মা’কে বলছি, পুত্র সন্তানের ভেতর নারীবাদী বীজ বপন করুন

ফাহমিদা জেবীন:

সাধারণত: Women chapter এ প্রায়ই আমাদের বহু লেখকের “নারীবাদী” নানা মতবাদ/আর্টিকেল চোখে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে অনেক নারীবাদী আবার বিক্ষিপ্তভাবেও বলে থাকেন, যা নতুন কিছু নয়। এ নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস’এ Claire Cain Miller নামে (সম্ভবত ব্রিটিশ) একজন লেখক শিক্ষণীয় একটি চমৎকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন। যা আমাদের মতো রাষ্ট্রগুলোতে প্যারেন্টিং নামক ক্লাসে নিয়মিত আলোচনা হওয়া উচিত। কেননা এই ভারতীয় উপমহাদেশেই সাধারণত দুধের বাচ্চা থেকে শুরু করে পয়ষট্টি ঊর্দ্ধ নারীও ধর্ষিত হন।

এই তো গতকালই পত্রিকায় দেখলাম, আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন করোনা রোগীকেও ধর্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, একজন ধর্ষক কি ভিনগ্রহ থেকে আসা কোন প্রাণী, সে কি মানুষ নয়? আজ্ঞে হ্যাঁ, সে অবশ্যই কোন না কোন মায়ের গর্ভজাত সন্তান। একজন মা, যে কিনা পুত্রসন্তান জন্মদিয়ে কখনই চাইবেন না যে তার ছেলে বড় হয়ে তার মতো অন্য আরেকজন নারীকে লাঞ্ছিত করুক, অবমাননা করুক।

যাই হোক, যে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে এতো কথার অবতারণা এবার সেই Claire Cain Miller এর প্রতিবেদনটিতে আসি। প্রতিবেদনটির মূল উপাত্তগুলো ছিল ঠিক এরকম:

১। ছেলে সন্তানকে কাঁদতে দেয়া। কারণ আবেগের কোন লিঙ্গ নেই।
২। ছেলের সামনে লিঙ্গ বৈষম্যহীন আদর্শ সৃষ্টিকরণ।
৩। তাকে তার মতো করে বড় হতে দেয়া।
৪। নিজের ও অন্যের প্রতি যত্নশীল হবার শিক্ষাদান।
৫। ঘরের কাজ (বোনের সাথে) ভাগাভাগি করণের শিক্ষা।
৬। ছেলেবেলাকে উপভোগ করতে দেয়া।
৭। মেয়েদের জন্য কখনো অপমানজনক শব্দ/বাক্য ব্যবহার না করার শিক্ষা।
৮। “না মানে না”- এটা শেখানো।
৯। মেয়ে বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্বে উৎসাহীকরণ এবং
১০। অন্য কোন ছেলের অন্যায়ে সোচ্চার হবার শিক্ষা।

এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি বিষয় ছিল প্রতিবেদনটিতে। যার অধিকাংশই আমরা (বাবা-মায়েরা) ছেলে সন্তানকে বড় করতে গিয়ে বিবেচনায় আনি না। বরং আমরা বাঙালি মায়েরা ছেলেকে ঘরের কাজের ধারে কাছেও আসতে দেই না। আমাদের শত বছরের ঘুণে ধরা সংস্কার হলো ঘরের কাজ করবে কেবল কন‍্যাসন্তান আর ছেলে শুধু বই পড়ে বিদ্ব্যান হবে। এভাবে ছেলে হয়তো মোটা মোটা বই পড়ে একদিন সমাজে নামী দামী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ঠিকই হয়ে যায় কিন্তু আর প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠে না।

জানা মতে, মানবিক আদর্শ, গুণাবলী এই বিষয়গুলি একটি পরিবারে সন্তানের মাঝে মায়ের কাছ থেকেই বেশি ডেলিভারি হয়ে থাকে। তাই একজন মা তাঁর পুত্রসন্তানকে আর বেশি কিছু না হোক অন্তত সমাজের সব মেয়ে সন্তানকে সম্মান ও তাদের প্রতি সহিষ্ণু হবার শিক্ষাতো দিতেই পারেন। সেইসাথে কিছু নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা যা সৃষ্টির সেরা জীব (আশরাফুল মাখলুকাত) হিসেবে প্রতিটি মানুষের জন্য অত‍্যাবশ‍্যকীয় শিক্ষা হওয়াটাও জরুরি।

কেননা নৈতিক শিক্ষাই কেবল অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকতে মানব বিবেককে বারংবার কড়া নেড়ে নেড়ে যায়। আর ধর্মের মূলমন্ত্র তথা “সৎ নীতিতে” বিশ্বাসের শিক্ষা, যা অসৎ পথে পা রাখতেই স্রষ্টা কতৃর্ক কঠোর শাস্তির বিধানকে মনে করিয়ে দেয়। এই সবকিছুর সংমিশ্রণে পরিবার কর্তৃক সামাজিকীকরণের এক-একটি ধাপ অতিক্রমের মধ‍্য দিয়েই কেবল একজন পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে গড়ে উঠা সম্ভব। যা অনেকাংশেই মায়ের (যে পরিবারে মা নেই বাবার উপর বর্তায়)। তাইতো নেপোলিয়ন বলেছিলেন, “আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দেব”। এইসব শিক্ষার মধ‍্য দিয়ে আপনি (মা) দিতে পারেন “প্রকৃত শিক্ষা” যা ছেলেকে তথাকথিত বিদ্বান হতে বিমুখ করে তুলবে।

জানি, জীবনটা উপন্যাস কিংবা কয়েক কলাম লেখা বা আর্টিকেল নয়। আমরা অনেকেই বহু প্রতিকূলতাকে আলিঙ্গন করেই দিনাতিপাত করি। তবুও সময়ের দাবি হিসেবে সমাজের চিরচরিত প্রথা থেকে “অন্যরকম এক চেষ্টা” করতে দোষ কী? আসেন না একবার চেষ্টা করেই দেখি, আমাদের পুত্ররা “ধর্ষকামী নয়, বরং নারীবাদী মন নিয়ে মানুষের মতো মানুষ হোক” – মা হয়ে এ শিক্ষার বীজ আজ থেকেই বপন করি।
তবেই হয়তো ছেলে আমার বেড়ে উঠবে সহিষ্ণু পরিবেশে নির্মল শুদ্ধতায়।

 

লেখক:
বাসাবো, ঢাকা-১২১৪

শেয়ার করুন:
  • 758
  •  
  •  
  •  
  •  
    758
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.