নারীবাদী আন্দোলনে ‘পিঙ্ক চাড্ডি’ পরিপ্রেক্ষিত

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

(১)
আন্দোলনের কথা যখনই আসে সকলেই তখন ওয়েভ বা তরঙ্গ হিসাব করেন- ফার্স্ট ওয়েভ, সেকেন্ড ওয়েভ, থার্ড ওয়েভ ইত্যাদি। সেই হিসাবটা যে সম্পূর্ণ ভুল, সেকথা বলতে পারছি না। কেননা বিলেতে ও আমেরিকায় যেভাবে নারীবাদী আন্দোলনের বিকাশ ও বিস্তার হয়েছে, সেটা তো ঐভাবে ফার্স্ট ওয়েভ সেকেন্ড ওয়েভ করেই ব্যাখ্যা ও আলোচনা করতে হয়। কিন্তু এইভাবে তরঙ্গ হিসাব করে নারীবাদের যে রূপটা আমরা আলোচনা করি, তার সীমাবদ্ধতা হচ্ছে যে এইসব আলোচনায় আমরা নারীমুক্তি চূড়ান্ত রূপ এবং সেইখানে পৌঁছানোর যে রাজনৈতিক পথ সেটা যেন আমরা উপেক্ষা করে যাই।
মোটা দাগে বলতে গেলে পশ্চিমা নারীবাদী চিন্তাগুলি মূলত একধরনের ক্রিটিক্যাল প্রজেক্ট। কিন্তু আপনি যদি এমন একটা সমাজ গড়তে চান যেখানে নারীর মর্যাদা হবে একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদা, তাইলে তো আপনাকে এই সমাজ পাল্টে ফেলতে হবে। সেই সমাজ পাল্টানোর কাজটা তো ক্রিটিক্যাল প্রজেক্ট দিয়ে হবে না।

সমাজ বদলের পথ একটা রাজনৈতিক পথ- একটা প্রগতিশীল রাজনৈতিক পথ। বর্তমান সমাজ কাঠামো বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বজায় রেখে নারীর জন্যে আপনি সীমিত কিছু অধিকার হয়তো আদায় করতে পারবেন, কিছু কল্যাণের পথ হয়তো করতে পারবেন- ঐ যে নারীর ক্ষমতায়ন আর কী কী সব যে বলে এনজিওগুলি; কিন্তু এই সমাজ বর্তমান রেখে নারী কখনোই পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যাদা অর্জন করবে না। বাজার অর্থনীতিতে নারী কেবলই একটি পণ্য। ক্রিটিক্যাল প্রজেক্ট করে আপনি সেই পণ্যের মূল্য বাড়াতে পারবেন, কিন্তু তার মানুষ মর্যাদা অর্জন করতে পারবেন না।

এইখানেই মার্ক্সবাদী বা সমাজতন্ত্রী নারীবাদীদের সাথে পশ্চিমা নারীবাদীদের বিরোধ। এইজন্যেই ডমিটিলা চুঙ্গারা (এই বিষয়ে আমার আগের লেখাটা পড়ুন, নিচে লিংক দেয়া আছে) মেক্সিকোর সেই সম্মেলনে বলেছিলেন যে, আমার কাছে নারীবাদ মানে কেবল পুরুষের মত সমানতালে বিড়ি সিগারেট খাওয়ার অধিকার নয়, বা পুরুষ যেমন মিস্ট্রেস রাখে তার সাথে পাল্লা দিয়ে ঐসব করা নয়। চুঙ্গারাদের কাছে নারীবাদ ও নারীবাদী আন্দোলন আর সমাজ বদলের লড়াই এক ও অভিন্ন লড়াই। কেননা ওরা জানেন এবং বোঝেন যে এই সমাজ না পাল্টালে আখেরে নারীর চূড়ান্ত মুক্তি হবে না।

এই যে বিতর্কটা না বিভক্তিটা, এটার সাথে সাথে তাইলে আমাদের সামনে সেই প্রশ্নটাই চলে আসে- তাইলে কি এই যে শহরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শিক্ষিত নারীরা নারীবাদী আন্দোলন গড়ে তুলছেন অনেকটা পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের ধারায় কোন রাজনৈতিক দিক নির্দেশন ছাড়া- এটা কি তবে সহি নারীবাদী আন্দোলন নয়?

