শুধু পুরুষরাই কি পুরুষতান্ত্রিক? নাকি দায় নারীদেরও?

আসমা সুলতানা প্রভা:

নারীদের জানা উচিত পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব এর জন্য পুরুষরা নয়, অনেক দায় আপনারও। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার জন্য শুধুমাত্র পুরুষরা দায়ী এমনটা ভাবা বোকামি। সাধারণত যাবতীয় শোষণ-বৈষম্য শুরু হয় পরিবার থেকে। পরিবারে শিশুদের সবচেয়ে বেশি সময় কাটে মায়ের সাথে। আর এখান থেকেই সমস্যার শুরু হয়।

সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরও মেয়েটির কাছে মায়ের ডাক পড়ে যাতে বড় ভাইকে ভাতখানি বেড়ে দেওয়া হয়। ছেলে বিয়ে করার পর ঘর থেকে আলাদা হয়ে গেলেই শাশুড়ি খুব করে বলে উঠলেন, যত দোষ তার ছেলের বউয়ের। পাশের বাসার মেয়েটির প্রেমের বিয়ে হচ্ছে দেখে আন্টি খালারা বলে উঠলেন, মেয়েটি বড়ই বেয়াদব, লাজ-লজ্জার বালাই নেই।

বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো আলোচনায় অংশ নেয়া মাত্রই বড় বোনরা বলে ফেললেন, খুব বাড় বেড়েছে মেয়েটির! সদ্য বিবাহিত মেয়েটি বাবার বাড়ি এসে যখন তার কষ্টের কথা মায়ের সাথে ভাগাভাগি করছে, তখন মায়ের একটাই উত্তর, মেয়েদের সব সহ্য করে চলতে হয়, মানিয়ে নিতে হয়। মেয়ে একটু পড়ালেখা বেশি করতেই তার বিচক্ষণ মা বলে বসলেন, মেয়েদের এতো পড়ালেখা দিয়ে কী হবে! চাকরিজীবী বউয়ের টাকা যখন সংসারের কাজে লাগে, তখন শাশুড়ি ছেলেকে নিয়ে উপহাস করতে পিছপা হন না। এই গেলো দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাবলী।

আমাদের সমাজ বাস্তবতা বলে, সমাজে কিছু দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, যেগুলোকে আমরা বৈধ বলে স্বীকৃতি দিয়ে থাকি। “পুরুষতন্ত্র” তার একটি। সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়মে সাধারণত নারী বা পুরুষ আচরণ করে থাকে। অর্থাৎ সমাজ যেভাবে একজন নারী ও পুরুষকে বেড়ে উঠতে শিক্ষা দেয় সেভাবেই তারা বেড়ে উঠে। সমাজ একজন নারী বা পুরুষের আচার-আচরণ, ভূমিকা, কেমন হবে তাও নির্ধারণ করে দেয়। এমনকি কোন কাজ কার জন্য হবে সেটাও সমাজ নির্ধারণ করে দেয়। এই নিয়ে জার্মান দার্শনিক নিটশের একটি বিখ্যাত উক্তি আছে। তিনি বলেন -“সমাজ বা রাষ্ট্রে চলতে গিয়ে আমরা কিছু দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ তৈরি করি। তৈরি করে আমরা ভুলে যাই, আর ভুলে যে যাই, তা-ও আমরা ভুলে যাই, ফলে তৈরি করা ওইসব দৃষ্টিভঙ্গি মূল্যবোধই আমরা বৈধ আর স্বাভাবিক মনে করি।” অর্থাৎ পুরো বিষয় এটা দাঁড়ায় যে আমরা সমাজে ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিকতাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি। তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো “পুরুষতন্ত্র”।

আমাদের বেশিরভাগ মানুষের মাঝে একটা কথা বলার প্রবণতা অনেক বেশি লক্ষ্য করা যায়, তা হলো কেবল পুরুষ মানেই পুরুষতান্ত্রিক। আদৌ তা পুরোপুরি সত্য নয়। চমকে উঠার মতো একটা সত্য এই যে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে আরো বেশি বিকশিত করতে বড় ভূমিকা পালন করে নারীরা। কারণ একজন নারী মাত্রই একজন মা। সাধারণত শিশু জন্মের পর মাকেই দেখাশোনা করতে হয়। মায়ের সাথে অধিক সময় কাটাতে হয়। ফলে সন্তান তাই শেখে যা সে তার মাকে করতে দেখে। একজন সন্তানের কাছে মায়ের গুরুত্ব অনেকখানি। তাই মা যা করে তার অনেকটা সন্তানরা অনুকরণ করে। আর পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তৈরির শুরুটা ঠিক এখান থেকেই। একজন নারী যে পুরুষতন্ত্র দ্বারা শোষিত হন, পরবর্তীতে অবচেতন মনে তারই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তার সন্তানদের মাঝে এই ধারা প্রবাহিত করার মাধ্যমে।

