সাহেদ গ্রেফতারে শিক্ষণীয় পাঠ

শাহরিয়া দিনা:

অবশেষে রিজেন্ট হাসপাতালের মো. সাহেদ বা সাহেদ করিম গ্রেফতার হলেন। ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি, সাতক্ষীরা থেকে তাকে আটক করা হয়েছে। তার গ্রেফতারের ছবি দেখে উদাস উদাস লাগতেছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার আমার কেন জানি মায়াও লাগছে। নেতাদের সাথে ঝকঝকে পোশাকে সেল্ফির পর সেল্ফি তোলা লোকটা, কত নামী-দামী তারকা সাংবাদিকদের সাথে তার উঠাবসা, টকশোতে সুন্দর করে কথা বলা লোকটা, কতো গুরুত্বপূর্ণ একটা লোক নিমিষেই উদ্ভট রকমভাবে শার্টের উপর বোরকা পরা কাদামাটি মাখা এ কী চেহারা তার!

ঠিক একইরকমভাবে অবাক হয়েছিলাম, যখন জানা গেল উনার করোনা পরীক্ষার জালিয়াতি খবর। বিশ্বের সমস্ত মানুষ যখন একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নেবার জন্য ঘরে বন্দী, আক্রান্তরা একটু অক্সিজেনের জন্য ছটফট করছে, ঠিক সেই মুহূর্তেও উনি কিংবা উনার প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির ব্যবসা করে গেছে। স্তব্ধ হয়েছিলাম, যখন শুনলাম নিজের ভাড়া করা ড্রাইভার দিয়ে পথচারীদের চাপা দিয়ে তার হাসপাতালে নিতো। একেকটা মানুষকে চাপা দেবার জন্য ড্রাইভারকে আট হাজার টাকা করে দিত। আর রোগীকে আইসিইউতে নিতে লাখ টাকার বিল ধরিয়ে দিতো। এও কি সম্ভব? কোনো মানুষ এটা পারে? কিন্তু সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশে তো পারলো সাহেদ, হয়তো এমন আরও হাজার হাজার সাহেদ আছে আমাদের চারপাশে, কে জানে!

মাঝে মাঝে খুব অস্থির হই, তখন নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা কী হলে তুমি সুখী হবে? উত্তর আসে, অনেক টাকা হলে। হ্যাঁ, টাকায় সুখ কিনতে না পারলেও সুখের সমস্ত উপকরণ কেনার জন্য টাকা লাগে। তাই বলে টাকার জন্য নৈতিকতা, পরের ক্ষতি করা, শয়তানের কাছে নিজের আত্মা বিক্রি করার কোন প্রয়োজন নেই মনে হয়।

গল্প আছে, নিজাম ডাকাতকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি যে রাহাজানি/ডাকাতি করছো, তোমার এই পাপের ভার কি তোমার পরিবার নিবে? সে কনফিডেন্সের সাথে জবাব দিল, অবশ্যই নিবে, কারণ তাদের ভালো থাকার জন্যই করছি। গল্পের পরের অংশটুকু সবাই জানেন স্ত্রী-পুত্র-পিতা কেউ-ই তার পাপের ভার নিবে না পরিস্কার জানিয়ে দিল। এবং শেষ পর্যন্ত এই ডাকাতই হয়ে যান নিজামুদ্দিন আউলিয়া। ইতিহাস বারবার ফিরে আসে। দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, ইতিহাস থেকে শিক্ষাটা সবাই নিতে পারে না।

সাহেদের বাবা করোনাভাইরাসে মারা গেল, সে পাশে থাকতে পারলো না। বউ তার সাথে সম্পর্ক অস্বীকার করলো। নেতারা লাত্থি মেরে তাড়িয়ে দিল। বা অস্বীকার করলো। তাহলে আর রইলো কী? যে কোমরে পিস্তল গুঁজে দেয়া সম্ভব, তার পেটের মধ্যে একটা গুলি চালিয়ে দেয়াও অসম্ভব না।

ক্ষমতাসীনের চারপাশে থেকে শূন্য থেকে রাতারাতি কোটিপতি হওয়াদের যেমন দেখা যায়, তেমনি কোটিপতি থেকে পথের ভিখিরি হবার নজিরও আছে। প্রভাবশালী যাদের সাথে সাহেদের মাখামাখি ছিল, কোথায় আজ তারা? সবাই তো আজ সরে গেছে। হতে পারে যে তারা এতোসব জেনেও কেবলমাত্র মণিমানিক্য পাওয়ার লোভে নিজেদের সাথে রেখেছিল, আজ যখন সব সামনে চলে এলো তখন কে কাহার!

লোভ মানুষকে আসলেই অন্ধ করে। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য আত্মা কলুষিত হয়ে যায়। মাঝে-মধ্যে নিজের সাথে নিজের বসতে হয়। নিজ আত্মার কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে হয়। দিনশেষে তুমি একা জেনে নিয়ে মনে রেখে চলতে হয়। টাকায় অমরত্ব কেনা যায় না। একদিন সবার নাম লাশ হয়। মৃত্যু সবাইকে এক করে দেয়, পার্থক্য একটাই কারো নাম উচ্চারিত হয় ঘৃণায়, কারোটা ভালোবাসায়। এতো লোভ করে লাভ কী, ঠিকানা শেষ পর্যন্ত ওই সাড়ে তিনহাত মাটি অথবা ছাই।

শেয়ার করুন:
  • 182
  •  
  •  
  •  
  •  
    182
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.