(২)
না, আমাদের এখানে শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীদের মধ্যে একটা নারী অধিকার আন্দোলন গড়ে উঠেছে, সেটাও অবশ্যই নারীবাদী আন্দোলন। যারা মার্ক্সবাদী রাজনীতির কথা না বলেও নারীর বঞ্চনার কথা বলেন, পিতৃতন্ত্রের বিরুদ্ধে কথা বলেন, ওরাও অবশ্যই নারীবাদী- সহি নারীবাদীই। নারীর জন্যে সমান অধিকারের কথা যিনি বলবেন, সম্মান মর্যাদার কথা বলবেন, যিনি বলবেন যে নারী ঊন-মানুষ নয় নারীও মানুষ, পুরুষের সমান পূর্ণাঙ্গ মানুষ, তিনিই নারীবাদী। নারীবাদ কথাটা তো কোন সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত কোন বিশেষ ধারণা নয়- নারীবাদী হতে আপনাকে কোন বিশেষ সংঘ সমিতির ঘোষণাপত্র মেনে সদস্যপদ গ্রহণ করতে হয় না বা কোন রাজনৈতিক দলের মতো বিশেষ একটি দলের অন্ধ অনুসারীও হতে হয় না।

সুতরাং সেই অর্থ আমাদের এখানে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনটি, এটি অবশ্যই একটি নারীবাদী আন্দোলন। এবং এইরকম শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীদের আন্দোলন, হোক সে সীমিত বা সুনির্দিষ্ট কিছু আধিকারের জন্যে বা নারীর প্রতি পুরুষের অন্তর্নিহিত বিদ্বেষ থেকে জন্ম নেওয়া অবমাননাকর আচরণ বিলোপের জন্যে, এগুলিও অবশীয় নারীবাদী আন্দোলন এবং এইসব আন্দোলন চূড়ান্ত নারীমুক্তির আন্দোলনকে কোন না কোনোভাবে অবশ্যই খানিকটা অগ্রসর করে নেয়। এইরকম একটা আন্দোলনের উদাহরণ দিই।

‘পিঙ্ক চাড্ডি’ আন্দোলনের কথা মনে আছে আপনাদের? খুব বড় আন্দোলন নয় বটে কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ আন্দোলন। ২০০৯ সাল, ভারতের ব্যাঙ্গালুরু শহরের কথা। ভারতে বিজেপি সমর্থক যে নানারকম ছোটবড় গ্রুপ আছে, ওদেরই একটা গ্রুপ শ্রী রামসেনা নেমেছে ভারতীয় সংস্কৃতি রক্ষার নামে নারীদের হেনস্থা করার জন্যে। নারীরা কেন পশ্চিমা বস্ত্র পরবে, নারীরা কেন ছোট কাপড় পরবে, নারীরা কেন বিড়ি খাবে, নারীরা কেন পাবে যাবে বা ডিসকোতে যাবে এইসব নানারকম বাৎচিত- ভাবখানা যেন নারীর স্কার্টের ঝুল কত ইঞ্চি কম বা বেশি তার উপর নির্ভর করে ভারতীয় সংস্কৃতির অস্তিত্ব।
আপনারা জানেন ওদের কথাগুলি, এইসব কথা আমাদের খুবই পরিচিত। আমাদের এখানেও মেয়েদেরকে এইরকম কথা শুনতে হয় নিয়মিত- ওড়না নাই কেন বা ওড়না জায়গামতো নাই কেন ইত্যাদি।

 

(৩)
ওরা তো এইসব কথা বলেই শুধু থেমে থাকে না, ওরা হামলা করে মানুষের উপর। ঐ রামসেনা নামের সংগঠনটির নেতা প্রমোদ মুথালিক আর তার সাঙ্গোপাঙ্গরা রাস্তায় পার্কে মাঠে ঘুরে বেড়ায়; ওদের হাতে থাকে লাঠি, সিঁদুরের কৌটা আর মঙ্গলসূত্র। যেখানেই দেখবে ছেলেমেয়ে একসাথে বসে গল্প করছে, ওদেরকে ধরে মারধর করে আর জোর করে ছেলেটাকে দিয়ে মেয়েটার কপালে সিঁদুর আর গলায় মঙ্গলসূত্র পরিয়ে দেয়। এইভাবে নাকি ওরা ভারতীয় সংস্কৃতি সুরক্ষা করে। আর নারীদের মধ্যে যারা পশ্চিমা পোশাক পরে বা ক্লাবে পাবে বা ডিসকোতে যায় বা রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে বা রেস্টুরেন্টে বসে ছেলেদের সাথে আড্ডা দেয়, বিড়ি সিগারেট খায় ওদের প্রতি এই রাম সেনারা অনলাইনে অফলাইনে ক্রমাগত গালাগালি করতে থাকে। এরা সব অসতী, চরিত্রহীনা বা দুশ্চরিত্রা কুলটা ইত্যাদি, এদেরকে মারতে হবে ধরতে হবে, কেটে ফেলতে হবে, ইন্ডিয়ায় থাকতে দেওয়া হবে না- এইসব নানারকম হুমকি।