একজন নারী যেমন পুরুষতান্ত্রিক প্রথাকে ভাংতে জানেন, তেমনি এই প্রথাকে যুগ যুগ ধরে তার সন্তানদের মধ্যে পাকাপোক্ত করে প্রসারিতও করতে পারেন। তবে নারীদের মধ্যে পুরুষতান্ত্রিক ধারণাগুলোকে পাকাপোক্ত করার প্রবণতাই বেশি লক্ষ্য করা যায়। একটা উদাহরণ দেই, পেঁয়াজ কাটতে হবে বলে আপনি আপনার মেয়েটিকে বললেন এবং একই কাজ করতে আপনার ছেলেটিও এলো, কিন্তু আপনি করতে দিলেন না এই বলে যে, এটা তার কাজ নয়, এবং এই কাজ করতে গেলে হয়তো সে হাত কেটে ফেলবে। তাতে করে ছেলেটি বুঝে নিলো যে সে তার বোনের চেয়ে আলাদা এবং এই কাজ তার জন্য নয়।
আপনি যেমনটা শেখালেন সে ঠিক তেমনটাই শিখলো। ঠিক তখন থেকেই তার মাথায় এই ধারণার জন্ম নেয় যে রান্না মাত্রই মেয়েদের কাজ। হায়! এখানে তার দোষ কী বলুন? আপনি আপনার মেয়েকে হয়তো চাকরিজীবী হিসেবে দেখতে চান, কিন্তু যত বিপত্তি বাঁধে যখন ছেলের বউ চাকরিজীবী হয়! আপনার কাছে ছেলের বউ মানেই ঘরের যাবতীয় কাজ করার দায়িত্ব তার, বাইরে তার কোনো কাজ তার থাকতে পারে না। আপনার শাশুড়ী আপনার সাথে যেভাবে আচরণ করেছে আপনিও একই আচরণ আপনার বউয়ের সাথে করবেন। এইটাই রীতি। ফলে আপনার ছেলেও তার সাথে খারাপ আচরণ করতে পিছপা হয় না। কারণ আপনার কাছ থেকেই শেখা।

একজন নারী যখন পুরুষতন্ত্র দ্বারা শোষিত হন, তখন আমরা সবাই পুরুষ দ্বারা শাসিত পুরুষতন্ত্রের দোহাই দিয়ে পার পেয়ে যাই। কিন্তু হায় এই পুরুষতন্ত্র দ্বারা শোষিত সেই নারীই আবার পুরুষতন্ত্রকে তার সন্তানদের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলে। একজন নারী যেভাবে পুরুষতন্ত্র দ্বারা শোষিত হয়, পরবর্তীতে নিজের ছেলে মেয়ের মধ্যে তারই প্রতিফলন ঘটান প্রতিটি কাজে, আচার-আচরণে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাই নারীদের বলি, আপনি যেভাবে শেখাবেন আপনার সন্তান সেভাবেই শিখবে। কেবল একজন নারীই পারেন তার সন্তানদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে। শুধুমাত্র আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি আপনার সন্তানদের নারী/পুরুষ হিসেবে তৈরি করবেন, নাকি মানুষ হিসেবে?

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা যায়, বিবাহিত নারীদের ৮০ শতাংশই নির্যাতনের শিকার। আর সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন স্বামীর হাতে। কিন্তু বেশিরভাগ নারীই সেটা চেপে যান বা নিরবে সহ্য করেন। ফলে নিজের মেয়েদের সামনে একই পন্থা অবলম্বন করার উদাহরণ স্থাপন হয়। একজন নারীকে কিছু কথার সম্মুখীন হতে হয় প্রতিনিয়ত, যেমন, মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে না কেন? বাচ্চা কবে নিচ্ছো? ডিভোর্সি মেয়ে আমার ছেলের বউ হতে পারবে না; কালো মেয়ে নয়, ছেলের জন্য ফর্সা মেয়ে লাগবে — এই কথাগুলো একজন পুরুষের চেয়ে নারীর মুখ থেকেই বেশি শোনা হয়।
রাস্তায় ইভটিজিং এর শিকার হলে মা বলেন চুপ থাকো, বড় আওয়াজে কথা বললে শুনতে হয় মেয়েদের বড় গলায় কথা বলতে নেই। এমনকি ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে অনেক নারীই ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটিকেই দায়ী করেন। নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, গত ২৭ জানুয়ারি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় জন্মদিনের কথা বলে ডেকে নিয়ে অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের পর ফেসবুক লাইভে এসে উল্লাস করেছিল চার ধর্ষক। এইরকম একটি ঘটনায় রীতিমতো সবাই স্তম্ভিত হয়ে যায়। কিন্তু অবাক করা কথা হলো, আমার হলের (বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হল) দুইজন আপুকে মেয়েটিকেই দায়ী করে কথা বলতে শুনি। তাদের ভাষ্য হলো, মেয়েটি সুযোগ দিয়েছে বলেই এমনটা হয়েছে। কথা শুনে যে কেউ রীতিমতো অবাক হবেন সন্দেহ নেই। একজন নারীই যখন ধর্ষণের মতো ঘটনায় একজন মেয়েকেই দায়ী করেন তখন আসলেই বলার মতো কিছু থাকে না। অথচ এই নারীই আবার একজন নারীর সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াতে পারেন।

বাংলা ট্রিবিউনের প্রধান প্রতিবেদক উদিসা ইসলাম বলেন, “আমাদের সমাজের বড় জটিলতা হচ্ছে নারীরা পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ নিয়ে চলে। নারীর আসল মুক্তি তখনই ঘটে যখন সে নিজেকে পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ থেকে মুক্ত করতে পারে।” একজন নারীও পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শ নিয়ে চলে, তবে সমস্যাটা ঠিক এই জায়গায়। একজন নারীর পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব পোষণ পুরুষের চেয়েও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে কারণ এই পুরুষতান্ত্রিকতা একজন নারী প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত করেন। নারীর সত্যিকার মুক্তি কেবল তখনই সম্ভব যখন তারা নিজেদের পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত করতে পারবেন। তা না হলে এই সমাজ ব্যবস্থা পরিবর্তন শুধুমাত্র কঠিনই নয়, বরং দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.