার সময় পাবে কোথায়? চিন্তাভাবনার গভীরতার প্রসার না ঘটলে নীতিবোধ শূন্যের কোঠায় উঠে আসে – যার ফলাফল করোনার জাল সনদপত্র। স্বাভাবিক নিয়মেই তাই কেউ চাইবে না নীতিবোধের অভাবে আর কোন মেধার স্খলন ঘটুক।

https://localtvkstu.wordpress.com/2013/08/21/sexed-up-and-smart-women-debate-marissa-mayers-vogue-photo/
https://pdfs.semanticscholar.org/f197/fd60fd2ae49fe309a05f14040aa5496ff206.pdf?_ga=2.12527356.95067086.1595086065-935706323.1595086065https://www.mic.com/articles/93620/psychologists-found-a-troubling-trend-among-young-women-who-post-sexy-facebook-photos
https://www.psychologytoday.com/us/blog/fulfillment-any-age/201304/the-high-cost-facebook-exhibitionism

https://www.mic.com/articles/93620/psychologists-found-a-troubling-trend-among-young-women-who-post-sexy-facebook-photos

 

ওয়াহিদা নূর আফজা: প্রকৌশলী, লেখক, সমাজকর্মী

শেয়ার করুন:
  • 219
  •  
  •  
  •  
  •  
    219
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.