শেষে ২০০৯ এ এসে ওরা নারীদের উপর হামলা শুরু করে। ২০০৯ এর জানুয়ারিতে একদিন রাতের বেলা কয়েকজন নারী ফিরছিলেন একটা পাব থেকে, এই রামসেনার লোকেরা ব্যাঙ্গালুরু শহরের রাস্তায় ওদের উপর হামলা করে ওদের কয়েকজনকে মারধর করে আহত করে। ব্যাঙ্গালুরু শহরের নারীদের জন্যে রাতের বেলা চলাচল একটু বিপদজনক হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যারা ক্লাবে ডিস্কোতে বা পাবে যেতে চায়, ওদের জন্যে তো একদম বিপদজনক একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়। রামসেনা আর ওদের নেতা প্রমোদ মুথালিক শহরে তর্জন গর্জন করে বেড়াতে থাকে- ভারতীয় সংস্কৃতি রক্ষার জন্যে ওরা অভিযান চালিয়ে যেতে থাকবে। পাব বা ডিস্কো থেকে কোন মেয়েকে বেড় হতে দেখলে তাঁকে রাস্তাতেই পেটানো হবে ইত্যাদি।
এটা জানুয়ারি মাসের কথা, সামনে ফেব্রুয়ারি। ফেব্রুয়ারিতে আবার ভ্যালেন্টাইনস ডে আছে। আর ভ্যালেন্টাইনস ডে সম্পর্কে ভারতে কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদিদের দৃষ্টিভঙ্গি আর প্রতিক্রিয়া সে তো আপনারা জানেনই। রামসেনার পক্ষে প্রমোদ মুথালিক এইবার ঘোষণে দিলেন যে এইবার ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে কোন ছেলেমেয়ে যদি রাস্তায় বের হয় তাইলে ওদেরকে দেখে নেওয়া হবে।

এই পর্যায়ে ব্যাঙ্গালুরুর নিশা সুজান ও তাঁর সাথে একদল নারী ফেসবুকে একটি গ্রুপ গঠন করেন the Consortium of Pub-going, Loose and Forward Women এই নামে। এই গ্রুপের কাজই ছিল শ্রী রামসেনার হুমকি, হামলা, গুণ্ডামি এইসবের প্রতিবাদ করা এবং নারীদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা।

না, সাধারণভাবে সকল নারী অধিকার বা নারীর প্রতি সকল শোষণ বঞ্চনা নিয়ে ওরা কথা বলতে বসেননি। ওদের একটাই কথা ছিল যে একজন নারী পাবে যাবে কিনা বা কী পোশাক পরবে বা ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপন করবে কী করবে না সেগুলি তার নিজের ইচ্ছা। নারী কীভাবে জীবনযাপন করবে সেটাতে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার শ্রী রামসেনা বা অন্য কারো নেই। লক্ষ্য করুন, ওরা গ্রুপটার নাম দিয়েছে কী? পাবগামী, শিথিল ও অগ্রসর নারীদের কনসোর্টিয়াম। স্পষ্টতই প্রতিবাদের ভাষায় নামকরণ এবং সেটাতে প্রতিবাদের লক্ষ্যটাও স্পষ্ট।

