পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যে সম্পর্ক কোথায়?

Kamla Bhasin

পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্র শব্দযুগল বর্তমান সময়ে খুবই পরিচিত। পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্র সম্পূর্ণ আলাদা দুইটি বিষয় হলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপটে এরা পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। পুঁজিবাদ যেমন কাজে লাগাচ্ছে পুরুষতন্ত্রকে, ঠিক তেমনই আবার পুরুষতন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করছে পুঁজিবাদকে। কিন্তু ঠিক কীভাবে এরা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল, এবং উদ্ভব ঘটল পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্র পরিভাষাটির? ভারতীয় উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিবাদের মধ্যকার সম্পর্কের ব্যাখ্যা দিয়েছেন কমলা ভাসিন, যিনি বিবেচিত হন দক্ষিণ এশিয়ার প্রধানতম নারীবাদীদের একজন হিসেবে। ইংরেজি থেকে অনুবাদটি করেছেন – জান্নাতুল নাঈম পিয়াল।

 

ব্যক্তিগত সম্পত্তি ধারণার উদ্ভবের মাধ্যমেই নারীর পুরুষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল। কেননা পুরুষরা জানতো না তাদের সন্তান কারা, এবং যদি তারা চাইতো ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভাগিদার তাদের সন্তানরা হোক, তাহলে তাদের দরকার ছিল প্রথমে নারীদের চারপাশে বেড়া দেয়া। বিষয়টি অনেকটা এমন যে আপনি যত বেশি সম্পদশালী হবেন, আপনার ততোই প্রয়োজন হবে নারীদের নিয়ন্ত্রণ করার। পুঁজিবাদ ও পুরুষতন্ত্রের একটি দ্বৈত সম্পর্ক রয়েছে, কারণ পুঁজিবাদের প্রয়োজন সস্তা শ্রম, আর নারীরাই হলো সবচেয়ে সস্তা শ্রমিক।

অবশ্য এটি (পুঁজিবাদ) নারীদের দিয়েছে তাদের ঘর থেকে বের হয়ে আসার সুযোগও। যদিও প্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে খুবই কম, (কেননা মাত্র কয়েক বছর আগেও ৯০ শতাংশ নারী কাজ করতো অপ্রাতিষ্ঠানিক সেক্টরে), তবু এটি কিছু নারীর জন্য কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে, এবং তাদেরকে দিয়েছে বেড়ে ওঠার সুযোগ। কিন্তু পুঁজিবাদের প্রয়োজন আরও বাজারের। তারা যুদ্ধকে তাদের নিজেদের সুবিধায় কাজে লাগায়; ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি হলো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলোর মধ্যে একটি।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হলো পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্র, যেটি লোভের কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে, এবং যেটি নারী ও তার শরীরকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করছে। নারী শরীর ব্যবহৃত হচ্ছে পর্নোগ্রাফি, কসমেটিক পণ্য, ফিল্ম থেকে শুরু করে এমনকি খেলাধুলা ও খেলনার প্রচারণাতেও।

পুঁজিবাদ মার্কেটিংয়ের সকল পুরুষতান্ত্রিক ধারণাকে কাজে লাগিয়েছে, যেমন পর্নোগ্রাফির মাধ্যমে পুরুষের যৌনতাকে নারীর যৌনতার উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। নারীদেহকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাজার, এবং সেটি এক পর্যায়ে রূপ নিয়েছে নারী পাচারে (অপ্রাতিষ্ঠানিক বা যা-ই হোক)। এখন সেটি একটি মিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি। কসমেটিক শিল্পের প্রধান ফোকাস হলো নারীর শরীর ও নারীর সৌন্দর্য, এবং সেটিও আজ বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি।

রাজীব গান্ধী ভারতীয় অর্থনীতিকে মুক্ত করে দেয়ার সাথে সাথেই একের পর এক, চার থেকে পাঁচজন ভারতীয় নারী বনে যান ‘মিস ওয়ার্ল্ড’, ‘মিস ইউনিভার্স’ ইত্যাদি। অথচ এর আগে একজন ভারতীয় নারীও এসব খেতাব জেতেনি। মিরান্ডা হাউসের মতো কিছু নারীবাদী সংস্থা ছিল ভারতে, যারা এ ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাকে নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু কদিন পর তাদের অস্তিত্বই বিলীন হয়ে যায় ভারতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে।

আজকাল ক্রিকেট দলগুলোরও বিভিন্ন ম্যাচো নাম রাখা হচ্ছে, যেমন ডেয়ারডেভিলস কিংবা নাইট রাইডার্স। খুবই ছোট পোশাক পরা, গ্ল্যামারাস চেহারার চিয়ারলিডিং স্কোয়াড ছাড়া আজকাল এই খেলাটি যেন উপভোগই করা যায় না। এভাবে বাণিজ্যিকীকরণ ও অমানবীকরণের মাধ্যমে ক্রীড়াজগতেরও যৌন প্রতীক গড়ে উঠেছে।

টয় ইন্ডাস্ট্রিও প্রচুর মুনাফা করে: মেয়েদের জন্য তারা বানায় বার্বি ডল, আর ছেলেদের জন্য সুপারম্যান বা স্পাইডারম্যান। ছোট ছোট ছেলেদের হাতে খেলনা বন্দুক তুলে দেয়ার মাধ্যমে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা হয় সহিংস ও মারমুখী হতে, যা অনেক পুরুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

আরেকটি বিশাল বিলিয়ন ডলার ইন্ডাস্ট্রি হলো সিনেমা ও টিভি ইন্ডাস্ট্রি, এবং বলাই বাহুল্য, সেগুলোও কাজে লাগাচ্ছে পুরুষতন্ত্রকে। ভারতীয় চলচ্চিত্রগুলোতে নারীদের জন্য অবমাননাকর, কুরুচিপূর্ণ লিরিকসমৃদ্ধ, সেক্সিস্ট গান থাকে, এবং এটি খুবই বেদনাদায়ক যে এসব ছবি শত-কোটি টাকার ব্যবসা করে। আসলে এর মাধ্যমে আমাদের সমাজেরই প্রতিফলন ঘটে।

এমনকি ধর্মীয় প্রথা ও উৎসবগুলো, যেমন ক্রিসমাসও পুঁজিবাদের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। একইভাবে ভারতে ও নেপালে আপনি দেখবেন করবা চৌথে উপবাস করা হয়। ভারত হলো বিবাহ-প্রথার একটি বিশাল বাজার, এবং ভারতীয় বিয়েগুলো খুবই পুরুষতান্ত্রিক ঘরানায় সম্পন্ন হয়।

পুঁজিবাদ আসলে সর্বত্র বিদ্যমান। তাই আমি ইতঃপূর্বেও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদীদের সমর্থন জানিয়েছি। আমি তাদের সাথে একমত যে সংগ্রামটি হতে হবে শ্রেণীশত্রু ও পুরুষতন্ত্র উভয়ের বিরুদ্ধেই (এছাড়া ভারতে আছে জাতপাত, যুক্তরাষ্ট্রে আছে বর্ণবাদ)। যতদিন না আমরা বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্যারাডাইম থেকে মুক্ত হতে পারছি, ততদিন আমরা পুরুষতন্ত্র থেকেও মুক্তি পাবো না। এবং এই বিষয়গুলো এই মুহূর্তে অসম্ভব মনে হচ্ছে।

 

তথ্যসূত্র:

https://feminisminindia.com/2018/04/03/kamla-bhasin-developmental-feminism/

http://kashmirtimes.com/newsdet.aspx?q=81642

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.