একটি সিনেমা দেখা ও আমার নিজের উপলব্ধির কিছু কথা

লুনা রাহনুমা:

পরিচালক অনুভব সিনহার হিন্দি ভাষার সিনেমা থাপ্পড়, মুক্তি পায় এই বছর ২৮শে ফেব্রুয়ারি। ১৪২ মিনিটের এই সিনেমার মূল আকর্ষণ হচ্ছে কয়েকটি থাপ্পড়।

প্রথম থাপ্পড়টি পড়ে সিনেমার প্রধান চরিত্র অমৃতার গালে। অমৃতার স্বামী বিক্রম নিজের বাড়িতে অফিস কলিগ ও কাছের মানুষদের জন্য একটি পার্টি দেয়, সেখানে বসের সাথে ঝগড়ার একপর্যায়ে রাগ ক্ষোভ সবকিছু উগরে দিতে স্ত্রীর গালে চড় বসায়।

দুৰ্ভাগ্যবসত অমৃতার আত্মসম্মানবোধ প্রখর হওয়ায় সে সংসার টিকিয়ে রাখতে হলেও এই চড়টাকে মেনে নিতে পারেনা। মনের ভেতর এতদিন লালন করা ভালোবাসায় ফাটল ধরে যায়। সিদ্ধান্ত নেয় – প্রিয় সংসার থেকে সরে যাবার। ডিভোর্স ফাইল করে নারী উকিলের কাছে গিয়ে।
নিজের পরিবার, প্রতিবেশী এমনকি তার উকিল অমৃতাকে আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে, “শুধু একটি থাপ্পড়!”

অমৃতা অনড়, “শুধু একটি থাপ্পড়। কিন্তু এটাও না দিতে পারতো।“
অন্যরাও অমৃতাকে বুঝানোর চেষ্টা করে, “বিক্রম জীবনে প্রথমবার ভুল করেছে, আর কোনদিন করবে না।“
অমৃতা অবুঝ, “এই প্রথমবারটিও তো না হতে পারতো।“

অমৃতদের বাড়িতে ঠিকা ঝিয়ের কাজ করে সুনীতা। রাতে ভাত খাবার সময় সুনীতা অনেকক্ষণ স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, “সব মরদই তো বৌকে মারে, আমি খামোখাই তোমারে গালি দেই।”
সুনীতার স্বামী থাপ্পড় মারে সুনীতাকে।
মেঝে থেকে উঠে বসে সুনীতা তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করে, “আমারে মারলা কেন?”
স্বামীর উত্তর, “তোকে মারতে আমার লাইসেন্স লাগবে নাকি?”

শহরের নামকরা নারী উকিল নেত্রা জয় সিং এর আত্ন-অহংকারের ভীত নড়ে যায় অমৃতার কেস লড়তে লড়তে। সে নিজেও বিচারক স্বামীর আচরণে, ভর্ৎসনায় নীরব নির্যাতনের শিকার।

এই রকম সামাজিক বিভিন্ন স্তরের মেয়েদের পারিবারিক নিগ্রহের ঘটনা দিয়ে বানানো সিনেমাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দর্শককে চুম্বকের মতো টেনে বসিয়ে রাখবে টিভি স্ক্রিনের সামনে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি এগিয়ে গিয়েছে অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের সাবলীল অভিনয়ে আর নাট্য নির্মাতাদের দক্ষতায়।

বুকের ভেতর একটি প্রবল ধাক্কা এসে লাগে যখন অমৃতার নাচের ছাত্রী ওকে চড় মারতে দেখে ফেলে। মায়ের কোলে শুয়ে খুব আস্তে জানতে চায়, “মা আমার বাবা কি তোমাকে মেরেছে কোনোদিন?”

বহুল আলোচিত এই সিনেমার থাপ্পড়গুলো একেক মানুষ একেকভাবে নিয়েছে। অনেক নারী দর্শকদের মনের ভেতর চেপে রাখা কষ্ট অশ্রু হয়ে গলে পড়েছে। অনেকে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলেছে। কেউ কেউ গর্বের সাথে বলেছে, আমার বর কোনোদিন আমাকে মারেনি। আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্যে বরের হাতে মার না খাওয়াটাও একটা গর্বের কথা বটে।

আমার হিসেবে মতে ৯৫ ভাগ পুরুষ সিনেমাটি দেখে হি হি করে হেসেছে। হয়তো নিজেদের শৌর্য-বীর্যের গৌরবে। ফিক করে তাচ্ছিল্ল্যের হাসি হেসে অমৃতাকে বলেছে, “তুইও একটা থাপ্পড় দিয়ে দে, এতো নাটক করার কি দরকার!”

আমি সিনেমা পাগল একজন পুরুষ মানুষকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনি “থাপ্পড়” সিনেমাটি দেখেছেন?” তিনি মুচকি হেসে তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখিনি, তবে দিয়েছি”।

আশার কথা এই যে আমাদের চারপাশের সকল পুরুষই বিক্রম নয়, মাত্র ৫ ভাগ হলেও পুরুষ আছে যারা ভালোবাসার সাথে স্ত্রীর সম্মানটাকেও সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

১৫ই জুলাই, ২০২০।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.