(৪)
ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে হুমকির মুখে সেই গ্রুপ থেকে নিশা সুজান এবং ওর বন্ধুরা একটা আহ্বান জানালেন সকলের উদ্দেশ্যে। আহ্বানটা ছিল যে সকলেই যেন শ্রী রামসেনার ব্যাঙ্গালুরু অফিসের ঠিকানায় প্রমোদ মুথালিকের উদ্দেশ্যে একটা করে গোলাপি রঙের প্যান্টি পাঠিয়ে দেয়। এইটার ওরা নাম দিয়েছে ‘পিঙ্ক চাড্ডি’। পিঙ্ক চাড্ডি কেন? কারণ চাড্ডি কথাটা ভারতে ওরা চরম দক্ষিণপন্থী বুঝানোর জন্যে ব্যাঙ্গার্থে ব্যাবহার করে- অনেকটা আমরা যে অর্থে ‘ছাগু’ ব্যবহার করি সেরকম, আর চাড্ডি হচ্ছে জাঙ্গিয়ার অপর নাম।

এই আহ্বানের পর একটা অভিনব কাণ্ড ঘটে যায়। ওদের গ্রুপটাতে পঁয়ত্রিশ হাজারের মতো সদস্য হয়ে যায় কয়েকদিনের মধ্যেই। মনে রাখতে হবে, এটা ২০০৯ সালের কথা। ফেসবুক তখনও এখনকার মতো এতোটা সর্বব্যাপী আকার ধারণ করেনি। আর সারা ভারত থেকে এমনকি ভারতের বাইরে থেকেও শ্রী রামসেনার দপ্তরে আসতে শুরু করে পিঙ্ক চাড্ডি। প্রথম একদিন দুইদিন এটা অনেকটা হাসি তামাশার ব্যাপার রয়ে যায় বটে, কিন্তু নারীদের পাঠানো পিঙ্ক চাড্ডির সংখ্যা এতো বাড়তে থাকে যে ব্যাপারটা আর হাসি তামাশার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ভারতের শীর্ষ সংবাদ মাধ্যমগুলি এই নিয়ে প্রতিবেদন করতে থাকে, আর শ্রী রামসেনার দপ্তরে এসে পৌঁছাতে থাকে সব পিঙ্ক চাড্ডি।

এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারও এই বিষয়টাতে নজর দিতে বাধ্য হয়। প্রবল জনমত তৈরি হয়। শ্রী রামসেনার পক্ষে প্রমোদ মুথালিক বাধ্য হয় সংবাদ সম্মেলন করে ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে ওদের কর্মসূচি ও হুমকি প্রত্যাহার করতে। ভ্যালেন্টাইনস ডের দুইদিন আগে প্রমোদ মুথালিক সহ শ্রী রামসেনার একঝাঁক নেতা কর্মীকে পুলিশ ধরে নিয়ে প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন দিয়ে আটকে রাখে। পিঙ্ক চাড্ডি আন্দোলন সফল হয়।

(৫)
এই আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা অংশগ্রহণ করেছেন, নিশা সুজান ও গ্রুপের অন্য সদস্যরা, ওরা সবাই ব্যাঙ্গালুরুর শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নারী। ওদের দাবি এবং কর্মসূচি সবই নারীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। নারীর জন্যে অর্থনৈতিক মুক্তি না বৈষম্যের অবসান এইসব কোন দাবিই ওদের ছিল না। ছোট একটা আন্দোলন, কিন্তু এই আন্দোলনটিকে কি ছোট করে দেখার সুযোগ আছে? নাই। কারণ যত তুচ্ছই মনে হোক না কেন, এই আন্দোলনের ফলে ব্যাঙ্গালুরু এবং ভারতের সর্বত্র নারীর এইসব ব্যক্তিগত স্বাধীনতার একরকম একটা প্রাথমিক স্বীকৃতি এসেছে। পুরো কার্যকর হতে হয়তো অনেক দেরি আছে এখনও, কিন্তু সূচনাটা তো হয়েছে। এটা কম কীসে!

এইসব আন্দোলন অবশ্যই নারীমুক্তির আন্দোলনের পথে একেকটা পদক্ষেপ, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে চূড়ান্ত নারী মুক্তির লড়াইটা আরও বড়, আরও ব্যাপক। সেজন্যে এইসব ছোটখাটো বিচ্ছিন্ন আন্দোলনকে নিয়ে মিলাতে হবে সমাজ বদলের লড়াইয়ের সাথে।

 

আগের লেখাটার লিংক:

ডমিটিলা চুঙ্গারা এবং নারীবাদী আন্দোলন

https://womenchapter.com/views/34623

শেয়ার করুন:
  • 332
  •  
  •  
  •  
  •  
    332
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.